ফিলিপ গ্যারেলের সিনেমা : অ্যান্টি-সিনেমার অবলোকন, বিপ্লব ও কাব্যের মন্থর ধারাভাষ্য/ অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

0
312
ফিলিপ গ্যারেল
জন্ম । ৬ এপ্রিল ১৯৪৮; ফ্রান্স

লিখেছেন অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়


ময়ের মোজাইক। টাইলের টুকরো তুলে তুলে গাঁথা সময়। এইভাবেই এগোয় সিনেমা। ছড়ায় মস্তিষ্কে। দর্শকের অনুভূতিমালায়, স্মৃতির ঘ্রাণে। এইসব ইথেরিয়াল মননের সিনে-ভাষা আমাদের কানে কানে বলে গেলেন তারকভস্কি। সিনেমার মন্থরতা সময়ের ভিন্ন ডাইমেনশনে ঘিরে ধরল আমাদের। মানে তাদের, যারা নেশাগ্রস্তের মতো সন্ধান করে ফিরতে থাকবেন সেই সব বিরল সময় শিল্পীদের। সিনেমার রহস্যময় সময়-ভাস্কর্যের।

ফিলিপ গ্যারেলের সিনেমা তেমনই। সেই বিরল শিল্পীদের একজন তিনি, যার সিনেমায় দৃশ্য-শব্দ দর্শককে অবলোকনের কাব্যে ঝিম-মান থিতু করায়।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪, সিনেমা-জীবনের প্রথম দশটি বছর কাজ করে গেছেন, কোনো প্রোডিউসার ছাড়াই। লগ্নির অভাবে সিনেমা ছেড়ে যাননি কখনো। প্রতিদিন নিরলস কাজ করে গেছেন। পাঁচটি দশক ধরে। দিনে দিনে তার সিনেমা হয়ে উঠেছে ন্যুভেল-ভাগ পরবর্তী ফ্রান্সের কাউন্টার সিনেমা– অ্যান্টি-সিনেমা। অ্যান্টি-সিনেমা কেন? গ্যারেল তার ব্যাখ্যা নিজেই দিচ্ছেন :

Anti-film is, in other words, a cinema in which the artist declares an oppositional position by creating and expressing his or her own method against the dominant écriture.

জেলাসি

“আমার প্রথম দিকের ছবিগুলি ছিল রিভেৎ ও গোদারের প্রত্যক্ষ প্রভাব মিশ্রিত’। রিভেৎ-এর ছবিকে তিনি ব্যখ্যা করেন ‘ক্লাসিক’ ও গোদারের ছবিকে ‘আধুনিক’ বলে। সেখান থেকে চিত্রভাষা ভেঙ্গে ক্রমে ফিরতে থাকবেন তিনি কাব্যের কাছে। লিরিকধর্মী কাব্যের কাছে। আরও বেশী করে। পাঁচ দশক পার করে তার সাম্প্রতিক ছবি জেলাসিতে এসে তার সিনেমা হয়ে উঠবে cinéma des rêves écrites– খসড়া-স্বপ্নের লিখিত সিনেমা। আর গ্যারেল উপলব্ধি করবেন–

“It’s nearly impossible to make fictional images,”

গ্যারেলের ক্যামেরা ও বাস্তবতার জগত নির্লিপ্ত হয়ে ঘুরে চলে তার চরিত্রদের ধারে-পাশে। যাকে বলা যেতে পারে : ‘characters we don’t quite know what to do with’। বলা যেতেই পারে। বন্ধু/প্রেমিক-প্রেমিকা, দম্পতি’দের অন্তরঙ্গতা ও অনিবার্য বিচ্ছিনতা তার ক্যামেরার ওপারে থম মেরে বসে থাকে। আর গড়িয়ে চলতে থাকে লঙ-টেক। তারপর হঠাৎই পোরট্রেইট-সম কোনো ক্লোজআপ-এর কাট এসে সময় সময় দর্শককে অস্বস্তি ফেলতে থাকে। তৈরি হয় সময়ের অস্বস্তিকর ভাস্কর্য। নেশাগ্রস্ত দর্শক পরিণত হন প্রয়োজনীয় ভ্যয়ারে।

দ্য বার্থ অব লাভ
…ইন্ডিভিজুয়াল’কে
ইমেজের দাস্য থেকে
মুক্ত করতে চান তিনি।
তাই
দশক দশক ধরে তিনি
ইমারত তুলছেন
অ্যান্টি-সিনেমার…

ন্যুভেল-ভাগের পরিপোষণে বেড়ে উঠে অ্যান্টি-সিনেমার দিকে ফিরলেন কেনই বা? এ প্রশ্নের উত্তরে গ্যারেল  বলেন : ন্যুভেল ভাগ ছিল– ‘মোড অফ থট’। একটা ডিসকোর্স। যা একজন ‘অত্যর’ এর সৃষ্টিশীল উন্মাদনা। ‘পলিতিক দেস অত্যর’– যা ক্রমে কালেক্টিভে পরিণত হবে, “but minus the factionalism and ‘cinema for cinema’s sake’?” –বলবেন গ্যারেল। অথবা এই অভাব বোধ থেকেই কাউন্টার পর্ব শুরু করে থাকবে তার সিনেমা। তার মতে আধুনিক সিনেমা এই কালেক্টিভ-এর থেকে সরে এসেছে। ইন্ডিভিজুয়াল’কে ইমেজের দাস্য থেকে মুক্ত করতে চান তিনি। তাই দশক দশক ধরে তিনি ইমারত তুলছেন অ্যান্টি-সিনেমার।

১৮ বছর বয়েসে তুলে ফেল্লেন প্রথম তাঁর চলচ্চিত্রটি। ফ্রান্স তখন ভরভরন্ত মে’ সিক্সটি-এইট-এ উত্তাল। ‘কাইয়ে-দু’ নব পর্যায়ে। নুভেল ভাগের টাটকা পরবর্তী পদক্ষেপের সময়ে গোদার ক্ষেপে রয়েছেন উগ্র বাম-বাদী রাজনীতিক দর্শনে। ছবিতে প্রতীকী ফাঁসি দিয়েছেন তৎকালীন ফরাসী সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী আন্দ্রে মালরো’কে।

সেই  উত্তাল ৬৮’র অস্থির সময়ে হাতে তুলে নিচ্ছেন ক্যামেরা, গ্যারেল। সাদা-কালো র-স্টকে’র গ্রেইন তার পর্দা জুড়ে। সময়ের সাথে তাল রেখে উৎক্ষিপ্ত, ঊষর। বয়েস কুড়িতে পৌঁছতেই পেয়ে যাবেন ভালোমতো খ্যাতি, সিনেমার সমঝদারদের কাছ থেকে। যার মধ্যে অবশ্যই থাকবেন জঁ লুক গোদার। তার প্রথম ছবির লগ্নিকারও ছিলেন গোদার স্বয়ং। প্রথম ফিল্মে  উঠে এসেছিল পারি শহরের রাস্তায় মে’ ৬৮’র বিপ্লবের গনগনে আগুন। ছবিটি সংরক্ষণের অভাবে এখন লুপ্ত।

অ্যা বার্নিং হট সামার

ইন্টিমেট– অন্তরঙ্গ গভীর অবলোকনই তার স্থায়ী শৈলী। অন্তরঙ্গ তার ক্যামেরা, তার ক্লোজআপ। অন্তরঙ্গ নির্বাচন তার চরিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রীদের। এই ইন্টিমেট সিনেমার বোধ থেকেই সম্ভবত তার ছবিতে ফিরে আসেন পরিবারের সদস্যরা– অভিনেতা-অভিনেত্রী হয়ে, বায়োপিকের সূত্র ধরে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বাবা ছেড়ে যান তাকে, শিশুকালে। সেই জীবনমূলক আখ্যান ফিরে আসে তার ছবিতে। আর সেখানে তার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেন তার আত্মজ– পুত্র লুই। বারবার তার ছবিতে অভিনয়ে ফিরিয়ে আনেন তার নিজের পিতা ও আত্মজদের। গ্যারেলের পিতা ছিলেন এক নামজাদা অভিনয় শিল্পীও। বার বার গ্যারেলের ছবিতে অভিনয়ে ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন তার পুত্র লুই, কন্যা এস্থারও।

…ব্যক্তি

ইমেজের
সংঘাত
ঘনিয়ে ওঠে
গ্যারেলের
অ্যান্টি-সিনেমায়…

ন্যুভেল-ভাগের দুর্দান্ত স্টারেরাও বাদ নেই। তার পর্দায় এসেছেন ক্যাথরিন দুনভ [Catherine Deneuve], জঁ পিয়ের লিও থেকে শুরু করে ব্রেথলেস-এর জিন সেবার্গ। এসেছেন মনিকা বেলুচ্চিও। ন্যুভেল-ভাগ থেকে সচেতন দূরত্ব নির্মাণ করলেও গ্যারেলের সিনেমায় পেইন্টিং ও কবিতা স্থাপত্য নির্মাণ করে গেছে সিনেমার মেটা-ল্যাংগুয়েজের, যেভাবে করে এসেছে গোদারের সিনেমাগুলিতে। গোদারের মতো তার ছবিতেও ক্লোজআপ এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সিগনিফায়ার। বারনিং হট সামার ছবিটির একটি মুখ্য দৃশ্যে মনিকা বেলুচ্চিকে একটি সিঙ্গেল টেক, মিডিয়াম শটে সারাক্ষণ ধরে রাখে। দর্শক পরবর্তী কাট ও দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করেন। অপেক্ষা গাঢ় হতে থাকে ক্রমে। গ্যারেলের ক্যমেরা স্থানু। দর্শকের অস্বস্তি শুরু হয়। ব্যক্তি ও  ইমেজের সংঘাত ঘনিয়ে ওঠে গ্যারেলের অ্যান্টি-সিনেমায়।

দ্য হাই লোনলিনেস

১৯৭৪-এ জিন সেবার্গ’কে নিয়ে তৈরি করেছিলেন দ্য হাই লোনলিনেস [Les hautes solitudes],যা গ্যারেলের ভাষায় “a film made out of the outtakes of a film that never existed,”। অডিও মতে সাইলেন্ট ছবি। নেই কোনো সঙ্গীত বা আবহ। কিন্তু বক্তব্যে মুখর। ছবিটি অ্যান্ডি ওয়ারহোল সদৃশ ধাঁচায় এক মৃত্যু প্রস্তুতির উপাখ্যান। পর্দা জুড়ে জিন সেবার্গ। ব্রেথলেস-এর নায়িকা। এ ছবি সেবার্গের বায়োগ্রাফি হলেও তা গড়ে উঠেছে নীৎসের অ্যান্টি-ক্রাইস্ট-এর আবছা ধোঁয়ায়। ব্রেথলেস-এর বছর কুড়ি বাদ পর্দা জুড়ে জিন সেবার্গ। সাদা-কালোয় তৈরি এক এলেজি। রহস্যময় অস্বস্তি ছেয়ে যায় এ ছবি দেখতে বসলে। বিশেষত যখন আপনি জানতে পারেন, আসলে এ হলো সেবার্গের  মৃত্যু-পূর্ববর্তী প্রস্তুতি-দশা। প্রকৃতঅর্থেই। এর সামান্য কয়েক বছর পরেই সেবার্গ মারা যাবেন। সাদা-কালোর ছায়ায় কাটিকুটি খেলা কম্পোজিশন। এই ছবির সাদা-কালো পর্দা জুড়ে হাই কন্ট্রাস্ট-এ মৃত্যু খেলা করে। আর সুন্দরী, প্রতাভাময়ী জিন সেবার্গ একটানা প্রেম করে চলেন খোদ ক্যামেরার সাথেই। কেউ নেই আর তার সহযোগী। ছবিটি তাই শব্দহীন। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে একটানা মন্তাজ আপনাকে প্রলুব্ধ করে চলে, আপনি সহযোগী হ’ন প্রিয় সিনেমার চিত্রভাষার অর্থ পুনরুদ্ধারে।

সাদাকালো তাঁর প্রিয় দুনিয়া। আবার দ্য উইন্ড অফ নাইট-এ ব্যবহার করছেন রং। সেই সেলুলয়েডেই। লিরিকধর্মী এখানে ক্যামেরার চলন। আর মনস্তাপ আর বেদনায় রঙ্গিন ক্যাথরিন দুনভে’র মুখ পর্দা জুড়ে। অপার এক বেদনাময় কাব্যিক লিরিকে ভাঙ্গা প্রেমের গল্প বলতে জঁ পিয়ের লিও’কে আনেন পর্দায় দ্য বার্থ অফ লাভ-এ। ৪০০ ব্লোজ-এর জঁ পিয়ের লিও গ্যরেলের পর্দায় গ্যরেলের দর্শনকে খুঁজে ফেরেন। প্রশ্ন করেন : এই পৃথিবীতে পুরুষের অবস্থানটিকে।

ওয়াইল্ড ইনোসেন্স

যদি বলি ওয়াইল্ড ইনোসেন্স ছবিটির কথা। এই ছবিটিতে গ্যারেল পৌঁছে গেছেন ব্যক্তিগত সিনেমার প্রায় সর্বশেষ স্তরে। চিত্রগ্রহন করলেন রাউল কুতার। ছবিটির আরেক ঐতিহাসিকতা– এটিই  রাউল কুতারের সর্বশেষ সিনেমাটোগ্রাফি। এখানে অটোবায়োগ্রাফি, স্মৃতি ও সাদা-কালোর সেলুলয়েড সময়কে অচেনা অলিন্দে থমকে রাখে।

…গ্যারেলের রহস্যময়
বিষয়-চয়নের সাথে
আলো খেলা করে
পেইন্টিংয়ের ধাঁচায়…

গ্যারেলের রহস্যময় বিষয়-চয়নের সাথে আলো খেলা করে পেইন্টিংয়ের ধাঁচায়। দুরূহ ডিটেইল-এর সমাহার তার মিজঁ-সিন জুড়ে। নিঃসঙ্গতা, খালি কামরার রহস্যময়তা, ব্যতিক্রমী ক্লোজআপ, মন্থর এডিটিং, চরিত্র-অভিনেতাদের অস্বস্তিকর অনুভবময় শৈলী, এই সব মিলিয়ে তিনি– ফিলিপ  গ্যারেল, যিনি ডিজিটাল ফিল্মমেকিংয়ের বশ মানলেন না কখনো। এমনই মজে আছেন সেলুলয়েডের প্রেমে, তার গ্রেইনে, ২৪-এর ফ্রেমে, ডীপ ফোকাসে।

কবি, বিপ্লবী, দার্শনিক ফিলিপ গ্যারেলের নতুন যে ছবি দেখার জন্যে অধীর যে হে বিরল দর্শক, আপনারা তা দেখবেন, এই মে মাসেই। ফরাসী রিভিয়েরাতেই। কান এর উৎসবে।

সিনেমা দীর্ঘজীবী হোক।


ফিলিপ গ্যারেলের ফিল্মোগ্রাফি
১৯৬৪ । Les enfants désaccordés
১৯৬৫ । Droit de visite
১৯৬৭ । মারি ফর মেমোরি [Marie pour mémoire]
১৯৬৮ । Anémone
১৯৬৮ । কনসানট্রেশন [La Concentration]
১৯৬৮ । Le révélateur
১৯৬৮ । Actua 1
১৯৬৯ । দ্য ভার্জিন'স বেড [Le lit de la Vierge]
১৯৭২ । দ্য ইনার স্কার [La cicatrice intérieure]
১৯৭২ । Athanor
১৯৭৪ । দ্য হাই লোনলিনেস [Les Hautes solitudes]
১৯৭৫ । Un ange passe
১৯৭৫ । Le berceau de cristal
১৯৭৮ । Voyage au jardin des morts
১৯৭৯ । L'enfant secret
১৯৭৯ । Le bleu des origines
১৯৮৩ । Liberté, la nuit
১৯৮৪ । Paris vu par... vingt ans après
১৯৮৫ । Elle a passé tant d'heures sous les Sunlights...
১৯৮৯ । Les Ministères de l'art
১৯৮৯ । Les baisers de secours
১৯৯১ । J'entends plus la guitare
১৯৯৩ । দ্য বার্থ অব লাভ [La naissance de l'amour]
১৯৯৬ । দ্য ফ্যানটম হার্ট [Le coeur fantôme]
১৯৯৯ । দ্য উইন্ড অব নাইট [Le vent de la nuit]
২০০১ । ওয়াইল্ড ইনোসেন্স [Sauvage Innocence]
২০০৪ । রেগুলার লাভারস [Les Amants réguliers]
২০০৮ । ফ্রন্টিয়ার অব দু ডাউন [La Frontiere de l'Aube]
২০১১। দ্য বার্নিং হট সামার [Un été brûlant]
২০১৩ । জেলাসি [La Jalousie]
২০১৫ । ইন দ্য শ্যাডো অব উইমেন [L'Ombre des femmes] 
২০১৭ । লাভারস অব অ্যা ডে [L'Amant d'un jour]
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
চলচ্চিত্রকার, লেখক, টেকনিশিয়ান,হিউম্যান রাইটস কর্মী; ভারত ।। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের অধ্যাপনা করছেন ।। ফেমিনিস্ট ও বর্ণবিদ্বেষী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ।। প্রকাশিত গ্রন্থ : টালমাটাল; উসিমুসি করে বুক; সিনেমার স্পেন; সিনেমার আর্জেন্তিনা ইত্যাদি ।। চলচ্চিত্র : রেড; ১৭০০ কেলভিন; দ্য থার্ড ব্রেস্ট; টেক কেয়ার; টেইলার মেড ইত্যাদি

মন্তব্য লিখুন