ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র এবং উৎসব সংস্কৃতি/ খন্দকার সুমন

0
148
filmfree

লিখেছেন খন্দকার সুমন


 

লচ্চিত্রপ্রেমিদের সমসাময়িক নান্দনিক চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ কেবল একটি ভালো চলচ্চিত্র উৎসবই পূরণ করতে পারে। চলচ্চিত্র উৎসব হচ্ছে এমন এক উৎসব, যে উৎসবে আয়োজকদের মনোনীত চলচ্চিত্র বোদ্ধামণ্ডলী দ্বারা নির্বাচিত কিছু নান্দনিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্র উৎসবটিতে যদি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়, তাহলে তাকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বলে। তবে একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব মানেই শুধু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়। পৃথিবীর নানান দেশের নান্দনিক চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সেই চলচ্চিত্রের নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র বোদ্ধাগণ উৎসবটিতে উপস্থিত থাকেন। উৎসবটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের সম্প্রীতি, শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ভাবনা আদান প্রদান হয়। বিশ্ব রাজনীতি পৃথিবীকে যখন নানান সীমারেখায় ভাগ করে চলছে, তখন একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের সকল সীমারেখা মিশিয়ে পৃথিবীর নানান বর্ণের, নানান জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের একত্রিত করে শান্তি ও সম্প্রীতির উদাহরণ তৈরি করে।

filmfree
ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

“নান্দনিক চলচ্চিত্র, মননশীল দর্শক, আলোকিত সমাজ” স্লোগানে সম্প্রতি শেষ হলো ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবরেইনবো ফিল্ম সোসাইটি গত ছাব্বিশ বছর ধরে উৎসবটির আয়োজন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ক’টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে থাকে, তার মধ্যে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অন্যতম এবং প্রসিদ্ধ। একটি চলচ্চিত্র উৎসবের মান প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয় বিগত দশ বছরে উৎসবটিতে নির্বাচিত এবং প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মানের উপর। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের নানান দেশের নান্দনিক চলচ্চিত্র নিয়মিত নির্বাচন ও প্রদর্শন করে আসছে। উৎসবটির ষোড়শ আসরে এশিয়ান প্রতিযোগিতা, রেট্রোস্পেকটিভ, বাংলাদেশ প্যানারোমা, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলড্রেনস ফিল্ম, স্পিরিচুয়াল ফিল্মস, ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ও উইমেনস ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশের পাশাপাশি আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ইরান, ইরাক, ফ্রান্স, চীন, কাজাখস্তান, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুর্কি ও সুইজারল্যান্ড-সহ ৬৪টি দেশের ২১৬টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তন, জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল ও প্রধান মিলনায়তন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তন, রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র এবং স্টার সিনেপ্লেক্সে চলচ্চিত্রগুলোর প্রদর্শনী হয়।

…একটি নান্দনিক চলচ্চিত্রে
নির্মাতা চলচ্চিত্রটির
ফ্রেমে ফ্রেমে আলোয়, রঙ্গে, শব্দে,
নৈশব্দে, কম্পোজিশনের পরতে পরতে
দর্শকের জন্য নানান
বিষয় তুলে রাখেন…

স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্তদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রগুলো পেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর কোনো সুযোগ নেই। এই চলচ্চিত্রগুলোতে নান্দনিক উপাদান থাকলেও বাণিজ্যিক উপাদান না থাকায় সাধারণ দর্শকেরা দর্শনীর বিনিময়ে দেখার আগ্রহ দেখান না। তাই একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য একটি চলচ্চিত্র উৎসব অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক আয়োজন। যেখানে নির্মাতার কোনো প্রকার খরচ ছাড়াই তার নির্মিত চলচ্চিত্রটি দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে। ইউটিউব বা ভিমিওর যুগে এমন কথা অনেকেই মানতে চাইবেন না। সেজন্য কিছু বাড়তি কথা না বললে বিষয়টি ধোঁয়াশা থেকেই যাবে।

আমরা ঘরে বসেই প্রার্থণা করতে পারি, তবুও কেন প্রত্যেক ধর্মেই উপসানালয়ে গিয়ে প্রার্থণা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে? কারণ গৃহস্থালির নানান কর্ম ব্যস্ততায় আমরা স্রষ্টার প্রতি যতটা মনযোগ দিয়ে প্রার্থণা করতে পারি, তারচেয়ে অনেক বেশি মনযোগী হয়ে সংযুক্ত হতে পারি উপসানালয়ে। একই রকম ইউটিউব বা ভিমিও-তে ঘরে বসে যখন একটি ছোট পর্দায় চলচ্চিত্র দেখি, তখন চলচ্চিত্রটির সাথে সঠিকভাবে সংযুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না। একটি নান্দনিক চলচ্চিত্রে নির্মাতা চলচ্চিত্রটির ফ্রেমে ফ্রেমে আলোয়, রঙ্গে, শব্দে, নৈশব্দে, কম্পোজিশনের পরতে পরতে দর্শকের জন্য নানান বিষয় তুলে রাখেন। সেই বিষয়গুলো একটি অন্ধকার ঘরে বড় পর্দায় ভালো প্রজেকশন এবং ভালো শব্দ যন্ত্র ছাড়া সংযুক্ত করা সম্ভব না। তাই প্রয়োজন বাড়তি মনযোগ এবং বাড়তি আয়োজন।

filmfree
ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

ফিরে আসি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রসঙ্গে। একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব মানে মহাকাণ্ড! পৃথিবীর নানান দেশের মানুষ আসে উৎসবটিতে। তাদের জন্য থাকা, খাওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আয়োজন নিঃসন্দেহে ঢাকার মতো অগোছালো শহরে একটা মহাকাণ্ডই বলা যেতে পারে। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকরা সেই কাণ্ডটি সফলভাবেই সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন। ঢাকার বর্তমান বাস্তবতায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর স্থানগুলো স্বল্প দুরত্বের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হয়েও রাস্তায় যানজটের কারণে একই দিনে আলাদা আলাদা স্থানে আগ্রহের বা পছন্দের চলচ্চিত্র দেখা সম্ভব না। ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্তদৈর্ঘ্য বিভাগে দেশ-বিদেশের ৫২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। মাত্র ৭২ ইঞ্চি পর্দায় অনিয়ন্ত্রিত শব্দযন্ত্রে নান্দনিক চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হলে দর্শক চলচ্চিত্রগুলোর সাথে সংযুক্ত হতে না পারায় অস্বস্তিতে পড়েন। আগেই বলেছিলাম, নান্দনিক চলচ্চিত্রের জন্য প্রয়োজন একটু বাড়তি আয়োজন। উৎসবের এই আসরে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে প্রজেকশন এবং শব্দযন্ত্র ভালোমানের থাকায় এখানে প্রদর্শিত চলচ্চিত্র দর্শক তৃপ্তি নিয়ে দেখেছেন।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা বিষয়ক ফোর্থ ইন্টারন্যাশনাল উইমেন ফিল্মমেকারস কনফারেন্স-এর আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের চলচ্চিত্র অভিযাত্রার গল্পের পাশাপাশি নারী নির্মাতাদের নানা প্রতিবন্ধকতার গল্পও শোনান এই কনফারেন্সে। আয়োজকদের এই আয়োজনটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ছাড়া আরও কিছু আয়োজন থাকে, তার মধ্যে চলচ্চিত্রবিষয়ক কর্মশালা অন্যতম। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অংশ হিসেবে অষ্টম ঢাকা আন্তর্জাতিক সিনে ওয়ার্কশপ-এর আয়োজন করা হয়। উৎসবে আসা বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র বোদ্ধাগণ বিভিন্ন সেশনে ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছেন।

filmfree
ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

এশিয়ায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় ফার্স্ট এশিয়ান ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাসেম্বলি সভা। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আমন্ত্রণে এশিয় অঞ্চলের ১২টি দেশের চলচ্চিত্র সমালোচক অংশ নেন সভাটিতে। আলোচনায় উঠে আসে ভারতের মতোই এশিয়ার অন্য দেশ সমূহে চলচ্চিত্র সমালোচনার গুরুত্ব বৃদ্ধি করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

দীর্ঘদিন পর  ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরোমা বিভাগটি আবার যোগ হয়েছে। বিভাগটি বাংলাদেশের নান্দনিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য একটি ভালো উদ্যোগ হলেও পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান মিলনায়তনে প্রদর্শনীর জন্য ভালো প্রজেকশন না থাকায় দর্শক হতাশ হয়েছেন।

…একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
চলচ্চিত্র নির্মাতার নেটওয়ার্কিংয়ের
জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হলেও
বাংলাদেশি নির্মাতাদের প্রতি
আয়োজকদের উদাসিনতা
ছিল লক্ষণীয়…

কিছুসংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাতার ব্যক্তিগত প্রচারণায় কিছুটা দর্শক পাওয়া গেলেও, ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের নিজস্ব প্রচারণার অবহেলায় উৎসবটিতে দর্শক সমাগম কম হয়।

filmfree
ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলচ্চিত্র নির্মাতার নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হলেও বাংলাদেশি নির্মাতাদের প্রতি আয়োজকদের উদাসিনতা ছিল লক্ষণীয়। উৎসবে বিদেশি অতিথিদের জন্য হসপিটালিটি থাকলেও বাংলাদেশি নির্মাতাদের জন্য এ রকম কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আয়োজকদের স্বেচ্ছাসেবী দলের কমিউনিকেশন ভালো না থাকায় টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে তথ্য-বুথ ও অফিস-বুথে সাধারণ দর্শক-সহ বাংলাদেশি নির্মাতাদের সাথে অশোভন আচরণ এবং হয়রানি উৎসবে সাধারণের সম্পৃক্ততায় বাধা তৈরি করেছিল।

নানান প্রতিকূলতার মাঝে থেকেও সার্বিকভাবে মানের দিক থেকে ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাধারণ দর্শকের কাছে গড়মানের একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।আমি আশাবাদী, উৎসবটির সম্ভাবনাময় নানান ভালো দিকগুলো কাজে লাগিয়ে আগামি ১৭তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশের সাধারণ দর্শক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে একটি আদর্শ মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপহার দিবে।

ছবি
ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বুলেটিন-এর সৌজন্যে
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার, বাংলাদেশ ।। ফিল্ম : পৌনঃপুনিক; অঙ্গজ

মন্তব্য লিখুন