আবু সাইয়ীদ: সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়সন্ধানী চলচ্চিত্রকার/ ফাহমিদুল হক

1
233

লিখেছেন  ফাহমিদুল হক


বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আবু সাইয়ীদের অবস্থান স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট। তার চলচ্চিত্র তেমন দর্শকপ্রিয়তা পায়নি। কিন্তু তার চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে, আবার দেশে ও বিদেশে তার চলচ্চিত্র বেশ কয়েকটি সম্মানজনক পুরস্কারও পেয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তির বিচারে আবু সাইয়ীদের অর্জন অসামান্য। বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রকারের ভাগ্যেই এতগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার জোটেনি। আবু সাইয়ীদ দুইটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো– আবর্তন [১৯৮৮] ও ধূসর যাত্রা [১৯৯২]। আর পূর্ণদৈর্ঘ্য  চলচ্চিত্রগুলো হলো– কিত্তনখোলা [২০০০], শঙ্খনাদ [২০০৪], নিরন্তর [২০০৬], বাঁশি [২০০৭], রূপান্তর [২০০৮] ও অপেক্ষা [২০১০]। সমালোচক ও চলচ্চিত্রামোদীদের কাছে আবু সাইয়ীদ নির্মিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হলো শঙ্খনাদ। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচাইতে সুনাম অর্জন করেছে নিরন্তর চলচ্চিত্রটি। নিরন্তর হলো বাংলাদেশে নির্মিত তিনটি চলচ্চিত্রের একটি যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। ফ্রান্সের ডানকার্ক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল মোরশেদুল ইসলামের চাকা, সাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবে নতুন নির্মাতার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল গোলাম রব্বানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায় এবং কেরালা চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছিল নিরন্তর

এই প্রবন্ধে আবু সাইয়ীদের ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে বিবেচনায় নিয়ে চলচ্চিত্রকার হিসেবে আবু সাইয়ীদকে মূল্যায়ন করা হবে। তার চলচ্চিত্রের বিষয় ও আঙ্গিক, তার চলচ্চিত্রসমূহ কোন সমাজ ও জীবনকে ধারণ করেছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্রে তার অবস্থান কী– এই কয়েকটি দিকে আলোকপাত করে সার্বিকভাবে চলচ্চিত্রকার আবু সাইয়ীদের শিল্পকর্মের বিচার করা হবে।

আশির দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশে স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয় মোরশেদুল ইসলামের আগামী [১৯৮৪] ও তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া [১৯৮৫] চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ঐসময় এই আন্দোলন বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই ধারার চলচ্চিত্রগুলোর দৈর্ঘ্য পরে বেড়েছে, এই ধারার চলচ্চিত্রগুলোকে এখন বিকল্পধারার পরিবর্তে স্বাধীনধারা নামে অভিহিত করা হচ্ছে। এই চলচ্চিত্র আন্দোলন আসলে ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ফসল, যে আন্দোলন সত্তর ও আশির দশকে তুঙ্গে অবস্থান করছিল। এফডিসিকেন্দ্রিক মূলধারার চলচ্চিত্র ব্যবসায় তখন মন্দার শুরু, বিশেষত চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বিচারে বাস্তবতা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছিল। এফডিসিকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র উৎপাদন, পরিবেশন ও প্রদর্শনের যে শক্ত একটা নেটওয়ার্ক তাতে বাস্তবতানির্ভর শিল্পপ্রয়াসী চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসুক নতুন পরিচালকদের অনুপ্রবেশের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। বা সেই নেটওয়ার্কের ভেতর থেকে নতুন ধরনের কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হলে তাতে নেটওয়ার্কের প্রভাবশালীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করতো। ফলে এফডিসির বাইরে কম বাজেটের ও স্বল্পদৈর্ঘ্যরে শিল্পপ্রয়াসী চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হতে থাকে আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনে আবু সাইয়ীদ যুক্ত হয়েছেন খানিক দেরিতে। বা বলা যায় এই দুই আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছেন, এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল তিনি নন। অন্য নির্মাতারা যেক্ষেত্রে বেড়ে ওঠা ও পড়াশুনার সূত্রে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং একপর্যায়ে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, আবু সাইয়ীদ কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্দেশে বগুড়া থেকে ঢাকা আসেন এবং চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯৮৮ সালে আবু সাইয়ীদ তার প্রথম চলচ্চিত্র আবর্তন নির্মাণ করেন। ১৬ মিমি ফরম্যাটে নির্মিত ২৫ মিনিট দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রটি আলাউদ্দিন আল আজাদের ছাতা গল্প অবলম্বনে নির্মিত, যা একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী হাজির করে। প্রথম চলচ্চিত্রেই আবু সাইয়ীদ সকলের দৃষ্টি কাড়েন, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এই লেখকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন:

আবর্তন নিয়ে আমরা তখন খুব হৈ চৈ করেছিলাম। আমাদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো তখন দুই ধারায় নির্মিত হচ্ছিলো। একটি হলো জাতীয়তাবাদী ও মেলোড্রামা ক্লিশে [যেমন, আগামী] এবং আইজেনস্টাইন ও জিগা ভের্তভ প্রভাবিত নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র [যেমন, হুলিয়া]। আবর্তন এই দুই ধারায় একটা ছেদ আনে, বা পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্তি দেয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনকে
–মাসুদ, ২০০৬

ধূসর যাত্রা চলচ্চিত্রটি একদল গবেষকের ওপর নির্মিত যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করতে গ্রামে যায়। ৩২ মিনিটের চলচ্চিত্রটি ১৬ মিমি ফরম্যাটে চিত্রায়িত। এই দুইটি চলচ্চিত্রই শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার পায়।

কিত্তনখোলা

কিত্তনখোলা : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সন্ধানে

কিত্তনখোলা নদীতীরে আয়োজিত মেলায় নৌবহর নিয়ে এসেছে যাযাবর বেদে সম্প্রদায় যারা বিক্রি করবে চুড়ি-ফিতা-কবিরাজি ঔষধ। জুয়ার আসর বসেছে, দেশি মদও সহজলভ্য। মেলার প্রধান আকর্ষণ যাত্রাদল ‘আদি মহুয়া অপেরা’। স্থানীয় ঠিকাদার ও প্রভাবশালি ব্যক্তি ইদু কন্ট্রাক্টর মেলার ইজারা নিয়েছে। গ্রামের সহজ-সরল যুবক সোনাই মেলার টানে ঘুরতে ঘুরতে প্রেমে পড়ে যায় বেদে মেয়ে ডালিমনের। যাত্রাদলের অভিনেত্রী বনশ্রীবালাকে শয্যায় পেতে চায় আয়োজক ইদু। যাত্রাদলের মালিক সুবল দাস বনশ্রীবালাকে ইদুর কাছে পাঠাতে চায়। বাধা দেয় অভিনেতা রবি দাস। এতিম শিশু ছায়ারঞ্জনকে দলে স্থান দিয়েছিল সুবল, আবার সুবল ছায়ার ওপর যৌন নির্যাতনও করেছিল। ছায়া জীবনের অভিশাপ ভুলে থাকতে চায় মদ খেয়ে। রবি ও ছায়া দুজনই বনশ্রীকে ভালবাসে, বনশ্রীও জীবনে থিতু হতে চায়। কিন্তু পতিতাপল্লী থেকে আসা যাত্রা অভিনেত্রীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা হয় না। ইদুর লালসা এড়াতে আত্মহত্যা করে। সোনাইও ডালিমনকে পায় না, বেদেসমাজের কঠোর নিয়ম-অনুশাসনের কারণে। ইদুর লোকের প্ররোচনায় জুয়া খেলে ইদু সর্বস্ব হারায়। সোনাইয়ের বন্ধকের জমিটা এবার পুরোপুরি হাতে চলে আসবে ইদুর।

কিত্তনখোলা সেলিম আল দীন রচিত একটি সফল নাটক ছিল ঢাকার মঞ্চে। এই নাটকটি থেকেই সেলিম আল দীন পশ্চিমা নাট্যরীতি থেকে সরে এসে স্থানীয় নাট্য-আঙ্গিককে আশ্রয় করে নাটক লেখা শুরু করেন। এই নাটকটিতে সেলিম আল দীন যেমন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন, তেমনি এই নাটকটির মধ্য দিয়ে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর যে স্বরূপ, তার এক চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আর প্রান্তিক সাধারণ মানুষ যে বিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে চলেছে তার বিশ্বস্ত রূপায়ণ দেখা যায় কাহিনীতে।

জীবনযাপনের নানান প্রতিকূলতা কীভাবে মানুষের আত্মপরিচয় ও পেশায় পরিবর্তন ঘটায়– তার এক বয়ান কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রে হাজির রয়েছে। প্রান্তিক বাংলায় শোষক বনাম শোষিত কিংবা জাতিগত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বিবর্তনশীল যে মানবজীবন, কিত্তনখোলা যেন বৃহত্তর সেই চিত্র আঁকে। সোনাই ‘শান্তিপুরে’ যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ইদু তার সমস্ত সম্পত্তি গ্রাস করার পর বেদে-যুবা রুস্তমের সঙ্গে সে ‘দুখাইপুরে’ যেতে বাধ্য হয়। রুস্তম যাযাবর জীবন ছেড়ে ভূমিতে থিতু হতে চায়, সঙ্গী হিসেবে পেতে চায় ডালিমনকে। কিন্তু ডালিমন বেদে সমাজ ত্যাগ করতে চায় না, তা সে-সমাজ যতই অভিশপ্ত হোক না কেন। বনশ্রীবালা পতিতাপল্লী থেকে বেরিয়ে এসে যাত্রাদলের অভিনেত্রী হয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয় না, ইদুর হাত থেকে বাঁচতে সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। রবি বা ছায়ার ভালবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। ছায়ারঞ্জন কখনো সংখ্যালঘু হিন্দু পরিচয় মুছে মুসলমান হয়ে যেতে চায়, কখনোবা কলকাতায় অভিবাসন করতে চায়। কিন্তু ছায়ারঞ্জনের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে– তা আমরা জানতে পারি না। শেষ দৃশ্যে আমরা একটা ওপেন এন্ডেড শটে দেখি ছায়া-সোনাই-রুস্তমেরা তাদের অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। জাতিগত ও পেশাগত ছোট ছোট গোষ্ঠীর হতভাগ্য মানুষেরা নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে থাকে, কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, চলে তার নিজস্ব গতিতে। আবু সাইয়ীদ চলচ্চিত্রায়ণের সময়ে মানুষের প্রত্যাশার বাইরে জীবনের এই লাগামহীন বয়ে চলাকে তুলনা করেছেন পাগলা ঘোড়ার সঙ্গে। চলচ্চিত্রের থিম সংগীতের মতো করে তিনি তিনবার ব্যবহার করেছেন এক পাঁচালি সংগীত: “আমার পাগলা ঘোড়া রে, কইর মানুষ কই লইয়া যাও?”

কেবল এই গানটি নয়, চলচ্চিত্রজুড়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় বিধৃত রয়েছে। মেলার এক স্বল্পপরিসরে এবং কয়েকদিনের কাহিনীতে বাংলার সাংস্কৃতিক শেকড়ের বিশাল ক্যানভাসকে পাওয়া যায়। লেখকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কিত্তনখোলা সম্পর্কে আবু সাইয়ীদ বলেছিলেন:

মাত্র তিন-চারদিনের ঘটনা, স্পেস অ্যান্ড টাইম সীমিত, কিন্তু গ্রামের অনেকগুলো পেশাজীবী মানুষের সমন্বয় হয়েছে এখানে। এছাড়া লোকজ সংস্কতির ক্রাইসিস ও কনফ্লিক্ট উঠে এসেছে। প্রত্যেকটি বিষয় কিন্তু বিশাল মাত্রায় ধরা হয়েছে। এই ব্যাপারটি আমাকে আকৃষ্ট করে, অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল ক্যানভাস ধরার সুযোগ আছে বিষয়টিতে। এত ছোট স্পেস ও টাইমের মধ্যে এরকম বিশাল ক্যানভাস ধরার সুযোগ আপনি খুব কম আর্ট পিস-এ পাবেন।
–সাইয়ীদ, ২০০৬

আখ্যানে যাত্রাপালা, পাঁচালি ও বাউল গান, রূপকথার উপস্থিতি সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি ও দর্শনের পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। নাট্যকার সেলিম আল দীন বলেন:

এ নাটকের গঠন পদ্ধতিতে আমরা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পূজা উৎসবকেন্দ্রিক মৌখিকরীতির বাংলা নাটকের সম্ভাব্য আঙ্গিক ব্যবহার করতে চেয়েছি। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় নাটকের প্রচলিত রীতির নাটকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে আমাদের। বাংলা নাটকে দেশজরীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যসমূহ– শাবারিদ খান-এর বিদ্যাসুন্দর, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, পাঁচালি– যাত্রা ইত্যাদি ছিল আমাদের আশ্রস্থল।
–দীন, ২০০৬: ৩৩২

সেলিম আল দীনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয় যে, কিত্তনখোলায় কেবল বাঙালির জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিই উঠে আসেনি, বাঙালি জীবনের যে সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ তাকেই নাটকের আঙ্গিক হিসেবে অবলম্বন করা হয়েছে।

গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোও এক চিত্র কিত্তনখোলায় আমরা দেখতে পাই। ইদু কন্ট্রাক্টরকে আমরা দেখতে পাই একজন প্রভাবশালি ও ধনী ভূস্বামী হিসেবে, যার মধ্যে অন্যের সম্পত্তি গ্রাস করার বৈধ ও অবৈধ প্রয়াস দেখা যায়। অন্যান্য জমির পাশে সোনাইয়ের জমিটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তার কাছে; সোনাই জমি বিক্রি করতে রাজি না হলে তার লোকেরা তাকে জুয়া খেলতে প্ররোচিত করে। সোনাই জুয়ায় হেরে ও ইদুর লোকের কাছে ঋণ করে বাধ্য হয় ইদুর কাছে বন্ধকী জমিটা বিক্রি করতে। মেলার আয়োজকও ইদু কন্ট্রাক্টর। প্রতিপত্তি ও অর্থের বরাতে সে অভিনেত্রী বনশ্রীবালার ওপরে তার লালসা চরিতার্থ করতে চায়। স্থানীয় প্রশাসক শফিক চেয়ারম্যানের সঙ্গেও তার দহরম মহরম সম্পর্ক। সবমিলিয়ে এক ক্ষমতাকাঠামোর চিত্র আমরা দেখি যে ক্ষমতাকাঠামো প্রান্তিক সাধারণ গরিব মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে শোষণের এক জাল বিস্তার করে। তবে এই শোষণপ্রক্রিয়া একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। জমি বিক্রি করতে না চাইতে সোনাইয়ের যে একরোখা অবস্থানকেও এক যথার্থ চিত্রায়ণ বলতে হবে।

বনশ্রীবালা চরিত্রের মধ্য দিয়ে নারীত্বের দ্বান্দ্বিতকতাও কিত্তনখোলার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। সুবল দাস বনশ্রীকে বেহুলা চরিত্রে অভিনয় করতে বললেও সে পছন্দ করে মনসা চরিত্রে অভিনয় করতে। মনসা হলো পূর্ববঙ্গের অনার্য দেবী, আর্য দেবতা শিবের সঙ্গে যার দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হয় বেহুলাকে, তার স্বামী লক্ষীন্দরকে সাপে কাটে বাসররাতে। কারণ তার শ্বশুর চাঁদবেনে মনসাকে পূজা দিতে রাজি নয়, তিনি শিবভক্ত। বেহুলার সতীত্ব ও স্বামীভক্তির জয় হয়, লক্ষীন্দরকে সে বাঁচাতে সমর্থ হয়, বিনিময়ে চাঁদবেনে মনসাকে পূজা করতে স্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে, দেবী হবার পরও মনসার জন্ম দুর্ভাগ্য নিয়ে, তার বাসররাতও ভেঙ্গে গিয়েছিল। পূজা পাবার ব্যাপারে তার দুর্মর আকাক্সক্ষা ও সংহার মূর্তি বনশ্রীকে আকর্ষণ করে। বনশ্রী মনসার সঙ্গে নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পায়। বেহুলার সতীত্ব, সংসার, স্বামীভক্তি বনশ্রীর জীবনের সঙ্গে খাপ খায় না। সে এসেছে পতিতাপল্লী থেকে, সংসার করা তার সাজে না, ইদু কন্ট্রাক্টরের মতো লোকেরা তাকে বিছানায় নিতে চায়।

শঙ্খনাদ

শঙ্খনাদ : স্মৃতিতাড়নায় দুর্বিপাক

বাবা-মা খুন হয়ে যাবার পরে শৈশবেই গ্রাম ছেড়ে শহরে পালিয়ে যায় ওসমান। স্মৃতিতাড়িত ওসমান সাতাশ বছর পর নয়নপুর গ্রামে ফিরে আসে। আসার পথে নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে সে। হাসপাতাল ঘুরে আশ্রয় হয় তার বাবা-মার হত্যাকারীর ছেলের বাড়িতে, যে এখন গ্রামের মোড়ল। সুস্থ হবার পরে গ্রামের স্কুলে চাকরি নেয় সে। পরিচয় হয় ছেলেবেলার বন্ধু ফজলুর সঙ্গে, যে বড় হয়ে ডাকাত হবার স্বপ্ন দেখতো। ফজলু এখন কাফন চোর। রহস্যময়ী কুঁজোবুড়ি জনসম্মুখে প্রকাশ করে ফেলে যে আগন্তুক ওসমানই সেই চাদ, যার বাবা-মাকে সাতাশ বছর আগে হত্যা করা হয়েছিল। ফলে মোড়ল মন্নাফ খাঁ কুঁজোবুড়িকে হত্যা করে। আর ফজলুকেই টাকার লোভ দেখিয়ে নিযুক্ত করে ওসমানকে হত্যা করার জন্য। পাখির চরে নিয়ে যাবার নাম করে ফজলু ওসমানকে নিয়ে যায় ভিন্ন এক চরে, যেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করা মন্নাফ খাঁর লোকেরা হত্যা করে ওসমানকে এবং ফজলুকেও।

শঙ্খনাদ নিঃসন্দেহে আবু সাইয়ীদের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকর্ম। নাসরীন জাহানের উড়ে যায় নিশিপক্ষী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটির কাহিনীতে কেবল যাদু-বিভ্রম-কুহক নেই, চলচ্চিত্রভাষার সার্থক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শঙ্খনাদ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশেরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চলচ্চিত্রে। গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর শক্ত উত্তরাধিকার যেমন মোড়ল চরিত্রের মধ্যে দেখা যায়, তেমনি কুঁজোবুড়ির ডাকিনীবিদ্যা ও ফজলুর অদ্ভূত পেশা-পরিচয় আমাদের বিভ্রমের এক ইন্দ্রজালে আটকে ফেলে। নয়নপুরে ওসমানের আগমণের কারণ কেবলই স্মৃতির মণিমুক্তোর সন্ধান, পিতৃ-মাতৃহত্যার প্রতিশোধ নয়– এই নিরীহ ব্যাখ্যা মোড়লের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকবে, দর্শকের কাছে অদ্ভূত লাগবে এবং কাহিনীর প্রতি আকর্ষণ এ কারণে আরও বাড়বে। সাবজেক্টিভ ক্যামেরা ও অন্তর্লীন আবহসঙ্গীত শঙ্খনাদ-এর কুহকী আখ্যানের প্রতি নিবিষ্ট থেকেছে।

নয়নপুরে আসার পথে নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ার দৃশ্যটি ছাড়া শঙ্খনাদ-এর পুরো আখ্যানটি নির্মিতির বিচারে শক্ত বুননে গাঁথা।

নিরন্তর

নিরন্তর : জনম জনমের বিপন্নতায় নারী

নিরন্তর ‘নিশিকন্যা’ তিথির কাহিনী। তিথি শব্দের অর্থও রাত। দেহব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে সে। বাবা প্রায় অন্ধ, ভাই বেকার, মা আর আরেক ছোটভাইকে নিয়ে তার সংসার। তিথিদের দালাল আনিস বিপদে-আপদে তিথিদের পাশেই থাকে। ক্লায়েন্ট দবিরের সঙ্গে তিথির সম্পর্ক কিছুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। মাঝারি ব্যবসায়ী দবিরের রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রী ফরিদা ও কন্যা। ভাইয়ের চাকরির খোঁজে তিথি দবিরের বাসা পর্যন্ত যায়, ফরিদা তাকে অপমান করে। আবার ফরিদাই মৃত্যুর আগে তিথিকে দান করে যায় জমানো টাকা। সেই টাকা তিথি তুলে দেয় ভাইয়ের হাতে। ভাই ইতোমধ্যে প্রেম করে বিয়ে করেছে, তিথির দেয়া টাকায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করে। ভাই ব্যবসায় ভালো করে, পুরো পরিবারের শ্রেণীগত উত্তরণ ঘটে। তিথিও অসম্মানজনক পেশাটি ছেড়ে দেয়। কিন্তু জীবনের নানান কদর্য অভিজ্ঞতা তাকে নিরন্তর তাড়া করে ফেরে।

হুমায়ূন আহমেদের জনম জনম উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ নিরন্তর। এর চিত্রনাট্য হুমায়ূন আহমেদ ও আবু সাইয়ীদ যৌথভাবে রচনা করেছেন। আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে নিরন্তরই কিছুটা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে তিথি দেহব্যবসায় নেমেছে। দারিদ্র্যের কারণেই বাবার লেখা চিঠি হাতে মধ্যবয়েসী কিশোরী তিথি টাকা ধার আনতে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এসব অভিজ্ঞতা তাকে এই পেশায় আসতে দ্বিধা-সংশয় কমিয়ে দিয়েছে। নানান ঘাত-প্রতিঘাতের চিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি আমাদের এক কঠিন-নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রটি দর্শকের মর্মমূলে চূড়ান্ত আঘাত করে শেষের দিকে যখন দেখা যায় তার ত্যাগের মধ্য দিয়ে পুরো পরিবারের শ্রেণীগত উত্তরণ ঘটেছে, তিথিও সেই পেশা ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু তার রয়েছে কদর্যতা-মাখামাখি এক স্মৃতির ভুবন– যেখানে সে একাকী, বিষণ্ন, পরাজিত।

চলচ্চিত্রটির একটি বিষয়ে বেশ খটকা লাগে। তিথির এই নিষিদ্ধ পেশাকে তার পরিবারের সব সদস্য কীভাবে নেয় বা দেখে– তা চলচ্চিত্রে হাজির করা হয়নি। কেবল তিথির মাকে এ বিষয়ে সচেতন বলে মনে হয়। অন্ধ বাবা, দুই ভাইয়ের কাউকেই এ বিষয়ে কথা বলতে, ভাবতে বা আচরণে প্রকাশ করতে দেখা যায় না। আপার কাছ থেকে ভাই টাকা নিচ্ছে, কিন্তু সেই টাকা আপা কীভাবে উপার্জন করে– তা জানতে তার কোনো আগ্রহ কখনোই দেখা যায়নি। বেকার ভাই হঠাৎ বিয়ে করে আনলে, ভাইয়ের স্ত্রীরও কোনো কৌতূহল এ বিষয়ে দেখা যায়নি যে, তিথি আপা কী ধরনের চাকরি করেন? এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি উৎসুক হবার কথা প্রতিবেশী বা সমাজের লোকদের। পরিবারটির বাইরে আর কোনো প্রতিবেশী বা সমাজের সদস্যদের আমরা চলচ্চিত্রে দেখি না। বেকার ভাইয়ের প্রেমিকা এ বিষয়ে একেবারেই কিছু জানে না, সেটাও একটু মুশকিল ঠেকে। বলা যায়, তিথির মতো চরিত্রের জীবনে কী কী ঘটনা ঘটতে পারে তার বৃহৎ প্রকাশ আমরা চলচ্চিত্রে দেখতে পেয়েছি, কিন্তু মামুলি ও ক্ষুদ্র অনেক বিষয়কে চলচ্চিত্রে মোকাবেলা করা হয়নি। মামুলি বিষয় হলেও এইসব খুঁটিনাটিই চলচ্চিত্রকে আরও বিশ্বস্ত করে তোলে।

বাঁশি

বাঁশি : শিশুরা বড়দের চেয়ে জ্ঞানী?

শায়লা ও আরিফ– দুই তরুণ-তরুণী একই বাস থেকে নামে, গন্তব্য একই গ্রামে। দু’জনে একইসঙ্গে গ্রামে যায়। শায়লা ওঠে খালার বাড়ি, খাঁ পরিবারে আর আরিফ যায় বন্ধু রঞ্জুর বাড়ি ভূঁইয়া বাড়িতে। শায়লা এসেছে স্রেফ বেড়াতে, মেলাও দেখবে। আরিফ গ্রামীণ মেলার ওপরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে, তার প্রাথমিক গবেষণার জন্য এসেছে সে, হাতে স্থির ও ভিডিও ক্যামেরা। মেলায় দু’জনের আবার দেখা হয়, আলাপ চলে, বন্ধুত্ব বাড়ে। দু’জন যে দুই পরিবারে উঠেছে তাদের আবার পুরনো রেষারেষি। ফলে দুই পরিবারের দুই শিশুকন্যা খেলতে গিয়ে ঝগড়া করলে, তার রেশ ধরে দুই পরিবার ঝগড়ায় লিপ্ত হয়, পুরুষদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া হয়, অস্ত্র-লাঠি হাতে দুই পরিবারের সদস্যরা মুখোমুখি দাঁড়ায়, শাসাতে থাকে। রাতে এক পক্ষ প্রতিপক্ষের যাত্রা প্যান্ডেল ভাঙ্গে, আরেক পক্ষ মেলার দোকানপাট ভাঙ্গে। শায়লা আর আরিফ গণ্ডগোল নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না, বিব্রতবোধ বাড়ে কেবল তাদের। তারা টলস্টয়ের লিটল গার্লস ওয়াইজার দ্যান মেন গল্প নিয়ে আলাপ করে– যা এই গ্রামের ঘটনাবলির সঙ্গে মিলে যায়। এদিকে দুই বাড়ির দুই শিশুকন্যা মেলার এক বাঁশিওয়ালার সঙ্গে, আরও অনেক শিশুসহ বেলুনবাঁশি বাজাতে বাজাতে গ্রাম প্রদক্ষিণ করতে থাকে। ঝগড়ারত দুই পক্ষ এই দৃশ্য দেখে থেমে যায়। আরিফ চিত্রনাট্যের জন্য ঠিক এ রকম একটি দৃশ্যের কথাই কল্পনায় ভাবতো। চলচ্চিত্রের সমাপ্তিতে জানা যায়, ঝগড়ার জের হিসেবে গ্রামে আর মেলা বসে না। মেলার অনুপস্থিতিতে বাঁশিওয়ালা তার পরিবারসহ গ্রাম থেকে শহরে অভিববাসন করে। শায়লা বিয়ে করে বিদেশে অবস্থান করে। আর আরিফ তার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের অনুসন্ধানে এখনও পরিভ্রমণ করে গ্রামে গ্রামে।

টলস্টয়ের গল্পই এই চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা, সেটা খুব স্পষ্ট বোঝা যায়। সামান্য বিষয় নিয়ে যে মানুষ কত বড় বিবাদে প্রতিনিয়ত জড়িয়ে যাচ্ছে, এই গল্প সেই বার্তাই দেয়। চলচ্চিত্রের গ্রামটি যেন সারা দেশ বা সারা বিশ্ব। দেশে বা বিশ্বে যে হানাহানি, যুদ্ধ-সংঘাত-মৃত্যুর মিছিল– সার্বিক বিচারে তার উপলক্ষ্যটি সামান্যই থাকে। শিশুরা কখনো কখনো বড়দের তুলনায় অনেক জ্ঞানের পরিচয় দেয়– যে কোনো কারণে ঝগড়াঝাঁটি লাগতেই পারে, কিন্তু সবকিছুর ওপরে মানবিক সম্পর্ক-বন্ধুত্ব। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত-উন্নত-সভ্য জাতি বা জাতিরাষ্ট্রের তুলনায় প্রান্তিক-ট্রাইবাল মানুষেরা অনেক সময় বিবেচনা-বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। কারণ তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের তুলনায় শান্তিপ্রিয়তাকেই বেশি লক্ষ করা যায়। ফলে চলচ্চিত্রের গল্পটি বিশ্বজনীন এক ভাবনার ওপরে নির্মিত। যুদ্ধ নয় শান্তি– এ রকম সরলবার্তা চলচ্চিত্রটিতে নেই; বরং এই সরল বিষয়টি ভুলে যে মানুষ সংঘাতকেই নিত্যসঙ্গী করে নিয়েছে তার চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে চলচ্চিত্রে। ফলে যতই বাচ্চারা গণ্ডগোল ভুলে খেলায় বা বাঁশিওয়ালার অনুবর্তী হোক না কেন, গল্পে বলা হয়েছে সংঘাতের জের ধরে গ্রামে নিয়মিত মেলাটিই বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁশিওয়ালার পেশা এতে হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে, গ্রাম ছেড়ে সে শহরে পাড়ি জমিয়েছে, ভাগ্যের অন্বেষণে। গ্রামীণ সৌন্দর্য ও মানুষের হিংসায় হতবুদ্ধি আরিফ আজও খুঁজে ফিরছে তার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য।

চলচ্চিত্রের থিমটি ভালো, তবে সেটির চিত্রায়ণ থিমটির তুলনায় চমৎকারভাবে পরিস্ফূট হয়নি। বাঁশিওয়ালার চরিত্রটি মূল কাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে অঙ্গীভূত হয়নি, চরিত্রটির প্রতি আরও যত্নবান হবার প্রয়োজন ছিল। বিশেষত বাঁশিওয়ালা ও বেলুন-বাঁশি হাতে বাচ্চাদের পদযাত্রার প্রতীকটি বেশি উচ্চতায় উঠতে পারেনি। আরিফ-শায়লার কিছু কিছু সংলাপ দুর্বল লাগে। যেমন, আরিফের একাধিকবার বলা “ভাবনগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কল্পনার সঙ্গে মিলছে না” সংলাপটি ভিন্নভাবে আরও কৌতূহলোদ্দীপকভাবে হাজির করা যেত। তাদের দুজনের কথা বলার কিছু ভঙ্গিও কৃত্রিম ঠেকে, চলতি কথা না হয়ে পাঠ্যপুস্তকের ভাষার মতো শোনায়।

রূপান্তর

রূপান্তর : পুরাণচর্চার প্রয়াস

মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবকে তীরচালনা শিক্ষা দিতেন গুরু দ্রোণাচার্য। দ্রোণাচার্য ঘোষণা দেন, অর্জুনই হলেন শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ, তার সেরা শিষ্য। এদিকে উপজাতি এক যুবরাজ একলব্য দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে চাইলে ছোট জাত হবার কারণে একলব্যকে শিক্ষাপ্রদানে অস্বীকৃতি জানান দ্রোণাচার্য। একলব্য দ্রোণাচার্যকেই গুরু মেনে তীরচালনার অধ্যবসায় করতে থাকে এবং দক্ষ হয়ে ওঠে। অর্জুন একলব্যের দক্ষতার পরিচয় পেয়ে গুরুর কাছে নিবেদন করে যে, একলব্যের কারণে তার তীরন্দাজির খ্যাতি হুমকির সম্মুখিন। গুরু অর্জুনকে আশ্বস্ত করে একলব্যের কাছে গিয়ে জানতে চান, সে এই দক্ষতা কোত্থেকে অর্জন করেছে? একলব্য জানায়, দ্রোণাচার্যই তার গুরু। গুরু এবার গুরুদক্ষিণা চান একলব্যের কাছে। বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দিতে হয় একলব্যকে। এভাবে অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।

এই বিষয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে নির্মাতা আরিফ। কারণ, স্পটে ভীড় করা সাঁওতাল যুবকরা বলতে থাকে যে, অভিনেতা তীর ধরতে জানে না; তীর ধরতে হয় মধ্যমা ও তর্জনী দিয়ে, অথচ অভিনেতা ধরেছে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে। সাঁওতালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বংশ পরম্পরা ধরে এভাবেই তীর চালিয়ে আসছে। তাদের এই মন্তব্য আরিফকে বিভ্রান্ত করে। আরিফ তার চিত্রনাট্য পাল্টে ফেলে। নতুন কাহিনীতে নতুনভাবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা শুরু করে আরিফ, যেখানে সাঁওতালদের অভিনেতা হিসেবে নিযুক্ত করে। নতুনভাবে লিখিত কাহিনীতে দেখা যায় যে, একলব্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তার অনুমতি নিয়ে তার অনুসারীরা মধ্যমা ও তর্জনী দিয়ে তীরচালনার চর্চা শুরু করে। এভাবে ক্ষমতার রূপান্তর হতে থাকে, চলচ্চিত্রের মধ্যে যে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে, তারও নাম দেয়া হয় রূপান্তর

রূপান্তর চলচ্চিত্রের মূল থিমটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একলব্য গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রোণাচার্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে দিয়েছিল। উচ্চজাতের পক্ষ নিয়ে নিম্নজাতের প্রতি দ্রোণাচার্যের এই অন্যায় আদেশ রূপান্তর চলচ্চিত্রের মূল থিমের সূচনাবিন্দু। এই ধারণাকে অবলম্বন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আরিফ পড়ে বিপদে। কারণ স্থানীয় সাঁওতালরা দাবি করে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তীরচালনার কোনো ব্যাপারই নেই। আরিফ বোঝার চেষ্টা করে যে একলব্যর তীরন্দাজীকে খর্ব করার জন্যই যদি বৃদ্ধাঙ্গুলি বিসর্জন দেয় একলব্য, তাহলে তারই অনুসারীরা [সাঁওতালরা নিজেদের একলব্যের অনুসারী দাবি করে, কারণ তারাও নিম্নজাতের এক জনগোষ্ঠী] কেন বৃদ্ধাঙ্গুলি আদৌ ব্যবহার করে না? মহাভারত-এর রেফারেন্স একালে কাজে দিচ্ছে না। রেফারেন্সবিহীন মধ্যবর্তী সময়টায় বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে ক্রমশ তর্জনী-মধ্যমায় সরে আসার বিষয়টিকেই পরিচালক মানুষের ক্ষমতার রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। উচ্চজাতের ক্ষমতাবানদের অন্যায় আদেশের প্রতি নিম্নজাতের মানুষদের টিকে থাকার কৌশলের রাজনৈতিক ইতিহাসটিকে আবু সাইয়ীদ রূপান্তর চলচ্চিত্রে বিধৃত করতে চেয়েছেন, যদিও সেই ইতিহাস কোথাও লেখা নেই। নিপীড়িতের লড়াই-সংগ্রাম-নিবিষ্টতার প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে রূপান্তর

তবে এই পুরাণ-আখ্যানকে বিশ্বস্তরূপে চিত্রায়ণ করার জন্য যে রকম বড় ক্যানভাস বা ভৌগোলিক বিন্যাস ফ্রেমবন্দি করা প্রয়োজন ছিল, চলচ্চিত্রে তার ঘাটতি ছিল বলা যায়। যে লোকেশন চলচ্চিত্রটির জন্য বেছে নেয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের বিচারে মন্দ নয়; কিন্তু তা মহাভারতের মহা-আখ্যানের তুলনায় সামান্য মনে হয়। পাণ্ডবদের তীরচালনায় প্রশিক্ষণপ্রদান করছেন দ্রোণাচার্য– শুরুর সেটটাকেও বিশ্বস্ত মনে হয় না। আরিফ ও তার সহকারি পরিচালক শায়লার সংলাপগুলোও ম্যাড়মেড়ে লাগে, কিছুটা অনির্দিষ্টও ঠেকে। ছবিতে শায়লা একমাত্র নারীচরিত্র, তার সঙ্গে আরিফের সম্পর্কটিকে নৈর্ব্যক্তিক এবং পরিচালক ও সহকারীর পেশাদারিত্বের ঘেরাটোপে বন্দি রাখার মাধ্যমে নাটকীয়তা সৃষ্টির সুযোগ হারিয়েছেন পরিচালক। এ রকম ‘চলচ্চিত্র নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র’গুলোতে [ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর ডে ফর নাইট, মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে এ রকম চলচ্চিত্র] সাধারণত ভেতরের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাইরের চলচ্চিত্রেও যথেষ্ট পরিমাণ ঘটনা ও কাহিনীবিন্যাস বরাদ্দ থাকে। কিন্তু রূপান্তর চলচ্চিত্রে বাইরের অংশে কাহিনী বলতে আরিফের বিভ্রান্তিতে পড়া এবং শায়লা বা সাঁওতালদের সঙ্গে সে বিষয়ে আলাপ। তবে সাঁওতাল নারীদের নৃত্যগীত ও পুরুষদের বাদ্য চলচ্চিত্রে ভিন্ন এক দ্যোতনা এনেছে। এই নৃত্যগীত চলচ্চিত্রে সাজেস্টিভ, মূল ন্যারেটিভের সঙ্গে তার যোগ নেই– কোনো উপলক্ষ্য নয়, চলচ্চিত্রের নাটকীয়তাকে প্রলম্বিত করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষত আরিফ যখন মাঝরাতে তর্জনা ও মধ্যমা টেবিলল্যাম্পের ওপরে রেখে ছাদে ছায়া ফেলে তীরচালনা কৌশলের রূপান্তর বুঝতে মগ্ন, তখন ক্রস কাটিং সম্পাদনার মাধ্যমে ভিজ্যুয়ালে বা নেপথ্যের শব্দে সাঁওতালদের নৃত্যগীত দেখা বা শোনা যায়।

রূপান্তর চলচ্চিত্রটিকে বলা যায় চমৎকার এক থিমের গড়পড়তা চলচ্চিত্ররূপ।

অপেক্ষা

অপেক্ষা : জঙ্গিবাদের সরল চিত্রায়ণ

ছোটবেলায় বাবা-মা হারানো রবিউল আহসান দাদির কাছে মানুষ। রবিউল রাজধানীতে এসেছে গায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে। রবিউলের দাদি তার অপেক্ষায় বসে থাকেন। নাতির ওপর অভিমান করে ভাবেন শহরে এসে নাতি তাকে ভুলে গেছে। দিন দিন স্মৃতি শক্তি কমে যাচ্ছে তার, রবিউলের চিঠি পেলেও তিনি ভুলে যান। অন্যদিকে পাড়ায় সবার কাছে ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত রেজাউল করিম রঞ্জু। তার বাবা-মা জেলা শহরে পড়াশোনা করতে পাঠান তাকে। কলেজের হোস্টেলে থাকে সে। এক সময়ে বাবা-মার অগোচরে জেআরবি নামক এক জঙ্গিদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে সে। ঢাকায় রবিউলের গানের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নির্মম মৃত্যু হয় রবিউলসহ আরো ছ’জনের। রঞ্জুর বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। তার বাবা-মা ছেলে সম্পর্কে নিষ্ঠুর সত্য জানতে পারেন, বেদনায়-বিস্ময়ে হতবাক তারা। পুলিশের অনুসন্ধানে রঞ্জুর ঘর থেকে জেহাদি বই আবিষ্কৃত হয়। একমাত্র সন্তানকে ঘিরে রঞ্জুর বাবা-মার যাবতীয় আশা-আকাক্ষা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। রঞ্জুর বাবা শহরে আসে, সাংবাদিকদের সূত্রে রঞ্জুকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করে। নানা অপারেশনের সামনে-পেছনে রঞ্জু সাফল্যের পরিচয় দেয়। রঞ্জু পদোন্নতি পেয়ে একটি এলাকার কমান্ডার হয়। চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, রঞ্জু শুয়ে থেকে নানান ভাবনা ভাবে। তার জানালায় উঁকি দেয় শিশু রঞ্জু। আবার হারিয়ে যায়। রঞ্জুর বাবা-মা রঞ্জুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আর রবিউলের দাদি নদীর ধারে শূন্যে তাকিয়ে থাকে। রবিউলের জন্য তারও অনন্ত অপেক্ষা।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উৎপত্তি ও প্রসারে স্থানীয় রাজনীতির কিছু কারণ থাকলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবও এক্ষেত্রে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল কর্তৃক প্যালেস্টাইনের ভূমিদখল, আফগানিস্তান ও ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলা এবং তাতে পশ্চিমা অন্যান্য শক্তির সমর্থনের কারণে বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়। অবশ্য এই প্রকাশ হঠাৎ করেই হয়েছে– এমন নয়; মৌলবাদী জঙ্গি তৎপরতা বা রাজনৈতিক ইসলামের একটি ধারা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে বিরাজ করে আসছিল। কিন্তু সত্যিকারঅর্থে তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং নতুন নতুন জঙ্গি গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে বিগত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের ওপরে আক্রমণের পর থেকে। ২০০৪-০৫ সালে জঙ্গি সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি নৃশংস হামলা চালায় আদালতপাড়ায়, সিনেমা-হলে। একবার হামলা হয় একযোগে দেশের প্রায় সব জেলায়। ঐ সময়ে তৎকালীন জোট সরকারের প্রভাবশালী কোনো কোনো মন্ত্রী এই তৎপরতায় সমর্থন দিয়েছিল। এর আগে রমনা বটমূলে ও উদীচীর অনুষ্ঠানেও হামলা হয়েছিল। ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকলে ২০০৭ সালে জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয় ও ফাঁসি দেয়া হয়। কিন্তু জঙ্গিবাদ বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হয়নি, একটি রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবে এখনও তা টিকে রয়েছে।

অপেক্ষা চলচ্চিত্রটিতে মানবিক-পারিবারিক সঙ্কটের দিক থাকলেও তা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক সঙ্কট, জঙ্গিবাদের একটি চিত্রই শেষ পর্যন্ত আঁকতে চেয়েছে। মানবিক সম্পর্কের দিকটি নির্মাণে পরিচালক দক্ষতার পরিচয় দিলেও রাজনৈতিক সঙ্কটটি চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে জঙ্গিবাদকে সরলরৈখিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত নাগরিকেরা জঙ্গিবাদকে যে-দৃষ্টিতে দেখে থাকেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গিটিই চলচ্চিত্রটিতে লক্ষ করা গেছে। বিষয়টি ভেতর থেকে দেখা হয়নি।

রঞ্জু বিজ্ঞানে ভালো, তাই হাতবোমা বানানোর জন্য তাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু রঞ্জু কেন জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হলো, তার কোনো কারণ চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়নি। তার পারিবারিক প্রেক্ষাপটটা আর দশটা সাধারণ মফস্বলী নিম্ন-মধ্যবিত্তের মতো, সে মাদ্রাসায়ও পড়েনি, সাধারণ শিক্ষা-পদ্ধতিতে শিক্ষিত সে। কলেজে ভালো ছাত্র হিসেবে সুনাম আছে। তার জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হবার পেছনে একটা কারণ থাকার কথা। সেই কারণটি চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়নি। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলা ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলীর পর সন্ত্রাসী হতে হয়তো বড়ো কারণ লাগে না, বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ হয়ে ওঠাটা যেমন সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির প্রতি এক ধরনের সাড়া বা প্রতিরোধ, রঞ্জুর জন্যও একই কারণ থাকতে পারতো। কিন্তু সেই কারণটাকে উল্লেখ করা হয়নি, যেই কারণে একজন ধর্মপ্রাণ তরুণ জঙ্গিবাদে প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। জঙ্গিবাদ নিয়ে রিপোর্ট করেন, এমন সাংবাদিকের মাধ্যমে রঞ্জুর বাবা রঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান। সেই সাংবাদিক আসিফকে একবার বলতে শোনা যায়, ‘জঙ্গিরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার’। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিটি কী, তা চলচ্চিত্রে বিশদ করা হয়নি। চলচ্চিত্রে দেখা যায় রঞ্জু জেআরবি [জেএমবি?] দলের সদস্য। কিন্তু সেই জেআরবি সৃষ্টিতে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব কী [জেএমবির ক্ষেত্রে তা ছিল] তা দেখানো হয়নি।

জঙ্গিবাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংশ্লিষ্টতাটি কেবল ধর্মীয় কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক দিকটিতে আলোকপাত করা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের আকর্ষণীয় তেল-সম্পদের কারণে পশ্চিমা শক্তি যে একেকটি হামলা করে, এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় নাগরিকেরা সেই অন্যায় হামলাকে প্রতিরোধ করতে গিয়েই যে ‘সন্ত্রাসী’তে পরিণত হয়, সেই কারণটি মুফতি সাহেব বা অন্যা কারও মুখ দিয়ে পরিচালক উল্লেখ করতে পারতেন। এক্ষেত্রে পুরনো অনির্দিষ্ট শত্রু ‘ইহুদি-নাসারা-মালাউন’দের কথাই বলা হয়েছে, সমসাময়িক প্রতিপক্ষের কথা নেই। হয়তো বাড়তি টোপ হিসেবে আনা হয়েছে বেহেশতে যাবার নিশ্চয়তা। আবার সেই অনির্দিষ্ট শত্রুদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশে কেন জঙ্গি কার্যক্রম করতে হবে, মুফতি সাহেবের বয়ানে তার ব্যাখ্যা অনুপস্থিত থাকে। অথচ প্রকৃত জঙ্গিদের কাছে ব্যাখ্যা কিন্তু ছিল। যেমন, মানুষের তৈরী আইনের পরিবর্তে শরিয়া আইন চালু করা তাদের লক্ষ্য ছিল, ফলে আদালত পাড়ায় বোমাহামলা হয়েছিল। এছাড়া বাঙালি সংস্কৃতির উপাদানগুলো অনৈসলামিক বলে জঙ্গিরা মনে করে, তাই উদীচী ও রমনায় হামলা হয়েছিল। সিনেমায় দেখা যায় অশ্লীলতা, তাই সিনেমা-হলে হামলা হয়েছিল। জেএমবির প্রচারপত্রে বা শীর্ষ জঙ্গিদের বিবৃতিতে এই ব্যাখ্যাগুলো পাওয়া গিয়েছিল। বাংলাদেশে জিহাদ কেন, তার কাঙ্ক্ষিত একটা ব্যাখ্যা অপেক্ষায় অনুপস্থিত রয়েছে।

কিত্তনখোলা

আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্র : মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ

আবু সাইয়ীদের ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের এককথায় মূল্যায়ন করা যায় এভাবে যে, প্রথম তিনটি চলচ্চিত্রই তার অপেক্ষাকৃত উন্নত শিল্পকর্ম, আর পরের তিনটি চলচ্চিত্রে পূর্বের প্রতিশ্রুতি সুরক্ষিত হয়নি। চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শক-সমালোচকদের সাড়া, জাতীয়-আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তি– এই দুই বিচারে এটা বলা যায়। তবে কেউ যদি চলচ্চিত্রগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখেন, তবে তার এ রকমই উপলব্ধি হবে। লক্ষ করার বিষয়, প্রথম তিনটি চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী অন্যের, যথাক্রমে সেলিম আল দীন, নাসরীন জাহান ও হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু শেষ তিনটির কাহিনী আবু সাইয়ীদের নিজেরই। এক্ষেত্রে এটিই কারণ হিসেবে হয়তো কাজ করতে পারে। তবে বাঁশিনিরন্তর-এর থিম চমৎকার হবার পরও, চিত্রায়ণের পর, শেষকর্মটি খুব ভালো দাঁড়ায়নি। হয়তো ভালো থিমটির কাহিনী যে রকম ঠাসবুনোটে বিন্যস্ত হওয়া উচিত ছিল, তা দাঁড় করাতে পারেননি কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার আবু সাইয়ীদ।

অল্প সময় ও স্থানব্যাপী কাহিনীবিস্তার হলেও কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রে বিশাল বাংলার চিত্র উঠে এসেছে। মেলার ব্যাপকতা চলচ্চিত্রের ফ্রেমে ধরা না পড়লেও, বুদ্ধিদীপ্ত অ্যাডাপ্টেশনের কারণে অল্প বাজেটে নির্মিত কিত্তনখোলা একটি উন্নত চলচ্চিত্র হিসেবেই বিবেচিত হবে। এটি ১৬ মিমি ফরম্যাটে নির্মিত চলচ্চিত্র, যদিও পরে এটি ৩৫ মিমি-এ প্রতিস্থাপন করে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। অন্যদিকে শঙ্খনাদ-এর কুহক ও কাহিনীসংগঠন চলচ্চিত্রটিকে অনন্য করে তুলেছে। আর কাহিনী হিসেবে নিরন্তর রীতিমতো এক চমক। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে যৌনকর্মীর ভূমিকায়– এ রকম কাহিনী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আগে দেখা যায়নি।

আবু সাইয়ীদের ছয়টি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দুয়েকটি বিষয়ে তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো [কিত্তনখোলা, শঙ্খনাদবাঁশি] এবং আরেকটি হলো আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ, বিশেষত গ্রামীণ মেলা ও যাত্রাপালা [কিত্তনখোলাবাঁশি]। আর নাগরিক জীবনের চাইতে গ্রামীণ জীবনের প্রতি আবু সাইয়ীদের আগ্রহ বেশি। একমাত্র নিরন্তর চলচ্চিত্রটি পুরোপুরি শহুরে প্রেক্ষাপটে রচিত। অপেক্ষায় গ্রাম ও শহর– উভয়ের উপস্থিতি রয়েছে। আর রূপান্তর-এ চলে এসেছে পৌরাণিক প্রসঙ্গ, আছে আদিবাসী চরিত্রও। গ্রামীণ ক্ষমতারাজনীতি ও পৌরাণিক রাজনীতিতে আবু সাইয়ীদ আগ্রহী, কিন্তু জাতীয় বা সমসাময়িক প্রসঙ্গে তার চালচ্চিত্রিক প্রকাশ নেই। একমাত্র ব্যতিক্রম– অপেক্ষা। তার সমসাময়িক চলচ্চিত্রনির্মাতারা যেক্ষেত্রে জাতীয় জীবনের প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনা– মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, সেক্ষেত্রে তিনি ধূসর যাত্রা ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি আনেননি। এইক্ষেত্রে তিনি অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম।

আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রগ্রাহক একেকটিতে একেক জন। অপেক্ষার চিত্রগ্রহণের কাজ তিনি নিজেই করেছেন। কিত্তনখোলারূপান্তর-এর আবহসংগীতের কাজটিও তিনি করেছেন। নিজের চলচ্চিত্রের নানান অংশে তার সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। অন্যের কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্রগুলোর সহ-চিত্রনাট্যকারও তিনি। তবে নিজের চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীতের জন্য সত্যজিতের যেমন সুনাম, কিংবা চিত্রগ্রাহক হিসেবে গৌতম ঘোষের, আবহসঙ্গীত বা চিত্রগ্রহণের কাজটির জন্য আবু সাইয়ীদকে আমরা বিশিষ্ট হয়ে উঠতে দেখি না। স্বাধীন একজন নির্মাতা হিসেবে নিশ্চয়ই এই বাড়তি কাজগুলো তার নির্মাণ-খরচ কমিয়ে আনে এবং চলচ্চিত্রের ওপর পরিচালকের দখল নিশ্চিত থাকে, কিন্তু ঐ বাড়তি ভূমিকাগুলোতে পরিচালকের দক্ষতাও পাশাপাশি কাম্য। তার তিনটি চলচ্চিত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন জুনায়েদ হালিম [শঙ্খনাদ, রূপান্তরবাঁশি] এবং সঙ্গীতের দায়িত্ব পালন করেছেন এস আই টুটুল [শঙ্খনাদ, নিরন্তরবাঁশি]। দুজনই গুণী ও দক্ষ তাদের নিজ নিজ দায়িত্বে। ফলে আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্রের সম্পাদনাগত উৎকর্ষ চোখে পড়ার মতো। কথাটা আবহসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও খাটে। বিশেষত শঙ্খনাদ চলচ্চিত্রে উভয়ের কাজই চোখে পড়ার মতো।

আবু সাইয়ীদ তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। আবর্তন [১৯৮৮] ও ধূসর যাত্রার [১৯৯২] জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছেন। আর কিত্তনখোলার [২০০০] জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও সংলাপের পুরস্কার। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিরন্তর [২০০৬] পেয়েছে তিনটি পুরস্কার। কেরালার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান পায় চলচ্চিত্রটি। পাশাপাশি ফিপ্রেস্কি সমালোচক পুরস্কারও পায় নিরন্তর। আর একই বছরে ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার রৌপ্য ময়ূরও লাভ করে চলচ্চিত্রটি। রূপান্তর [২০০৯] চলচ্চিত্রটি ট্রাইবাল শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে [ভারত] শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে। শঙ্খনাদ চলচ্চিত্রটি সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি লাভ করে। রূপান্তরবাঁশি চলচ্চিত্রদ্বয় ইউরোপ থেকে চিত্রনাট্যসংক্রান্ত অনুদান পায়– রূপান্তর ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডের রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের হুবার্ট বল ফান্ড থেকে এবং বাঁশি ২০০৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ভিশন সুড এস্ট থেকে অনুদান লাভ করে। রূপান্তর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও অনুদান পায়। এছাড়া বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোগের বেশ কটি পুরস্কারও তিনি লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার [শঙ্খনাদ, ২০০৪ ও অপেক্ষা, ২০১১]। পুরস্কারপ্রাপ্তির বিচারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে আবু সাইয়ীদের অবস্থান প্রথম সারিতে।

শঙ্খনাদ

আবু সাইয়ীদের চলচ্চিত্রভাষা

আবু সাইয়ীদ শঙ্খনাদ চলচ্চিত্রে চলচ্চিত্রভাষা প্রয়োগের এক অনুপম নিদর্শন হাজির করেছেন। সময় ও স্থানের সীমা অতিক্রম করেই চলচ্চিত্রের একেকটি দৃশ্যের অবতারণা করতে হয়। সেই অতিক্রমণটি হতে হয় বুদ্ধিদীপ্ত– এই এক স্থানেই সাধারণ চলচ্চিত্র ও উন্নত চলচ্চিত্রের পার্থক্য রচিত হতে পারে, সাধারণ চলচ্চিত্রকার ও মেধাবি দৃশ্যনির্মাতার ব্যবধান ধরা পড়ে। শঙ্খনাদ-এর প্রধান চরিত্র স্মৃতিতাড়িত ওসমান। নয়নপুর গ্রামে এসে সে তার শৈশবকেই খুঁজে ফেরে। বর্তমান যুবা ওসমান যেমন নয়নপুর গ্রামে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তেমনি স্মৃতি হাতড়ে সে শৈশবকে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা করছে। ফলে বর্তমান ও অতীতের এক সংমিশ্রিত সময়রূপ আমরা শঙ্খনাদ-এ দেখতে পাই। কখনো অতীত, কখনো বর্তমান, কখনোবা অতীত-বর্তমানে মিলেমিশে একেকটি কালিক দ্যোতনা সৃষ্টি করা হয়েছে চলচ্চিত্রে। তাই ওসমান মন্নাফ খাঁর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে নয়নপুরে স্মৃতি হাতড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা যেমন বর্তমান, এই মন্নাফ খাঁর পিতাই সম্পত্তি করায়ত্ব করতে ওসমানের বাবা-মাকে হত্যা করছে– এ রকম অতীত দৃশ্যের প্রতীকী ছায়ানাট্য আমরা চলচ্চিত্রে দেখি। সাজেদুল আউয়াল ছায়ানাট্যের আশ্রয়ে নির্মিত দৃশ্যটির বর্ণনা করেন এভাবে :

ওসমানের ভাবনায় ভর করে তার বাবা ও মাকে হত্যার দৃশ্যটি আমরা যখন প্রত্যক্ষ করি, তখন ছায়ানাট্যে দেখতে পাই যে, কিছু লোক তার বাবা ও মাকে দা দিয়ে কোপাচ্ছে। এক পর্যায়ে ক্যামেরা যে-পরদায় ছায়ানাট্যটি সংঘটিত হচ্ছিল তা থেকে ডানদিকে মুভ করে এবং অকস্মাৎ তার বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি বালক ওসমানকে বলছেন, ভেগে যা, পালা। পুরো সিকোয়েন্সটি ওসমানের মনোভঙ্গিতে চিত্রায়িত– বলা চলে ওসমানের ভাবনার দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপ।
–আউয়াল, ২০০৬

আবার বটগাছের কাছে এসে ওসমানের বর্তমান ও অতীত যেন একাকার হয়ে যায়। একই ফ্রেমে দেখা যায় বড় ওসমান বটগাছের নিচে, আর ছোট ওসমান ও তার বন্ধু ফজলু বটের ঝুরিতে দোল খাচ্ছে। কুয়োর কাছে গেলে ওসমানের কুয়োপাড়ে গোসলের কথা মনে পড়ে। এবারে দৃশ্য নয়, পর্দায় বড় ওসমানকেই আমরা দেখি, অতীতের শব্দ যুক্ত হয় বর্তমানের চিত্রের সঙ্গে– কুয়োপাড়ে মা চঞ্চল ওসমানকে শাসন করছে গোসল করাতে গিয়ে। শঙ্খনাদ-এর আলোচনায় সাজেদুল আউয়াল [আউয়াল, ২০০৬] একে বলেছেন সাউন্ড ইমেজ। অতীতের চরিত্র আরেকবার বর্তমানে হাজির হয়– নিজেদের বাড়ির কাছে গেলে বড় ওসমানকে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য ওসমানের বাবা ঘুড়ি হাতে হাজির হয়। স্মৃতিকাতর ওসমানের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে কালকে অতিক্রম করার এ রকম অপূর্ব দৃশ্যব্যঞ্জনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শঙ্খনাদ-এর মতো করে আর কখনও দেখা যায়নি। একইরকম দৃশ্যসংগঠন আমরা দেখি অপেক্ষা চলচ্চিত্রে। জঙ্গীজীবনের এক অবসরে রঞ্জুর বাবার কথা মনে পড়ে, একটি পুরনো প্রসাদোপম বাড়িতে বাবা ও ছোট রঞ্জু লুকোচুরি খেলে। বাবা দুরন্ত রঞ্জুকে খুঁজে পায় না। রঞ্জুর নাম ধরে ডাকতে থাকে। সেই লুকোচুরি খেলা একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে তরুণ রঞ্জুও দেখে, সেই ডাকে তরুণ রঞ্জু সাড়া দেয়। বাবা অবশ্য তরুণ রঞ্জুর সাড়া শুনতে পায় না, ছোট রঞ্জুকে কাঁধে নিয়ে চলে যায়। প্রতীকী এই দৃশ্যে ছোট ও বড় রঞ্জু একই ফ্রেমে হাজির করে আবু সাইয়ীদ শঙ্খনাদ-এর সেই ভাষাই যেন আবার প্রয়োগ করলেন। এই এক জায়গায় তিনি অব্যর্থ, বলা যায় অপেক্ষা চলচ্চিত্রের একমাত্র যদি নাও হয়, প্রধান চালচ্চিত্রিক ব্যঞ্জনাযুক্ত দৃশ্য বলতে আমরা এটিকেই দেখি।

চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে এ রকম নিরীক্ষা আমরা অন্যান্য চলচ্চিত্রে খুব বেশি দেখি না। অন্যান্য চলচ্চিত্রের কাহিনীও শঙ্খনাদ-এর মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক হয়তো নয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত ভাষাগত প্রয়োগের অভাব অনুভূত হয়েছে। যেমন কিত্তনখোলাবাঁশি চলচ্চিত্রে মেলার দৃশ্যগুলোয় আনুষ্ঠানিক ব্যাপকতার অভাব লক্ষ করা গেছে। বিশেষত কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রে সমীরন দত্তের ক্যামেরা বড় বেশি স্থির। জমজমাট মেলাপ্রাঙ্গনের কাহিনীতে আরও বেশি গতিশীল ক্যামেরা কাঙ্ক্ষিত ছিল। কোনো ক্রেন শট ছাড়াই মেলার ঘটনাবলিকে তুলে ধরা হয়েছে। সুনির্বাচিত ক্যামেরা অ্যঙ্গেল দিয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। রুস্তম ও ডালিমন কথা বলছে, তার পেছনে স্থির নদী, তারও পেছনে বাঁধ, সেই বাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মেলায় আগত লোকজন যার প্রতিফলন নদীর পানিতে– এ রকম দৃশ্য পরিকল্পনা মেলার আবহ ধরে রেখেছে। সেলিম আল দীনের নাটকের শেষে সোনাই, ছায়া, রুস্তমের ঘটনাগুলো আলাদা আলাদাভাবে [যেমন সোনাই ইদুকে খুন করে] ঘটলেও চলচ্চিত্রে তাদের অনির্দিষ্ট হয়ে পড়া ভবিষ্যৎ-ভাবনা এক দৃশ্যে এনে একটি ওপেন এন্ডেড শটে, ক্যামেরা প্যান করে সকলের দুর্ভাবনাকে একত্রে দেখানো হয়েছে। এটা চলচ্চিত্রকারের এক বুদ্ধিদীপ্ত নির্বাচন। সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে চলচ্চিত্রে সংযোজিত গান “আমার পাগলা ঘোড়া রে, কইর মানুষ কই লইয়া যাও…”, এই অনির্দিষ্টতাকে বোঝাতে লাগসই হয়েছে।

নিরন্তর কাহিনীপ্রধান চলচ্চিত্র। তিথির মনোজগতের ভাবনাগুলো কিছুটা পরিসর পেয়েছে চলচ্চিত্রে। তবে তা কোনো পরাবাস্তব দৃশ্য সৃষ্টির মাধ্যমে বেশিদূর বিস্তৃত করা হয়নি। তার বিষণ্ন চেহারাই ছিল তার মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য একমাত্র উপায়। অন্যদিকে তিথি তার কদর্য জীবন যে-শহরে বয়ে বেড়ায়, সেই শহরের কিছু দৃশ্য চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু সেই শহরকে মায়াবী করে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। অথচ তিথির জীবনের কদর্যতার সঙ্গে সম্পূরক হতো যদি শহরের যানযট, শব্দদূষণ, মলিন রাস্তা-ঘাট-মানুষকে তুলে ধরা যেত। এমন নয় যে ঢাকা শহর খুব ঝকঝকে শান্ত-নিরাপদ শহর, বরং যট-দূষণই তার সঙ্গে বেশি যায়। কিন্তু পরিচালক সার্ক ফোয়ারার যে-দৃশ্য টপ-অ্যাঙ্গেল শটে নিয়েছেন, তাকে মোহনীয় করে উপস্থাপন করেছেন। তিথি বাসে বাসে যে ঘুরছে তা ভীড়-ভাট্টাবিহীন, কেবল-নারীদের বাস। ব্যাকগ্রাউন্ডে যখন বাজছে গান– “ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত রাজপথ …”– তখনও ছিমছাম শহরকেই দেখানো হয়েছে।

ড্রেসিং টেবিল [মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমা]

শেষ কথা

মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদের মতো আবু সাইয়ীদ ঠিক বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল, এ কথা বলা যাবে না। লেখালেখি, সাক্ষাৎকার, প্রেস রিলেশন কিংবা অ্যক্টিভিজম মিলিয়ে বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের ভিড়েও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু পর্দায় দৃশ্যসৃজনের মাধ্যমে সমাজমনস্ক গল্প বলার ক্ষেত্রে তিনি পারঙ্গমতা অর্জন করেন। কিত্তনখোলা থেকে শঙ্খনাদ হয়ে নিরন্তর পর্যন্ত চলচ্চিত্রকার হিসেবে আবু সাইয়ীদের ক্রমাগত অগ্রগতি ঘটেছে। আর রূপান্তর থেকে বাঁশি হয়ে অপেক্ষা পর্যন্ত তার অগ্রবর্তিতা যেন থমকে গেছে। নির্মাণের বেশ কয়েকবছর পর কিত্তনখোলা জাতীয় পুরস্কার পাবার পর পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসে এবং ৩৫ মিমি-এ প্রতিস্থাপন করে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিও পায়। শঙ্খনাদ দেশে-বিদেশে তেমন পুরস্কার না পেলেও সমালোচক ও বোদ্ধা দর্শকের কাছে সমাদৃত হয়েছে, পাশাপাশি ইউরোপের দুটি দেশে মুক্তিও পেয়েছে। নিরন্তর আন্তর্জাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি কিছুমাত্রায় দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু রূপান্তর, বাঁশিঅপেক্ষা চলচ্চিত্রত্রয় কিছু পুরস্কার-অনুদান লাভ করার পরও দর্শক-সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়তে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান দৃশ্যপট খুব আশাব্যঞ্জক নয়। মূলধারার চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক মন্দায় রয়েছে, স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রও যেন নতুন ভাবনার নতুন ধরনের চলচ্চিত্র হাজির করতে পারছে না। উভয় ধারাই দর্শক আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিদেশ থেকে আসছে না কোনো পুরস্কার-সংবাদ। এই পরিস্থিতিতে আবু সাইয়ীদ তার চলচ্চিত্রভাবনা ও উদ্যোগ সামনের দিনগুলোতে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন বা পারছেন, উৎসুক চলচ্চিত্রামোদীরা তা নিশ্চয়ই পর্যবেক্ষণ করবেন।

ত থ্য সূ ত্র
আউয়াল, সাজেদুল [২০০৬]। দূরশ্রুত কোনো এক শঙ্খনাদের সন্ধানে। চলচ্চিত্রের সময়, সময়ের চলচ্চিত্র। ফাহমিদুল হক ও শাখাওয়াত মুন সম্পা.। ঢাকা: ঐতিহ্য
দীন, সেলিম আল [২০০৬]। রচনাসমগ্র-২। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স
মাসুদ, তারেক [২০০৬]। গবেষণাকর্মের জন্য গৃহীত সাক্ষাৎকার
সাইয়ীদ, আবু [২০০৬]। গবেষণাকর্মের জন্য গৃহীত সাক্ষাৎকার

প্রথম প্রকাশ : ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল। সংখ্যা ১১, ডিসেম্বর ২০১৬
লেখকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক ও চলচ্চিত্র গবেষক; অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা, বাংলাদেশ। সিনে-গ্রন্থ : বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র-- নতুন সিনেমার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ [২০১২]; চলচ্চিত্র সমালোচনা [২০১৩]; তারেক মাসুদ-- জাতীয়তাবাদ ও চলচ্চিত্র [২০১৪]; চলচ্চিত্রের সময়, সময়ের চলচ্চিত্র [২০০৬]*; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প-- সংকটে জনসংস্কৃতি [২০০৮]*। অন্যান্য গ্রন্থ : মিডিয়া ও নারী [২০০৬]; বেড়ালের দেশে ইঁদুর হয়ে [২০০৯]; অসম্মতি উৎপাদন-- গণমাধ্যম-বিষয়ক প্রতিভাবনা [২০১১]; মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি [২০১৩]*; শিপ্রার শহরে কয়েকজন এজেন্ট [২০১২]; সে ও তার ছায়া [১৯৯৭]; এ শহর আমার নয় [২০০৫]; কর্পোরেট মিডিয়ার যুদ্ধ ও তথ্য বাণিজ্য-- ইরাক-আফগানিস্তান-প্যালেস্টাইন [২০০৪]*। [[* যৌথ-রচনা/সম্পাদনা]]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন