আব্বা/ শর্বরী ফাহমিদা

3
176

লিখেছেন । শর্বরী ফাহমিদা


শেখ নিয়ামত আলী। জন্ম : ৩০ এপ্রিল ১৯৩৯; চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। প্রয়াণ : ২৪ নভেম্বর ২০০৩; ঢাকা, বাংলাদেশ। বাংলাদেশি সিনেমার এক ক্ষণজন্মা, দুর্দান্ত ‘অথর’ ফিল্মমেকার। বানিয়ে গেছেন মাত্র তিনটি ফিচার ফিল্ম : সূর্য দীঘল বাড়ী [যৌথ-নির্মাণ; ১৯৭৯], দহন [১৯৮৬] ও অন্য জীবন [১৯৯৫]। তিনটির জন্যই বেস্ট ডিরেক্টর ক্যাটাগরিতে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আরও অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার শোভিত হয়ে আছে তাঁর নামের পাশে। প্রিয় সিনে-পাঠক/সিনে-দর্শক, জন্মদিনে তাঁর কন্যার স্মৃতিচারণ থেকে এক ঝলক বোঝাপড়া করা যাক এই সুমহান ফিল্মমেকারের সঙ্গে, আসুন…

Sheikh Niamat Ali
শেখ নিয়ামত আলী । ‘অন্য জীবন’-এর শুটিংয়ে…

 

‘চিরতার পানি খেয়েছিস সবাই?’
আমরা তিন ভাই বোন আব্বার এমন প্রশ্নে সমস্বরে বলে উঠতাম, ‘জ্বী!’
‘নে, এবার দৌড় শুরু কর।’
ভোর পাঁচটার সময় উঠে মায়াকানন, আহাম্মদবাগ, কদমতলা, নন্দীপাড়া হয়ে আবার বাসায় ফেরা। আব্বার সাথে মর্নিং ওয়াক করা মানে জীবন সম্পর্কে সম্মুখ কিছু জ্ঞানার্জন করা। তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা শেখ নিয়ামত আলী। আর এভাবেই শুরু হতো আব্বার সাথে আমাদের প্রতিটি দিন। তখন এ সমস্ত এলাকা খুব একটা উন্নত ছিল না।

Sheikh Niamat Ali
শেখ নিয়ামত আলী । ‘দহন’-এর শুটিংয়ে…

এখন যেটা অতীশ দিপঙ্কর সড়ক, তখন এই রাস্তাটি এতটা প্রশস্তও ছিল না। দু’পাশে ছিল সারি সারি বস্তির ঝুপড়ি ঘর। সেগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটার সময় বলতেন, ‘জীবন্ত চলচ্চিত্র! দেখ, এদের দিকে তাহলে বুঝবি কি সুন্দরভাবে পৃথিবীটা উপভোগ করতে পারছিস।’ আর তাই তো তাঁর চলচ্চিত্র দহন-এ এ উঠে এসেছে ঐসব পোড় খাওয়া জীবনের কথকতা।

…খালি গায়ে,
মাদুরে বসে
স্ক্রিপ্ট লিখতেন
ঘন্টার পর ঘন্টা…

আব্বার লেখার ব্যাপারটি ছিল খুব অদ্ভুত! খালি গায়ে, মাদুরে বসে স্ক্রিপ্ট লিখতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। যেহেতু খুব বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেননি তিনি, সেহেতু তাঁর এক একটা গল্প তৈরি হতো বাস্তবতার নিরিখে। তাতে কত ঘষা মাজা। জীবনে চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে কি অসীম গভীরতা নিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতেন! সূর্য দীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রটি যখন পুরস্কার পেল, পরিচিত সবার মুখে যখন শেখ নিয়ামত আলী আর মশিহউদ্দিন শাকের কাকুর নাম, তখন অল্প-বিস্তর বুঝতে পারতাম, খুব একটা বড় কিছু হয়েছে নিশ্চয়; কিন্তু এই সাধারণ মানুষটিকে দেখে কখনোই মনে হয়নি যে কি অসাধারণ কাজ করার ক্ষমতা রাখেন! অন্য জীবন চলচ্চিত্রে নায়িকা চম্পা খুব মজার একটা কথা বলেছিলেন, আব্বাকে না কি ওনার কাছে স্কুলমাস্টারের মতো লাগে!

Sheikh Niamat Ali
শেখ নিয়ামত আলী । ফিল্মমেকার-অভিনেতা খান আতাউর রহমান ও মিউজিক ডিরেক্টর আমানুল হকের সঙ্গে…

শেখ নিয়ামত আলীর প্রত্যেকটা চরিত্র একেবারেই বাস্তবজগত থেকে উঠে এসেছে। যেখানে নেই এক বর্ণও অবাস্তবতার ছোঁয়া, দহন-এর মুনির, আইভী, কিংবা সাদিক অথবা মামা– প্রতিটা চরিত্র আমি নিজ চোখে দেখেছি আমাদের মায়াকাননেই। আবার অন্য জীবন চলচ্চিত্রে আলী, ফরিদা, ও মুচি– এদেরকেও আমি বাস্তবজীবনে দেখেছি আড়াইহাজার ও রুপগঞ্জে! তাঁর গল্পের চরিত্ররা সবাই বাস্তব। আর গল্পের প্রেক্ষাপট তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থার ধারক ও বাহক বলা যায়– যা চলচ্চিত্রে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।

…কালজয়ী নির্মাতা হওয়া
সত্ত্বেও কেন যেন
কোথাও আজ আর
শেখ নিয়ামত আলীকে
খুঁজে পাই না…

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মাত্র তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। সবক’টিই সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত। বিনিময়ে পেয়েছেন অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার, সম্মাননা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন বিদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে। কালজয়ী নির্মাতা হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন কোথাও আজ আর শেখ নিয়ামত আলীকে খুঁজে পাই না! তাতে অবশ্য কিছুই যায়-আসে না; কারণ, ভালো কাজের মূল্যায়ন আজ না হয় কাল হবেই।

শেখ নিয়ামত আলী । ‘অন্য জীবন’-এর শুটিংয়ে; পাশে আছেন তাঁর স্ত্রী; এবং সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন

চলচ্চিত্রের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা আর মায়া থেকেই ভীষণ দারিদ্রের মধ্যে থেকেও কখনো মেইনস্ট্রিম নির্মাতা হতে পারেননি শেখ নিয়ামত আলী। আজ ৩০ এপ্রিল, এই মহান মানুষটির ৭৯তম জন্মদিন। আমরা তোমার সন্তানেরা তোমার শেখানো ও দেখানো পথে যেতে না পারার জন্য লজ্জিত, কারণ তোমার মতো কষ্টসহিষ্ণু আমরা হতে পারিনি।

Sheikh Niamat Ali
শেখ নিয়ামত আলী । মাস্টার ফিল্মমেকার, বাংলাদেশ

ছবি । শর্বরী ফাহমিদার সৌজন্যে...
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; বাংলাদেশ । কিংবদন্তি ফিল্মমেকার শেখ নিয়ামত আলীর কন্যা

3 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন