সিনেমা ও পরাবাস্তববাদ

0
340

লিখেছেন রুদ্র আরিফ


 

সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের আবির্ভাব এই বাস্তবজগতে মূলত ১৯২০ দশকে; শিল্প ও সাহিত্যের হাত ধরে। অপ্রাকৃত কিংবা অসঙ্গত সন্নিবেশ ও সমাহারের জাদুতে, খেয়ালী কিংবা অসংলগ্ন চিত্রকল্পের হাজিরা হয়ে ওঠে এই প্রবল প্রভাববিস্তারী সাংস্কৃতিক আন্দোলনটি বৈশিষ্ট্য। পরাবাস্তববাদের সূচনালগ্নে, শিল্প-জগতের সবচেয়ে নবীন সদস্য– ‘সিনেমা’ বয়সে যদিও তখনো বেশ কাচা, তখনো নিজ পায়ে ঠিকঠাক হাঁটতে শেখেনি তেমন, তবু এই আন্দোলনটির ঢেউ একেও করে ফেলে প্লাবিত। ইতিহাসের প্রথম পরাবাস্তববাদী সিনেমা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ফরাসি নীরিক্ষাধর্মী ফিল্মমেকার ও সিনে-তাত্ত্বিক জার্মেইন দ্যুলাকের [১৮৮২-১৯৪২] দ্য সীশেল অ্যান্ড দ্য ক্লার্জিম্যান [La Coquille et le clergyman]। স্বদেশের প্রখ্যাত নাট্যকার, কবি ও থিয়েটার ডিরেক্টর আতোঁন্যাঁ আর্ত্যুর [১৮৯৬-১৯৪৮] লেখা একটি মৌলিক চিত্রনাট্য থেকে নির্মিত এ ফিল্মটির প্রথম প্রদর্শনী হয় প্যারিসে, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮। জনৈক আর্মি জেনারেলের স্ত্রীর রূপে বিমোহিত এক ধর্মযাজকের কামাতুর হ্যালুসিনেশনের নানা পরাবাস্তববাদী ভঙ্গিমা ধারণ করেছে ফিল্মটি। যদিও এ সিনেমার নির্মাণ কৌশল অনেক পরাবাস্তববাদ আন্দোলনকারীকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, এমনকি স্বয়ং আর্ত্যুও নাখোশ হয়েছিলেন দ্যুলাকের ওপর, এবং অব্যবহিতকাল পরেই দুই মহান বন্ধুর প্রথম ফিল্মি-আবির্ভাবে পরাবাস্তববাদী হিসেবে এ সিনেমাটির আবেদন যথেষ্টই ম্লান হয়ে গিয়েছে; তবু সিনে-জগতে এ ধারার আবির্ভাবের প্রথম বিন্দু হিসেবে এটিতে অস্বীকার করার উপায় নেই। ফিল্মটির পরাবাস্তববাদী ভঙ্গিমার ভূয়সী প্রশংসা করে সম্প্রতি ব্রিটিশ সমালোচক লি জেমিসন [১৯৭৭-] লিখেছেন, “বস্তুগত বাস্তবতার ত্বকের ভেতর দ্য সীশেল অ্যান্ড দ্য ক্লার্জিম্যান ঢুকে গিয়ে, দর্শকদের এমন একটি অস্থিতিশীল ল্যান্ডস্কেপে নিয়ে ফেলেছে– যেখানকার চিত্রকল্প কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, আর্ত্যু কেবল ভৌত ও বাহ্যিক চিত্রকল্পকেই নয়, বরং অন্যান্য চিত্রকল্পের সঙ্গে সেটির আন্তঃসংযোগটিকেও উল্টে দিয়েছেন। এর ফলে জন্ম নেওয়া এই জটিল ও বহুস্তরী ফিল্মটি ভিত্তিগতভাবে এতই অস্থিতিশীল যে, চিত্রকল্পগুলো একে অন্যের ভেতর দৃশ্যগত ও শব্দগতভাবে বিলীন হয়ে গিয়ে অবচেতনের ওপর সিনেমার ছড়ি ঘোরানোর সম্ভাবনা সত্যিকারঅর্থেই জাহির করতে পেরেছে।”

দ্য সীশেল অ্যান্ড দ্য ক্লার্জিম্যান

এ তো ছিল সূচনা। তবে এরপরই দৃশ্যপটে হাজির হন স্প্যানিশ সেই দুই মহান বন্ধু– যাদের নামের সঙ্গে ‘পরাবাস্তববাদ’ শব্দটি নিজ নিজ ক্ষেত্রে পরম মমতায় সমার্থক হয়ে আছে। একজন, পরাবাস্তববাদী সিনেমার শ্রেষ্ঠ কারিগর– লুই বুনুয়েল [১৯০০-১৯৮৩]; অন্যজন, পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পের শ্রেষ্ঠ জাদুকর– সালভাদর দালি [১৯০৪-১৯৮৯]। দুই বন্ধু মিলে এমন একটি নির্বাক শর্টফিল্মের স্ক্রিপ্ট লিখেন, বুনুয়েলের নির্মাণে যেটি হয়ে ওঠে সত্যিকারের প্রথম পরাবাস্তববাদী সিনেমা। নাম, অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ [Un Chien Andalou]। সিনেমার ‘প্লট’ বলতে যা বোঝায়, এটিতে সেই অনিবার্য উপাদানটির কোনো অস্তিত্বই রাখেননি তারা। প্রচলিত সিনে-রীতির সাক্ষাৎ-বিরোধিতার এ কেবলই একটি উদাহরণ। এ রকম অগুণতি উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে ২১ মিনিট সময়ব্যাপ্তির এ ফিল্মে। কথিত আছে, বুনুয়েল তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন ফরাসি ফিল্মমেকার জ্যঁ এপস্টেইনের [১৮৯৭-১৯৫৩] অধীনে। একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে বসে বন্ধু দালিকে জানালেন ঘুমে দেখা এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা : চাঁদকে নাকি এক ফালি মেঘ এসে চিড়ে দিয়েছিল এমনভাবে– “ঠিক যেন ক্ষুরের ব্লেড চিড়ে দিচ্ছে কারও চোখ।” জবাবে দালি জানালেন, তিনিও আজব এক স্বপ্ন দেখেছেন, অগুণতি পিঁপড়ার ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে একটি হাত। রোমাঞ্চিত বুনুয়েল মুহূর্তেই বলে ওঠলেন, “এটাই তো সিনেমা; চল, বানিয়ে ফেলি!” মানুষের মন কী-ই-না ভাবতে পারে– এই সম্ভাবনাকে পুঁজি করে, মানুষের আবেগাত্মক অবদমনের কনসেপ্টের ভিত্তিতে স্ক্রিপ্ট লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা।

অ্যান আন্দালুসিয়ান ডগ

স্ক্রিপ্টিংয়ে প্রচলিত কোনো ভঙ্গিমাই মানেননি এ দুজন। বুনুয়েলের ভাষ্য জানান দেয়, “কোনো ধরনের গ্রহণযোগ্যতার বিবেচনায় কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা জাহির করা কোনো আইডিয়া বা চিত্রকল্প [ছিল না এখানো]।… এ সিনেমায় কোনোকিছুই কোনোকিছুর প্রতীক হয়ে ওঠেনি। [এখানে] প্রতীক অন্বেষণের একমাত্র প্রক্রিয়াটি হতে পারে, হয়তো, সাইকোঅ্যানালাইসিস [বা, মনস্তত্ত¡-বিশ্লেষণ]।” আত্মজীবনীতে বুনুয়েল আরও জানান, “সিনেমায় পরাবাস্তববাদের নন্দনতত্ত্ব হলো [সিগমুন্ড] ফ্রয়েডের কয়েকটি উদ্ভাবনের সঙ্গে সমন্বয় সাধন। পরাবাস্তববাদকে ‘সাইকিক অটোমেটিজম’ [বা, অবচেতন মনের ক্রিয়া] হিসেবে অভিহিত করা পাঠশালার বুনিয়াদি মূলসূত্রগুলো সম্পর্কে ফিল্মটিকে সম্পূর্ণই অনবগত রাখা হয়েছিল, যেন মনোজগতের সত্যিকারের ক্রিয়াকলাপকে ফিরিয়ে আনা যায়– কার্যকারণ, নৈতিকতা কিংবা নান্দনিকতার নিয়ন্ত্রণাধীন যে কোনো কাঠামোর আয়ত্বের বাইরে।” আরে, এই তো পরাবাস্তববাদী সিনেমার মূলসূত্র!

…এই ফিল্মটি ধারণ করে
আছে আধুনিক জীবনের
উন্মত্ততা, বুর্জোয়া সমাজের
যৌনবিকৃতি ও ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার
মূল্যবোধের এক
তীর্যক চিত্র, এক
অন্যতর প্রতিবাদনামা…

১৯২৯ সালে মুক্তি পাওয়া এ ফিল্মটির পর, পরের বছরই, এই দুই বন্ধু-জুটি ৬৩ মিনিট সময়ব্যপ্তির যে সবাক ফিল্মটি হাজির করেন, অনেকের বিবেচনায় সেটিই পরাবাস্তবাদী সিনেমাগুলোর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। দ্য গোল্ডেন এইজ [L’Age d’Or] শিরোনামের এই ফিল্মটি ধারণ করে আছে আধুনিক জীবনের উন্মত্ততা, বুর্জোয়া সমাজের যৌনবিকৃতি ও ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার মূল্যবোধের এক তীর্যক চিত্র, এক অন্যতর প্রতিবাদনামা। আর এরপর মূলত, দুই বন্ধুর পথ দু’দিকে, নিজ-নিজ দিকে বেঁকে গেলে, পৃথিবীর চিত্রশিল্পের ইতিহাস যেমন ঋদ্ধ হয়েছে দালির পরাবাস্তববাদী অসংখ্য মাস্টারপিস চিত্রকর্মে, তেমনি সিনেমার ইতিহাসে বুনুয়েলের পরাবাস্তবাদী সিনেমাগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম-টেক্সট।

ইরেজারহেড

প্রাথমিক যুগ পেরিয়ে, ‘পরাবাস্তববাদী সিনেমা’ আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট সময়কালে বন্দি না থেকে, ছড়িয়ে পড়েছে নানা অবয়বে। কখনো বিষয়বস্তু হিসেবে, কখনো-বা মন্তাজের প্রশ্রয়ে, এমনকি একেবারেই বাণিজ্যিক সিনেমার হয়তো কোনো এক বিশেষ মুহূর্তের দৃশ্যায়নে এ ধারার প্রবল উপস্থিতি প্রায়শই চোখে পড়ে। তবে পূর্ণাঙ্গ অবয়বের প্রশ্নে, সমকালীন ফিল্মমেকারদের মধ্যে আমেরিকান মাস্টার– ডেভিড লিঞ্চের [১৯৪৬-] ক্যারিশমা অগ্রগণ্য। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার বিবেচনায়, ‘এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিল্মমেকার’ ও অনলাইন ফিল্ম-জার্নাল অলমুভির ভাষ্যে, ‘আধুনিক আমেরিকান ফিল্মমেকিংয়ের রেনেসাঁ-মানব’ লিঞ্চ একইসঙ্গে অভিহিত হয়ে থাকেন ‘প্রথম জনপ্রিয় পরাবাস্তববাদী’ ফিল্মমেকার হিসেবেও। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ইরেজারহেড [১৯৭৭] দর্শকের সামনে জাহির করেছে এমন এক অস্বস্তির কাহিনি– যেটির মুখোমুখি হতে গেলে যে কেউই শিউরে ওঠতে বাধ্য, অথচ এর সংস্পর্শের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শিল্পাঞ্চলে, অতিকায় সব মেশিনের নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞ, ধোঁয়া ও শব্দ-সন্ত্রাসের ভিড়ে, পরিত্যক্ত দালানের বাসিন্দা এক যুবক ও তার প্রেমিকার কাহিনি এটি। তাদের জীবনে নতুন অতিথি হয়ে আসা সন্তানটি দেবদূততুল্য নয়, বরং যেন সাক্ষাৎ-শয়তান! বিকৃত শরীরের এ শিশুটির নিরন্তর কান্না এতই পৈশাচিক, মা তাকে ফেলে চলে যায়, আর বাবা, মানে আমাদের নায়কটি তাকে সামলাতে গিয়ে হয়ে ওঠে জগতের সবচেয়ে মাথা-খারাপ মানুষ যেন! আধুনিকতার এই অন্যতর ভৌতিকরূপ জাহির করে এভাবেই লিঞ্চ আমাদের জানিয়ে দেন, পরাবাস্তববাদী সিনেমা বস্তুত পপকর্ন খেতে খেতে কিংবা কোমল পানীয়তে চুমুক দিয়ে, তাড়িয়ে তাড়িয়ে কোনো বিক্ষিপ্ত দৃশ্যাবলি উপভোগের বিষয় নয়; বরং মানবাত্মায় আবাস গড়ে অবচেতনেই আমাদের তাড়িয়ে বেড়ানো বিক্ষিপ্ত প্রণোদনার এক গভীর ভাষান্তর। এ ফিল্মের পাশাপাশি, লিঞ্চের ব্লু ভেলভেট [১৯৮৬], লস্ট হাইওয়ে [১৯৯৭], মালহল্যান্ড ড্রাইভ [২০০১] প্রভৃতি ফিল্মও এ সত্যের সাক্ষ্য দেয়।

দ্য মোল

এ ধারার সমকালীন আরেক মাস্টার, চিলির আলেহান্দ্রো হোদোরোস্কি [১৯২৯-]। ‘সহিংস পরাবাস্তববাদী চিত্রকল্পের’ জন্য খ্যাতিমান এ ফিল্মমেকার এ পথে যাত্রা শুরু করেন দ্য মোল-এর [El Topo] মাধ্যমে। রহস্যময় কালো পোশাক পরা জনৈক বন্দুকবাজ যুবকের একটি কুহেলিকাপূর্ণ ওয়েস্টার্ন ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ভ্রমণ; আর চলতি পথে একাধিক বিকলাঙ্গ বা বিকৃত দৈহিক গঠনের মানুষের মুখোমুখি হয়ে পড়া, এবং সংঘাত, মায়া, দুর্ঘটনা, নৃশংসতা ইত্যকার ঘটনাবলিতে জড়িয়ে পড়া– এ হলো এ ফিল্মের বাহ্যিক কাহিনি। অন্তঃস্থলে এটি ধারণ করে আছে মানবসভ্যতার এক নিকষ অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক, যেটির নানা ক্ষুদ্র অথচ তীক্ষ্ণ ছিদ্রপথে ঠিকরে বেড়িয়ে এসেছে অপার আলোর মহিমা। ফিল্মটি নানা কারণে যতটা আলোচিত, বোধ করি সমালোচিত কিংবা বলা ভালো, নিন্দিত তারচেয়েও বেশি! মানবতা ভূলুণ্ঠনের এক বিকৃত উদাহারণ হিসেবে এটিকে গালমন্দ করেছেন অনেকেই; অনেক নারীবাদী হয়েছেন ক্ষিপ্ত; তবে এর উল্টো ও অন্তর্জাত চিত্র পাওয়া যায় আমেরিকান কবি ও সমালোচক পিটার সেলডালের [১৯৪২-] বয়ানে : “এ একেবারেই আজব এক মাস্টারপিস [সিনেমা]।… প্রথম দেখায় এটিকে একটি স্রেফ সহিংস পরাবাস্তববাদী ফ্যান্টাসি, একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের অবান্তর কল্পনার চেয়ে বেশি কিছু মনে হবে না হয়তো। [তবে দ্বিতীয়বার দেখলে বোঝা যাবে] পরাবাস্তববাদ ও পাগলামি এখানে সময়-ঘড়ির মতোই চমৎকারভাবে পরিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হয়ে রয়েছে।” বলে রাখি, এ ধারায় এ ফিল্মমেকারের আরেকটি মাস্টারপিস সৃষ্টি– ১৯৭৩ সালে নির্মিত দ্য হলি মাউন্টেন [La montaña sagrada]।

…পরাবাস্তববাদী সিনেমা
বস্তুত পপকর্ন খেতে খেতে
কিংবা
কোমল পানীয়তে চুমুক দিয়ে,
তাড়িয়ে তাড়িয়ে কোনো
বিক্ষিপ্ত দৃশ্যাবলি উপভোগের
বিষয় নয়; বরং মানবাত্মায়
আবাস গড়ে অবচেতনেই আমাদের
তাড়িয়ে বেড়ানো বিক্ষিপ্ত প্রণোদনার
এক গভীর ভাষান্তর…

পরাবাস্তববাদী সিনেমার আরেক জাদুকরের নাম ইয়ারোমিল ই্যরেস [১৯৩৫-২০০১]। চেক নিউ ওয়েভ নামে খ্যাত, সিনেমার ইতিহাসের অন্যতর ফিল্ম-মুভমেন্টটির এই শীর্ষযোদ্ধার ভ্যালেরি অ্যান্ড হার উইক অব ওয়ান্ডারস [Valerie a týden divů]– অনেকের মতেই, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দান্ত সিনেমাগুলোর একটি। তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ায় [বর্তমানে চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া নামে, দু’দেশে বিভক্ত] পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, কিংবদন্তি সাহিত্যিক ভিতেস্লাভ নেভালের [১৯০০-১৯৫৮] উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমায় মনোমুগ্ধকর ফটোগ্রাফি ও মিউজিকের সন্নিবেশে একটি পরাবাস্তব রূপকথাকে ফ্যান্টাসি ও হররের সীমানায় বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই হাজির করতে পেরেছেন এ ফিল্মমেকার। প্রসঙ্গক্রমে বলি, ‘চেক নিউ ওয়েভ’ আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বশীল বেশির ভাগ সিনেমাতেই পরাবাস্তবতার উৎকৃষ্টতর উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য, ভেরা খ্যিতিলোভার [১৯২৯-২০১৪] ডেইজিস [Sedmikrásky; ১৯৬৬]; ইয়ান নিমেছের [১৯৩৬-২০১৬] অ্যা রিপোর্ট অন দ্য পার্টি অ্যান্ড দ্য গেস্টস [O slavnosti a hostech; ১৯৬৬]; মিলোস ফরমানের [১৯৩২-] দ্য ফায়ারমেন’স বল [Hoří, má panenko; ১৯৬৭] প্রভৃতি।

ভ্যালেরি অ্যান্ড হার উইক অব ওয়ান্ডারস

২০০৬ সালে প্রকাশিত সুররিয়ালিজম অ্যান্ড সিনেমা গ্রন্থে ব্রিটিশ সমালোচক মাইকেল রিচার্ডসন যথার্থই দাবি করেছেন, স্টাইল কিংবা ফর্ম নয়, বরং পরাবাস্তববাদী চর্চার নিরিখেই এ ধরনের সৃষ্টিকর্মকে নিরূপন করা উচিত। তার ভাষ্যমতে, “প্রচলিত ধারণা অনুসারে বিচার করতে গেলে পরাবাস্তববাদকে পদে পদে ভুল বোঝার আশঙ্কা তৈরি হয়, সেই ভুল বোঝাবুঝিগুলো আবার পরস্পরবিরোধী; তবে এ সকল ভুল বোঝাবুঝির গোড়ায় রয়েছে বৃহৎ পরিসরে উপলব্ধি করার বদলে বরং ছোট্ট পরিসরে কোনো স্টাইল কিংবা এ রকম কোনো মানদণ্ডে পরাবাস্তববাদকে আটকে ফেলার আকাঙ্ক্ষা । পরাবাস্তববাদের ভঙ্গিমাটি তৈরি হয়ে থাকে যে সকল স্বতন্ত্র গুণাবলির সমাবেশে– অনেক সমালোচকই তা সণাক্ত করতে ব্যর্থ হন। তারা বরং কোনো থিম, কোনো নির্দিষ্ট ধরনের চিত্রকল্প, নির্দিষ্ট ধরনের কনসেপ্টের খোঁজ করেন– যেটির মানদণ্ডে কোনো সিনেমা কিংবা শিল্পকর্মকে ‘পরাবাস্তববাদী’ হিসেবে বিচার করতে পারবেন। সমস্যা হলো, এ প্রক্রিয়াটি স্বয়ং পরাবাস্তববাদের একান্ত নির্যাসের উল্টো; কেননা এটি [পরাবাস্তববাদ] তো ‘এখানকার’ কোনোকিছু বলতে আসলে ‘সর্বত্রেরই’ কোনোকিছুকে বোঝায়। এটি কোনো একটি জিনিস নয়; বরং সামগ্রিকতাকে জাহির করার উদ্দেশ্যে নানাবিধ জিনিসের মধ্যকার একটি সম্পর্ক হয়ে ওঠে। ‘পরাবাস্তব’ হিসেবে ডাকা যাবে– এমন কোনো জাদুকরি দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে আসেননি পরাবাস্তববাদীরা। বরং অস্তিত্বের নানাবিধ অবস্থানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার সংযোগস্থলটি অন্বেষণই তাদের উদ্দেশ্য। কোথাও উপস্থিত হওয়ার বদলে বরং কোথাও থেকে প্রস্থান করার প্রতিই পরাবাস্তববাদের বরাবরের আগ্রহ নিহিত।” পরাবাস্তববাদী সিনেমাও, বস্তুত, তা-ই।



Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন