হো সিয়ো-সিয়েন : সেলুলয়েডে তাইওয়ানের কথক ও তার ‘ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই’/ আকরাম খান

0
146
Hou-Hsiao-hsien

ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই
Hǎishàng Huā
ফিল্মমেকার । হো সিয়ো-সিয়েন
প্রডিউসার । শোজো ইচিয়ামা; ইয়াং তেং-কুয়েই
স্টোরি । হান বাংগিং
স্ক্রিনপ্লে । চু তিয়েন-ওয়েন
সিনেমাটোগ্রাফার । পিন বিং লি
এডিটর । চিং-সং লিও
মিউজিক । ইয়োশিহিরো হাননো
আর্ট ডিরেক্টর । ওয়েন-ইং হুয়াং
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । টনি লিয়ুং চিউ-ওয়াই [ওয়াং]; মিকিকো হালা [ক্রিমসন]; ভিকি ওয়েই [জেসমিন]; কারিনা লাউ [পার্ল]; শুয়ান ফাং [জেড]; মিচেল রেইজ [এমারাল্ড]; রেবেকা পান [হুয়াং] 
ভাষা । কান্তোনিজ; সাংহাইনিজ
রানিংটাইম । ১৩০ মিনিট
দেশ । তাইওয়ান
রিলিজ । ১৯৯৮
অ্যাওয়ার্ড । বেস্ট ডিরেক্টর, বেস্ট আর্ট ডিরেক্টর [এশিয়া প্যাসিফিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ১৯৯৮]

লিখেছেন আকরাম খান


 

জু, মিজুগুচি, কুরোসাওয়া, ঋত্বিক, সত্যজিৎ, কিয়ারোস্তামি— এশিয়ার সৃজনশীল ও আঁতর চলচ্চিত্রকারদের এই ধারাবাহিকতায় নিঃসন্দেহে তাইওয়ানি পরিচালক হো সিয়ো-সিয়েন আরেকটি বিস্ময়। চীনের গাওডাং প্রদেশে ১৯৪৭ সালো হো’র জন্মের ঠিক এক বছর পরেই তার পরিবার তাইওয়ানের দক্ষিণে ঘর বাঁধে। ১৯৮০ সালে কিউট গার্ল [Jiùshì liūliū de tā] চলচ্চিত্রটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রকার হিসেবে হো’র যাত্রা শুরু। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত পরিচালকের মতোই তার প্রথম দুটি ছবি কিউট গার্ল ও ১৯৮১ সালে নির্মিত চিয়ারফুল উইন্ড-এর [Feng er ti ta cai] বর্তমানে কোনো প্রিন্ট পাওয়া যায় না। ১৯৮৩ সালে সরকারি প্রযোজনায় নির্মিত দ্য স্যান্ডউইচ ম্যান [Erzi de da wan’ou] চলচ্চিত্রটিতে হো-সহ পরিচালনায় ছিলেন আরো চারজন নতুন পরিচালক। চলচ্চিত্রটির নানন্দিক উৎকর্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল, এর বক্স-অফিস সাফল্য খুলে দেয় তাইওয়ানে শৈল্পিক চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার দরজা। একই বছর হো সিয়ো-সিয়েনের দ্য গ্রিন গ্রিন গ্রাস অব হোম [Zai na he pan qing cao qing] তাইওয়ানে সেরা ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হয়। পরপর দুই বছর ‘৮৪ ও ‘৮৫-তে হো’র দ্য বয়েজ ফ্রম ফেংকুয়েই [Fēngguì lái de rén], অ্যা সামার অ্যাট গ্র্যান্ডপা’স [Dōng dōng de jiàqī] চলচ্চিত্র দুটি ফ্রান্সের নানতে চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পায়। এ সময় বিশ্ব চলচ্চিত্র প্রেক্ষাপটে হো ব্যাপক সাড়া ফেললেও অ্যা সিটি অব স্যাডনেস-এর [bēiqíng chéngshì] ১৯৮৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন লায়ন প্রাপ্তি তাকে এনে দেয় আঁতর চলচ্চিত্রকারের স্বীকৃতি। ১৯৯৯ সালে তার পরিচালিত ফ্লাওয়ারস অব সাংহাইকে কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরিরা গোল্ডেন পাম-এর শর্টলিস্টে রেখেছিলেন।

…হো’র প্রথম দিকের
আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্রে
সরকারের চাপিয়ে দেয়া
সংস্কৃতি ও ভাষার বদলে
জনসাধারণের বহুমুখী সংস্কৃতি

ভাষার ব্যবহার
লক্ষ্য করা যায়…

তাইওয়ানে পূর্বে নয় ধরনের আদিবাসীদের বাস ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে এই দ্বীপ-ভূখণ্ডে চীন, পর্তুগিজ ও স্পেনিশরা আসা শুরু করে। ১৬২৪ সালে তাইওয়ান পর্তুগিজ ও স্পেনিশদের অধীনে আসে। চীন ১৬৬১-তে তাইওয়ান দখল করে নেয়। আঠারোশ শতকের শেষদিকে চীন-জাপান যুদ্ধে চীন পরাজিত হলে তাইওয়ান জাপানের অধীনে চলে আসে, পরবর্তী পঞ্চাশ বছর তাইওয়ান ছিল জাপানের উপনিবেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর তাইওয়ানে শুরু হয় মূল চীনা ভূখণ্ডের জাতীয়তাবাদীদের শাসন। দীর্ঘ পরাধীনতার সময়কালে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, গণঅভ্যুত্থানের চেষ্টাকে শাসকরা নির্বিচারে জেল-হাজতে পুরে ও ব্যাপক গণহত্যার মধ্য দিয়ে দমন করে। তাইওয়ানিদের নির্যাতনের ইতিহাস স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত হওয়া তো দূরের কথা, দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষ আলোচনা করতেও সাহস পেত না। অবশেষে ১৯৮৭ সালে তাইওয়ানে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে মার্শাল ল উঠে যাওয়ার পর লেখক-শিল্পীরা তাদের সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরতে শুরু করেন। হো’র প্রথম দিকের আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্রে সরকারের চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতি ও ভাষার বদলে জনসাধারণের বহুমুখী সংস্কৃতি ও ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

flowers of shanghai
ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই

১৯৮৭ সালের পর থেকে তার চলচ্চিত্রে তাইওয়ানিদের গুপ্ত ইতিহাস ও আমেরিকার সহযোগিতায় দ্রুত পরিবর্তনশীল নগরজীবনে আত্মপরিচয় সংকটে ভোগা উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রজন্মের ভোগ-বিলাসে ভেসে যাওয়া– এই দুই বিষয় মূলত ঘুরে-ফিরে এসেছে। অ্যা সিটি অব স্যাডনেস, দ্য পাপেটমাস্টার [Xìmèng rénshēng; ১৯৯৩], গুড মেন গুড উইমেন [Hǎonán hǎonǚ; ১৯৯৫]– রক্তাক্ত ইতিহাস উন্মোচিত করার এই ট্রিলজি-যাত্রার পর থেকে হো ফিরে এসেছিলেন সমসাময়িক তাইওয়ানে, গুডবাই সাউথ গুডবাই [Nánguó zàijiàn, nánguó; ১৯৯৬] চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রে হো চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের আদান-প্রদান ও তাদের জীবনে রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাবের গল্প বলার পর তাইওয়ান থেকে আরো দূরে সরে আরো অতীতে ফিরে গিয়ে ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই-এর মধ্য দিয়ে তার পূর্বসূরি চীনা সংস্কৃতিকে আরো ভালো করে বুঝে ওঠার প্রক্রিয়ায় যেন বর্তমানের তাইওয়ানকেই আরো স্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে অনুধাবন করতে চেয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই চলচ্চিত্রটি আমি একাধিকবার দেখার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিবারই নতুন ধরনের অসাধারণ এই চলচ্চিত্রটির নির্মাণশৈলী, বিষয়বস্তু, গল্প বলার ধরন প্রত্যক্ষ করে এর চলচ্চিত্রিক উৎকর্ষতায় মুগ্ধ হয়েছি।

ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই-এর যেসব বৈশিষ্ট্য আমার চিন্তাকে আলোড়িত করেছে, তা শব্দমালার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট আকার দেবার জন্য চলচ্চিত্রটি নিয়ে লিখব বলে মনস্থির করি।

flowers of shanghai
ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই

২.

হোং জিয়ানের সাংহাইনিজ ভাষায় রচিত উপন্যাসের চলচ্চিত্রে রূপান্তর হো সিয়ো-সিয়েনের ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই। চলচ্চিত্রটির ঘটনাস্থল ১৮৯৪ সালে ‘ফ্লাওয়ার হাউস’ নামে পরিচিত বিশাল দোতলা বাড়ি, যা মূলত একটি সুরুচিপূর্ণ পতিতালয়। পুরো চলচ্চিত্রটি এর অভ্যন্তরে চিত্রায়িত। ফ্লাওয়ার হাউসে বসবাসরত দেহপসারিণীদের বলা হয় ফ্লাওয়ার গার্ল [ফুলকুমারী]। শুধুমাত্র যৌন-আকাঙ্ক্ষা নয়, চীনের উচ্চবংশীয় ধনী পুরুষেরা ফ্লাওয়ার হাউসে যাতায়াত করে চীনা সংস্কৃতির মোহময় আদবকায়দায় শিক্ষিত ও সাজসজ্জিত, আপ্যায়নে পটিয়সী দেহপসারিণীদের সঙ্গলোভে [ফ্লাওয়ার গার্লরা জাপানের গেইসাদের সাথে তুলনীয়]। ফ্লাওয়ার হাউসের পৌর দেহপসারিণীরা ছোট ছোট মেয়েদের কিনে ফুলকুমারী হিসেবে গড়ে তোলে। ফুলকুমারীরা তাদের আন্টি [খালা] বলে ডাকে।

…মোমবাতির মায়াময় আলোয়
শান্ত পরিবেশে
ফুলকুমারীদের চামড়ার ভেতর
যেন চলতে থাকে অবিরাম
যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ; কিন্তু
মোহনীয় ফুলকুমারীদের সভ্য
পরিমিত অপরূপ মুখোশে
কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তিই
ফুটে ওঠে না…

চলচ্চিত্রটির কাহিনি কোনো একটি বা দুটি মূল চরিত্রকে কেন্দ্র করে এগোয় না। সমান্তরালভাবে এগিয়ে যায় বেশ কয়েকটি নারী-পুরুষের সম্পর্কের আদান-প্রদান ও টানাপোড়েনকে আবর্তন করে। চলচ্চিত্রটির শুরুতে আমরা দেখি, একটি ভোজসভায় টেবিল ভরা ধূমায়িত চীনা খাদ্যের চারপাশে মোমবাতির হালকা আলোয় ফ্লাওয়ার হাউসের উচ্চবংশীয় পৃষ্ঠপোষকদের মদ্যপানের খেলায় আমোদ-ফূর্তিতে মেতে থাকতে। এই দৃশ্যপর্বেই পরিচিত হই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে ওয়াং ও তার সহকর্মী হোয়াংয়ের সাথে। ওয়াং এক সময়ের নামকরা বর্তমানে কিছুটা ম্লান হয়ে আসা ফুলকুমারী ক্রিমসনের প্রধান খদ্দের। ক্রিমসনের চেয়ে কমবয়সী উঠতি ফুলকুমারী জেসমিনের সাথে ওয়াংয়ের ঘনিষ্ঠতা বিশাল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মধ্যবয়স্কা ক্রিমসনের মনে জাগিয়ে তোলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। চলচ্চিত্রটিতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওয়াং ও ক্রিমসনের দীর্ঘদিনের দৈহিক ও মানসিক সম্পর্ক থেকে গড়ে ওঠা একের প্রতি অপরের অধিকারবোধ। একদিন রাতে মাতাল অবস্থায় ওয়াং দরজার ফাঁক দিয়ে ক্রিমসনকে বিছানায় অন্য একটি পুরুষের সাথে দেখে রাগে-দুঃখে তাকে পরিত্যাগ করে জেসমিনকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু জেসমিনের তথাকথিত অবিশ্বস্ততায় সে হতাশ হয়ে ক্রিমসনের কাছে আবার ফিরে আসে। হোয়াংয়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গিনী ফুলকুমারী দয়ালু পার্ল– যে আবার খালার সত্যিকারের মেয়ে, তার বিশেষ অবস্থান ও পরিমিত ভদ্র ব্যবহারের কারণে খুব সঙ্গতভাবেই হয়ে ওঠে ফুলকুমারীদের অন্তর্কলহের মীমাংসাকারী।আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমতি যুবতী এমারেল্ড সাংহাইয়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ফুলকুমারী। অনেক দরকষাকষি করে শেষ পর্যন্ত সে তার জামিনদার ও খদ্দের লু’র সহযোগিতায় খালার কাছ থেকে তার স্বাধীনতা কিনে নিতে সক্ষম হয়। সদ্য কৌশোর পেরোনো ফুলকুমারী জেড তার খদ্দেরের ফাঁপা প্রেমের আশ্বাসে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয় এবং তাকে ফাঁদে ফেলে একসাথে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। হোয়াং ও পার্লের মধ্যস্থতায় জেড তার খদ্দেরের সাথে একটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সমঝোতায় পৌঁছায়।

flowers of shanghai
ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই

সূক্ষ্ম, নিখুঁত সৌন্দর্যের সাথে গঠিত ফ্লাওয়ার হাউসের অভ্যন্তর যেন উচ্চবংশীয় চীনা পুরুষদের বাইরের বাস্তব সংঘর্ষপূর্ণ পৃথিবী থেকে পালানোর আদর্শ জায়গা। মোমবাতির মায়াময় আলোয় শান্ত পরিবেশে ফুলকুমারীদের চামড়ার ভেতর যেন চলতে থাকে অবিরাম যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ; কিন্তু মোহনীয় ফুলকুমারীদের সভ্য পরিমিত অপরূপ মুখোশে কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তিই ফুটে ওঠে না। সবচেয়ে যন্ত্রণাময় অনুভূতিও তারা প্রকাশ করে ফিসফিস শব্দে, বড়জোর দুয়েক ফোটা চোখের জলে; কারণ এমন আচরণই ফ্লাওয়ার হাউসের পৃষ্ঠপোষকদের কাছে শোভন। চলচ্চিত্রটি জুড়ে খদ্দেরদের সাথে ফুলকুমারীদের নিজের মধ্যে কথোপকথন প্রত্যক্ষ করে ফুলকুমারীরা যে মানুষের বদলে পণ্যবস্তুতে রূপান্তর হয়েছে, এই উপলব্ধিতে শরীরে ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে যায়। এমারেল্ডের দরদাম করে তার স্বাধীনতা কেনা ও খালাকে কাপড়, গয়নাগাটি বুঝিয়ে দেয়ার দৃশ্য আমাদের কাছে রক্তমাংসের অনুভূতিসম্পন্ন এমারেল্ডকে দামি কাপড় ও গয়নার সমকক্ষ করে দেয়। ওয়াং সহজেই একাধিক ফুলকুমারীর কাছে যেতে পারে; কিন্তু ক্রিমসনের নাটকের অভিনেতার সাথে প্রেম ওয়াংকে এতটাই প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে যে, সে তার একমাত্র পৃষ্ঠপোষক হওয়া সত্ত্বেও স্বেচ্ছাচারীর মতো সবরকম সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়াং তার আকাঙ্ক্ষার নারী ক্রিমসন ও জেসমিনকে সবরকমভাবে পেতে চেয়েও কখনোই পুরোপুরি হাতের মুঠোয় পায় না। সে টাকা-পয়সা লেনদেনের মধ্য দিয়ে ক্রিমসন ও জেসমিনের সঙ্গ লাভ করলেও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণে দ্বিচারী প্রেমিকের মতোই তড়পাতে থাকে।

…চলচ্চিত্রটিতে প্রচুর
সংলাপ; কিন্তু এক
মুহূর্তের জন্যও
চলচ্চিত্রটিকে থিয়েট্রিক
মনে হয়নি…

চলচ্চিত্রটিতে আফিম সে সময়ের চীনের শুধুমাত্র অপরিহার্য ডিটেইল হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। ফ্লাওয়ার হাউসের পৃষ্ঠপোষকেরা আফিম খায় স্বপ্নে ডুবে গিয়ে প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতার উর্ধ্বে ওঠার জন্য। ওয়াং যখন জেসমিনকে আফিম সেবন করতে সাধে, জেসমিন বলে– আফিমে আসক্ত হয়ে পড়লে তার কাজ চলবে না, ক্রিমসনের অনেক খদ্দের আছে, সে আসক্ত হয়ে পড়লেও অসুবিধা নেই। একটি কমবয়সী ফুলকুমারী যখন খদ্দেরের ডাকে সাড়া না দেওয়ার জন্য খালার কাছে মার খায়, এমারেল্ড তখন তাকে বুদ্ধি দেয় আফিম সেবন করে ব্যথা ভুলতে। জেসমিনের সাথে ওয়াংয়ের ভাগ্নের প্রেম যখন ওয়াং জেনে যায়, জেসমিন আফিম খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে; জেডও প্রতারিত হওয়ার পর আত্মহত্যার উদ্দেশে আফিম খায়। চরিত্রগুলোর অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক সম্পর্ক উন্মোচনের লক্ষ্যে আফিম একটি সার্থক মোটিফ। চলচ্চিত্রটিতে প্রচুর সংলাপ; কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও চলচ্চিত্রটিকে থিয়েট্রিক মনে হয়নি। এই ছবিতে শুধু কাহিনীর দিক-নির্দেশনার জন্য ব্যবহৃত হয়নি, বরং সংলাপ চরিত্রদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে। বাস্তব পৃথিবীর মতোই এই সিনেমার চরিত্ররা নিমিষেই এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে চলে যায়, প্রচুর এলোমেলো মিথ্যা কথা বলে, তারপরেও হো সংলাপের মধ্য দিয়ে তার উদ্দেশ্য ঠিকই হাসিল করেন। ওজু, এরিক রোমারের মতো হো’র ছবিতে কথা বলা এমন একটি আচরণ যা শোনার সাথে দেখারও বিষয়।

…মনে হয়
যেন
একজোড়া ধ্যানী চোখ
পলক না ফেলে
নিমগ্ন হয়ে
ফ্লাওয়ার হাউসের চরিত্রগুলোকে
অনুসরণ করছে…

ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই-এর একটি দৃশ্যে প্রায় ত্রিশ/চল্লিশ সেকেন্ড ধরে ট্রেজার ও পরিচারিকা কানাকানি করে– যা আমরা দেখি, কিন্তু একটা শব্দও শুনি না। পুরো চলচ্চিত্রটিতে এ ধরনের বেশকিছু দৃশ্য আছে যেখানে পরিচালক ইচ্ছে করেই রহস্যময়তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে শুধু চরিত্রগুলোর আচরণে ইঙ্গিত দিয়েছেন– যা আমাদের কল্পনার কাছে আবেদন রাখে। চলচ্চিত্রটির অনেক ঘটনাই অফস্ক্রিনে বা দৃশ্যের অন্তরালে ঘটে। খালার ফুলকুমারীদের প্রহার, ট্রেজার ও জেডের মধ্যে বেশিরভাগ ঝগড়া, এমারেল্ডের খালার একাধিক পুরুষ প্রেমিকের সাথে প্রণয় ইত্যাদি এই ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার পরই কেবলমাত্র আমরা চরিত্রগুলোর আচার-আচরণ ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আভাস পাই। ছবি শুরুর প্রথম ভোজসভার দৃশ্যেই আমরা শুনি ক্রিস্টাল নামের এক ফুলকুমারী অসুস্থ। ফ্লাওয়ার হাউসের একজন পৃষ্ঠপোষক সেই ভরা মজলিশে রসিয়ে রসিয়ে ক্রিস্টালকে নিয়ে রগরগে গল্প বলে। পুরো ছবিতে কখনোই আমরা ক্রিস্টালকে দেখতে পাই না। ছবির প্রায় শেষের দিকে ট্রেজারের জেড প্রসঙ্গে কথা বলার সময় খুব হালকাভাবে জানতে পারি, ক্রিস্টাল মারা গেছে। জেসমিনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেশ কয়েকটি দৃশ্যপর্বের পর হোয়াং ফ্লাওয়ার হাউসের একজন পরিচারিকা ও পার্লের কথোপকথন থেকে জানতে পারি, ওয়াংয়ের ভাগ্নের সাথে জেসমিনের প্রেমের সম্পর্ক ওয়াং টের পাওয়ার পর সে তাকে ত্যাগ করেছে। এ ধরনের এলিপসের ব্যবহার চলচ্চিত্রটির প্রতি আমাদের মনোযোগী হতে বাধ্য করে। এলিপস, অফস্ক্রিনের ঘটনাপ্রবাহ চলচ্চিত্রটির নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতর ঠাসাঠাসি না করে, যথেষ্ট জায়গা রেখেই আমাদের কল্পনায় গল্পের পরিধি অনেক বাড়িয়ে দেয়।

flowers of shanghai
ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই

একশ ত্রিশ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটিতে মাত্র বত্রিশটি কাট। দীর্ঘ শটগুলোতে ক্যামেরা চরিত্রগুলোর কথোপকথন ও বিচরণের সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ট্র্যাক ও প্যান করে। মনে হয় যেন একজোড়া ধ্যানী চোখ পলক না ফেলে নিমগ্ন হয়ে ফ্লাওয়ার হাউসের চরিত্রগুলোকে অনুসরণ করছে। প্রতিটি শট জোড়া লাগানো স্লো ফেড-আউট ফেড-ইন দিয়ে। চলচ্চিত্রটির সার্বিক ছন্দে ও গল্প বলার আঙ্গিকে ফেড-আউট ফেড-ইন নানা মাত্রা যোগ করেছে। কখনো ফেড-আউট ফেড-ইনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয় দৃশ্যপর্ব, কখনো পরিবর্তিত হয় ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ; আবার একই দৃশ্যপর্বে ফেড-আউট ফেড-ইনের পর দেখি বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেছে, এবং পার হওয়া সময়ে এমন কিছু ঘটেছে– যার ইঙ্গিত পরবর্তী দৃশ্যে আছে। ক্রিমসন ও ওয়াংয়ের মান-অভিমানের পর ওয়াং ক্রিমসনকে কাছে টেনে আনে, ধীরে ফেড-আউট হয়। ফেড-ইনের পর দেখি পরিচারিকা টেবিলে খাবার সাজায়, ওয়াং ও ক্রিমসন একে অপরের দিকে প্রেমের দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে পরিতৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে একসাথে বসে খায়। ওয়াং ও হোয়াং জেসমিনের ঘরে যায়, কিছুক্ষণ কথা বলে; ফেড-আউট ফেড-ইনের পর দেখি, জেসমিনের পাশে আধশোয়া অবস্থায় ওয়াং মুখ থেকে আফিমের পাইপ টেবিলে নামিয়ে রাখছে।

…চীনা ল্যাম্প

মোমবাতি জ্বালানো রাতের
আবছায়ার দৃশ্যগুলো দেখলে
মনে হয়, রাতের
হালকা ঢেউ খেলানো
কালো জলে নানা রকম
নরম আলোর প্রতিবিম্ব
ফুটে আছে…

ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই-এর নির্মাণশৈলীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে আলোকসজ্জা। হো সিয়ো-সিয়েনের যে কোনো ছবি দেখলে সহজেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায়, লাইটিংয়ের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র ইতিহাসে তার মতো শিল্পী খুব কমই আছেন। ফ্লাওয়ারস অব সাংহাই-এর আলোকসজ্জা রেমব্র্যান্টের পেইন্টিংয়ের আলোছায়ার যুগলবন্দির মতোই বিশুদ্ধ সুন্দর। চীনা ল্যাম্প ও মোমবাতি জ্বালানো রাতের আবছায়ার দৃশ্যগুলো দেখলে মনে হয়, রাতের হালকা ঢেউ খেলানো কালো জলে নানা রকম নরম আলোর প্রতিবিম্ব ফুটে আছে। এই চলচ্চিত্রটিতে হৌর আলোকসজ্জা পরিকল্পনা আমাদেরকে অফস্ক্রিন স্পেসের প্রতি কৌতূহলী ও কল্পনাপ্রবণ করে তোলে। চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ চিত্রায়িত হয়েছে তাইওয়ানে ফ্লাওয়ার হাউসের সেট বানিয়ে; একদম শেষ ডিটেইল পর্যন্ত এমন একটি স্বনির্ভর ও বদ্ধ জগৎ নির্মাণ করা হয়েছে– যা চিরতরে গত।

আশা করি বাংলাদেশের দর্শকদের এই শিল্পীর অপূর্ব শিল্পকর্মগুলোর স্বাদ পাওয়ার সৌভাগ্য হবে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি, ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ । ফিচার ফিল্ম : ঘাসফুল; খাঁচা

মন্তব্য লিখুন