আমার হিচকক/ ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো [কিস্তি : ১/২]

0
266

মূল ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ।। অনুবাদ রুদ্র আরিফ


Θ অনুবাদকের নোট Θ
মাস্টার অব সাসপেন্সখ্যাত ব্রিটিশ-আমেরিকান ফিল্মমেকার আলফ্রেড হিচককের [১৩ আগস্ট ১৮৯৯–২৯ এপ্রিল ১৯৮০] মুখোমুখি হয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ মুভমেন্টের বৈপ্লবিক ফিল্মমেকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো [৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২–২১ অক্টোবর ১৯৮৪]। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকার হিচকক/ত্রুফো নামে প্রকাশিত হয়ে, পেয়েছে সিনে-দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের কদর। সেই গ্রন্থের ভূমিকাপর্বের দীর্ঘ গদ্যটির প্রথমাংশ পাঠে, প্রিয় পাঠক/দর্শক, আপনাকে স্বাগত জানাই…

সকলই ঘটেছিল যখন, যাত্রা শুরু হয়েছিল আমাদের।

১৯৫৫ সালের শীতের কথা। ফ্রেঞ্চ রিভেয়্যেরায় [দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রান্সের ভূমধ্যস্থ উপকূল] টু ক্যাচ অ্যা থিফ-এর লোকেশন শুটিং শেষ করে, জোইঁভিলির [ব্রাজিলের শহর] সেন্ট-মরিস স্টুডিওতে হাজির হয়েছিলেন আলফ্রেড হিচকক, ফিল্মটির পোস্ট-সিনক্রোনাইজেশনের কাজ সারতে। আমি আর আমার বন্ধু ক্লুদ শ্যাব্রল [ফরাসি ফিল্মমেকার; ১৯৩০-২০১০] মিলে ঠিক করলাম, সেখানে যাব, কাইয়্যে দু সিনেমার [ফরাসি ফিল্ম-জার্নাল] জন্য তার একটা সাক্ষাৎকার নিতে। জটিল-কূটিল প্রশ্নে ভরা একটি দীর্ঘ তালিকা আর ধারে নেওয়া একটি টেপ রেকর্ডারে সশস্ত্র হয়ে, মনে বিরাট উচ্ছ্বাস নিয়ে পা বাড়ালাম আমরা।

১৯৫৯ । জ্যঁ ককতো, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, ক্লুদ শ্যাব্রল

জোইঁভিলি পৌঁছে, কুচকুচে কালো এক অডিটরিয়ামের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেটির এক ফাঁক গলে, স্ক্রিনে দেখা মেলল– মোটরবোটে অবিরাম ছুটে যাচ্ছেন ক্যারি গ্র্যান্ট [ব্রিটিশ আমেরিকান অভিনেতা; ১৯০৪-১৯৮৬] ও ব্রিজিত অ্যবা [ফরাসি অভিনেত্রী; ১৯২৮-]। সেই অন্ধকারের মধ্যেই, আমরা পরিচিত হলাম হিচককের সঙ্গে। আমাদের তিনি বিনীত অনুরোধ জানালেন, যেন অডিটরিয়াম চত্বরের অপর পাড়ে, স্টুডিওর পানশালায় গিয়ে তার অপেক্ষা করি।

…বস্তুতপক্ষে
আমরা পড়ে গিয়েছিলাম
হিচককের কোনো
সিনেমার মতোই যেন
ফাঁদে…

আমরা দুই সিনে-পাগল, হিচককের সর্বশেষ কাজটির এক ঝলক সচক্ষে দেখতে পাওয়ার শিহরণ পেরিয়ে, দিনের আলোর ঝলকানিকে যেন অন্ধ হয়ে, আক্ষরিকঅর্থেই উত্তেজনায় ফেটে পড়েছিলাম। বকবকের উত্তাপে আমরা এতই মগ্ন হয়েছিলাম, চত্বরটির মাঝখানে থাকা গাঢ়-ধূসর বরফাঢাকা ডোবাটি নজরে আসেনি মোটেও। আরেক পা এগোতেই, গিয়ে পড়লাম বরফের পাতলা আবরণীর ঠিক ওপরে; মুহূর্তেই সেটি পথ দেখিয়ে দিলো আমাদের। এক পলকে পুকুরটির বরফশীতল জলে চুবানি খেলাম আমরা; হয়ে গেলাম হতভম্ব। ভয়ার্ত কণ্ঠে শ্যাব্রলের কাছে আমি জানতে চাইলাম, “টেপ রেকর্ডারটির কী অবস্থা?” সে সাড়া দিলো বাক্সটি ধরা বামহাত ধীরে ধীরে উপরে তুলে; যেন কান্নার স্রোতের মতো, প্রবল নিরানন্দ নিয়ে, সেটির সবদিক থেকেই চুইয়ে ঝরতে থাকল পানি।

স্নোপিং বেসিনের ভেতর, নাকানি-চুবানি খেয়ে, সেটির ঠিক মাঝখানে পিছলে ফিরে যাওয়া ছাড়া, কিনারায় পৌঁছানোর উপায় পাচ্ছিলাম না কোনো; বস্তুতপক্ষে আমরা পড়ে গিয়েছিলাম হিচককের কোনো সিনেমার মতোই যেন ফাঁদে। অবশেষে, জনৈক দয়ালু ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে দিলে, উপরে উঠে আসার ভাগ্য হলো আমাদের।

পাশ দিয়ে যাওয়া জনৈক ওয়ার্ড্রব মিসট্রেস এগিয়ে এসে, আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন এক ড্রেসিংরুমে– যেন কাপড় বদলিয়ে, নিজেদের শুকিয়ে নিতে পারি। সেই দয়ার জন্য তাকে যখনই ধন্যবাদ জানানোর চেষ্টা করলাম আমরা, তিনি দ্রুততার সঙ্গে বলে ওঠলেন, “রুটি-রোজগারের এ কেমন পথ রে বাবা! তোমরা রিফিফি [জুলস ডেসিন, ১৯৫৫] সিনেমার এক্সট্রা নাকি?” আমরা রিপোর্টার– এ কথা জেনে, আগ্রহ সব মিইয়ে গেল তার; আমাদের পরিষ্কার হয়ে নিতে বললেন তিনি।

…যদিও তখনো আমরা ভেজা,
আর ঠাণ্ডায়
রীতিমতো কাঁপছি, তবু
হাঁটা দিলাম সেই
পানশালার উদ্দেশে–
যেখানে হিচকক আমাদের
অপেক্ষায় ছিলেন…

এর মিনিট কয়েক পর, যদিও তখনো আমরা ভেজা, আর ঠাণ্ডায় রীতিমতো কাঁপছি, তবু হাঁটা দিলাম সেই পানশালার উদ্দেশে– যেখানে হিচকক আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। বলতে গেলে আমাদের দিকে ঠিকমতো তাকালেনও না তিনি; আমাদের অবস্থা নিয়ে একটা কথাও না বলে, অমায়িকভাবে প্রস্তাব দিলেন, যেন সন্ধ্যায় হোটেল প্লাজা অ্যাথেন্সে আরেকটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিই।

টু ক্যাচ অ্যা থিফ । ব্রিজিত অ্যবা ও ক্যারি গ্র্যান্ট

এর বছরখানেক পর, প্যারিসে নিজের এক প্রেস কনফারেন্সে, আমাদের ওপর চোখ পড়তেই, হিচকক অবশেষে সেই ঘটনাটি স্বীকার করে নিয়েছিলেন; বলেছিলেন, “ভদ্রমহোদয়দ্বয়, যখনই হুইস্কির কোনো গ্লাসে এক জোড়া বরফ খণ্ডের মধ্যে ঠোকাঠুকির শব্দ হতে দেখি, তখনই আপনাদের দুজনের কথা মনে পড়ে যায় আমার।”

এভাবে আমরা জানতে পেরেছিলাম, নিজস্ব রঙ-মশলায় এভাবে তিনি কাহিনীটির বুনন গড়েছিলেন। হিচককের সেই সংস্করণ অনুসারে, সাক্ষাৎকারটি নিতে যাওয়ার সময়, শ্যাব্রলের ছিল ধর্মযাজকের বেশ, আর আমার পরনে ছিল জান্ডার্মির [ফরাসীয় সৈন্যবিশেষ] ইউনিফর্ম।

প্রথম সেই জলজ সাক্ষাতের প্রায় এক দশক পর, আবারও হিচককের সামনে হাজির হতে উদ্যত হলাম আমি; সঙ্গে তার কাজ নিয়ে একগুচ্ছ রহস্যভেদী প্রশ্ন। দৈববাণীর মন্ত্রণায় আমাকে ঈদিপাসের মতো রোমাঞ্চিত করে তুলেছিল যে জিনিসটি, তা হলো– এই মধ্যবর্তী বছরগুলোতে ফিল্মমেকার হিসেবে আমার কর্মপ্রচেষ্টা, যা কিনা সিনেমায় হিকচকের অবদানের বিরল গুরুত্ব এবং এ মাধ্যমটিতে যারা কাজ করেন– তাদের ভেতর সেটির সবিশেষ তাৎপর্য সম্পর্কে নিজের ভেতর ক্রমাগত বাড়তে থাকা সচেতনতা।।

…জলজ সাক্ষাতের প্রায়
এক দশক পর, আবারও
হিচককের সামনে
হাজির হতে উদ্যত হলাম
আমি; সঙ্গে তার
কাজ নিয়ে
একগুচ্ছ রহস্যভেদী প্রশ্ন…

হিচককের ডিরেক্টোরিয়াল ক্যারিয়ারটি পরীক্ষা করে নিতে গেলে, গ্রেট ব্রিটেনে তার বানানো নির্বাক সিনেমাগুলো থেকে শুরু করে বর্তমানে হলিউডে বানানো রঙিন সিনেমাগুলো পর্যন্ত, আবিষ্কারের এক ঋদ্ধ সমৃদ্ধ উৎসের দেখা মেলে। হিচককের কাজের মধ্যে, একজন ফিল্মমেকারের পক্ষে তার নিজের অসংখ্য সমস্যার জবাব খুঁজে পাওয়া সম্ভব– যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপরিহার্য প্রশ্নটিও অন্তর্ভুক্ত : একদম নিখাঁদ ভিজ্যুয়াল তাৎপর্যের ভেতর দিয়ে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করা যায়?

আলফ্রেড হিচককের ওপর এ কাজটি করার ক্ষেত্রে আমি কোনো প্রবর্তকতুল্য লেখক নই; আমাকে বরং প্ররোচক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এই গ্রন্থটি বস্তুতপক্ষে একটি সাংবাদিকতাসূচক কাজ; পঞ্চাশ ঘণ্টার দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারটি দিতে হিচকক রাজি হয়েছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

১৯৬২ সালে হিচকককে চিঠি লিখেছিলাম আমি; জানতে চেয়েছিলাম, স্রেফ তার ক্যারিয়ার ঘিরে, পর্যায়ক্রমিকভাবে করা পাঁচশোর মতো প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হবেন কিনা; প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমাদের আলোচনাটি এগোবে এভাবে :

ক. প্রতিটি সিনেমার সূত্রপাতের পরিস্থিতি;
খ. চিত্রনাট্যের প্রস্তুতি ও কাঠামো গঠন;
গ. প্রতিটি ফিল্মের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ডিরেক্টোরিয়াল সমস্যাবলি;
ঘ. প্রতিটি ফিল্মের ক্ষেত্রে নিজের প্রাথমিক প্রত্যাশাগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও শিল্পসম্মত ফলাফলের সম্পর্কের ব্যাপারে হিচককের নিজের মূল্যায়ন।

টেলিগ্রাম করে সম্মতি জানিয়েছিলেন হিচকক। ফলে সর্বশেষ বাধাটি তখন বাকি রইল আমার সামনে : ভাষার বাধা। নিউইয়র্কের ফ্রেঞ্চ ফিল্ম অফিসের কর্মী, আমার বান্ধবী– হেলেন স্কটের দ্বারস্থ হলাম। ফ্রান্সে বড় হওয়া এই আমেরিকান তরুণীটি নিজের সিনেমার শব্দতালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ দখলদারিত্ব, নিজের উচ্চারণ-বিচার ও অনন্যসাধারণ মানবিক গুণাবলি সহকারে, এই প্রজেক্টটির একজন আদর্শ সহচর হয়ে ওঠল।

…প্রতিদিন
নয়টা থেকে ছয়টা পর্যন্ত
একটানা
কথা চালিয়ে যেতাম আমরা…

১৩ আগস্ট, হিচককের জন্মদিনে, হলিউডে গিয়ে হাজির হলাম আমরা। প্রতিদিন সকালে বেভারলি হিলস হোটেল থেকে আমাদের [আমি ও হেলেন] পিকআপ করে, ইউনিভার্সেল স্টুডিওতে নিজের অফিসে নিয়ে যেতেন তিনি [হিচকক]। আমরা [আমি ও হিচকক] দুজনেই মাইক্রোফোন লাগিয়ে নিতাম; পাশের রুমে বসে আমাদের আলাপ রেকর্ড করতেন একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিদিন নয়টা থেকে ছয়টা পর্যন্ত একটানা কথা চালিয়ে যেতাম আমরা। লাঞ্চ করার জন্য আসা-যাওয়ার সময় যেসব আলাপ হতো, সেগুলোরও ছিল ট্র্যাক রেকর্ড।

সাক্ষাৎকারপর্ব । ত্রুফো, হিচকক ও হেলেন স্কট

একজন রসিক লোক, চুটকির ওস্তাদ হিসেবে বিনোদনমূলক সাক্ষাৎকার দিতে খ্যাত হিচকক একেবারেই সত্যিকারের সেভাবেই শুরু করেছিলেন এ বেলা; একগুচ্ছ ছোট ছোট আমোদপূর্ণ উপাখ্যান দারুণ গুছিয়ে শুনিয়ে অবিভূত করে ফেলেছিলেন আমাদের। অবশেষে, তৃতীয় দিনে এসে, নিজের ক্যারিয়ারের ওঠা-নামা প্রসঙ্গে অপেক্ষাকৃত গম্ভীর ও চিন্তাশীল কথাগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করে তার মুখ দিয়ে। নিজের অর্জন ও ব্যর্থতা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন ছিল একেবারেই নিখাদ রকমের আত্মসমালোচনামূলক; তার দ্বিধা, হতাশা ও আশাবাদের হিসেব-নিকেশ ছিল পরিপূর্ণই অকপট।

আলাপ যত এগোতে থাকল, হিচককের পাবলিক ইমেজ ও তার ব্যক্তিসত্ত্বার মধ্যকার এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য ওঠতে থাকল ফুটে। অপরিবর্তনশীল আত্ম-নিমগ্নতা এবং নিরন্তর বিদ্রূপাত্মক খোলসের আড়ালে একজন গভীরতর নরম, সংবেদনশীল ও আবেগাক্রান্ত মানুষের দেখা পেলাম আমি– যিনি নিজের [সিনেমার] দর্শকের সঙ্গে সংযোগস্থাপনের এক সুনির্দিষ্ট রকমের প্রবল সংবেদনশীলতা অনুভব করেন।

…যে মানুষটি
ভীতির শুটিং করার
সকল সীমারেখা পেরিয়ে গেছেন,
তিনি স্বয়ং একজন
ভীষণ ভয়কাতর লোক…

যে মানুষটি ভীতির শুটিং করার সকল সীমারেখা পেরিয়ে গেছেন, তিনি স্বয়ং একজন ভীষণ ভয়কাতর লোক; এবং আমার ধারণা, তার ব্যক্তিত্বের এই বৈশিষ্ট্যটিই তাকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ক্যারিয়ার জুড়ে নিজেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রডিউসার ও সেইসব টেকনিশিয়ানদের কাছ থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন– যাদের সামান্যতম ভুলভ্রান্তি কিংবা খামখেয়াল তার কাজের বিশুদ্ধতাকে হয়তো বিপন্ন করে তুলতে পারত– যা কিনা একজন ফিল্মমেকারের জন্য প্রচুর বিপত্তির কারণ হয়ে ওঠতে সক্ষম। কোনো অভিনেতা যেন প্রশ্ন তুলতে না পারেন, সেজন্য নিজেই নিজের সিনেমার প্রডিউসার হয়ে যাওয়া, এবং টেকনিক্যাল বিষয়ে টেকনিশিয়ানদের চেয়েও বেশি জ্ঞান রাখার চেয়ে নিজেকে সুরক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় একজন ডিরেক্টরের জন্য আর কী হতে পারে?

দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার উদ্দেশে, শৈশবের সকল শক্তিধর আবেগের পুনর্জাগরণের ব্যবহার ঘটিয়ে, তাদের মন জিতে নিয়েছেন হিচকক। তার সিনেমায় দর্শক স্বয়ং লুকোচুরি খেলার কিংবা অন্ধজনের হাতি চেনার, এবং তাকের ওপরে থাকা একটি ভুলে যাওয়া খেলনার ধীরে ধীরে এক রহস্যময় ও হুমকি হয়ে ওঠার আকার ধারণের সেইসব রাতের আতঙ্কের সকল টেনশন ও শিহরণকে রিক্যাপচার করতে সক্ষম– নিজ নিজ কল্পনাশক্তির জাদু ব্যবহার করে।

এ সকলই আমাদের মনে সাসপেন্সের জন্ম দেয়– এমনকি এ বিষয়ে হিচককের ওস্তাদি সম্পর্কে আমরা অবগত থাকা সত্ত্বেও, এগুলোকে প্রদর্শনের একটি ক্ষুদ্র ফর্ম হিসেবে সাধারণত গণ্য করা সত্ত্বেও, সাসপেন্সটি বস্তুতপক্ষে স্বয়ং দর্শনযোগ্য হয়ে ওঠে।

…স্টেশনে যাওয়ার পথে
প্রতিটি লালবাতি,
ট্রাফিক সিগন্যাল,
গিয়ার বদল
কিংবা ব্রেক কষা,
এবং
প্রতিটি পুলিশ এটির
আবেগাত্মক প্রভাবকে
সুতীব্র করে তুলবে…

সাসপেন্স হলো একটি ফিল্মের ন্যারেটিভ ম্যাটেরিয়ালের স্রেফ নাটকীয়রূপ, কিংবা, আপনি যদি চান তাহলে নাটকীয় পরিস্থিতিগুলোর সবচেয়ে সুতীব্র উপস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে একে ব্যবহার করতে পারেন। একটি ঘটনা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যাক : নিজের ঘর ছেড়ে যাচ্ছে একটা লোক, ডাক দিয়ে একটা ক্যাব থামাল, এবং তাতে চেপে বসে স্টেশনের দিকে ছুটে গেল ট্রেন ধরবে বলে। কোনো অ্যাভারেজ ফিল্মের একটি স্বাভাবিক দৃশ্য এটি। এখন ক্যাবের ভেতর বসে লোকটির উচিত নিজের ঘড়ির দিকে তাকানো এবং বলা, “হায় আল্লাহ, ট্রেনটা আমি ধরতেই পারব না!”; তাহলে তার এ যাত্রাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নিখাদ সাসপেন্স সিক্যুয়েন্সে পরিণত হবে। স্টেশনে যাওয়ার পথে প্রতিটি লালবাতি, ট্রাফিক সিগন্যাল, গিয়ার বদল কিংবা ব্রেক কষা, এবং প্রতিটি পুলিশ এটির আবেগাত্মক প্রভাবকে সুতীব্র করে তুলবে।

ইমেজটির উদ্বেগের সুস্পষ্টতা ও প্ররোচক ক্ষমতাটি এমনই যে, দর্শকের মনে এমনতর প্রশ্নের উদ্রেক ঘটবে না : “লোকটির কীসের এত তাড়া? পরের ট্রেন ধরলে তার অসুবিধা কোথায়?” সিনেমার পর্দায় সাময়িক উন্মাদগ্রস্ততার ইমেজারির মাধ্যমে সৃষ্টি করা টেনশনের কারণে, অ্যাকশনটির এ তাড়াটি কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।

ভয়-দৃশ্যের মাস্টার হিচকক স্বয়ং ভিতু একটা!

নিশ্চিতভাবেই, নাটকীয়রূপের ওপর এই জোরাজুরিটি পারবে না ‘খামখেয়াল’কে এড়িয়ে যেতে, এবং যদিও হিচককের শিল্প হলো ‘খামখেয়াল’কে যথাযোগ্যভাবে চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা; তবু এ বিষয়টি কখনো কখনো অবোধ্যতা সম্পর্কে নালিশ জানাতে [দর্শককে] মরিয়া করে তোলে। হিচকক যখন এ বিষয়টি সামলান, তখন বোধগম্যতা নিয়ে মাথা ঘামান না তিনি; তবু সত্য হলো, তার কাজ বোধাতীত হয়ে ওঠার ঘটনা বিরলই। তিনি যা করেন, তা হলো– কোনো একটি জাদুকরি ঘটনাচক্র ঘিরে প্লটটির মোড় ঘুরিয়ে দেন; আর তা তার সামনে প্রধান পরিস্থিতিকে দেয় হাজির করে। এরপর কাহিনীটিতে টেনশন ও বোধগম্যতার সর্বোচ্চ মাত্রা প্রয়োগে নিজেকে ন্যস্ত করেন তিনি– এক সুতীব্র আক্রমণের ভেতর এর সবগুলো সুতো যতটা সম্ভব শক্ত করে বেঁধে ফেলার মাধ্যমে। তারপর তিনি আচমকাই সব সুতো দেন আলগা করে; আর দ্রুতগতিতে খুলতে শুরু করেন কাহিনীর পাক।

…দর্শকের নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ
আদায় করে নিয়ে, তারপর
তাদের আবেগ ধরে রেখে
টেনশনকে পুরো সিনেমায়
অব্যাহত রাখার
এই যে সংকল্প– এটিই
হিচককের সিনেমাগুলোকে
এমন ভীষণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত
অথচ
তবু অননুকরণীয়
করে তুলেছে…

সাধারণত, কোনো সিনেমার সাসপেন্স সিক্যুয়েন্সটি সেটির সেইসব “সৌভাগ্যক্রমে-প্রাপ্ত মুহূর্তে” তৈরি হয়, যেগুলো দর্শকের স্মৃতিশক্তির ভেতর ঘোরপাক খেতে থাকে। কিন্তু হিচকক চান প্রত্যেকটি দৃশ্যই হয়ে ওঠুক একেকটি “সৌভাগ্যক্রমে-প্রাপ্ত মুহূর্ত”; এবং ক্যারিয়ার জুড়ে তার প্রতিটি প্রচেষ্টার মধ্যেই এমন একেকটি সিনেমার কাছে তিনি পৌঁছুতে চেয়েছেন– যেগুলোর মধ্যে কোনো ফাঁক কিংবা ফাটল নেই।

দর্শকের নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ আদায় করে নিয়ে, তারপর তাদের আবেগ ধরে রেখে টেনশনকে পুরো সিনেমায় অব্যাহত রাখার এই যে সংকল্প– এটিই হিচককের সিনেমাগুলোকে এমন ভীষণ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অথচ তবু অননুকরণীয় করে তুলেছে। নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখার এ চর্চায় কাহিনীকেই তিনি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে গণ্য করেননি; অভিপ্রায় সম্পর্কে তার একাগ্রচিত্তও এই প্রকাশভঙ্গিমায়, এই রূপান্তরগুলো, এবং এইসব সিকুয়েন্সের মধ্যে প্রতিফলন ফেলেছে– যেগুলো [অন্য ফিল্মমেকারদের] বেশির ভাগ সিনেমার ক্ষেত্রেই সাধারণত তুচ্ছ হিসেবে পরিগণ্য।

এমনকি দুটি কী-সিক্যুয়েন্সের মধ্যে স্রেফ সেঁতু হিসেবে কাজ করা কোনো এপিসোডও কখনোই মামুলি হয়ে ওঠতে পারবে না; কেননা “সাদামাটা” বিষয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা আছে হিচককের। যেমন ধরুন, আইনি ঝামেলায় পড়া একজন লোক– যাকে আমরা নিষ্পাপ বলেই জানি, সে নিজের মামলা নিয়ে হাজির হলো কোনো এক উকিলের কাছে। এটি একটি দৈনন্দিন ঘটনা। এ ঘটনাটি হিচককের হাতে পড়লে, উকিলটি উপস্থাপিত হবে একজন সন্দেহবাজ লোক হিসেবে, এবং মামলাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বদলে বরং অনাগ্রহী রূপেই দেখা মেলবে তার। কিংবা, দ্য রং ম্যান-এ তিনি যেমনটি দেখিয়েছেন, মামলাটি সে নেবে কেবল নিজের সম্ভাব্য মক্কেলকে এই সতর্কবার্তা জানিয়ে দিয়ে যে, এ ধরনের আইনি কাজে তার অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে এবং এ মামলা সামলানোর র জন্য যথার্থ লোকটি হয়তো সে নয়।

এমনতর ডিস্টার্বিং ভূমিকাপর্বের মাধ্যমে, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার এমন এক অনুভূতি সৃষ্টি করেন তিনি, যেটি এই সাদামাটা পরিস্থিতিটির ভেতর নাটকীয়তার সম্ভাবনা তৈরি করে।

…কোনো সাদামাটা দৃষ্টিপাতের
প্রশ্নে, হিচকক অভিনয়ের
প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম
করে, সৃষ্টি করেন
সেইসব দাম্ভিক মায়ের
একজনকে…

এই ভঙ্গিমার আরেকটি জাদু হলো, মায়ের সঙ্গে নিজের প্রেমিকার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এক তরুণ– এমন একটি মামুলি দৃশ্যের ভেতর তার [হিচককের] আউট-অব-অর্ডিনারি টুইস্টের প্রতিফলন ঘটানো। একদিন নিজের শাশুড়ি হবে– এমন বুড়িকে খুশি করানোর ব্যাপারে মেয়েটি স্বভাবতই উদ্বিগ্ন। নিজের প্রেমিকের নিরুদ্বেগ আচরণের বিপরীতে, এখানে সে স্পষ্টতই লাজুক ও অস্থির। পুত্রটির পরিচয়পর্বের আনুষ্ঠানিকতাকে অফস্ক্রিন ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝাপসা করে দেওয়ায়, দর্শক দেখতে পায় মেয়েটির দিকে এই বুড়ির তাকিয়ে দেওয়া অভিব্যক্তি; তাকে ঘিরে ফেলবে এমন এক আবহ– যা হয়ে ওঠবে নিখাদ হিচককধর্মী– যেটির সঙ্গে দর্শকরা ভীষণ পরিচিত। তরুণীটির মনোজগতের ভাঙচুর সুনির্দিষ্ট হয়ে যায় একটু সামান্যতম পিছু-হটার মধ্য দিয়েই। এখানেও, কোনো সাদামাটা দৃষ্টিপাতের প্রশ্নে, হিচকক অভিনয়ের প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করে, সৃষ্টি করেন সেইসব দাম্ভিক মায়ের একজনকে।

এ অবস্থাটি থেকে, ফিল্মটিতে সকল পারিবারিক দৃশ্যই আবেগে উপচে পড়বে এবং দ্বন্দে এঁটে যাবে– সিনেমার পর্দা থেকে তুচ্ছতাকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রশ্নে হিচককের নিজস্ব সংকল্পের প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিফলন সহকারে।

দ্য রং ম্যান

সাসপেন্স সৃষ্টি করার শিল্প মানে দর্শককে সম্পৃক্ত করার শিল্পও বটে, যেন দর্শকও বস্তুতপক্ষে ফিল্মটিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। প্রদর্শনের এ জায়গাটিতে, ফিল্মমেকিং আসলে ফিল্মমেকার ও তার সিনেমার মধ্যকার কোনো দ্বৈত খেলা নয়, বরং ত্রিমুখি এ খেলাটিতে দর্শকের অংশগ্রহণও প্রয়োজন পড়ে। ফিল্মি কনটেক্সটে সাসপেন্স হলো টম থাম্বের [ইংলিশ লোককথার একটি চরিত্র] সাদা নুড়ি পাথর কিংবা অরণ্য জুড়ে লিটল রেড রাইডিংহুডের [একটি ইতালিয়ান রূপকথা] হেঁটে যাওয়ার মতো, একটি কাব্যিক তাৎপর্য জাহির করে আবেগগুলোকে সুতীব্র করে তুলতে এবং [দর্শকের] হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিতে।

…সাসপেন্স সৃষ্টি করার
শিল্প মানে দর্শককে
সম্পৃক্ত করার শিল্পও বটে,
যেন দর্শকও বস্তুতপক্ষে
ফিল্মটিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন…

সাসপেন্স বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠায় হিচককের ভর্ৎসনা করার মানে হলো, তাকে ফিল্মমেকারদের মধ্যে সবচেয়ে কম বোরিং হয়ে ওঠার জন্য দোষারূপ করার সামিল; এ বস্তুতপক্ষে সেই প্রেমিককে দোষারূপ করার সামিল– যে নিজের আনন্দে মনোযোগ দেওয়ার বদলে বরং নিজের প্রেমিকার সঙ্গের সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে বেশি মনোযোগী। হিচককের সিনেমার ধরণই হলো দর্শককে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট করে ফেলা, যেন আরব দর্শকটি বাদাম খেতে খেতে খোসা ছাড়াতে ভুলে যায়, যেন ফরাসি দর্শকটি তার পাশের সিটের মেয়েটিকে খেয়ালে না রাখে, যেন ইতালিয়ান দর্শকটি থামিয়ে দেয় তার চেইন-স্মোকিং স্বভাব, যেন কাশির রোগি নিরস্ত হয় তার অবিরাম কাশি থেকে, যেন প্রকাশ্যে সঙ্গমরত সুইডিশরা থামিয়ে দেয় সঙ্গম।

জগতের সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয় টেকনিয়ান হিসেবে সর্বজনীনভাবে পরিচিত হতে পারতেন হিচকক; এমনকি তার নিন্দুকেরা তার এই উপাধিকে সাদরে মেনে নিতে রাজি। তবু, এ কথা কি নিশ্চিত নয় যে, কোনো চিত্রনাট্য বেছে নেওয়া, সেটি নির্মাণযোগ্যরূপে গঠন করা, এবং সেটির সকল কনটেন্ট একান্তভাবে বস্তুতপক্ষে সেই টেকনিকের ওপর নির্ভরশীল? সকল শিল্পীই ক্ষ্যাপাটে, এবং এর ফলে কনটেন্ট থেকে আলাদা ফর্ম তৈরি করে নেওয়ার সমালোচনামূলক প্রবণতা তাদের মধ্যে রয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটি হিচককের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা বিশেষভাবে অযৌক্তিক, যা কিনা এরিক রোমের [ফরাসি ফিল্মমেকার; ১৯২০-২০১০] ও ক্লুদ শ্যাব্রল তাদের গ্রন্থে [হিচকক] দেখিয়েছেন, তাকে না একজন সাদামাটা কাহিনীকার, না একজন সৌন্দর্য-পিপাসু হিসেবে যথাযোগ্যভাবেই চিহ্নিত করে। তারা লিখেছেন, “হিচকক হলেন সিনেমার ইতিহাসে ফর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ভাবকদের অন্যতম। এ ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মুরন্যু [জার্মান ফিল্মমেকার; ১৮৮৮-১৯৩১] ও আইজেন্টেইনের [সোভিয়েত ফিল্মমেকার; ১৮৯৮-১৯৪৮] মতো ফিল্মমেকারদের সঙ্গেই বোধকরি তার তুলনা টানা সম্ভব।… ফর্ম এখানে কনটেন্টকে স্রেফ সুশোভিতই করেনি, বরং বস্তুতপক্ষে এটিকে সৃষ্টি করেছে।”

…একজন ফিল্মমেকারের
জন্য, সবচেয়ে বড় বিপদটি
হলো, নিজের সিনেমাটি
নির্মাণের কালে তিনি হয়তো
সেটির ওপর নিয়ন্ত্রণ
হারিয়ে ফেলতে পারেন…

ফিল্মমেকিং শিল্পটি ওস্তাদলোকের জন্য একটি সবিশেষ কঠিন বিষয়; কেননা, বহুবিধ ও প্রায়শই পরস্পরবিরোধী প্রতিভাদলের সন্নিবেশ ঘটায় এটি। যে কারণে অনেক বেশি উৎকৃষ্ট কিংবা ভীষণ প্রতিভাধর মানুষেরা ফিল্মমেকিংয়ে এসে ব্যর্থ হয়েছেন, তা হলো– এ কাজে এসে বিশ্লেষণাত্মক ও সমন্বয়বোধের যুগপৎ সম্মিলন ঘটাতে সক্ষম কোনো মস্তিষ্কই কেবল পারে একটি ফিল্মের শুটিং, কাটিং ও মন্তাজের খণ্ড-বিখণ্ডগুলোর সহজাত প্রলোভনের গোলকধাঁধায় পথ খুঁজে নিতে। একজন ফিল্মমেকারের জন্য, সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো, নিজের সিনেমাটি নির্মাণের কালে তিনি হয়তো সেটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। বস্তুতপক্ষে, সকল সর্বনাশের মূলে এটিই সবচেয়ে কমন কারণ।

ডিরেক্টর’স চেয়ারে হিচকক

একটি সিনেমার প্রত্যেকটি কাট, তা সেটি হোক তিন থেকে দশ সেকেন্ডের, দর্শককে নিজস্ব তথ্য দিতে থাকে। এই তথ্যটি পুরোটাই প্রায়শই অস্পষ্ট কিংবা নিতান্তই অবোধ্য হয়ে ওঠে; এর কারণ– ফিল্মমেকারটির উদ্দেশ্যটি হয় অনির্দিষ্ট হতে শুরু করে দিয়েছে, নয়তো সেটিকে স্পষ্ট করে তোলার মতো দক্ষতার ঘাটতি রয়ে গেছে তার মধ্যে।

স্পষ্টতার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা– এ প্রশ্ন যারা তোলেন, তাদের আমি স্রেফ বলে দিতে পারি, সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এ কথাটি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত উদাহরণের আশ্রয় নেওয়া যাক : “এ পর্যায়ে এসে, বালাচভ বুঝতে পারল, কানাদিন তাকে ধোকা দিয়েছে, বেনসনের কাছে যাওয়া পথে, এই উপস্থাপন করে যে, তারা তলমাশেফের সঙ্গে যোগাযোগ করে, লুঠের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেবে’… ইত্যাদি, ইত্যাদি।

হাজারও সিনেমায় এটি কিংবা এ রকমই কোনো সংলাপ রয়েছে, যেগুলো আপনাকে করে দিয়েছে বিমূঢ়, কিংবা আরও বাজেভাবে বললে, পর্দায় তা দেখতে দেখতে আপনার মধ্যে কোনো ভাবাবেগ তৈরি করেনি। নির্মাতারা বালাচভ, কানাদিন, বেনসন ও তলমাশেফ সম্পর্কে সবকিছু অবগত থাকলেও, আপনি, দর্শক হিসেবে, সিনেমার এই আদি নিয়মটির গুণের ব্যাপারে রয়ে গেছেন সম্পূর্ণই বিভ্রান্ত : দেখানোর বদলে কোনোকিছু যদি শোনানো হয়, দর্শক সেটির মানে ধরতে পারবে না।

হিচকক যেহেতু সবকিছু নিখাদ ভিজুয়াল তাৎপর্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করার পথ বেছে নিয়েছেন, ফলে বালাচভ, কানাদিন, বেনসন ও তলমাশেফ মহোদয়গণ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।

হিচককের ওপর যে দোষারূপগুলো অবিরাম চাপিয়ে দেওয়া হয়, এর একটি– স্পষ্টতার প্রতি তার জোর দেওয়ার মধ্যে যে সরলীকরণ প্রবণতা রয়ে গেছে, সেটি তার ফিল্মি-পরিধিকে অনেকটাই শিশুতোষ আইডিয়াগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। আমি মনে করি, এ কথা সত্য হতে পারে; তবে এর বিপরীতে, নিজের [সিনেমার] চরিত্রগুলোর ভাবনা-চিন্তাকে শুট করার এবং সংলাপ অবলম্বন না করেই সেগুলোকে বোধগম্য করে তোলার যে অনন্য সক্ষমতা তার রয়েছে, তাতে তাকে একজন বাস্তববাদী ফিল্মমেকার হিসেবেই আমি গণ্য করি।


গ্রন্থসূত্র । হিচকক/ত্রুফো। সিমন অ্যান্ড শ্যুস্টার পাবলিকেশন; ১৯৮৩

দ্বিতীয় কিস্তি, আসছে শিগগিরই…

Print Friendly
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [২ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন