বিএম কলেজ গেট টু ঢাকা ও বিভিন্ন ফ্রেমের একজন রাসেল আহমেদ/ মিছিল খন্দকার

0
85

লিখেছেন মিছিল খন্দকার


ক দশক আগের রৌদ্রদগ্ধ প্রায় নিস্তব্ধ বিভিন্ন দুপুরের কথা মনে পড়ে। কিংবা সেই সময়কার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত হুটহাট ঢুকে পড়ে এই নাগরিক শোরগোলে ঠাসা ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে। ২০০৭/০৮/০৯/১০ সালের বিভিন্ন দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যা-রাত-ভোররাত-ভোর এসে ২০১৭ সালের মধ্য মে’র এই দুপুর রাতের মধ্যে জট পাকিয়ে যায়। সেই জটের মধ্যে আটকা পড়ে কেমন বিষন্নতর হয়ে একের পর এক সিগারেট পোড়াই হাতে। মনে পড়ে, সেই সময় মানে ২০০৭/০৮/০৯/১০ সালে আমরা বলতাম, যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, এই রাস্তা দিয়ে একদিন জীবনানন্দ দাশ হেঁটে ফিরতেন ঘুঘু, শালিক, দোয়েলের কাকলিমুখর বট, অশথ, হিজল আর ঝাউবন ঘেরা তার বগুড়া রোডের বাড়িতে। দুপুরে যখন বিএম কলেজ ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা হয়ে যেতো, তখন ফিজিক্স ভবনের সামনে [জীবনানন্দের সময় যেটায় ছিলেন ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট। শোনা যায়, মাঝে মাঝেই ওই ভবনের দোতলায় থাকা একটা ঝুল বারান্দায় জীবনানন্দ বসতেন। আগের ভবনের অবিকল নকশায় বর্তমানটা করা হলেও ঝুল বারান্দাটা এই ভবনে নাই।] আড্ডায় কেউ কেউ বলতো, শুনেছি, এই ভবনে বসে জীবনানন্দ দাশ তার ‘হায় চিল’ কবিতাটা লিখেছিলেন। শিক্ষক জীবনানন্দ হয়তো এই মাঠ হয়ে ধানক্ষেতের আল ধরে প্রতিদিন ফিরে যেতেন কবি জীবনানন্দের কাছে।

সেইসব দিনে আমি আর অভি [আব্দুল্লাহ মাহফুজ/কবি আগন্তুক মাহফুজ] খুব খুব বন্ধু। আমরা দুই বগির ট্রেন। এক সাথে সারাদিন থাকি। সন্ধ্যা থাকি। মাঝরাত পর্যন্ত থাকি। তারপর কোনো কোনো দিন রাতে আমি অভির বাসায় ফিরি ওর সাথে। আবার কোনো দিন ও আমার সোবাহান মিয়ার পুল এলাকার মেসে চলে আসে। সারারাত বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা হয়, পরিকল্পনা হয়, স্বপ্নকে ধরার ফাঁদ পাতা হয়। সিগারেট জ্বলে সারারাত। রুমমেট বিরক্ত হয়। ছাদে চলে যাই। ভোর হয়ে যায়। আড্ডা শেষ হয় না। কখনও কখনও ঢাকা থেকে মেহেদী চলে আসে। কোনো কোনো দিন অভি, মেহেদি, প্রিন্স, রাব্বি, তানিজ- সহযোগে সারারাত আড্ডাফাড্ডা দিয়ে ভোর নামিয়ে ফেলি। আমি আর অভি তখন দিন-রাত কবিতা নিয়ে ভেতরে ভেতরে হুলস্থূল বাধিয়ে চলেছি। অভির মাথায় তখন নানা পরিকল্পনা- কবিতা, সাংবাদিকতা, নাটক-সিনেমা, বাম রাজনীতি, ভাস্কর্য নির্মাণ আন্দোলন। আমার ঘোর কেবলই কবিতার। বাকি সব বিষয়ে শুধু সঙ্গ দিয়ে যাওয়া। কোনো কোনো দিন বিকালে বিএম কলেজের সামনে বিপ্লব দা’র চায়ের দোকান, কোনো কোনো দিন ওই জীবনানন্দের গন্ধওয়ালা ফিজিক্স ভবনের সিঁড়িতে বা সামনের মাঠে। আবার কোনো কোনো দিন বিবির পুকুর, কবি জীবনানন্দ দাশ সড়ক [বগুড়া রোড], কোনো কোনো দিন ত্রিশ গোডাউন, লঞ্চঘাট, কীর্তনখোলা পাড়। আড্ডা হয়। গান হয়। কবিতা হয়। মূলত এসব হওয়া-হওয়ির সেই সময়ে জীবনানন্দের কারণে বরিশাল আমাদের কাছে হয়ে ওঠে প্যারিস, কলকাতা বা ঢাকার চেয়ে শিল্প-সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শহর।

২.

এসবের শুরুর দিকে রাতের পর রাত জেগে বেশ কিছু কবিতা লেখা হয় আমার আর অভির। তখনও কোনো লিটলম্যাগ বা দৈনিকের কাউকে কবিতা ছাপানো অর্থে চিনতাম আমরা। কেবল আমার কবিতাগুলো অভি, আর অভিরগুলো আমি পড়ি। এবং উভয়ে এই ঐক্যমত্যে পৌঁছাই যে, এসব কবিতা দিয়ে একটা বই করার এখনই উপযুক্ত সময়। সিদ্ধান্ত হয় বইটা হবে যৌথ। আর এর প্রকাশক হবে বন্ধুরা। সেই মতে ঢাকা ও বরিশালে থাকা বন্ধুদের প্রত্যেকের জন্য একশ’ টাকা করে বাধ্যতামূলক চাঁদা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অমৃত লাল দে কলেজের সামনে যেখানটায় ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন অনেক দুপুর-সন্ধ্যা আমাদের শোরগোলে খানখান হয়েছে, সেই সুমনের দোকানে এক দুপুরে বইয়ের নাম ঠিক হয়। সাথে সাথে ফোনে বই করার সিদ্ধান্ত ও হবু বইয়ের নাম জানানো হয় কবি অভিজিৎ দাসকে। একই সঙ্গে নাম তার কেমন লাগলো জানতে চাই। অভিজিৎ অনেকটা সান্ত্বনাসূচক ভদ্রতায় বলেন, বেশ হয়েছে। আধুনিক নাম।

…টাইপ করাতে হবে,
বুক ডিজাইন করাতে হবে,
প্রচ্ছদ করাতে হবে।
এসব কাজে এমন দক্ষ
লোকজন কোথায় পাই!
এমন সময়ে
আমাদের ফ্রেমে এলেন রাসেল আহমেদ…

এরই মধ্যে অভির কর্মোদ্দ্যম সমান গতিতে চলতে থাকে। তালিকা ধরে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ওঠানো শেষ হয়। কয়েক রাত ধরে অভি ও আমার বাসায় বসে কবিতা বাছাই করতে গিয়ে আমরা চোখে নিচে অমাবস্যা জমিয়ে ফেলি। বন্ধু মেহেদীর আইডিয়া আসে, বইয়ের একপাশে আমার কবিতা থাকবে এবং বইটা হরাইজন্টাললি ঘুরিয়ে ফেললে অভির কবিতা। মধ্যে প্রিন্টার্স লাইন ও উৎসর্গপত্র। প্রাথমিক কাজ শেষ করা গেলো। কিন্তু কবিতা তো খাতায়– হাতে লেখা, পরিকল্পনা সব মাথায়। টাইপ করাতে হবে, বুক ডিজাইন করাতে হবে, প্রচ্ছদ করাতে হবে। এসব কাজে এমন দক্ষ লোকজন কোথায় পাই! এমন সময়ে আমাদের ফ্রেমে এলেন রাসেল আহমেদ। আমাদের রাসেল ভাই।

৩.

তখন রাসেল ভাইকে বিএম কলেজের সামনে, তার বন্ধু জাহিদ ভাইয়ের দোকান ‘অরণ্যে’ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে দেখতাম মাঝে মাঝে। আর দেখতাম সন্ধ্যায় বিএম কলেজের মধ্যে, কিংবা সামনের বিপ্লব দা বা শাহীনের চায়ের দোকানে। চা-সিগারেট চক্রে টুকটাক কথা হতো কখনও কখনও। তাও ওই উভয় পক্ষের শিল্প-সাহিত্যে আগ্রহের কারণে; যৎসামান্যই। এর মধ্যে ওই ফটোকপি, টাইপ ও প্রিন্টের দোকানে যাওয়া-আসা বাড়ে, রাসেল ভাইয়ের কম্পিউটার দক্ষতা, আঁকাআঁকি বিষয়ে আমরা যৎকিঞ্চিত অবগত হই। এরপর কলেজ গেটের কোনো এক চা-সিগারেট চক্রে, কিংবা বিএম কলেজের সেই ফিজিক্স ভবনের সামনে আমাদের বই বিষয়ক আকাশকুসুম নিয়ে রাসেল ভাইয়ের সাথে অভির প্রথমে আলাপ হয়। জানানো হয় টাকা জোগাড় আছে, কবিতাও আছে, নামও ঠিক, শুধু কিনা টাইপ, প্রচ্ছদ আর ছাপার কারণে স্বপ্ন পূরণ ঝুলে আছে। রাসেল ভাই রাজি হন, বইয়ের ডিজাইন ও প্রচ্ছদ করে দিতে। তার পরিচিত এক প্রেসের সাথেই– যতোটা মনে পড়ে– ছাপার বিষয়ে আলাপ হয়ে থাকে। এরপর বিএম কলেজের সামনে তার অপর এক বন্ধুর দোকান ‘রেইনবো কম্পিউটারে’ ব্যবসায়িক কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের বইয়ের টাইপের কাজ আগাতে থাকে। দোকানের কম্পিউটার যখন ব্যস্ত থাকে তখন আমরা আড্ডা দিই বিএম কলেজের মধ্যে, বিপ্লব দা বা শাহিনের চায়ের দোকানে, কখনও বিবির পুকুর পাড়ে চলে যাই, কখনও কীর্তনখোলা পাড়। আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ক্রমে আমাদের কাছে প্রকাশিত হতে থাকেন তিনি। শুরু হয় স্বপ্ন বিনিময়। শান্ত স্বভাবের ম্যাজিকাল হাসি নিয়ে রাসেল ভাই তার স্বপ্নের কথা বলতে থাকেন। কোনো কোনো দীর্ঘ আড্ডা গভীর রাত পর্যন্ত চললে এক ফাঁকে বলতে থাকেন, তার মাথায় লিপিবদ্ধ সিনেমা স্ক্রিপ্টের গল্প। সেই সবগুলো স্প্রিপ্ট তিনি লিখে যেতে পেরেছেন কিনা, জানা নেই আমার।

একবার একটা বই দিলেন পড়তে, মুহম্মদ জাফর ইকবালের জিব্রাইলের ডানা। বললেন, পড়া শেষ হলে এটা নিয়ে আলাপ করবেন। পড়া শেষ হলো। বই ফেরত দিলাম। এরপর জানতে চাইলেন, এটা নিয়ে সিনেমা বানালে কেমন হয়? ওই সময়কার বিবেচনায় আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগলো। ভাবলাম, এটা ক্যামেরায় তুলে আনা কিভাবে সম্ভব! ইতস্তত করে কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করলাম। রাসেল ভাই তখন এটার চিত্রনাট্য কেমন হবে, দৃশ্যধারণ কোথায় কিভাবে হবে, বাজেট কেমন হবে, এটা তার কতোতম সিনেমা হবে– এসব ডিটেইল বলে আমাকে আশ্বস্ত করতে পারলেন যে, এটা তার কথার কথা, স্বপ্ন নয়।

যাই হোক, আবার বইয়ের প্রসঙ্গে আসি। কবিতা টাইপের পর যে প্রুফ দেখার একটা বিষয় থাকে তা আমাদের চিন্তায় কয়েক মাইল দূরে ছিলো তখনও। ফলে রাসেল ভাই টাইপ করার সময়ই আমাদের সাথে আলোচনা করে করে বানান ঠিক করতে লাগলেন। এর মধ্যে একদিন আমার একটা কবিতায় একটা শব্দ চেঞ্জ করতে চাইলেন। আমি বেঁকে বসলাম, চটে গেলাম। পরক্ষণেই এও ভাবলাম, উনি বিষয়টা ভালো ভাবে নেবেন তো? হয়তো আমাদের কাজটা আর করবেন না। কিন্তু না, রাসেল ভাই হাসলেন। কম্পিউটারটা লগ অফ করলেন। চা খেতে নিয়ে গেলেন আমাকে। চা শেষে সিগারেট ধরিয়ে বিএম কলেজের ভেতরে যেতে যেতে জানালেন, আমার এই বিষয়টা তার পছন্দ হইছে।

এর কয়েক দিন পর একদিন দুপুরে আমাকে আর অভিকে ফোন করে ডেকে আনলেন। কম্পিউটার স্ক্রিনটা আমাদের দিকে ঘুরিয়ে বললেন, এই তোদের বইয়ের কভার। পছন্দ হইছে? কভার ভালো-খারাপ বিবেচনার মতো অবস্থা আমাদের ওই মুহূর্তে ছিলো না। দু’জনই তখন কভারের নিরিখে বইটা ভিজ্যুয়ালাইজ করতে চাইছিলাম হয়তো। মে বি ভাবছিলাম, আমাদের বই তাহলে হচ্ছেই এবার। ভেতরে থাকা প্রায় টের না পাওয়া অবিশ্বাসটাও এর মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছিলো। এই আনন্দে, গ্রাফিক্সে করা ওই কভারের সৌন্দর্যের কাছে আমাদের জীবনে দেখা অন্য সব কভার কিছুই না বলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম আমরা।

…একে একে
বিএম কলেজ এলাকায়
চাউর হয়ে গেলো যে,
লিটলম্যাগ করতে চাইলে
ভাবনার কিছু নেই,
অলংকরণ-অঙ্গসজ্জাসহ
টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য
একজন বড় ভাই আছেন…

এরপর বইটা ছাপা হলো। প্রেস থেকে দুইটা বই নিয়ে আসার সময় কবি তুহিন দাস, রাসেল ভাইয়ের কাছ থেকে একটা বই রেখে দিলেন। এই মর্মে আমরা জানলাম, বরিশালে কেবল আমরাই কবিতা লিখি না, এ শহরে তুহিন দাস নামে আরও একজন কবি আছেন। এরপর আমাদের জানার পরিধি বিস্তৃত হতে হতে একে একে হেনরী স্বপন, সাইদ র’মান, র’মান র’মান, সাইফ ইবনে রফিক, ইমরান মাঝি, মহিবুল্লাহ শাওয়াল, কিং সউদ, মোহাম্মদ জসিম, অনিন্দ্য দ্বীপ, সানাউল্লাহ সাগর বরিশালে প্রভূত কবির উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত হলাম এবং তাদের সাথে পরিচয় হতে লাগলো। এর কাছাকাছি কোনো এক সপ্তাহে আমরা কবি কিং সউদের লিটলম্যাগ সন্ধ্যা এবং দৈনিক পরিবর্তন-এ কবি হেনরী স্বপন সম্পাদিত সাহিত্যপাতা আবহমান-এ লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের মেইনস্ট্রিমে যাত্রা শুরু করলাম। ফলত আমার মাথায় তখন লিটলম্যাগের জ্বিন। অভির সাথে পরামর্শ করতে গেলে ও জানালো, প্রতিদিন ওর আর আমার কবিতা দিয়ে দুই টাকার কবিতাপত্র করা যেতে পারে। যেই ভাবনা সেই কাজের জন্য আবার আমরা রাসেল ভাইয়ের শরানাপন্ন হই এবং যথারীতি তার টাইপ, অলংকরণ ও ডিজাইনে ফটোকপি সংস্করণ দুই টাকার কবিতাপত্র বের হতে থাকে। বেশ লাভজনক ব্যবসা। বিএম কলেজ ক্যাম্পাসে দুপুরের ঘণ্টা দুই টাকার কবিতাপত্র বিক্রির টাকা দিয়ে চা-সিগারেট খাওয়ার পর রাসেল ভাইয়ের বন্ধু নুরু ভাইয়ের ফটোকপির দোকানে পরবর্তী দিনের সংখ্যার টাকা জমা রাখা হতো। এরপর বিশেষ বিশেষ জাতীয় দিবসে বন্ধু কবি মাহমুদ মিটুলের সাথে যৌথ সম্পাদনায় বের করতে শুরু করলাম লিটলম্যাগ মানচিত্র। এক্ষেত্রেও উদ্ধারকর্তা রাসেল ভাই। একে একে বিএম কলেজ এলাকায় চাউর হয়ে গেলো যে, লিটলম্যাগ করতে চাইলে ভাবনার কিছু নেই, অলংকরণ-অঙ্গসজ্জাসহ টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য একজন বড় ভাই আছেন।

৪.

এভাবে ক্রমে রাসেল ভাইয়ের সাথে আড্ডা-আন্তরিকতা বাড়তে থাকে। বয়সের দূরত্ব সে তো শুরুতেই ঝেড়ে ফেলেছিলেন তিনি। প্রকৃতার্থে রাসেল ভাই-ই প্রথম আমাদের শিখিয়েছেন, বন্ধুত্বে বয়স কোনো বিষয় নয়। এই সময়কালে মধ্যে বরিশালে নতুন একটা দৈনিক পত্রিকার যাত্রা শুরু হলো। সেখানে ক্রিয়েটিভ বিভাগে জয়েন করলেন রাসেল ভাই। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকটা আঞ্চলিক দৈনিকে কাজ করেছেন। অভি দৈনিক পরিবর্তন নামে একটা পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন, সেটা ছেড়ে ও বাংলার বনে নামে ওই পত্রিকায় জয়েন করলেন। আর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেবেন বলে কথা চলছিলো কবি তুহিন দাসের সাথে। পরে তুহিনের সাথে মালিক পক্ষের ব্যাটে-বলে মিললো না। ফলে রাসেল ভাই আর অভির পরামর্শে আমার ডাক পড়লো সাহিত্য সম্পাদনার। প্রথমে ইতস্তত করলাম। জীবনের প্রথম সম্পাদনার কাজ বলে সাহসের কুলাচ্ছিলো না। সেটা পূরণ করলেন রাসেল ভাই। তিনি বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন। প্রায় ১০ দিন বিভিন্ন সময় বসে আমরা পরিকল্পনা করলাম। এরপর লেখা আহ্বান। কবি হেনরী স্বপন, তপংকর চক্রবর্তী, দীপংকর চক্রবর্তী, মোশতাক আল মেহেদী, মোহাম্মদ জসিম, বিধান অধিকারীসহ কারও কাছ থেকে লেখা চেয়ে নিলাম। এরপর বাছাইকৃত লেখা নিয়ে বসলাম। রাসেল ভাই টাইপ করলেন। প্রুফ রিডারও তিনি। আমাকেও প্রুফের বিষয়টা বুঝিয়ে দিলেন।

এভাবে প্রথম দিন সকাল ১০টায় বসে একটানা দুপুর তিনটা হয়ে যায়। এরপর লাঞ্চ বিরতি নিই আমরা। দু’জন মিলে জিলা স্কুলের পাশের একটা পুকুরের মধ্যে গড়ে ওঠা ভাতের হোটেলে ইলিশ মাছ আর ডাল চচ্চরি দিয়ে ভাত খাই। ভাবতে গেলে এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই সেই প্রায় বিকালটা। এরপর আবার বসি পেজ মেকাপে। এবার দেখি বাছাই করা লেখায় দুই পৃষ্ঠার সাহিত্য পাতা ভরছে না। অনেক স্পেস খালি থেকে যাচ্ছে। কী করি উপায়! দুর্ভাবনায় ছেদ টেনে এক পর্যায়ে রাসেল ভাই চুপচাপ তার মেইল খোলেন। তার একটা গল্প দেন পড়তে। বলেন, ছাপার যোগ্য হলে ছাপাতে পারিস। দেখলাম, ভালো গল্প। কিন্তু ওই সংখ্যায় তো অলংকরণে রাসেল ভাইয়ের নাম যাচ্ছে, ফলে তার গল্পটাই অন্য একটা নাম দিয়ে বসানো হলো পেজে। এভাবে দুই ভাই মিলে ওই সাহিত্য পাতার ৭/৮টা সংখ্যা করে ফেললাম। এরপর সংবেদনশীল রাসেল ভাই কোনো এক সূক্ষ্ম অভিমানে চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। স্বভাবতই অলংকরণসহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে তাকে পাবো না– এটা জেনেই ভড়কে গেলাম। তাকে সেটা জানালামও। তিনি বললেন, হয়তো অলংকরণ অতো ভালো হবে না, তবু নিজের মতো করে ওখানকার কম্পিউটার অপারেটর দিয়ে সিম্পল কিছু অলংকরণ করিয়ে নিস। আর বাকিটা তো তোর এরই মধ্যে আয়ত্ব হয়েছেই। ফলে আগায়ে যেতে বললেন। বছর খানেক কাজ করার পর বিভিন্ন কারণ জড়ো হলে আমিও চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।

…আমরা সবাই মিলে
খানাদানা করতে করতে
সেই নাটক দেখলাম

একে অপরের অভিনয়ের
অনেকটা প্রশংসা

কিছুটা নিন্দা করলাম…

ওই সময়ে রাসেল ভাইয়ের সিনেমা-নাটক নির্মাণে প্রাকটিক্যালি নেমে পড়ার তাড়না বাড়তে লাগলো। এদিকে অভিরও একই তাড়না। ফলে অভি একটা স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললো নাটকের। একটা হ্যান্ডিক্যাম মানেজ করলো কোনো এক বন্ধুর, মে বি শিহাদের। অ্যালবার্ট রিপন ভাই আবির্ভূত হলেন পয়সার যোগানদাতা হিসেবে। আর্টিস্টও সিলেক্ট করা হলো বিএম কলেজ ক্যান্টিনে বসে। স্যুটিং স্পট হিসেবে বাছাই করা হলো বিএম কলেজ ও এর আশপাশের এলাকা এবং ইনডোরে আমার মেস [সে অনুযায়ী, মেহেদীর মাধ্যমে ঢাকা থেকে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের ছবি এনে দেয়ালে লাগিয়ে মেসের সাজসজ্জায় পরিবর্তন আনা হলো]। যথারীতি নাটকে একটা কবি চরিত্র আছে, যেটায় অভিনয় করতে হবে আমাকে। বাইরে না বললেও, ভেতরে ভেতরে চরম ভয়ে আছি। তো যাই হোক, স্ক্রিপ্ট হলো, আর্টিস্ট সিলেক্ট হলো, লোকেশন হলো, হ্যান্ডিক্যাম ম্যানেজ হলো, প্রযোজক পাওয়া গেলো– এখন ক্যামেরা চালাবেন কে! এবারও অভি শরনাপন্ন হলো রাসেল ভাইয়ের। শুরুতে ক্যামেরা চালানোর দায়িত্ব পেলেও, পরে নাটকের ভিডিও এডিটিংয়ের দায়িত্বও পড়ল তার ওপরে। শ্যুটিংয়ে শুরু হলো। অভি আর রাসেল ভাইয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শেয়ারিং বাড়তে লাগলো। আমাদের আর্টিস্টদের মধ্যে তখন একটা স্টার ভাব চলে আসি আসি অবস্থা, কিন্তু অভিনয় ভীতির কারণে পুরোপুরি আসতে পারছে না। রাসেল ভাইয়ের কাছে বললাম, ভাই, অভিনয় করতে হবে জীবনে কোনোদিন ভাবি নাই। অভির পাল্লায় পড়ে কিনা এখন সেই খানাও খাইতে হবে! তিনি বললেন, জাস্ট তুই যেমন যেমন আচরণ করিস, সেভাবে তোর মতো করে ডায়ালগ বলে যাবি। আর তুই তো কবিই। চরিত্রটাও কবির। ফরে পেছনে ক্যামেরা আছে ভুলে যা। আমি আমতা আমতা করে বললাম, দেখি। এরপর শ্যুট হলো। রাসেল ভাই বললেন, ভালো হইছে অভিনয়। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

নানান ঝক্কি-ঝামেলার পর শ্যুটিং শেষ হলো, এডিটিং হলো [অভির স্মৃতিতে বিষয়টা আরও ডিটেইল পাওয়া যাবে]। আমরা সবাই মিলে খানাদানা করতে করতে সেই নাটক দেখলাম ও একে অপরের অভিনয়ের অনেকটা প্রশংসা ও কিছুটা নিন্দা করলাম। রাসেল ভাই আর অভির সিনেমা ও নাটক বানানোর বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রবেশ হলো। ফলে পিপাসা বাড়লো। এরপর ওরা দুজন পারষ্পরিক বোঝাপড়ায় আরও একটা নাটক বানালো হ্যান্ডিক্যামেই। সেটায়ও যথারীতি অ্যালবার্ট রিপন পয়সা লগ্নি করলেন। শিহাদ হ্যান্ডিকাম দিলো। আমরা অভিনয় করলাম। রাসেল ভাই এডিট করলেন। এরপর বরিশালের অন্য একটা গ্রুপ– টিপু, অনি ও সম্রাট ভাইয়েরা হ্যান্ডিক্যামে একটা নাটক বানালো। সেখানেও রাসেল ভাই।

৫.

বই করার পর দিনে দিনে সাহিত্য বিষয়ক পড়াশুনা-অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হতে থাকে। ঢাকায় আসা-যাওয়ার ফলে তরুণ অনেক কবির সাথে শাহবাগে অভিজিৎ দাসের মাধ্যমে পরিচয় হয়। বরিশালের বুক ভিলা থেকে অগ্রজ-অল্প অগ্রজ অনেক কবির বইপত্র কিনি-পড়ি। পাবলিক লাইব্রেরি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, পুরান বইয়ের দোকান ইত্যাদিও করি। বিবির পুকুর পাড়ে কবি হেনরি স্বপন, তুহিন দাস, মহিবুল্লাহ শাওয়াল, কিং সউদ, মোহাম্মদ জসিম, ঢাকা থেকে এলে অভিজিৎ দাস, সাইফ ইবনে রফিক, কদাচিৎ ইমরান মাঝি, সাইদ র’মান, র’মান র’মান তাদের সাথে আড্ডা, শিল্পসাহিত্য, কবিতা, সুমন প্রবাহন-অনন্ত জাহিদের আত্মহনন নিয়ে বিষন্নতা ও কবিত্ব, ছবির দেশে কবিতার দেশে, হৃদয় অবাধ্য মেয়ে, ফিরে এসো চাকা, গীতবিতান, শক্তি-বিনয়-আল মাহমুদ, সিগারেট, নেশাপানি হতে থাকে। ঠিক এই সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে ফেসবুক নামক একটা বিষয় রীতিমতো নাগরিক তরুণদের জীবনের কেন্দ্রে এসে হাজির হয়।

বরিশালে চেনাজানাদের মধ্যে রাসেল ভাইসহ প্রায়পরিচিত আর হাতে গোনা মাত্র কয়েকজনের ফেসবুক আইডি আছে তখন। আমি মাঝে মাঝে রাসেল ভাইয়ের পাশে বসে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি, টুকটাক প্রশ্ন করি। ঢাকায় গেলে সদ্যপরিচিতরা অনেকে ফেসবুক আইডি চায়। তখন এই স্টাইলটা খুব চলতেছিলো। ফলে নিজের ফেসবুক আইডি না থাকার একটা হীনমন্যতা ভেতরে পায়চারি করে, টের পাই। সেটা দূর করতে রাসেল ভাইয়ের কাছে যাই একদিন সন্ধ্যায়। তিনি চা-সিগারেটের চুক্তি মোতাবেক ই-মেইল অ্যাকাউন্টসমেত একটা আইডি খুলে দেন। প্রোফাইল পিকচার ও কভার ফটোর জন্য নিয়ে যান একটা সেলুনে। সেখানে আয়নায় নাক রেখে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে বলে গোটা দুই ক্লিক। এরপর আয়নার আমিকে সাদাকালো করে মুখোমুখী দুই আমিকে প্রোফাইল পিকচার করে দেন। ফেসবুকে আমার প্রথম বন্ধু– সেও ওই রাসেল ভাই। কবি সাহিত্যিকদের অনেককেও আমার আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেন, কাউকে কাউকে তার অ্যাকাউন্টা থেকে আমার ফ্রেন্ড হতে সাজেস্ট করেন। এভাবে অনলাইনে কার্যক্রম বাড়তে থাকে আমার। অনলাইনকেন্দ্রিক পড়াশুনার ক্ষেত্রও তৈরি হয় রাসেল ভাইয়ের দেওয়া বিভিন্ন ওয়েব পত্রিকার লিংক পেয়ে।

ফেসবুকে তখনও আমি কেবল ঢুকি, সবার ছবিতে লাইক দিই, অন্যের ফ্রেন্ডলিস্ট দেখে কয়েকটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বেরিয়ে যাই। ওই সময়ে অভিজিৎ দাস, রাকিবুল হক ইবন, শ্মশান ঠাকুর প্রভৃতি কবি-লেখক ফেসবুকে আমাকে লেখা ট্যাগ করতে থাকেন। ফলত আমিও তাদের আমার লেখা ট্যাগ করার তাড়না অনুভব করতে থাকি। কিন্তু টাইপ করতে তো জানি না! ফলে প্রথম দিকে কাগজে কবিতা লিখে রাসেল ভাইয়ের কাছে নিয়ে যেতাম, তিনি টাইপ করে ফেসবুকে পোস্ট করে দিতেন। এরপর তিনি আমাকে অভ্র কিবোর্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লিটলম্যাগে লিখতে শুরু করি।

৬.

এবার নিজেও একটা সিরিয়াস লিটলম্যাগ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। এদিকে রাসেল ভাই তখন প্রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন যে, সিনেমার স্বপ্ন নিয়ে লঞ্চে উঠবেন। জানান তার প্রডাকশন হাউসের নাম চূড়ান্ত করেছেন– উইজার্ড ভ্যালি। লোগোও করে ফেলেছেন নিজেই। স্বাধীন নির্মাতা হিসেবে নিজের নাটক-সিনেমায় লগ্নি করার জন্য পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিটুকু বেচে দেবেন বলেও জানান। এজন্য কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথাও বলেছেন। তখন ভাবতাম, মুখে বললেও শেষ পর্যন্ত তিনি ওই জমি বেচবেন না হয়তো।

এর মধ্যে একদিন বিকেলে আমি আমার লিটলম্যাগ বিষয়ক প্ল্যান শেয়ার করতে তার সঙ্গে বসি। এরপর অর্ধমাস ধরে প্রায় প্রতিদিনই আমরা দু’জন এক সাথে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কাটাই। সন্ধ্যায় আড্ডা এবং শ্রীমন্ত নামে ওই লিটলম্যাগের জন্য লেখা সংগ্রহের পর রাত দশটায় রাসেল ভাইয়ের সাথে শিডিউল থাকতো। তিনি বন্ধুর দোকানের চাবি রেখে দিতেন। রাতের খাবার শেষে আমরা বসতাম কম্পিউটারের সামনে। কাজ, সিনেমা, ফেসবুকিং, আড্ডা এসব শেষে ভোররাতে নথুল্লাবাদ গিয়ে নাস্তা শেষে যে যার ডেরায়। এভাবে টাইপ, প্রুফ, পেজ মেকাপ, অলংকরণ শেষে দেখা যায় পাঁচ ফর্মার লিটলম্যাগের আরও এক পৃষ্ঠা অবশিষ্ট আছে। ওই সময়ে রাসেল ভাইয়ের প্রায় প্রতিদিনই কবিতা লেখা ও ছবি আঁকা হচ্ছিলো। দাঁড়ি রাখার শুরুও তখনই। সেই থেকে দেখা হলেই ক্ষ্যাপাতাম, আমার দেখাদেখি দাঁড়ি রাখলেন, কবিতাও লিখতেছেন। নকলপ্রবণতা বাদ দেন ভাই। রাসেল ভাই বলতেন, হেইয়া মনু! যাই হোক, নিজের লেখা কবিতাগুলো তিনি কাউকে দেখাতে চাইতেন না খুব একটা। তবে দুয়েকটা ছবি স্ক্যান করে ফেসবুকে পোস্ট করতেন। যৌক্তিকতা বিবেচনায় ওইসব ছবির থেকে একটা জুড়ে দিয়ে লিটলম্যাগের ফাঁকা পৃষ্ঠাটা পূর্ণ করা হলো। এভাবে পত্রিকার কাজ চলাকালে একদিন সন্ধ্যায় এসে একটা চিরকুট হাতে দিয়ে বললেন, বাসায় গিয়ে দেখিস। পরে খুলে দেখি, একটা ছোট্ট কবিতা, আমাকে উৎসর্গ করে লেখা। ওই সময়ে একেক দিন একেকটা কবিতা লেখা কাগজের টুকরা এনে আমাকে দিতেন আর ঠাট্টা করেই বলতেন, এসব কবতে [কবিতাকে মজা করে তিনি কবতে বলতেন] আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। মিছিল খন্দকার, চোখে অন্ধকার দেখলেও, কবতের ক্ষেত্রে বেশ যত্নবান, তাই তার কাছে রাখতে দিলাম। তয় ঠিক এক যুগ পরে চাইলেও ফেরতে দিতে হইবে কিন্তু।

এরপর প্রায় এক মাসের শ্রম শেষে শ্রীমন্ত বের হলে সেটা বিপণন নিয়ে ব্যস্ত থাকি আরও এক মাস। এর মধ্যে একদিন রাসেল ভাইয়ের ফোন। দেখা হয়। বলেন, চল টিকিট করতে যাই। মুহূর্ত আগে জন্ম নেওয়া বিষন্নতাসহ জানতে চাই, কবে যাচ্ছেন। বলেন, বৃহস্পতিবার। এরপর রিকশায় উঠে বলেন, তোর দোস্ত ঈয়নরে বাসা ঠিক করার দায়িত্ব দিছি। সেও তো কবি, ফলে ভরসা পাইতেছি না। তাই নিজেও যাইতেছি, গিয়া সপ্তাহখানেক পর আবার আইসা কয়েক দিন থাকমু।

৭.

এরপর আপনার ঢাকার জীবন শুরু, রাসেল ভাই। আমিও বছরখানেক পর ঢাকায় চলে আসি। প্রথম দিকে ছবির হাটে দেখা হতো। আপনার প্রথম নাটক ফ্লাইওভার অনএয়ারের আগে একদিন নিয়ে গেলেন আপনার আদাবররে বাসায়। নাটকটা দেখালেন। সারারাত আড্ডা হলো। এর মধ্যে কোনো একদিন ছবিরহাটে নৃ-এর গল্পটা শোনালেন। পূর্বপ্রস্তুতি শেষে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রির টাকায় নৃ-এর শ্যুটিং শুরু হয়। ক্রমে দেখা-সাক্ষাৎ কমতে থাকে বিবিধ অহেতুক বাস্তবতায়। তবে দেখা হলেই নৃ নিয়ে সংগ্রাম, টাকার অভাবে শ্যুটিং আটকে যাওয়া এবং সিনেমাটা শেষ করার তাড়নার কথা জানাতেন মনে পড়ে। বহুদিন পর গত শীতের কোনো একদিন ছবিরহাটে দেখা। আপনার হাতে ক্যামেরা। একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন। কয়েকটা ক্লিকের পর কবিতা নিয়ে কথা উঠল। এক পর্যায়ে আপনার দেওয়া সেই কবিতাগুলার প্রসঙ্গ উঠলে মুচকি হাসলেন। জানলাম, সত্যিই রেখে দিয়েছি। এক যুগ পর চাইলেও পাবেন।

…আপনার দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীর দিনে
এমন ঝড় আর বজ্রপাতের শব্দের মধ্যেই
চমকে ওঠে কান্নারত আপনার ইথেল।
অথচ আপনি
কাফন জড়িয়ে কফিনে
নিথর হয়ে থাকেন…

এরপর গত বছরখানেক আপনার সাথে যোগাযোগ নেই। হঠাৎ সেদিন উথালপাতাল ঝড়-বৃষ্টির রাতে ফোনের পর ফোন আসতে থাকে রাসেল ভাই। সেসব ফোনে আপনার কাছের মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল বজ্রসংবাদ। তাদের কেউ তখন বৃষ্টি আর ঝড় উপেক্ষা করে আপনার বরিশালে ফেরার আয়োজনে ব্যস্ত। ঝড়-বৃষ্টির প্রচণ্ডতা বাড়তে থাকে, বাতাসের ঝাপটা আর বৃষ্টির ছাটে ভিজে যেতে থাকে হাসপাতালের বারান্দায় থাকা মানুষজন। আপনি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েও দেখেন না সে বৃষ্টি। আপনার দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীর দিনে এমন ঝড় আর বজ্রপাতের শব্দের মধ্যেই চমকে ওঠে কান্নারত আপনার ইথেল। অথচ আপনি কাফন জড়িয়ে কফিনে নিথর হয়ে থাকেন।

Print Friendly
শেয়ার
কবি; বাংলাদেশ। কাব্যগ্রন্থ : মেঘ সামান্য হাসো

মন্তব্য লিখুন