“জহির আমাকে ছাড়ল না…”/ কিংবদন্তি সিনেমাটোগ্রাফার আফজাল চৌধুরী

0
122
Afzal Chowdhury

সাক্ষাৎকার । ওমর শাহেদ


বাংলাদেশের প্রথম কালার, প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবির ক্যামেরাম্যান তিনি। জহির রায়হানের অনেক ছবিরও ক্যামেরাম্যান। ২ মে ২০১৬, কালের কণ্ঠ-এর সাক্ষাৎকারভিত্তিক নিয়মিত সাপ্তাহিক সাময়িকী কথায় কথায়-এর পক্ষে মুখোমুখি হলে আফজাল চৌধুরী জানালেন জহির রায়হানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা…


 

ওমর শাহেদ
জহির রায়হানের সঙ্গে কিভাবে পরিচয়?

আফজাল চৌধুরী
জহির রায়হানের সঙ্গে খুব পরিচয় ছিল না। যখন ইউএসএসে চাকরি করতাম, তখন প্রেস ক্লাবের অ্যাসোসিয়েট মেম্বার ছিলাম। বিকজ আই ইউজ টু ওয়ার্ক ইন অ্যা প্রেস। প্রেস ক্লাবে আড্ডা মারতাম, নাজির আহমেদের সঙ্গে চা খেতাম, আড্ডা দিতাম। ওখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। এ জে কারদার আসত, চা খেত, গল্প করত। এক দিন দুই দিন দেখেছি, আই ডোন্ট রিমেম্বার থট অ্যাবাউট জহির রায়হান। দ্যাট টাইম হি ওয়াজ নো বডি। ১৯৬২ সালে খান আতা লাহোরে একটি চিঠি নিয়ে এলো। সে গিয়েছিল গানের রেকর্ডিংয়ের জন্য। চিঠি, পিআইয়ের রিটার্ন টিকিট নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এসে বলল, জহির রায়হান একটি ছবি করবে, তুমি এই চিঠি পড়। বেচারা এই ছবির জন্য খুব পেরেশান আছে। দেশের ক্যামেরাম্যান তার পছন্দ হচ্ছে না। তখন আমি তাঁকে বলেছিলাম, লাহোরে এক বাঙালি ছেলে আছে, মুম্বাইতে ট্রেনিং পেয়েছে, ও তোমার কাজ করবে। আমার বিশ্বাস ও পারবে। এ কথায়ই কিন্তু সে রাজি হয়েছে। এই টিকিট দিয়েছে। চিঠিতে জহির বলল, আফজাল তুমি এক মাসের ছুটি নিয়ে এখানে এসো। আমার মনে হয়, এক মাসের মধ্যে ছবিটি শেষ করে দিতে পারব। এলাম। এই যে এলাম তারপর থেকে তো আর যাইনি। এই ছবি করার পর থেকে [হাসি] জহির আমাকে ছাড়ল না।

Zahir Raihan
কাচের দেয়াল

ওমর শাহেদ
এটি কোন ছবি?

আফজাল চৌধুরী
‘কাচের দেয়াল’।

ওমর শাহেদ
করাচি-লাহোরে যখন ছিলেন, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বাঙালি কেমন ছিল?

আফজাল চৌধুরী
আধা বাঙালি এক ডিরেক্টর আমার সঙ্গে বাংলা বলত। তার নাম ভুলে গিয়েছি। হি ওয়াজ অ্যা পয়েট, অনেক বড় বড় আর্টিস্টের অনেক গান লিখেছে। নামকরা লোক… এনিওয়ে… লাহোরে একজন ছিল অর্কেস্টার বাঁশি বাজাত, ও ভেরি ফেমাস, ফিল্মের গানের সঙ্গেও বাঁশি বাজাত। আর শবনমের বাঙালি এক মেকআপম্যান ছিল খুব ভালো।

ওমর শাহেদ
আপনাদের প্রতি মনোভাব কেমন ছিল?

আফজাল চৌধুরী
যখন যুদ্ধ হলো, তখন তো আমি ওখানে। আমি, রহমান, শবনম, রবীন, নজরুল ইসলাম, এহতেশাম, এহতেশামের পুরো ফ্যামিলিই ছিল। রেগুলার শুটিং করতাম। লাহোরে করেছি, লাইটবয় সব পাঞ্জাবি। শুনতাম, যুদ্ধ হচ্ছে, উন্ডেড সোলজাররা সব আসছে। লোকে এসব বলত। তবে আমরা খুব নর্মালি কাজ করেছি, লাহোরে কিছু হয়নি। শুনতাম করাচিতে কিছু হয়েছে, লোকে বলত। দোকানে, কাঁচা বাজারে, সবজি, মাছ কিনতে যেতাম। ওরা তো সব সময় বলত, প্রথমে ভাবত আমরা করাচির, ওয়াইফ তো শাড়ি পরত, করাচির মেয়েরা বেশি শাড়ি পরে। তারপর জানল যে না আমরা ফ্রম ইস্ট পাকিস্তান। দোকানদাররা আমাদের বলত, আমরা তো ভেবেছিলাম, শেখ সাহেব ইলেকশনে জিতে গেছেন, তিনিই প্রাইম মিনিস্টার হবেন। তিনি তো আমাদের সঙ্গে এলেন না, দেখা করলেন না, কিছু বললেন না। আমরা তো তাঁকে দেখতে চেয়েছিলাম, তাঁর কথা শুনতে চেয়েছিলাম। বললাম, ভাই এগুলো সব পলিটিক্স, প্যাঁচানো জিনিস, এগুলো নিয়ে আলাপ করতে চাই না। কিন্তু এই যে যুদ্ধ হচ্ছে, মার খাচ্ছে, ওখানে রেডিও-টেলিভিশনে বলত সব ঠিক আছে। বিবিসি মাঝে মাঝে আমাদের সত্যি খবর জানাত। কিন্তু ওরা কোনো রকম অ্যাগ্রেসিভ কিছু করেনি। শবনমকে পূজা করত ওরা। ওকে সাইন করানোর জন্য পাঞ্জাবি প্রডিউসাররা তো লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকত। এবার ও গিয়েছিল, ওকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য পিটিভি ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। রবীন, শবনমকে এখান থেকে নিয়ে গিয়েছিল। এখানে ওদের এআরওয়াই চ্যানেল আসে। তাতে কিছু দেখেছি। ইউ নট বিলিভ, মানে পিটিভির টেলিভিশন স্টেশনে গাড়ি থেকে নামছে শবনম, মেয়েরা সব ফুল দিয়ে তাকে বরণ করছে [হাসি]।

ওমর শাহেদ
তারপর এখানে জহির রায়হানের চিঠি পেয়ে এলেন?

…ওই টাইমের
এফডিসি তো
হলো হেভেন। ওখানে
প্রচুর ব্র্যান্ড নিউ
লাইট ছিল…

আফজাল চৌধুরী
এলাম। জহির রায়হান আমাকে ব্রিফ করল যে ওর মাথায় কী আছে। এটি আমারও জানা দরকার। সে বলছে হোয়াট হি ওয়ান্টস– একটি লোয়ার মিডল ক্লাস জয়েন্ট ফ্যামিলি। তাদের বাড়িতে অনেকগুলো রুম আছে। ফ্যামিলিতে মামা-ভাগ্নে অমুক-তমুক থাকে। এই বাড়ির ভেতরেই সব ঘটনা ঘটে। বাড়িতে এমন এক পরিবেশ যে স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার, বাইরে থেকে বেশি আলোও আসে না। অন্ধকার সব, খুব লোয়ার গ্রেডেড। এখানে আমি চাই– ওই রুমে যে একজন বসে আছে ১৫-২০ ফুট দূরে, আর একজন এখানে বসে আছে। এ থাকবে ক্লোজে, আর ও লং শটে। জহির বলছে, দুজনকেই ফোকাসে রাখতে হবে। এও কথা বলছে, ওও কথা বলছে। মাঝে মাঝে কেটে ক্লোজে যাব, কিন্তু ওপেনিং রকম হতে হবে। বললাম, আচ্ছা। বাড়িতে পরিষ্কার লাইট নেই, ডিম লাইট, মানে দেখলেই মনটি ছোট হয়ে যায়। আমি তো মনে মনে চিন্তা করে রেখেছি যে লোকি ফটোগ্রাফির কথা বলছে সে। আর আমি মাস্টার অব দ্যাট। [হাসি]। এনিওয়ে, একটি সুবিধা আমি পেয়েছিলাম এফডিসিতে, এটি আমাকে সাহায্য করেছে আর ওই টাইমের এফডিসি তো হলো হেভেন। ওখানে প্রচুর ব্র্যান্ড নিউ লাইট ছিল। আমি লাইট কন্ট্রোলের জন্য কিছু কাটার বানিয়েছিলাম। যাতে ওপরে-নিচে লাইট দেওয়া যায়। যাকে বলে রিয়েল পেইনটিং উইথ লাইট।

আফজাল চৌধুরী । ছবি : কাকলী প্রধান

ওমর শাহেদ
প্রথম দিনের শুটিং?

আফজাল চৌধুরী
প্রথম দিন স্টুডিওতে যখন লাইট করি, কাটার বানিয়ে, এফডিসিতে স্ট্যান্ডের অর্ডার দিয়েছিলাম, নাজির আহমদ সাহেব সব বানিয়ে দিলেন। স্টুডিওতে রিউমারও হয়েছিল, চৌধুরী সাহেব লাইট করে আবার লাইট কেটেও দেয়। এ ছিল তাদের কাছে একেবারে নতুন ব্যাপার। কোনোদিন তারা এসব শোনেনি। এখানে লাইট হতো দেখতাম, গেজেটও আছে, কেউ ইউজ করেনি। সব পড়ে আছে। সব নিয়ে এসে লাগালাম। আরো অনেক গেজেট ছিল। প্রথম দিন শুটিং করলাম। জহির আগে থেকে বোধ হয় ল্যাবে বলে রেখেছিল যে আজকের শুটিংয়ের প্রিন্ট প্রসেস করে কাল সকালে এসে প্রিন্ট দেখবে। এটি করেছিল যে কনফিডেন্স নেওয়ার জন্য। তো লাইটিংয়ের ফ্যাসিলিটি এত ভালো ছিল আর ফোকাসের এই যে সিস্টেমটি আমাকে বলল, একে বলে ডিপ ফোকাস। ইনডোরে এই ডিপ ফোকাস ইটস অ্যা ভেরি টাফ জব। আর্টিস্টের জন্য আরো প্রবলেম। কারণ যে অ্যাপাচার ইউজ করে আমি যে ডেপথ পাব, অফকোর্স আমাকে লেন্সও চুজ করতে হবে অ্যাকরডিং টু লাইট।

ওমর শাহেদ
পরদিন?

আফজাল চৌধুরী
৯টা থেকে আমাদের শিফট শুরু হয়, ৮টা পর্যন্ত দেড় শিফট করে কাজ করতাম আমরা। মাঝখানে দুপুরে লাঞ্চের ব্রেক। ডিনারের ব্রেক হতো না। পরদিন সকালে টেলিফোন করে জহির বলল, চল একটু রাশ দেখে আসি। বললাম, হয়ে গেছে? বলে যে হ্যাঁ, কাল বলে দিয়েছি। গেলাম দেখতে। দেখা যখন হয়ে গেল জহির আমার গলা জড়িয়ে ধরল। বলল, দিস ইজ হোয়াট আই ওয়ান্টেড। ডেলি আমরা ৮০, ৯০, ৯৫, ১০০ শট নিতাম।

ওমর শাহেদ
তিনি কাকে নিতে চেয়েছিলেন?

আফজাল চৌধুরী
ও ওই বেবি ইসলামকে নিতে চেয়েছিল। তখন তো বেবি এখানে এক নম্বর মাতব্বর। কলকাতা থেকে এসেছে। কলকাতা থেকে এলেই অনেক, আবার অজয় করের ছাত্র। আমাদের তো নাক সিঁটকাত, তবে আমার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। জহির তাকে বলেছে, ৩০ দিনের মধ্যে ছবি শেষ করতে চাই। সে বলেছে যে তুমি যে সিস্টেমে বলেছ, আমি দুটো কী তিনটি শট ডেলি নিতে পারব। এই শুনেই [হাসি] তার মাথায়, তখন সে খান আতার সঙ্গে পরামর্শ করল– এ তো শুটিং করতে ছয় মাস লাগাবে। আমি তো পারব না, আমার তো এত পয়সা নেই। স্টুডিও বিল যা হবে, কোত্থেকে দেব? তার পরই আমাকে ডাকা। কলকাতার নিউ থিয়েটারকে ডুবিয়েছে ডিরেক্টর, ক্যামেরাম্যানরা। আমি তো খবর রাখি। ডিরেক্টররা পান চিবুতে চিবুতে ধুতি ঠিক করতে করতে লেটে আসত। সেটে এসে অ্যাসিসট্যান্টকে বলত, কী অবস্থা? ওরা বলে, স্যার আমাদের সব রেডি। তখন তারা বলত, আজ শরীর ভালো যাচ্ছে না। এক কাজ কর, প্যাকআপ করে দাও। এই করে করে নিউ থিয়েটারকে ওরা ডুবিয়েছে। ওইখানে শেখা সব লোক এখানে কাজ করত। জহিরের তো মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। সে ডেসপারেট হয়ে আমাকে এনেছে। আমি টোয়েন্টি নাইন অ্যান্ড হাফ ডেইজ ছবি শেষ করেছি। শুটিং কমপ্লিট।

ওমর শাহেদ
লাস্ট সিন বাদে পুরোটাই তো ইনডোরে হলো?

আফজাল চৌধুরী
কিছুটা জহিরের ছাদে, ওই গান একটি, আতার…।… ওই এক নম্বর ফ্লোর, তখন তো একটিই ফ্লোর ছিল।

ওমর শাহেদ
আপনার অ্যাসিসট্যান্ট কে ছিল?

আফজাল চৌধুরী
ওই টাইমে অরুণ ছিল বোধহয়; না, অরুণ ছিল না, পরে এসেছে। স্টুডিওরই কোনো অ্যাসিসট্যান্ট ছিল।

ওমর শাহেদ
কাচের দেয়াল চলল কেমন?

আফজাল চৌধুরী
তখনকার বিজনেস পয়েন্ট অব ভিউতে ছবি ভালো যায়নি। বাট অ্যাপ্রিসিয়েশন পেয়েছে। পাকিস্তান টাইমে তো প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড ছিল, ৯টি প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। অ্যাকসেপ্ট আমারটি। আমার নাম ছিল, কিন্তু পাকিস্তানি ডেলিগেট ছিল জুরিবোর্ডের মেম্বার, তারা দেখল ওয়েস্ট পাকিস্তানের তারা কেউ পাচ্ছে না, তখন বলল যে ঠিক আছে ক্যামেরাম্যানকে দাও। একজন ভালো ক্যামেরাম্যান ছিল সে [হাসি] পেয়েছে।

Zahir Raihan
সঙ্গম

ওমর শাহেদ
এই ছবির পরই তো সিদ্ধান্ত নিলেন যে যাবেন না?

আফজাল চৌধুরী
কাচের দেয়াল-এর পর জহির বলল, কালার ছবি করব, তোমার তো কালারে এক্সপেরিয়েন্স আছে। তোমাকে দিয়ে কালার ছবি করব। তখন এফডিসিতে কালার ল্যাবটি লাগাচ্ছিল। তখনও ল্যাব কমপ্লিট হয়নি, টেস্টিং চলছে। কালার ল্যাবে যে ছিল সে করাচির ছেলে। নাজির আহমদকে বলেছিলাম একজন ভালো ছেলে আছে, ইংল্যান্ডের ল্যাবে কাজ করেছে। ওর চাকরি হয়ে গেল। ’৬২-তে এখানে বিয়েও করলাম। আর যাওয়া হয়নি।

ওমর শাহেদ
এর পরের ছবি তো সঙ্গম?

আফজাল চৌধুরী
কাহিনী তেমন কিছু নয়– একজন প্রফেসর এক গ্রুপ ছেলেমেয়েকে নিয়ে হিল ট্র্যাক্টসে পিকনিকে গেছে। ওখানে হল্লা, গান-বাজনা, প্রেম এসব আছে। এর মধ্যে ঝড় তুফান হওয়ায় সব এদিক-ওদিক চলে যায়। জঙ্গলের মধ্যে চলে যায়, পাহাড়ের মধ্যে খোঁজাখুঁজি করে কেউ। গিমিক আছে, জঙ্গলের মধ্যে জংলিদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ওরা সব ট্রিপিক্যাল গান, ঢাকঢোল বাজায়। ফরেন ছবিতে হয় না, জংলিদের মুখে কালার-টালার দিয়ে… একটি মূর্তিও আছে। মূর্তিটি বানানো হয়েছিল আউটডোরে, এখানকার ফ্রোরে। তখন তো এত ফ্লোর ছিল না।

ওমর শাহেদ
কালার স্ক্রিন, প্ল্যানের কথা বলেছিলেন তিনি? 

আফজাল চৌধুরী
কালার স্ক্রিন বলতে মেকআপের প্রবলেম ছিল এখানে, বললাম সেফেস্ট মেকআপ হচ্ছে নরমাল যে পার্টিতে আমরা যাই সেই মেকআপ। তখন তো এখানে মেকআপের তেমন কিছু ছিল না। আর এই পার্টি মেকআপের সমস্যা হচ্ছে ঘেমে গেলে বেশিক্ষণ থাকে না, আবার লাগাতে হয়। তাছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না। ওই সিস্টেমেই আমরা মেকআপম্যানকে ট্রেনিং দিয়েছিলাম। আর কাপড়চোপড়ের ক্ষেত্রে, নরমাল যা পরে সেগুলো আছে। তবে হিরো-হিরোইনের জন্য শাড়ি, কাপড় অবশ্য চিন্তা করেই করেছিলাম।

ওমর শাহেদ
তাহলে ওই ছবির অধিকাংশ শুটিংই আউটডোরে?

আফজাল চৌধুরী
ইয়েস।

ওমর শাহেদ
কিভাবে সেখানে থাকতেন?

জাহাজের ডেকের
মতো, ওপরে
কাঠ, নিচে খালি, তিনটি
বেডরুম ছিল। আমরা
সবাই বারান্দায় শুয়ে
থাকতাম…

আফজাল চৌধুরী
আমাদের রাঙামাটির রাস্তায় শুটিং হচ্ছে। ওখানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাংলো ছিল। জাহাজের ডেকের মতো, ওপরে কাঠ, নিচে খালি, তিনটি বেডরুম ছিল। আমরা সবাই বারান্দায় শুয়ে থাকতাম। সুমিতা-জহির রুম পেয়েছিল, মেয়েরা একটি রুম আর হিরো হারুণ আর খলিল, ওদের জন্য এক রুম। খলিল অবশ্য আমাদের সঙ্গেই লাইন ধরে শুয়ে থাকত।

ওমর শাহেদ
তাহলে তো রিস্কের মধ্যে ছিলেন, আউটডোরে শুট করছেন, ঠিক হচ্ছে?

আফজাল চৌধুরী। ছবি : ইত্তেফাক

আফজাল চৌধুরী
দ্যাটস অ্যা গুড কোয়েশ্চন। তিন-চার দিন শুটিংয়ের পর আমাদের প্রোডাকশন ম্যানেজারকে ওকে বললাম, ভাই তুমি প্রিন্ট নিয়ে যাও। আমার অবশ্য চিন্তা কিছু ছিল না। একটিই মাত্র চিন্তা ছিল নতুন ল্যাব। অবশ্য যারা ল্যাবে কাজ করছিল, তাদের কালার সম্পর্কে, কেমিক্যাল সম্পর্কে খুব ভালো নলেজ ছিল। নতুন মেশিন, তখন বেবি ইসলাম ছিল জেনারেল ম্যানেজার– এই ধরনের রোলে। সে নিজেই এক্সপোজ করে টেস্ট করছিল। এনিওয়ে, তো আমরা পাঠালাম। এখানে তো রিউমার ছিল মার্কেটে যে আলটিমেটলি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই প্রিন্ট হবে। [হাসি] তো চলে আসার পরে, প্রোডাকশন ম্যানেজার চিটাগাংয়ে কাকে টেলিফোন করেছে, আমাদের সংবাদটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বলেছে যে ল্যাবের রিপোর্ট ইজ অ্যাক্সিলেন্ট, নো প্রবলেম। বলে, যা করছ, ঠিক সেটার ওপরই শুটিং করতে বলেছে। খবরটি আমরা শুনলাম। শুনে আমরা খুব খুশি। তখন জহির বলল যে, চলো। এখন জহিরের স্টোরির মেইন টার্নআপ যে কেমন করে মেয়েরা হারিয়ে গেল? একটি দুর্ঘটনা?

ওমর শাহেদ
হু!

…রাতে আড়াইটা-তিনটার
সময়, আমরা তো বাইরে
ডেকের ওপর শুয়ে
আছি, ওখান থেকে
পানির ছিটা আসছে। জহির
লাফ দিয়ে বেরিয়ে
এসেছে। এই ওঠ,
ওঠ। কী ব্যাপার? দেখি
পুরো তুফান…

আফজাল চৌধুরী
সেই দুর্ঘটনা জহির করেছিল যে একটি বিরাট ঝরনা হবে, ওখানে কিছু একটি ঘটনা হবে। আমরা ঝরনা খুঁজতে গেলাম। বাংলা থেকে বোধ হয় দেড়-দুই কিলোমিটার ভেতরের দিকে, হেঁটে গেলাম। বিরাট এক কালো পাথর, ওপর থেকে ঝিরঝির করে পানি পড়ছে [অট্টহাসি]। তুফান বা বৃষ্টি হলে যে বিরাট ঝরনা থেকে প্রচণ্ড বেগে পানি পড়ে বোঝা গেল। কী রকম কপাল! উই আর ভেরি ডিসঅ্যাপয়েন্টেড। ওই লোকের মুখেই শুনে ওই জায়গায় গেলে এ রকম পাবে, ও রকম পাবে। লোকে বলল, এ রকম ঝরনা আছে, চলেন যাই। আমরা খুবই ডিসঅ্যাপয়েন্টেড। জহিরের মন খারাপ, সে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রাতে আড়াইটা-তিনটার সময়, আমরা তো বাইরে ডেকের ওপর শুয়ে আছি, ওখান থেকে পানির ছিটা আসছে। জহির লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই ওঠ, ওঠ। কী ব্যাপার? দেখি পুরো তুফান। বাড়িটি এ রকম করে হেলছে। আমাদের বলল, চৌকির তলে ঢোক। জহিরের বেডরুমে চৌকির তলে ঢুকে পড়লাম। প্রায় দু-তিন ঘণ্টা এ রকম বৃষ্টি, তুফান। কাচের গ্লাস তো, গাছের পাতা যখন পড়ে, মনে হয় বুলেট এসে পড়ছে, ঠাস ঠাস আওয়াজ হচ্ছে। শোঁ শোঁ বৃষ্টি হচ্ছে। ভোর ৫টা-৬টার সময় ঝড় থেমেছে। তখন আবার দরজা খুলে দেখি, গাছে একটি পাতাও নেই। যে গাছে আগে খুব বাঁদর ঘুরে বেড়াত, সেই গাছে একটিও পাতা নেই। জহির দৌড়ে এসে বলল, আফজাল ঝরনায় চলো। গেলাম। সত্যি তো, ও মাই গুডনেস। মানে কী রকম করে পানি পড়ছে, বিশ্বাস করা যায় না। আর বৃষ্টি তো হচ্ছেই। বললাম, জহির তুমি ঝরনা চেয়েছিলে, এই দেখো। সে বলল, শুটিং করতে হবে। বললাম, এ রকম বৃষ্টি, এমন পরিবেশ। কালার ছবি তো কিছু আসবেই [হাসি]। প্রোডাকশনকে বললাম, একটা কিছু করো। তারা ছইটই বানিয়ে মাথার ওপরে দিল। আর্টিস্টকে ডাকল। ডেকে ওই পাহাড়ের ওপরে… আর ওখানে এত অন্ধকার চারদিকে যে অ্যাপাচার ২৮ ওপেন লেন্সে শুটিং করতে হলো। ইনডোরে আমরা যে লেন্সে শুটিং করি সেই লেন্সেই শুটিং করলাম। একটি বিরাট সাপ ক্রস করে গেল। গাছ ভেঙে পড়েছে। হিরোকে ওটি দিয়ে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আসতে হবে। মানে ফ্যান্টাস্টিক, আনবিলিভেবল। জহিরের এ রকম ঘটনা আরেকটি হয়েছে, আমার শুটিংয়ে– জ্বলতে সুরুজ কে নিচে

Zahir Raihan
জ্বলতে সুরুজ কে নিচে

ওমর শাহেদ
এটি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি?

আফজাল চৌধুরী
না প্ল্যান ছিল, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের। কিন্তু লাহোরে গিয়ে আমরা হিসেব করে দেখলাম, দুই লাখ টাকা পার্থক্য। দুই লাখ টাকা বেশি হলে কালারে করা যায়। মানে ম্যাটারিয়াল আর প্রসেসিংয়ে দুই লাখ-আড়াই লাখ টাকা বেশি লাগে। সে বললো কী করব? আমি বললাম যে না তুমি কালারেই কর।

ওমর শাহেদ
বরফে শুটিং করবেন?  

আফজাল চৌধুরী
থানা থেকে আমাদের দুইজন পুলিশ দিল যে ওখানে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। জহির তো পটপট করে হেঁটে চলে গেল। আমি তো কিছুদূর গিয়ে বসে পড়লাম। পাহাড়ে কতক্ষণ চলা যায়। তারপর আস্তে ধীরে গিয়ে দেখি, বরফ হয়েছিল, কিছু কিছু জায়গায় জমে আছে। তার ওপরে শুয়ে শুয়ে সে বলে, এই দেখ আফজাল বরফ। আমি বললাম এই বরফে তো কাজ হবে না। অনেক বরফ দরকার। আর এখানে শুটিং করতে হেলিকপ্টার লাগবে। তখন সে বলে হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি, কী করব? চল ফিরে যাই। এই একই অবস্থা। সকালে ৫টা-৬টার সময় জহির দরজার ওপর ধাক্কাচ্ছে। বলছে, আফজাল বেরিয়ে এস। ব্যালকনির সামনে খোলা জায়গা, সেখানে আমাদের গাড়ি ছিল। আমরা ওপর থেকে দেখি গাড়িগুলো সব ঢেকে গেছে বরফে। আর জহিরের কী লাফালাফি। কো-ইনসিডেন্সটি দেখেন– ও চেয়েছিল বৃষ্টি, পেয়ে গেল। ও চেয়েছিল বরফ, পেয়ে গেল। আশ্চর্য। গান পিকচারাইজ করা হলো বরফে।

ওমর শাহেদ
প্রথম কালার ছবি সঙ্গম মুক্তি পাওয়ার পরে রেসপন্স কেমন ছিল?

আফজাল চৌধুরী
সঙ্গম খুব ভালো চলেছে। পাকিস্তানের করাচি, লাহোরে খুব ভালো চলেছে।

ওমর শাহেদ
এটি তো জহির রায়হারের প্রথম উর্দু ছবি। কেন উর্দুতে তিনি ছবিটি করলেন?

আফজাল চৌধুরী
তখন তো ওয়েস্ট পাকিস্তানের উর্দুূ ছবি এখানে আসত। এসে হিট করত। লাহোরের অনেক ছবি হিট করেছে। তো আমরা কেন বানাব না? খালি জহির রায়হান না, নজরুল ইসলাম করেছে, এহতেশাম করেছে, আরো কে কে করেছে।

ওমর শাহেদ
এরপর কোন ছবি করেছেন?

আফজাল চৌধুরী
সিনেমাস্কোপ বাহানা। জহির চেয়েছিল সে প্রথম কালার ছবি করবে, প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি বানাবে। আমাদের এখানে তখন কেবল দুটি ছবি কালারে হয়েছে। একটি করেছিল এহতেশামের ভাই মুস্তাফিজ, আরেকটি জহির রায়হান। ওটা কালারে, জহিরেরটি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট।

Zahir Raihan
জীবন থেকে নেয়া

ওমর শাহেদ
এরপরের ছবি তো জীবন থেকে নেয়া?

…জহির জানত
যে, আমি এই
ছবি নিয়ে বিপদে
পড়ব। ও খুব
সাহসী ছিল, অ্যা
ভেরি ব্রেভ ম্যান…

আফজাল চৌধুরী
এটি তো পলিটিক্যাল ছবি। এর মধ্যে মিসেস রওশন জামিলকে দেখানো হয়েছে আইয়ূবের রোলে। ও চাবি নিয়ে থাকত। জহির জানত যে, আমি এই ছবি নিয়ে বিপদে পড়ব। ও খুব সাহসী ছিল, অ্যা ভেরি ব্রেভ ম্যান। তো সেজন্য আমাকে বললো যে, দেখ এই ছবিটি আমি খুব তাড়াতাড়ি শেষ করবো। কারণ এর মধ্যে কোনো গিমিক নাই। তুমি সাধাসিধে কাজ করে যাবে। কোনো চিন্তা-ভাবনার কিছু নেই এর মধ্যে। যেটি শট হবে, সেভাবে লাইটিং করবে। যা তোমার ডে হবে, সেভাবে করবে। আর যেটি তোমার নাইট হবে সেভাবে কাজ করবে। যত দ্রুত পার, ছবিটি শেষ কর। কারণ যত তাড়াতাড়ি করব তত আমি সেইফ সাইডে থাকব। ওর মধ্যে আমরা কোনো এক্সপেরিন্টে করিনি। যেমন আমরা কোনো খারাপ কথা শুনলে তার ফেস দেখিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে দ্রিম, দ্রাম আওয়াজ দেই। সেটি সে ভিজ্যুয়ালি দিতে চেয়েছিল। মানে সাউন্ডে যে ইফেক্টটা আসে সেটি ভিজ্যুয়ালি জুম লেন্সে সে দিতে চেয়েছিল।

ওমর শাহেদ
‘আমার সোনার বাংলা’র যে পিকচারাইজেশন– এটার ব্যাপারে তাঁর কোনো সাজেশন ছিল?

আফজাল চৌধুরী
না, এটির সাজেশনটি হচ্ছে, আউটডোরে যে গানগুলো হয়েছে আর্টিস্ট নট ইমপরটেন্ট, গগনটি… এক কোনায়, নেচারটি; ডিরেক্টরের চিন্তাটি ক্যামেরাম্যান স্ক্রিনে দেবে। আমাকে বলেছে, আমি এটি চাই এবং আমি তাকে ফ্রেম দেখাই। কোনো একটি সিরিয়াস কিছু হলে আমি তাঁকে ফ্রেম দেখাই। এটি আমার পুরোনো অভ্যাস। এর শুটিং হয়েছিল সাভারে। প্রভাত ফেরি একদম রিয়েল। ওই রাতের ১২টা থেকে আমরা বসে আছি। একটি ক্যামেরা দিয়েছিলাম আমার এক অ্যাসিসটেন্টকে, কবি জসীমউদ্দীনের ছেলে। তাকে বলেছিলাম, তুমি রাস্তার শুটিং করবে। আর আমি আর জহির রায়হান শহীদ মিনারের কাছাকাছি। ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানের ওপরে দাঁড়িয়ে আমরা জুম লেন্স লাগিয়েছিলাম। ওখানে ভোরে সব আসছেন সেগুলো শুটিং করা হয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগ জহির নিজে অপারেট করেছে। ডিসকাস করার তো টাইম ছিল না।


প্রথম প্রকাশ । কথায় কথায়  কালের কণ্ঠ । জাতীয় দৈনিক, বাংলাদেশ ।। ১৩ মে ২০১৬ 
সাক্ষাৎকারক ও কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; সাংবাদিক । বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন