আন্তোনিওনি ও গোদার । মুখোমুখি ২ মাস্টার ফিল্মমেকার

0
955

অনুবাদ  রুদ্র আরিফ


একজন মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি [২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১২-৩০ জুলাই ২০০৭]; সিনেমায় বিচ্ছিন্নতাবোধের কবিখ্যাত ইতালিয়ান মাস্টার ফিল্মমেকার। সিনেবিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সর্বোচ্চ পদকজয়ী [পাম দি’অর (কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফ্রান্স); গোল্ডেন লায়ন (ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ইতালি); গোল্ডেন বিয়ার (বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, জার্মানি); গোল্ডেন লিওপার্ড (লোকার্নো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল; সুইজারল্যান্ড)] একমাত্র এই ফিল্মমেকার। জিতেছেন অস্কারও।
আরেকজন জ্যঁ-লুক গোদার [৩ ডিসেম্বর ১৯৩০-]; ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার। সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী, দাপুটে ও নিরন্তর নিরীক্ষাধর্মী ফিল্মমেকারদের অন্যতম তিনি। অনেকের বিবেচনায় তিনিই ফিল্ম-মুভমেন্ট ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ-এর প্রধান বিপ্লবী। 

১৯৬৪ সালের কোনো একদিন, ‘অগ্রজ’ আন্তোনিওনির মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘অনুজ’ গোদার। ফরাসি ফিল্ম ম্যাগাজিন কাইয়্যে দু সিনেমার নভেম্বর ১৯৬৪ সংখ্যায় মুদ্রিত হওয়া এ সাক্ষাৎকারটি সঙ্গত কারণেই সিনেমা-জগতের একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ টেক্সট…

 

জ্যঁ-লুক গোদার

জ্যঁ-লুক গোদার
আপনার আগের তিনটি ফিল্ম– দ্য অ্যাডভেঞ্চার [L’Avventura], দ্য নাইট [La Notte] ও এক্লিপস-এ [L’Eclisse], একটির তুলনায় অন্যটিতে উন্নতির ছাপ পাওয়া যায়, এবং এগুলো একই অসুন্ধানের সারিতে পাশাপাশি অবস্থান করে। আর এখন আপনি রেড ডিজার্ট-এর [Red Desert] মাধ্যমে একটি নতুন লক্ষ্যে পৌঁছুতে পেরেছেন বলে মনে হয়। ফিল্মটির নারীর কাছে এটি হয়তো একটি অবতরণ, কিন্তু আপনার বেলায় এটি রজকের মতো কিছু একটা; এবং আরোবেশি পূর্ণতর : এটি পুরো পৃথিবীর একটি ফিল্ম; আর তা কেবল বর্তমানের পৃথিবীর নয়।

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
এইমুহূর্তে রেড ডিজার্ট নিয়ে আমার পক্ষে কথা বলাটা বেশ দুরূহ। ফিল্মটি কেবলই মুক্তি পেলো। এটি বানানোর পেছনে আমার মধ্যে যেসব ‘অভিপ্রায়’ কাজ করেছে, আমি এখনো সেসবের খুব নিকটেই আছি; ফলে, এটিকে এই মুহূর্তে সঠিকভাবে বিচার করার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তার পরিচ্ছন্নতা ও নিরাসক্তি আমার মধ্যে নেই। তবু আমার ধারণা, আমি বলতে পারি, এই বেলা অনুভূতিবিষয়ক কোনো ফিল্ম বানাইনি। আমার আগের ফিল্মগুলো থেকে আমি যে ফল পেয়েছি– লোকজন ভালো বলুক কিংবা মন্দ– সেগুলো এখন পুরনো হয়ে গেছে। এটি একেবারেই ভিন্ন প্রসঙ্গ। একটা সময় চরিত্রগুলোর একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্কের প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো। এখন সেটার বদলে প্রধান চরিত্রটি অবশ্যই তার সামাজিক পরিবেশের মুখোমুখি হয়; আর এ কারণেই কাহিনীটিকে আমি একেবারেই ভিন্ন পথে ব্যবহার করেছি।

…আমার উদ্দেশ্য ছিলো
পৃথিবীর কাব্যময়তাকে
অনুবাদ করার–
যার মধ্যে এমনকি
ফ্যাক্টরিকেও সুন্দর করে
তোলা যায়…

অনেকেই খুব সহজে যে কথাটি বলেন, তেমনি বলা যায়, অমানুষিক শ্রম-জগতকে আমি দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করছি; কেননা, ব্যক্তিমানুষদের এটি নিপীড়ন করে এবং তাদের স্নায়ুকে বিকল করে দেয়। আমার উদ্দেশ্য এবং আমার উপলব্ধি ছিলো এই যে, একজন মানুষ সবসময়ই জানে তার গন্তব্য কোথায়; কিন্তু সে যাচ্ছে কোথায়– এমনটি জানতে পারার ঘটনা খুব দুর্লভ; আমার উদ্দেশ্য ছিলো পৃথিবীর কাব্যময়তাকে অনুবাদ করার– যার মধ্যে এমনকি ফ্যাক্টরিকেও সুন্দর করে তোলা যায়। ফ্যাক্টরির গলি ও বাঁকের এবং ওগুলোর চিমনিগুলোর পক্ষেও আমাদের দেখে দেখে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া গাছের আউটলাইনের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে ওঠা সম্ভব। এ বড়ই ধনবান এক দুনিয়া : জীবন্ত ও ব্যবহারযোগ্য।

রেড ডিজার্ট । ফ্যাক্টরিকেও সুন্দর করে তোলা যায়…

আমার বলা উচিত, রেড ডিজার্ট-এ যে স্নায়ুবৈকল্যের বর্ণনা আমি করতে চেয়েছি, সেটি সর্বোপরি খাপ-খাইয়ে নেওয়ার একটি বিষয়। সেখানে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো লোক আছে। আর যারা সেটা করতে পারে না, তার কারণ হয়তো তারা এখন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া জীবনের পথে হেঁটে ক্লান্ত। জ্যুলিয়ানার [ফিল্মটির কেন্দ্রীয় চরিত্র] সমস্যা এটাই। তার ব্যক্তিগত ক্রাইসিসে যে জিনিসটি বয়ে এসেছে, তা হলো– তার সংবেদনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা ও মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের যে পথ তার উপর ভর করেছে– এগুলোর মধ্যে পুনর্মিলনের অযোগ্য বিভক্তি ও ফারাক। এই ক্রাইসিসটি শব্দ ও রঙের ব্যাপারে তার উপলব্ধি এবং তার চারপাশের মানুষদের প্রতি শীতলতা– পৃথিবীর সঙ্গে তার এইরূপ ভাসা-ভাসা সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রেই নয়; বরং তা তার মূল্যবোধের [সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয়] সিস্টেমেরও– যেগুলো এখন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে এবং যেগুলো তাকে আর কোনোভাবেই সমর্থন করে না। সে তাই বুঝতে পারে, নারী হিসেবে নিজেকে তার সম্পূর্ণভাবে পুনরাবিষ্কার করতে হবে। এই পরামর্শটিই ডাক্তারেরা তাকে দেয়, এবং এটিই সে মেনে চলার চেষ্টা করে। একদিক থেকে ফিল্মটি এই উদ্যমেরই ইতিহাস।

জ্যঁ-লুক গোদার
সে তার সন্তানকে যে গল্পটি শোনায়, সেটি এখানে মানানসই কীভাবে?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
একজন নারী আর একটি অসুস্থ শিশু আছে এখানে। অসুস্থ শিশুটিকে গল্প শোনানোর দরকার পড়েছিলো মায়ের; কিন্তু যতো গল্প তার জানা ছিলো– সবই শিশুটি ইতোমধ্যে শুনে ফেলেছে। ফলে নারীটিকে গল্প বানাতে হয়েছে। জ্যুলিয়ানার মানসিক দিক বিবেচনা করে আমি ভেবেছি, এটি অবচেতনভাবে তার জীবনের বাস্তবতা থেকে পালিয়ের যাওয়ার, এই পৃথিবীর বাইরে সেই প্রকৃতির সে রকম রঙের মধ্যে যেতে পারার একটা উপায়ের গল্প হওয়াটাই স্বাভাবিক। নীল সমুদ্র আর সাদা বেলাভূমি। এমনকি মানুষের আকার ধারণ করে রাখা পাথরগুলো তাকে আলিঙ্গন করছে যেন, মধুর করে শোনাচ্ছে তাকে গান। কোরাদোর সঙ্গে বেডরুমের দৃশ্যটি মনে আছে আপনার? দেয়ালের দিকে ঝুঁকে আছে সে [নারীটি], আর বলছে : ‘তুমি কি জানো, আমি কী চাইতাম? যতো মানুষ আমাকে ভালোবাসতো, তাদের সবাইকে পেতে; তারা সবাই ঠিক একটা দেয়ালের মতো আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকুক।’ নিজের বেঁচে থাকায় সাহায্য করার জন্য তাদেরকে তার দরকার; হয়তো এটা নিজে থেকে করতে পারবে না ভেবে সে ভীত।

…সমাজের আদর্শের সঙ্গে
যা
খাপ খায় না–
নাটকীয়তা
তাতেই অন্তর্নিহিত থাকে…

জ্যঁ-লুক গোদার
তার মানে, শুধুমাত্র একটি সুপ্রাচীন ও গভীরতরো স্নায়ুবৈকল্য প্রকাশ করার একটি হাতিয়ার ছাড়া আধুনিক দুনিয়া আর কিছুই নয়?

রেড ডিজার্ট । শ্বাসবন্দি জ্যুলিয়ানার বাস ক্রাইসিসের মধ্যে…

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
শ্বাসবন্দি জ্যুলিয়ানা ক্রাইসিসের মধ্যে বাস করে। স্বভাবতই তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা একটি ক্রাইসিসের অবতারণা করে– যার শিকঁড় গভীরে প্রোথিত হতে বাধ্য। স্নায়ুবৈকল্যের কারণ ও উৎসের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছা সহজ নয়। এটি নিজেকে অনেকগুলো অবয়বে প্রকাশিত করে থাকে; মাঝে মধ্যে এর উপসর্গকে সিজোফ্রেনিয়ার মতো দেখায়। কেবলমাত্র চরিত্রটির উপর চাপ প্রয়োগ করে, এক ধরনের প্ররোচনার মধ্যে এটিকে বিষয়বস্তু করে তুলে আপনি পরিস্থিতিটিকে উপলব্ধি করতে পারবেন। এই প্যাথালজিক্যাল কেস বেছে নিয়েছি বলে সমালোচিত হয়েছি আমি। কিন্তু আমি যদি সমাজের প্রতি অকাট নিখুঁতভাবে স্বাভাবিক আচরণ করা কোনো নারীকে বেছে নিতাম, তাহলে সেখানে কোনো নাকটীয়তা থাকতো না; সমাজের আদর্শের সঙ্গে যা খাপ খায় না– নাটকীয়তা তাতেই অন্তর্নিহিত থাকে।

জ্যঁ-লুক গোদার
এই চরিত্রটিকে কি ইতোমধ্যে এক্লিপস-এ অনুসরণ করা হয়নি?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
এক্লিপস-এর চরিত্র ভিত্তোরিয়া কিন্তু জ্যুলিয়ানার একেবারেই বিপরীত। সে এক শান্ত, সুসমন্বিত মেয়ে– যে কিনা যা করে, ভেবেচিন্তেই করে। তার মধ্যে নিঃসন্দেহে স্নায়ুবৈকল্যের কোনো লক্ষণ নেই। এক্লিপস-এর ক্রাইসিসটির সম্পর্ক আবেগের সঙ্গে। রেড ডিজার্ট-এ আবেগকে নেওয়া হয়েছে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার জন্য। জ্যুলিয়ানা ও তার স্বামীর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিদ্যমান। কেউ যখন তার কাছে জানতে চাইতো : ‘তুমি তোমার স্বামীকে ভালোবাসো নাকি?’; উত্তরে সে বলতো : ‘হ্যাঁ’।

…ক্রাইসিসের উৎসকে আমি
খুঁজে পেয়েছি একটা
নদীর মতো– যেটি কিনা
হাজারো ঢেউ একসঙ্গে ধারণ
করে, এবং তারপর ভেঙে পরে
এক প্লাবনে, উপছিয়ে পরে
তীর ছাপিয়ে আর
ডুবিয়ে দেয় সবকিছু…
রেড ডিজার্ট । ‘তুমি তোমার স্বামীকে ভালোবাসো নাকি?’…

আত্মহত্যা করতে চাওয়ার আগপর্যন্ত তার ক্রাইসিস তার অন্তর্জগতে গভীরভাবে নিমজ্জিত হয়ে ছিলো অনেকটা অগোচরেই। তার ক্রাইসিসের দায় যে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার নয়– সে ব্যাপারটি আমি পরিষ্কার করতে চেয়েছি : এটি কেবলই ট্রিগার। আপনি হয়তো ভাববেন, সেই পরিবেশের বাইরে কোনো ক্রাইসিস নেই। সেটা ঠিক নয়। আমরা যদি উপলব্ধি নাও করতে পারি, তবু ‘ইন্ড্রাস্ট্রি’ আমাদের জীবনের উপর ছড়ি ঘোরায়। আর ‘ইন্ড্রাস্ট্রি’ বলতে আমি কেবল ফ্যাক্টরিগুলোর কথাই বলছি না; বরং এগুলোর প্রোডাক্টের কথাও বলছি। আমাদের বাড়িভর্তি যেসব প্লাস্টিক কিংবা ম্যাটেরিয়াল জিনিসপত্র আছে, অল্প কয়েক বছর আগেও এগুলোর কথা আমরা একেবারেই জানতাম না। এগুলো সুউজ্জ্বল রঙিন; আর এগুলো আমাদের সর্বত্রই তাড়িয়ে বেড়ায়। আমাদের মানসিকতার মধ্যে, আমাদের অবচেতনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন জাগায় যে জিনিস, সেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এগুলো [প্রোডাক্টগুলো] আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ফ্যাক্টরির জগতে রেড ডিজার্ট-এর কাহিনিকে বসাতে গিয়ে যা যা করতে হয়েছে আমাকে, সেই ভিত্তিতে বলতে পারি, সেই ক্রাইসিসের উৎসকে আমি খুঁজে পেয়েছি একটা নদীর মতো– যেটি কিনা হাজারো ঢেউ একসঙ্গে ধারণ করে, এবং তারপর ভেঙে পরে এক প্লাবনে, উপছিয়ে পরে তীর ছাপিয়ে আর ডুবিয়ে দেয় সবকিছু।

জ্যঁ-লুক গোদার
আধুনিক পৃথিবীর সৌন্দর্যও কি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাবলির নিস্ফলতাকে ফাঁস করে দিয়ে এদের একটি জবাবকে হাজির করে না?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
সমাজের অতি শর্তাধীন থাকা এই ব্যক্তিমানুষদের নাটককে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। এ ধরনের নাটক ছাড়া মানবজাতির পক্ষে টিকে থাকাই হয়তো সম্ভব নয়। তবু, আমি মনে করি না, আধুনিক পৃথিবীর সৌন্দর্য নিজেই আমাদের সবধরনের নাটকের সমাধান করে দিতে পারবে। অন্যদিকে, আমি মনে করি, জীবনের নতুন টেকনিকগুলোতে নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা যদি আমাদের জানা থাকে, তাহলে আমাদের সমস্যাগুলো সমাধানের নতুন রাস্তা হয়তো আমরা পাবো। কিন্তু আপনি আমাকে দিয়ে এ ধরনের কথা বলাচ্ছেন কেন? আমি কোনো দার্শনিক নই; তাছাড়া, কোনো ফিল্মের ‘উদ্ভাবনের’ সঙ্গেও এইসব আলাপের কোনো সম্পর্ক নেই।

জ্যঁ-লুক গোদার
কোনো ছোট্ট বালকের বেডরুমে রোবটের উপস্থিতি তার জীবনের জন্য একটি ভালো নাকি মন্দ সত্ত্বা?

রেড ডিজার্ট । ছোট্ট বালকের বেডরুমে রোবটের উপস্থিতি…

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
আমার ধারণা, ভালো। কারণ, সে যদি এ ধরনের খেলনার সঙ্গে অভ্যস্থ হয়ে যায়, তাহলে সে তার জন্য অপেক্ষমান জীবনের ধরন সম্পর্কে নিজে প্রস্তুতি নিতে পারবে। তবে আমরা একটু আগে যা নিয়ে কথা বলছিলাম, সেই আলাপে ফিরতে চাই। খেলনাগুলো ইন্ড্রাস্ট্রির প্রোডাক্ট, এগুলো শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাদেরকে এসবের অনুশীলন করতে দেয়। মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবারনেটিক্‌সের অধ্যাপক সিলভিও সেক্কাতোর সঙ্গে ঘটা আমার আলাপচারিতার কথা ভেবে এখনও চমকে ওঠি। আমেরিকানরা তাকে ভীষণ সম্মানের জায়গায় তুলে রেখেছে, যেন তিনি এক নতুন আইনস্টেইন। আজব এক মানুষ। তিনি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, যেটি দেখতে পারে এবং যা দেখেছে– তার বর্ণনা দিতে, গাড়ি চালাতে এবং চাওয়া অনুযায়ী নন্দনতাত্ত্বিক, নৈতিক কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আর্টিক্যাল লিখতে সক্ষম। এটি কোনো টেলিভিশন নয়, বরং একটি সত্যিকারের ইলেক্ট্রনিক ব্রেন। আমাদের আলাপচারিতার মধ্যে এই ভীষণ অসাধারণরকম বুদ্ধিমান মানুষটি এমন একটিও টেকনিক্যাল টার্ম ব্যবহার করেননি– যেটি আমি বুঝতে পারবো না। যাহোক, আমার মনে হচ্ছিলো, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর বুঝতেই পারলাম না– তিনি কী নিয়ে কথা বলছিলেন। তবুও, তিনি আমার ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করছিলেন; যদিও আমাদের দুজনের বাস দুটি ভিন্ন জগতে। তার পাশে ছিলো তার সেক্রেটারি; নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসা ২৪-২৫ বছর বয়সী মিষ্টি এক মেয়ে। মেয়েটি তাকে [অধ্যাপককে] নিখুঁতভাবেই বুঝেছিলো। এ ধরনের ইলেক্ট্রনিক ব্রেনের প্রোগ্রাম করেছে যারা, অন্তত ইতালিতে মূলত তারা হলো সাধারণমানের হাইস্কুল থেকে ডিপ্লোমা করা তরুণরা : একটি ইলেক্ট্রনিক ব্রেনের চিন্তার সঙ্গে বেঝাপড়া করাটা তাদের পক্ষে ভীষণ সহজ কাজ হলেও আমার পক্ষে নিশ্চিতভাবেই তা নয়।

…আজকের দিনে
ফিল্মের
কী এমন কথা বলার আছে
আমাদেরকে?…

ছয় মাস আগে আরেকজন পণ্ডিত এসেছিলেন রোমে, আমার সঙ্গে দেখা করতে; নাম– রবার্ট এম. স্টুয়ার্ট। তিনি একটি ক্যামিকেল ব্রেন আবিষ্কার করেছেন; তিনি তখন নাপোলিতে যাচ্ছিলেন সাইবারনেটিকসের একটি মহাসভায় যোগ দিয়ে সেখানে তার আবিষ্কারের কথা জানাতে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ আবিষ্কারগুলোর একটি। ছোট্ট একটি বাক্স ছিলো অসংখ্য টিউবে ভরা জিনিসটি : এর মধ্যে রাসায়নিক দ্রবীভূত অবস্থায় ছিলো স্বর্ণ ও অন্যান্য পদার্থের অনেকগুলো সেল। এই সেলগুলোর নিজস্ব জীবন আছে, আছে নির্দিষ্ট রিঅ্যাকশন : কোনো রুমে যদি আপনি হাঁটেন, তাহলে এগুলো এক রকম আকার ধারণ করবে; আর যদি আমি হাঁটি, তাহলে ধারণ করবে আরেক রূপ। এই আরকি! ছোট্ট বাক্সটিতে এই যে লক্ষ লক্ষ সেল, এগুলোর ভিত্তিতে আপনি আসলে মানব-মস্তিস্ককে পুনর্গঠন করতে পারবেন। ঐ লোকটি এগুলোকে খাওয়ান, ঘুমুতে দেন– তিনি এ ব্যাপারটি আমাকে স্পষ্ট করে বলেছেন; চরম অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে গিয়ে আমি আর তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনিনি। অবশ্য, যে শিশুটি তার জীবনের একেবারের শুরুর দিনগুলো থেকে রোবটের সঙ্গে খেলে আসছে, সে এ ব্যাপারটি নিখুঁতভাবে বুঝতে পারবে; এ ধরনের শিশু যদি চায়, তাহলে তার পক্ষে রকেটে চেপে মহাশূন্যে যেতে কোনো অসুবিধা হবে না।

এ ধরনের লোকজনকে ভীষণ হিংসা লাগে আমার। ভাবি, যদি আমিও এই নতুন পৃথিবীর একটি অংশ হতে পারতাম! দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখনো সেখানে পৌঁছিনি। তাছাড়া, আমার মতো কিংবা যারা জন্মেছে যুদ্ধের পরে– তাদের মতো বুড়ো প্রজন্মের জন্য এটি একটি খাঁটি ট্রাজেডি। আমি মনে করি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা কিছু বড় ধরনের সহিংস রূপান্তরের দেখা পাবো; আর তা ঘটবে জাগতিক পৃথিবী ও মানুষের মনস্তত্ত্ব– উভয় ক্ষেত্রেই। বর্তমান ক্রাইসিস বেরিয়ে আসবে এই আত্মিক দ্বিধা থেকে– যা হবে নৈতিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিকও। আমি তাই নিজেকে জিজ্ঞেস করি : ‘আজকের দিনে ফিল্মের কী এমন কথা বলার আছে আমাদেরকে?’ আর এ কারণেই আমি সেই বিষয়ে একটি কাহিনি বলতে চেয়েছিলাম, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

রেড ডিজার্ট । সমাজের আদর্শের সঙ্গে যা খাপ খায় না…

জ্যঁ-লুক গোদার
আর এ কারণে আপনার ফিল্মের পুরুষ কেন্দ্রীয় চরিত্রেরা এই মানসিকতার অংশভুক্ত হয়। তারা ইঞ্জিনিয়ার; তার এই নতুন পৃথিবীর অংশ।

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
না; মোটেও তা নয়। কোরাদো অনেকটাই রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব; পাতাগোনিয়া থেকে চলে যেতে চায় সে। নিজের কী করার আছে– সে ব্যাপারে ন্যূনতম ধারণাও নেই তার। সে দূরে চলে যেতে চায়; সে ভাবে, এভাবেই সে তার বিদ্যমান ক্রাইসিসের সমাধান করবে। সমস্যাটি যে বাইরে নয়, বরং তার নিজেরই ভেতরে– সেটা সে উপলব্ধি করতে পারে না। আসলে, সে সত্যিকারঅর্থেই চলে যেতে চায় কিনা, সেই ব্যাপারে তাকে দ্বিধায় ফেলে দেওয়ার জন্য কোনো নারীর সঙ্গে তার দেখা হওয়াটাই যথেষ্ট। এই এনকাউন্টার তাকে বিমর্ষ করে। পুরনো পৃথিবীর একটি সমালোচনার ইচ্ছেতে ফিল্মটির যে মুহূর্তটির অবতারণা করেছি, সেটির উপর আমি জোর দিতে চাই। সেখানে ক্রাইসিসের মধ্যবর্তী সময়ে নারীটির সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, সে তখন একজন পুরুষের সঙ্গে দেখা করে– যে কিনা নারীটির নিজের ও তার [নারীটির] নিরাপত্তাহীনতার সুযোগ নেয়। এ হলো সেই একই পুরনো ব্যাপার– যা তাকে [নারীটিকে] বিপর্যস্ত করে। কেউ কেউ, যেমন তার স্বামী অবশ্য ভিন্ন আচরণ করেছিলো : পরের দিকের তুলনায় শুরুর দিকে সে [স্বামীটি] হয়তো তাকে [নারীটিকে] সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলো; কিন্তু এই যে, সে [নারীটি] তার নিজেরই জগতের দ্বারা প্রতারিত হয়ে বসে আছে।

জ্যঁ-লুক গোদার
ফিল্মটির শেষবেলায় সে কি তার স্বামীর মতোই হয়ে উঠবে?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
আমি মনে করি, বাস্তবতার সঙ্গে একটি সংযোগ খুঁজে পাওয়ার প্রচেষ্টার উদ্যমের পর সে হয়তো আপসের মাধ্যমেই শেষ টানবে। ক্রাইসিস অবস্থার মধ্য দিয়েই স্নায়ুবৈকল্য যাতায়াত করে; তবে তা স্বাচ্ছন্দ্যময় অবস্থার ভেতর দিয়েও যায়– যা কিনা সারাজীবন টেকসই হতে পারে। সে [নারীটি] হয়তো আপসের একটা জায়গা খুঁজে পাবে ঠিকই, কিন্তু স্নায়ুবৈকল্য তার ভেতরে চিরকালই রয়ে যাবে। স্লাইটলি আনফোকাস্‌ড্‌ ইমেজের মাধ্যমে আমি অসুস্থতার চলমানতার এই আইডিয়াটিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছি। সে [নারীটি] তার জীবনের একটি নিশ্চল পর্বে আছে। তার হবেটা কী? সেটি খুঁজে পাওয়ার জন্য আরেকটি ফিল্ম বানাতে হবে আমাকে।

…একটি সচেতন বিদ্রূপ
তো
চূড়ান্তরকম
প্রয়োজনীয় বিষয়…

জ্যঁ-লুক গোদার
একজন শিল্পী হিসেবে আপনি কি মনে করেন, আপনার কাজে আধুনিকতার প্রতি সচেতনতা আপনার নান্দনিকতার ক্ষেত্রে দূরবর্তী কোনো প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে?

রেড ডিজার্ট । আমাদের অনুভূতির বদল ঘটা দরকার…

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
হ্যাঁ, অবশ্যই। এটি আমার কোনোকিছু দেখার ধরনকে বদলে দেয়। সবকিছুই পাল্টে দেয় এটি। আমরা যে নতুন কিছু খুঁজে ফিরছি– পপ আর্টই তার প্রমাণ। পপ আর্টকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। এটি একটি ‘বিদ্রূপাত্মক’ আন্দোলন। আর একটি সচেতন বিদ্রূপ তো চূড়ান্তরকম প্রয়োজনীয় বিষয়। অন্যদের তুলনায় যিনি কিনা একজন পেইন্টারের চেয়েও বেশি কিছু, সেই [রবার্ট] রৌশ্চেনবার্গকে বাদ দিলে, পপ আর্টিস্টরা নিজেদের কাজে নান্দনিকবোধ যে তখনো পরিপক্ক হয়ে ওঠেননি– সে ব্যাপারে যথেষ্ট অবগত ছিলেন; অবশ্য [কায়েস] ওল্ডেনবার্গের সফ্‌ট টাইপরাইটারটি চমৎকার; এটি আমার ভীষণ প্রিয়। আমার ধারণা, এই যে সবকিছুই ব্যক্ত করা হয়েছে– এই বিষয়টি ভালোই। আমি যে রূপান্তর প্রক্রিয়ার কথা বলছিলাম, এটি তাকে কেবল ত্বরান্বিতই করতে পারবে।

জ্যঁ-লুক গোদার
বিজ্ঞানীরা কি এই সচেনতনায় অংশগ্রহণ করেন? আমরা পৃথিবীটাকে যেমন করে দেখি, তারাও কি তেমনি দেখেন?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
কেমিক্যাল ব্রেনের আবিষ্কারক স্টুয়ার্টের কাছে আমি এই প্রশ্নটিই রেখেছিলাম। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তার এই সুনির্দিষ্ট চাকরি তার ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কের উপর একটি প্রভাব নিশ্চিতভাবেই ফেলে।

জ্যঁ-লুক গোদার
আর অনুভূতি? আমরা কি তা ধরে রাখব?

…সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসের
চরিত্রগুলো কখনোই
শিল্পী কিংবা কবি
হয় না…

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
কী যে প্রশ্ন! আপনি কি মনে করেন এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা সহজ বিষয়? আমার পক্ষে যা বলা সম্ভব, তা হলো– আমাদের অনুভূতির বদল ঘটা দরকার। ‘আবশ্যকই’। আমার বলা উচিত, এগুলো ইতোমধ্যে বদলাচ্ছে, বদলে গেছে।

জ্যঁ-লুক গোদার
সায়েন্স ফিকশন উপন্যাসের চরিত্রগুলো কখনোই শিল্পী কিংবা কবি হয় না।

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
কথা সত্য; এটি আজব ব্যাপার। তারা হয়তো ভাবে, শিল্প ছাড়াই তারা কাজ করতে সক্ষম। হয়তো শৈল্পিক কাজের মতো একেবারেই প্রয়োজনোতিরিক্ত বিষয়আশয়কে সৃষ্টি করার শেষ মানবজাতি হবো আমরাই।

জ্যঁ-লুক গোদার
রেড ডিজার্ট কি আপনাকে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে সহযোগিতা করেছে?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
ফিল্মমেকিং মানে হলো বেঁচে থাকা; এ ছাড়া এটি সে ধরনের ব্যক্তিগত ইস্যুর সমাধানের মানেও ধারণ করে– কাজের ক্ষেত্রে যে ইস্যুগুলোকে লাগে, এবং এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও লাগে। যুদ্ধের আগে মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে আলাপ করতো, এখন যদি তা নিয়ে আদৌ না করে থাকে– আমাদের চারপাশের পৃথিবীটার বদলে যাওয়াটা যেমন এর কারণ, তেমনি কারণ হলো– আমরাও বদলে গেছি। আমাদের প্রয়োজন, আমাদের লক্ষ্য, আমাদের যুক্তি বদলে গেছে। যুদ্ধের পরপর বলার মতো অনেক বিষয়আশয় ছিলো। সেগুলো সমাজকে দেখানোর ক্ষেত্রে, ব্যক্তিমানুষের সামাজিক অবস্থাকে দেখানোর ক্ষেত্রেও বিবেচিত হতো। বর্তমানে, ইতোমধ্যে তা ঘটে গেছে; ইতোমধ্যে হয়ে গেছে দেখানো। যে নতুন থিমগুলো নিয়ে আমরা কাজ-কারবার করছি, তার একটার কথা ইতোমধ্যে উল্লেখ করে ফেলেছি আমি। আমি এখনো জানি না, কী করে এগুলো নিয়ে কাজ করতে হয়, কী করে হাজির করতে হয় এদের। আমার ধারণা, রেড ডিজার্ট-এ এগুলোর একটিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে যদি নাও পারি, ছুঁতে অন্তত পেরেছি। আমরা এখনই আধুনিক সমাজের প্রত্যাশার ও আমাদের বেঁচে থাকার উপায়ের প্রশ্নে একগুচ্ছ সমস্যার সম্মুখিন হতে শুরু করে দিয়েছি। এমনকি মিস্টার গোদার, আপনিও ভীষণ আধুনিক ফিল্ম বানান; নির্দিষ্ট বিষয়আশয়কে ঘিরে আপনার কাজ করার রাস্তা অতীতকে ভাঙার একটি প্রয়োজনীয়তার কথাই কিন্তু প্রকাশ করে দেয়।

…ফিল্মমেকিং
মানে
হলো
বেঁচে
থাকা…

জ্যঁ-লুক গোদার
অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মের, অবজেক্ট বা ডিটেইলের শট আপনি কীভাবে শুরু কিংবা শেষ করেন? এটি কি আপনি চিত্রশিল্পীর মতো মেজাজ নিয়ে করেন?

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
একেবারেই রিয়ালিস্টিক নয়– এ রকম টার্মের মাধ্যমে বাস্তবতাকে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি আমি। শটে পরিষ্কার অ্যাবস্ট্রাক্ট লাইন হিসেবে ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে আমাদের দিকে ছুটে আসা গাড়ির চেয়ে ছোট্ট মলিন সড়ক আমাকে বেশি টানে। একটি চরিত্রের জীবন থেকে শুরু না করে বরং এভাবে করলে তার আরো কাছাকাছি পৌঁছানো যায়; আমার কাছে তার [চরিত্রের] জীবনের সর্বোপরি গুরুত্ব পায় কেবলমাত্র সম্বন্ধস্বরূপ। নারী চরিত্রটি এই বিবেচনায় কাহিনির একটি অংশ যে, এটি [কাহিনিটি] তার নারীত্ব, তার ফিমেইল-আউটলুক ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। এগুলো কাহিনিটির ক্ষেত্রে অপরিহার্য বলে মনে করি আমি। এ কারণেই আমি চেয়েছিলাম চরিত্রটিকে একটি অল্পস্বল্প নিশ্চলতার ধরনে ফুটিয়ে তুলতে।

জ্যঁ-লুক গোদার
এদিক থেকে এটি আপনার আগের ফিল্মগুলোর তুলনায় একটি ব্রেকও বটে।

…যা কিছু করা হয়ে গেছে,
এখন পর্যন্ত
যা কিছু করে ফেলেছি আমি–
সেগুলোর প্রতি আমার
কোনো
টানই নেই আর…

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
হ্যাঁ, আলংকারিকভাবে বলছি, এটি একটি অল্প-রিয়ালিস্টিক ফিল্ম। বলা দরকার, এটি রিয়ালিস্টিক হয়ে উঠেছে একটি ভিন্নতর পন্থায়। উদাহরণস্বরূপ, ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমে আমি ডেপ্‌থ্‌ অব ফিল্ডকে সীমাবদ্ধ রেখেছি– যেটি কিনা নিঃসন্দেহে রিয়ালিজমের অপরিহার্য একটি মৌলিক উপাদান। বিষয়আশয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য চরিত্রকে ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি এখন আমাকে টানে; কারণ, বর্তমানে যে জিনিসগুলোকে গ্রাহ্য করা হয়, তা হলো– বিষয়আশয়, অবজেক্ট, ম্যাটার। রেড ডিজার্টই শেষকথা– এমনটা বিশ্বাস করি না আমি; এটি বরং গবেষণার একটি চলমান খণ্ড। ভিন্ন ভিন্ন হাতিয়ারের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি শোনানোর ইচ্ছে আমার। যা কিছু করা হয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত যা কিছু করে ফেলেছি আমি– সেগুলোর প্রতি আমার কোনো টানই নেই আর; এসব আমার একঘেঁয়ে লাগে। আপনার অনুভূতিও হয়তো একই; তাই না?

   [অসমাপ্ত]
।।


বাংলা অনুবাদের গ্রন্থসূত্র

আন্তোনিওনির সিনে-জগত/ গ্রন্থনা ও অনুবাদ : রুদ্র আরিফ
প্রকাশক : ভাষাচিত্র  । প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৩
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৩২০ । মূল্য ৫০০ টাকা
অনলাইল ক্রয়সূত্র : রকমারি.কম

 

Print Friendly
শেয়ার

সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [২ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন