ফিল্মমেকার রোমান পোলান্সকির সাক্ষাৎকার । এ জীবনের যত ট্র্যাজেডি [কিস্তি : ২/৩]

2
262

সাক্ষাৎকার গ্রহণ । ফিলিপ এহেমকেমার্টিন ভলফ ।। অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

রোমান পোলান্সকি। জন্ম : ১৮ আগস্ট ১৯৩৩; প্যারিস, ফ্রান্স। পাম দি’অরঅস্কারজয়ী কিংবদন্তি পোলিশ ফিল্মমেকার। রিপালশন; রোজমেরি’স বেবি; চায়নাটাউন; টেস; বিটার মুন; দ্য পিয়ানিস্ট; অলিভার টুইস্ট; দ্য গোস্ট রাইটার; ভেনাস ইন ফিউর প্রভৃতি সিনেমার নির্মাতা, সিনেবিশ্বের এই মহান সিনিয়র সিটিজেনের জীবনের নানা ট্র্যাজেডির ওপর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জার্মান ম্যাগাজিন স্পিগেল-এর দুই প্রতিনিধি। সাক্ষাৎকারটির তিন কিস্তির দ্বিতীয় কিস্তি হাজির করা হলো এখানে…

আগের কিস্তি 


 

অল্প বয়সে পোলান্সকি

সা ক্ষা কা র 

স্পিগেল : বাবাকে আরও অনেকের সঙ্গে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এক বন্দিশিবিরে– এমন দৃশ্যও তো আপনাকে একদিন দেখতে হয়েছিল?

পোলান্সকি : দৌড়ে আমি তার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে দূরে ঠেলে দিয়ে বলেছিলেন : ‘পালাও, পালিয়ে যাও!’ আমি জানতাম, তিনি আমার জীবন বাঁচাতে চাইছেন। কিন্তু যে কোনো মূল্যে বাবাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে চাইছিলাম আমি। তার সঙ্গে থাকার জন্য যে কোনো অজুহাতের আশ্রয় নিতে রাজি ছিলাম। শিশুরা প্রকৃতিগতভাবেই আশাবাদী হয়ে থাকে। শিশু ভাবে, সবকিছু শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে। কিন্তু আমি ঠিকই জানতাম, কীসের ঝুঁকি নিয়েছিলাম তখন। সবার পায়ে পায়ে তখন মৃত্যুর বসবাস। তাই আমি দৌড়ে পালিয়ে গেলাম। এভাবেই আমার জীবন বাঁচিয়েছিলেন বাবা।

স্পিগেল : আপনার মা তো ইতোমধ্যেই লোকান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন। আপনি কি তখন জানতেন, তিনি আর জীবিত নেই?

পোলান্সকি : না। আমরা শুধু জানতাম, তাকে অসভিৎসের [পোল্যান্ড] একটি বন্দিশিবিরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করতাম, তিনি একদিন ফিরে আসবেন। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, বাবা ততদিনে ফিরে এসেছেন, তখনো আমি বিশ্বাস করতাম– বেঁচে আছেন মা। আমার ধারণা, বাবা তখন জানতেনও না, মাকে ধরে নিয়ে যে গাড়িটিতে তোলা হয়েছিল, সেটির সরাসরি গন্তব্য ছিল গ্যাস চেম্বারে। আমার বোনও অসভিৎসে [অসভিৎস কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প : নাৎসি বন্দিশিবির] বন্দি ছিলেন। তিনি অবশ্য প্রাণে বেঁচেছেন।

স্পিগেল : আত্মজীবনীতে আপনি লিখেছেন, দখলদারিত্বের সেই দিনগুলোতে, একজন শিশু হলেও, কী ঘটছে– তা জানার জন্য আপনি নিয়মিতই সিনেমা-হলে যেতেন।

পোলান্সকি : সে সময়ে আমার ঠিক কী করা উচিত, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সিনেমা-হলই ছিল আমার জন্য বিনোদন লাভের একমাত্র মাধ্যম।

স্পিগেল : কী ধরনের সিনেমা দেখেন তখন?

পোলান্সকি : জার্মান সিনেমা। অন্য কোনো সিনেমার তখন অনুমোদন ছিল না। এমনকি কোনো প্রোপাগান্ডা ফিল্মও ছিল না সেখানে। তবে সিনেমা-হলে যাওয়াকে পোল’রা এক ধরনের দেশপ্রেমহীনতা হিসেবেই চিহ্নিত করত। গ্রাফিতিতে লেখা থাকত : ‘শুধুমাত্র শুয়োরেরাই সিনেমা-হলে যায়!’ আমি ছিলাম সেই শুয়োরগুলোর একজন!

স্ত্রী শ্যারন টেট ও স্বামী রোমান পোলান্সকি

স্পিগেল : এতকিছুর সঙ্গে একজন মানুষ কী করে সামলে ওঠে? আপনি একটি ইহুদিপল্লীতে জীবন কাটাচ্ছিলেন, আপনার মা মারা গিয়েছিলেন, আর আপনার বাবা ছিলেন বন্দিশিবিরে আটক। আর পরবর্তীকালে আপনার গর্ভবতী স্ত্রীর ওপর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড– তাতে মনুষ্যত্বের ওপর সব আস্থা কি আপনি খুইয়ে ফেলেননি?

পোলান্সকি : আপনার নিজের সঙ্গেই যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে এ বিষয়টিকে এমন দার্শনিক বয়ানে আপনি চয়ন করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। এটিকে আপনি স্রেফ ব্যক্তিগতভাবে নিন। এটি আপনার কী সর্বনাশ ঘটাবে– তা উপলব্ধি করতে পারবেন না। জগত-সংসার নিয়ে ভাবতে পারবেন না আপনি। আমার সঙ্গেই কেন ঘটল? এর কারণ হয়তো, এই ঘটনাটি ভীষণ অপরিচিত ছিল। এ কথা শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সবার বেলাতেই প্রযোজ্য।

স্পিগেল : প্রতিশোধের কোনো ফ্যান্টাসি কি কাজ করেছে আপনার ভেতর? যে আপনার সঙ্গে এমনটা করল, সেই লোকটিকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করেনি?

পোলান্সকি : নিশ্চয়ই আপনার মধ্যে প্রতিশোধের ফ্যান্টাসি কাজ করবে। এ ঘটনার পরপর যদি তাদের কাউকে আমি খুঁজে পেতাম, তাহলে হয়তো আমি এভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। তবে আমার ভেতরে একটা বিচক্ষণ কণ্ঠস্বরও ছিল– সেটি আমার দৃঢ়বিশ্বাসের জায়গা। আমি বরাবরই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী ছিলাম। কিন্তু এ বেলা এ প্রশ্নের সামনে পড়ে গিয়েছি : এই লোকগুলোর কি এই শাস্তিটিই প্রাপ্য? তাতে কী এমন লাভ হবে? দুনিয়ার কাছে এ তো কেবলই একটি ঘটনামাত্র। কিন্তু আমার কাছে এর তাৎপর্য কী? আমার ভালোবাসার মানুষটি হারিয়ে গেছে। তাকে আমার কাছ থেকে কীভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে– তাতে শেষ পর্যন্ত কী আসে-যায়? ক্যান্সারে নাকি হার্ট অ্যাটাকে? আপনি যখন কাউকে হারাবেন, তার মানে তাকে হারাবেনই। এইসব ঘটনা ট্র্যাজেডিতে একটি মাত্রা যোগ করে ঠিকই, তবে তা শুধুমাত্র বাইরের লোকদের কাছেই; কিন্তু যে মানুষটি তার সঙ্গে একান্তই ব্যক্তিগতভাবে জড়িত, তার কাছে নয়।

স্পিগেল : ১৯৬৯ সালে আপনার স্ত্রীকে খুন করা ম্যানসন গুন্ডাবাহিনী তো পুরো ১৯৬০ দশকই কোনোকিছুর তোয়াক্কা করেনি। কিন্তু এ ঘটনার পর হুট করেই সবকিছু বদলে গেল। লোকজন সন্দেহবাতিক ও প্যারানয়েড হয়ে ওঠল, আর নিজেদের দরজা-জানালা ঠিকমতো বন্ধ করতে লাগল।

পোলান্সকি : হ্যাঁ। আর ঠিক সে সময়েই চাঁদের বুকে মানুষ তার প্রথম পা ফেলেছিল! সেটিই বরং ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এটি মানব-সভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি উদাহরণ। তারপর থেকে আমরা আগের চেয়ে আরও বেশি স্মার্ট অনুভব করলাম নিজেদের; এবং তবুও খুনিরা পৃথিবীকে নাড়া দিয়ে গেল। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, এ ঘটনাটি ঘটেছিল এমন এক জায়গায়, হলিউডের পর্বতচূড়ায়– যে জায়গাটি আসলে ভীষণ শান্তিপূর্ণ ও প্রাচুর্যময় ছিল।

দুই বন্ধু : পোলান্সকি ও নিকোলসন

স্পিগেল : এ ঘটনার পর আপনি লস অ্যাঞ্জেলেস ছেড়ে, বসবাসের জন্য ইউরোপে চলে যান। যদিও চার বছর পর, ১৯৭৩ সালে আপনি হলিউডে ফিরে এসে চায়নাটাউন-এর শুটিং করেছিলেন।

পোলান্সকি : সেখানে আর কোনোদিনই ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না আমার। প্যারামাউন্ড পিকচার্সের প্রধান কর্তা– বব ইভান্স, এবং জ্যাক নিকোলসন [১৯৩৭-; আমেরিকান অভিনেতা] আমাকে রাজি করিয়েছিলেন। কিন্তু একবার যখন ফিরে গেলাম, আবারও থাকতে শুরু করে দিলাম সেখানে : পার্টি, বন্ধু-বান্ধব, নারী…। তখনকার দিনে এ ছিল একেবারেই এক গ্রহ। এখন সেই দিনগুলোর কথা যদি ভাবি, মনে হয়, যেন একটি ভিন্ন গ্রহে জীবন কাটিয়েছি আমি। সেটির মেজাজ আর লোকগুলো ছিল আলাদা। লোকজন সবকিছু গভীরভাবে উদযাপন করত; কেননা, ১৯৬০ দশকের উদ্বেগহীনতার দিন ফুরিয়ে গিয়েছিল। তারা খুশি ছিল। তাছাড়া, নিঃসন্দেহে, তখন তো এইডস ছিল না! এইডস এসে এসবের বিনাশ ঘটিয়েছে আরও পরে।

স্পিগেল : সে সময় জ্যাক নিকোলসনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় আপনার।

পোলান্সকি : চায়নাটাউন-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তবে এর আগে থেকেই আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। আমার গ্যস্টাডের [সুইজারল্যান্ড] বাড়িতে তিনি প্রায়ই আসতেন। আমি তাকে স্কি করতে শিখিয়েছি।

স্পিগেল : আপনার জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া পরবর্তী ঘটনাটি তো নিকোলসনের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতেই ঘটেছিল?

পোলান্সকি : হুম।

স্পিগেল : সামান্থা গেইমার [১৯৬৩-; আমেরিকান লেখক] তার আত্মজীবনীতে অভিযোগ করেছেন, নিকোলসনের বাড়িতে আপনি যখন তাকে যৌন নিগ্রহ করেন, তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। তার আত্মজীবনীর বেশিরভাগ অংশই আপনাকে নিয়ে লেখা।

পোলান্সকি : আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যদ্দূর আমার মনে পড়ে, ঘটনাটি এ রকম ছিল না।

স্পিগেল : আপনি বইটি পড়েছেন?

পোলান্সকি : না। তবে বইটির কথা নিশ্চয়ই জানি।

স্পিগেল : এসব ঘটনার কথা লিখতে গিয়ে, আপনার প্রতি ভীষণ মমত্বের ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি।

পোলান্সকি : তাই নাকি?

সামান্থা গেইমারের বয়স তখন ১৩ । ছবি তুলেছেন পোলান্সকি

স্পিগেল : গেইমারের সঙ্গে সম্প্রতি আমাদের দেখা হয়েছে। আপনার প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। আপনি নিশ্চয়ই তা জানেন?

পোলান্সকি : হ্যাঁ; আমি তা জানি। আমি শুধু এ কথাই বলতে পারি, এতগুলো বছর ধরে তার ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে এবং মিডিয়াগুলো তাকে যেভাবে টানা-হ্যাঁচড়া করেছে– সে জন্য আমি সত্যিকার অর্থেই দুঃখিত। সবকিছু ফাঁস হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত, তার নামটি গোপন রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা আমি সবসময়ই করেছি। আমি মনে করি না, এ ব্যাপারে আমার কাছ থেকে আর কিছু শুনতে পাবেন আপনারা। ফ্রান্সে তার বইটি এলে আমি অবশ্যই পড়ব।

স্পিগেল : ২০০৯ সালে আপনি গেইমারের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন, এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছেন তার কাছে।

পোলান্সকি : এর কারণ, তাকে আমি টিভিতে দেখেছিলাম। তাকে অবশেষে দেখতে পাওয়া আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

স্পিগেল : ঘটনাটির জন্য এই ৩২ বছর পরে এসে ক্ষমা না চেয়ে, তক্ষুনি কি চাইতে পারতেন না?

পোলান্সকি : এর কোনো কারণ ছিল না তখন।

স্পিগেল : ছিল না?

পোলান্সকি : আমরা সবাই স্রেফ এটি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এ নিয়ে আমি আর কথা বলব না!

স্পিগেল : আপনার তো নিজেরই এখন ২০ বছর বয়সী এক কন্যা আছে; ফলে ১৩ বছর বয়সী কোনো মেয়েকে নিগ্রহ করার বিষয়টি আপনি নিশ্চয়ই এখন ভিন্নভাবে দেখেন?

পোলান্সকি : দেখুন, আমার নিজের কন্যার জন্ম হয়েছে সেই ঘটনার বহু বছর পরে। এর মাঝখানে সময় কেটে গেছে ৩৫ বছরেরও বেশি। আপনি কি মনে করেন, এতকাল ধরে আমাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে? আর আপনি যদি আমার পরীক্ষার পরিদর্শক হোন, তাহলে কি বলবেন, সব ঠিক আছে এখন?

স্পিগেল : কেউ হয়তো এমনটাই বলবে!

পোলান্সকি : এই হলো আপনার উত্তর!


সূত্র • স্পিগেল। ম্যাগাজিন, জার্মানি। ১২ নভেম্বর ২০১৩

পরবর্তী কিস্তি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]