গোদারের সঙ্গে ক্যামেরার দিনগুলো/ রাউল কুতার

1
459

মূল  রাউল কুতার অনুবাদ • আশিকুর রহমান তানিম


রাউল কুতার [১৬ সেপ্টেম্বর ১৯২৪-৮ নভেম্বর ২০১৬]। ফরাসি সদ্যপ্রয়াত মাস্টার সিনেমাটোগ্রাফার। কিংবদন্তি ফিল্ম-মুভমেন্ট– ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’-এর অধিকাংশ মহাগুরুত্বপূর্ণ ফিল্মেরই ক্যামেরাঅলা। বিশেষত জ্যঁ-লুক গোদার [৩ ডিসেম্বর ১৯৩০-] নির্মিত নিউ ওয়েভ সিনেমাগুলোতে ক্যামেরার জাদু দেখিয়েছেন কুতার। চলুন, জানা যাক গোদার সম্পর্কে তার পাঠ…

গোদার সিনেমা বানানোর আগে, চিত্রগ্রাহকেরা সাধারণত অবিশ্বাস্যরকমের লম্বা সময় চাইতেন কোনো শটের লাইট সেটাআপের জন্য। একজন চিত্রগ্রাহক একটা স্ট্রেটফরোয়ার্ড হরিজন্টাল প্যানের প্রস্তুতির জন্য অন্তত দুই ঘণ্টা ব্যয় করার সময় চাইতেন ফিল্মমেকারের কাছে। তিনি হয়তো আরও পাঁচ বা ছয়গুণ তাড়াতাড়ি কাজটা শেষ করে ফেলতে পারতেন চাইলেই, কিন্তু নিজের প্রতি এই আপ্তবাক্য আউড়াতেন– আমি যত কম সময় চাইব, আমার অস্তিত্ব হবে ততই ক্ষুদ্র। ফলতঃ এমনকি ক্যামেরাম্যানের অজান্তেই, চিত্রগ্রহণের কাজটা তাই হয়ে পড়েছিল খুব বিশালায়তনের এক কাজ। চিত্রগ্রাহক কিছু ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল কিংবা অভিনেতাদের চলাচলের দৃশ্যধারণ করতেন কেবলমাত্র নিজের সন্তুষ্টি কিংবা অস্তিত্বের নিদর্শনস্বরূপ। চলচ্চিত্র তাই এমন কিছু ব্যাপারের সমষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছিল– সিনেমার সাথে যেসব ব্যাপারের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেগুলো ছিল এক সমষ্টিগত সার্কাসের ফসল, যেখানে প্রত্যেকেই তার নিজের কসরত জাহির করতে চাইতেন!

গোদার চিত্রগ্রাহককে কখনোই বলতেন না যে, ‘আপনি চিত্রগ্রহণ এইভাবে করবেন কিংবা ঐভাবে করবেন, এই অ্যাঙ্গেলে করবেন, আলোর বিপরীতে করবেন ইত্যাদি’; বরং গোদার তাকে যা বলতেন, তা হলো, ‘আমি শুধু আপনার কাছে একটি জিনিসই চাই। আপনাকে অবশ্যই নতুন করে আবিষ্কার করা লাগবে– কীভাবে কোনোকিছু সহজভাবেই করে ফেলা যায়।’ মানুষজন তাই গোদার এবং বাকিদের প্রতি মুগ্ধ বনে গিয়েছিল; কেননা, তাদের কাছে সিনেমার প্রধানতম বিষয় চলচ্চিত্র বা চলমান ছবি, কেবলই ছবি।

এখন এটা একদমই ধ্রুব যে, যখন থেকে চিত্রগ্রাহকরা আকর্ষণীয় হওয়ার পথ ছেড়ে সিমপ্লিসিটি কিংবা সহজ ও সরলতর রাস্তায় ফিরে যেতে সম্মত হলেন, চলচ্চিত্রের ছবির সাধারণ স্টাইল বদলে যেতে যাওয়া শুরু করে দিলো। কারণ, চিত্রগ্রাহকদের কসরতবাজির কারণে চলচ্চিত্রের দৃশ্য খুব অসংযত হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।

ব্রিথলেস-এর শুটিংয়ে গোদার ও কুতার

এই সম্বন্ধে আমার একটা পরিস্কার ধারণা হয়েছিল, অহুই দো ক্লিশিতে [রাস্তা] অবস্থিত ‘ফ্রেঞ্চ সোসাইটি অব ফটোগ্রাফার্স’-এ গিয়ে। চলচ্চিত্রে কাজ করার আগে আমি সেখানকার একজন ফটোগ্রাফার ছিলাম। ঐ সময় ছাত্ররা শুধু ফটোগ্রাফির দুটো স্টাইলই অনুসরণ করত। রাস্তার দৃশ্য, জানালার পাশে তাদের স্ত্রী বসে আছে– এ রকম অপ্রস্তুত প্রকাশ, যেগুলো ইন্সট্রাক্টররা ভাবত অনাকর্ষণীয়রকম মাতাল। আরেকরকমের ছবি ছিল, যেগুলো ছিল মেকি এবং জবড়জং, যেগুলো দেখে কেউ সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন– ছবির সাবজেক্টগুলো ঠিক রিয়েল লাইফের নয়, আলোকসজ্জায় রঙচঙে করে এদের উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা ছিল ‘হারকোর্ট স্টাইল’; আর স্কুলের ইন্সট্রাক্টররা, যারা এ রকম ফটোগ্রাফির সাথে খুব বেশি জড়িত ছিলেন, তারা খুব সিরিয়াস হয়েই এবং কোনোরকম অশ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে নয়, এগুলোকে বলতেন, ‘সিনেমা লাইটিং’। এমনই ছিল এইসব, যে কেউ বলতে পারতেন– সব চলচ্চিত্রই ছিল এ রকম মাতাল ধরনের।

কিন্তু সেসব ছবিই দৃষ্টি আকর্ষণ করত, যেগুলোর দিকে একটা দীর্ঘ সময় ধরে তাকিয়ে থাকা যেত আবেগ কিংবা আকর্ষণ নিয়ে; কেবলমাত্র কার্তিয়্যে-ব্রেসোঁর [অঁরি কার্তিয়্যে-ব্রেসোঁ : ফরাসি মাস্টার ফটোগ্রাফার; ১৯০৮-২০০৪] ফটোগ্রাফিগুলোই নয়, পেতি [পিয়েরে পেতি : ফরাসি ফটোগ্রাফার; ১৮৩২-১৯০৯] ও নাদা’র [নাদা : ফরাসি ফটোগ্রাফার; ১৮২০-১৯১০] তোলা পুরনো ধাঁচের পোর্ট্রেটগুলোর দিকেও। তারা ছবিগুলো একটা স্টুডিওতে তুলতেন বিশাল এক জানালা দিয়ে আসা আলোর ব্যবহার করে, সত্যিকারের দিনের সুন্দর ঝলমলে আলো দিয়ে। আর, একজন চলচ্চিত্রগ্রাহকের কখনোই ভোলা উচিত না– দর্শকের চোখ পুরোপুরিভাবে টিউন করা থাকে একমাত্র দিবালোকের সাথেই। দিনের আলোর একতা অপরিসীম ক্ষমতা আছে পারফেক্ট হওয়ার, সেটা দিনের যে সময়ই হোক না কেন। দিনের আলোতেই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হয়ে ওঠে পরিপার্শ্বের কিংবা মানুষের চেহারা। এবং প্রত্যেক মানুষই দিনের আলোর সাথেই অভ্যস্ত সবচেয়ে বেশি!

মনুষ্য চোখ একটি কক্ষের গভীরতা অন্তর্ভেদ করে মুহূর্তেই জানালার উপর দৃষ্টিপাত করতে পারে, এই অন্তর্ভেদে তার কোনো সমস্যা না হলেও ক্যামেরা ঠিকই সমস্যার সম্মুখীন হয়; অর্থাৎ, ফিল্ম-স্টক সমস্যায় পড়ে। প্রাকৃতিক আলোর সৌন্দর্য পর্দায় ধরার জন্য যেসব মুহূর্তই আনা কারিনা ও বেলমদোঁ [জ্যঁ-পল বেলমদোঁ : ফরাসি অভিনেতা; ১৯৩৩-] পিয়েরো লা ফু সিনেমায় রুমের ভেতর সৃষ্টি করেছিলেন– এসব ছিল চিত্রগ্রাহকের কাজ। এই ব্যাপারটাই গোদার চাইতেন, যখন তিনি বলতেন, ‘মঁশিয়ে, আমরা সহজ-সরল হতে চাইছি’।

পিয়েরো লা ফু’র শুটিংয়ে আনা কারিনা, গোদার ও কুতার

গোদার নিজে অবশ্য প্রকৃত অর্থে সহজ-সরল ছিলেন না। আমি তাকে সিম্পল বলতে চাই না। আমি আগে থেকে কখনোই বুঝতাম না– তিনি কি চাইতেন; আর এই ব্যাপারটিই সবকিছুকে জটিলতর করে তুলত। আর তিনি একইসাথে অনেককিছু চাইতেন। তিনি আলো ছাড়া শুট করতে চাইতেন; তিনি ভাবতেন এমন একটা শটের কথা, যেটা তিনি ফ্রিৎস্ লাংয়ের কোনো ছবিতে দেখেছেন ছয় মাস আগে, আর রেনোয়ার [জ্যঁ রেনোয়া : ফরাসি মাস্টার ফিল্মমেকার; ১৮৯৪-১৯৭৯] ছবি থেকে খুঁজে নিতেন শটের বাকি অংশ…। তিনি নিজেও নিশ্চিত থাকতেন না, কোনটা চাইছেন; এবং তিনি সেটা ব্যাখ্যাও করতে পারতেন না; কিন্তু সত্যি বলতে এই হীনম্মন্যতাটুকু একদমই খারাপ ছিল না।

আমাকে এসব বলার পর, তিনি সেট থেকে আমি-সহ সবাইকে বের করে দিতেন। এরপর তিনি নিজে চিন্তা করতে বসতেন– কীভাবে কাজটি করতে চান। আমি ফেরত আসার পর আবিষ্কার করতাম, শটটির ধারণা আর আগের মতন নেই। তা যাই হোক, সেই উজ্জ্বল সাদাটে আলো– যেটা গ্রিফিথের [ডি.ডব্লিউ. গ্রিফিথ : আমেরিকান মাস্টার ফিল্মমেকার; ১৮৭৫-১৯৪৮] কোনো সিনেমার একটি ছোট [দুঃখের ব্যাপার যে, খুবই ছোট] দৃশ্যে টেবিলের এক প্রান্তে জ্বলছিল, সেই আলোটা গোদার পছন্দ করতেন, এবং তিনি প্রায়ই ভাবতেন, হয়তো সিনেমাটির ফিল্ম ডেভেলপ করার পর সেই একই সাদা আলো তিনি পাননি– যেটা চিত্রায়ণ করা হয়েছিল। এ রকম অনেক ভাবনাই কাজ করত গোদারের মনে। না, তিনি মোটেও সহজ-সরল ছিলেন না।

আমি মনে করতে পারি সেই দুর্লভ মুহূর্তগুলো, যখন আমরা স্টুডিওতে কাজ করেছি। একটা ছিলো অভ্যন্তরীণ একটা সিক্যুয়েন্সের জন্য, বেশ কিছু লম্বা শট নিয়ে তৈরি হয়েছিল অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান সিনেমার জন্য। ক্যামেরার নড়াচড়া এতটাই অদ্ভুতুড়ে আর জটিল ঠেকছিল যে, গোদার স্টুডিও শুটিং থেকে অব্যহতি নিয়ে নেন!

ওয়েল, স্টুডিওর আসলে দরকারটা কী? এটা কীভাবে কাজকে সহজতর করে? স্টুডিওর ভেতর, ধরুন, একজনের পেছনে একটা দেয়াল তুলে ক্যামেরায় ধারনের জন্য একটা কক্ষ বানানো যায় আরও কয়েকটি বাতির সাহায্যে। আমি সেটাই করতে চেয়েছিলাম। গোদার আমাকে বলেছিলেন, ‘না, আমাদের অবশ্যই দেয়াল তোলা উচিত না। যখন কোনো স্বামী দেখবে যে তার স্ত্রী পুড়ে ফেলা এক জয়েন্ট নিয়ে আসছে, সে তো দূর থেকে পারবে না একটা দেয়াল তুলে ফেলতে। তার বসে থাকতে হবে চেয়ারে এবং সেখান থেকেই দেখতে হবে।’

স্টুডিওর আরেকটা সুবিধা হচ্ছে, বেশ জটিল কোনো দৃশ্যের জন্য, যে রকমটা ছিল অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান-এ, সেট বিল্ডার এমনভাবে সেট তৈরি করতে পারতেন– ক্যামেরার বেশি কিংবা কম নড়াচড়া খুব একটা অসুবিধার সৃষ্টি করত না এখানে। আমি গোদারকে বলেছিলাম, ‘সেটটা বদলে ফেলো; ঐ খুঁটি দুটির একটিকে আরেকটি থেকে দূরে সরিয়ে দাও। আমি এর মাঝখান দিয়ে ক্যামেরা ইন করতে পারছি না।’ তার উত্তর ছিল এ রকম, ‘একটা অল্পবয়েসী দম্পতি পোর্তে সাঁ দানিসের কাছের কোনো ফ্ল্যাটে মোটেও এত জায়গা নিয়ে থাকে না। আমি কমবয়েসী কাপলদের কথাই বলছি। তোমাকে এর মাঝেই ম্যানেজ করে নিতে হবে।’

দৃশ্য । অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান

স্টুডিও শুটিংয়ের ক্ষেত্রে আমার তৃতীয় ও দরকারি যুক্তি ছিল, ছাদের ক্যাটওয়াকগুলো– যেগুলো লাইটকে সংযুক্ত করে রাখত। আমরা অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান কালার ফিল্মে শুট করছিলাম, এবং অবশ্যই কালার ফিল্মের স্টক ঐ সময়ে খুবই ধীরগতির ছিল; তাই আমাদের অন্তত কিছু আলোর দরকার ছিল, যেন দেখা যায় অন্তত। তাই আমি আলোকজ্জ্বল করেছিলাম দৃশ্যটি : সেটের উপরে যেই বাতিগুলো ঝুলছিল, ওগুলোর সাহায্যে যেখানে আনা কারিনা আর জ্যঁ-ক্লুদ ব্রিয়েলি [ফরাসি অ্যাকটর-ডিরেক্টর; ১৯৩৩-২০০৭] বিছানায় যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। গোদার আমাকে সেট থেকে বের করে দিলেন, এটা নিয়ে ভাবলেন এবং আবার আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমাকে হাজারটা নতুন জিনিসের কথা বলতে লাগলেন, হরবড় করে বলতে থাকা কথার ফাঁকে অন্তত ২০টি চলচ্চিত্রের কথা শোনালেন– যেগুলো আমি দেখিইনি। আমি কিছু জিনিস সোজাসাপ্টাভাবে সামলিয়ে আবার শুরু করলাম। এর কয়েক সেকেন্ড পর, গোদার সব থামিয়ে দিলেন। অভিনেত্রী আনাকে বললেন, ‘তোমার সমস্যাটা কী, বলো তো? তুমি কি বাসায়ও বিছানায় এভাবেই যাও?’

তিনি নিজেকে আনার জায়গায় নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘আমরা পুরোদস্তুর পাগল। আমরা একটা দৃশ্য ধারণ করতে চাইছি যেখানে আনা বিছানায় যাবে, অথচ এখানে কোনো ছাদই নেই। আনা কখনোই এমন কোনো রুমে ঘুমায়নি– যেখানে ছাদ ছিল না।’ সেটে কোনো ছাদ বানানো বেশ ব্যয়বহুল। প্রযোজক তখন গোদারের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমরা কি ছবিতে এই ছাদের কিছু দেখতে পাবো? এটা ছাড়াই কাজ চালানো যায় না?’ জবাবে গোদার বললেন, ‘না, আমরা এটা দেখতে পাবো না। কিন্তু ছাদটা যদি না থাকে, আনা দৃশ্যটা করতে পারবে না। আমাদের অবশ্যই ছাদ লাগবে।’

সুতরাং, আমরা একটা ছাদ বানালাম। আমার কাছে আর কোনো গ্যান্ট্রি ছিল না রুমটাকে আলোকিত করার জন্য; আমরা দেয়ালগুলোও নড়াতে পারছিলাম না, সেটটা ছিল একদম ফিক্সড, আমাদের তাই কোনোরকম আলোই ছিল না। মোদ্দাকথা, স্টুডিওর যতরকম সুবিধা আছে, সবই উধাও হয়ে গেল। শেষমেশ আমাদের তাই সত্যিকারের রুমেই যেতে হলো, সকল সমস্যা মাথায় নিয়েও। এটাই ছিল শেষবার, যখন আমরা স্টুডিওর ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম; কারণ, সত্যিকারের রুমেই [বাস্তব লোকেশনেই] গোদারের মতো একজন ফিল্মমেকার মুক্তভাবে কাজ করতে পারেন।

দৃশ্য । পিয়েরো লা ফু

২.

গোদার আরও বেশি খুঁতখুঁতে ছিলেন ফিল্ম-স্টক এবং ল্যাবের বিষয়-আশয় নিয়ে। আমি এখানে টেকনিক্যাল হবোই; আমার হাতে আর কোনো সুযোগ নেই। ফিল্ম-স্টক আর ল্যাবরেটরি যে কোনো ছবির ৮০ শতাংশই– এর চাতুর্য কিংবা অবর্ণনীয়তা, এর প্রভাব কিংবা ওজনহীনতা, এর দৃঢ়তা কিংবা আবেগ সব। কিন্তু এগুলো তো আর দর্শক চিন্তা করে না!

মানুষজন প্রায়ই আমাকে বলেন, ‘লোলা[Lola; জ্যাক দুমি; ১৯৬১] দৃশ্যধারণ খুব দুর্দান্ত হয়েছে। এর কারণ কী আপনার মুড?’ তারা জিজ্ঞেস করে, ‘নাকি দুমি [ফরাসি নিউ ওয়েভ ফিল্মমেকার; ১৯৩১-১৯৯০]? নাকি নান্তের লাইটিংয়ের জন্য?  নাকি আন্যুক এইমির [ফরাসি অভিনেত্রী; ১৯৩২-] লুকের জন্য?’ হয়তো এর সবগুলোই এটির কারণ; কিন্তু প্রথমত এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো, লোলার ফিল্ম-স্টক ছিলো ‘গিভায়ের্ট ৩৬’– যেটা কোম্পানি এখন আর বানায় না। তাই আমি চাইলেও সেইসব অসম্পৃক্ত কালো, অকল্পনীয় সাদা, সত্যিকার ও কাল্পনিক ছবির মিশেলগুলো নতুন করে ধারণ করতে পারব না– যেগুলো আমার মতে লোলার গীতিকাব্যময়তার ৭০ শতাংশ কারণ ছিল।

গোদার এটা জানতেন। যখন ফিল্ম-স্টকের প্রশ্ন আসতো, তিনি কোনো দ্বিধাবোধ করতেন না। ঐ প্রথমবার ব্রিথলেস-এ তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আর কোনো কৃত্তিমতা নয়, আমরা সত্যিকারের লাইটেই শুটিং করব। তুমি তো একজন ফটোগ্রাফার। তুমি কোন স্টক প্রিফার করো?’ আমি তাকে বললাম, আমি ইলফোর্ডের এইচপিএস দিয়ে কাজ করে মজা পেয়েছিলাম। গোদার এরপর আমাকে ঐ স্টকে ছবি তুলতে দেন। এরপর অন্যান্য স্টকের সাথে তুলনা করলেন, আর কয়েকবার পরীক্ষা করলেন। শেষমেশ বললেন, ‘এই স্টকটাই আমি চাই’।

দৃশ্য । ব্রিথলেস

আমরা ইংল্যান্ডের ইলফোর্ড কোম্পানির কাছে গেলাম; কিন্তু তারা দুঃখ প্রকাশ করে জানাল, তাদের এইচপিএস স্টক মোশন পিকচারের জন্য নয়, শুধুমাত্র স্টিল ফটোগ্রাফি বা স্থিরচিত্রের জন্যই। আমরা হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম; কিন্তু গোদার তো তেমন পাত্র নন। স্টিল ক্যামেরার রিলের জন্য ইলফোর্ড যে স্টক বানাত, তা ছিল সাড়ে সতের মিটারের রিল। সিনেমার ক্যামেরার জন্য দৈর্ঘ্যটা আরও বেশি হওয়া লাগত। কিন্তু গোদার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এই স্টকই ব্যবহার করবেন; মোশন পিকচারের জন্য এ রকম রিল একটার পর একটা জুড়ে দিয়ে, এবং স্প্রোকেট হোলগুলো লেইকার মতো সবচেয়ে বেশি সুসংগত ছিল যে ক্যামেরায়, সেই ‘ক্যামফ্লেক্স’ই ব্যবহার করবেন। এর সঙ্গে জড়িত পেশাদাররা এসব শুনে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন!

কিন্তু এতেই শেষ নয়। একজন ফটো ডেভেলপার এইচপিএস স্টকে ফেনাইডোন কেমিক্যালটি ব্যবহার করে ভালো ফলাফল পেয়েছিলেন। গোদার আর রসায়নবিদ দুব্যোর সঙ্গে জিটিসি ল্যাবে কয়েকটা ধারাবাহিক পরীক্ষা করেছিলাম আমরা। ইমালশনের গতি ডাবল করে দিয়েছিলাম; আর তাতে ফলও পেয়েছিলাম ভালো। গোদার ল্যাবকে বলেছিলেন, ফিল্ম ডেভেলপের সময় ফেনাইডোন বাথ ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু ল্যাবরেটরি তাতে অপারগতা জানায়। যদি সবকিছু একই ডেভেলপিং প্রসেস দিয়ে যেত এবং সব যন্ত্র স্ট্যান্ডার্ড কোডাক প্র্যাকটিস অনুযায়ী কাজ করত, তাহলে জিটিসি এবং এলটিসির ম্যাশিনগুলো প্রতিঘণ্টায় ৩০০০ মিটার ফিল্মস্টক ডেভেলপ করতে পারত। ল্যাবরেটরি শুধু জ্যঁ-লুক গোদারের জন্য আলাদা করে একটি ম্যাশিন দিয়ে নিশ্চয়ই ফিল্ম ডেভেলপ করবে না; কারণ তিনি একদিনে তো আর ১০০০ মিটারের বেশি ডেভেলপ করতেন না।

ব্রিথলেস-এ আমরা অবশ্য কিছুটা সৌভাগ্যের ছোঁয়া পেয়েছিলাম। জিটিসি ল্যাবরেটরির কোণে পড়ে থাকা একটি বাড়তি ম্যাশিন অনেকটা অচলাবস্থায়ই ছিল শুধুমাত্র পরীক্ষা নীরিক্ষার জন্য। তারা আমাদের এই ম্যাশিনটি ধার দেয় যেন আমরা আমাদের জোড়াতালি দেওয়া ইলফোর্ড স্টক নিজেদের ইচ্ছেমতো ডেভেলপ করতে পারি। একটা জিনিস অনুধাবন করা জরুরি, ব্রিথলেস-এর আকাশচুম্বী সাফল্য আর সিনেমা জগতের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হওয়ার পেছনে রয়েছে গোদারের কল্পনাশক্তি আর বিশেষত [যেটা আমার মতে সিনেমার প্রধান বৈশিষ্ট্য] নিজের ভেতর জীবনধারণ করাটা। কিন্তু, সবার জ্ঞানের বহর উপেক্ষা করে সাড়ে সতেরো মিটার ফিল্ম জুড়ে দেওয়া আর অভাবনীয়ভাবে জিটিসি ল্যাবের ম্যাশিন ব্যবহারের অধিকার পাওয়াটাও একটা বিশাল ব্যাপার ছিল।

পোস্টার । অ্যা লিটল সোলজার

এরপর আমরা ম্যাশিনটা আরেকবার ব্যবহারের সুযোগ পাই দ্য লিটল সোলজার-এ। আমরা আবার যখন বসন্তের ফুলের মতো হাজির হই জিটিসির দোরগোড়ায় দ্য ক্যারাবিনার্স-এর জন্য ম্যাশিনটা চাইতে, সেটা ততদিনে সেখানে আর ছিল না। তবে দ্য ক্যারাবিনার্স ছিল অন্যরকম এক সিনেমা। গোদার বলেছিলেন, ‘সব দৃশ্য আমার মাথায় রয়েছে। আমি জানি, কীভাবে যুদ্ধ চিত্রায়ণ করব; কিন্তু সেটা ডেভেলপ করার জন্য আমার চাই একটা ভালো ডেভেলপিং বাথ। যুদ্ধের সিনেমা নিয়ে এত অসন্তোষজনক কাজ কেন? এগুলো অসন্তোষজনক কেননা ডেভেলপিং গ্রেগুলো খুবই নরম। দ্য ক্যারাবিনার্স-এর জন্য আমি চাই ফিল্মকে এ রকমভাবে প্রসেস করতে, যেন সত্যিকারের সাদা আর সত্যিকারের কালো রঙটি পাওয়া যায়। এরমধ্যে এখানে-সেখানে গ্রে বড়জোর তিন-চার ফোটার বেশি যেন খুঁজে পাওয়া না যায়। তা-না-হলে, আমরা আমাদের সময় নষ্ট করব শুধুশুধু; যুদ্ধের দৃশ্য ধারণ করতে পারব না।’ এইবেলা গোদার যেভাবেই হোক ল্যাবরেটরিকে পেরেছিলেন তাদের নিজেদের প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটাতে। আমরা অনুমতি পেয়েছিলাম বিশেষ প্রসেসিং প্রক্রিয়া এবং বিশেষ ডেভেলপিং সিডিউল ব্যবহার করার। আর গোদার তার চারটি শক্তিশালী গ্রে রঙও পেয়েছিলেন। কিন্তু, এটা ছিল ব্যতিক্রম।

পিয়েরো লা ফু ছিল রঙিন। চিত্রগ্রাহকদের ক্ষেত্রে রঙ নিয়ে দুশ্চিন্তা আস্তে আস্তে কমে আসছিল; কারণ, প্রত্যেক বছরেই স্টক আরও নমনীয় হয়ে উঠছিল। কিন্তু, আগের মতোই যখনই কোনো চিত্রগ্রাহক রঙিন ছবিতে কাজ করেন, তখন সচেতন থাকেন এই ব্যাপারে– মনুষ্য চোখের মতো ক্যামেরা এত সংবেদনশীল নয়। সমস্যাটা হয় তখনই, যখন অনেক রকম টেকনিক আর কাজের ধরন আবিষ্কার হয়েছিল প্রথমদিককার রঙিন স্টক নিয়ে কাজ করার জন্য : যেমন, টেকনিকালার– যেটা খুব একটা নমনীয় ছিল না। অথচ মানুষজন সেখানেই আটকে গেছে!

দৃশ্য । দ্য ক্যারাবিনার্স

এখানে আমি শুধু মেকআপের কথাই বলছি। মেকআপ রঙিন চলচ্চিত্রের জন্য অপরিহার্য জিনিস, সহজেই বোঝা যায়। যেহেতু ফিল্মস্টক নমনীয় নয়, ল্যাবরেটরিগুলোর এমন কোনো ফিক্সড পয়েন্ট ব্যবহার করার দরকার হয়েছিল, যেখানে সত্যিকারের রঙ আবার বসানো যাবে এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চেহারাতেই এগুলো কাজ করবে।

সব মেকআপম্যানই ছিলেন আমেরিকান টেকনিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত– যারা মান্ধাতার আমলের টেকনিকালার মেথড শিখেছিলেন। তারা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খুব উজ্জ্বল লালে রাঙিয়ে দিতেন– যেটা টেকনিকালারের বেশ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যখন ল্যাবরেটরি এই রেড কারেকশন করতে চাইল, হয়তো কিছুটা নীল যোগ করার দরকার পড়ল তখন, আর গোদার টের পেলেন, নিজের অন্যতম প্যাশন সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করা তার জন্য এ যেন সব চুরমার হওয়ার শামিল।

এই লালচে মেকআপ একটি বেহুদা অভ্যাস! শৌখিন ফটোগ্রাফারেরা জানেন, তারা অসাধারণ ফলাফল পাবেব– যদি তাদের স্ত্রী ও বাচ্চাকাচ্চাদের কোডাক্রোমে রেখে কোনো মেকআপ ছাড়া ছবি তোলেন। অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান-এ গোদার নিউট্রাল মেকআপের জন্য আবদার করলেন– যা ছিল খুব হাল্কা ও স্বচ্ছ। যদি এমন কোনো মুহূর্ত আসত, যেখানে আমাদের একটু রঙ যোগ করে কারেকশন করার প্রয়োজনবোধ হতো, আমরা তার উপর একটা পরিস্কার গ্রে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতাম। আমরা সেটা চেষ্টা করেছিলাম এবং সফল হয়েছিলাম। ফল প্রায় একই থাকত। যাইহোক, ল্যাবরেটরিয়ানদের যেমন নিজেদের অভ্যাস ছিল, মেকআপম্যানদেরও ঠিক একইরকমের অভ্যস্ততা ছিল; আর এই অভ্যস্ততা থেকে বের করে এনে প্রাকৃতিক মেকআপ পাওয়াটা রীতিমতো যুদ্ধের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। গোদারকে তাই তাদের উদ্দেশ্যেও বলতে হতো, ‘জেন্টেলম্যান, কিপ ইট সিম্পল!’


প্রথম প্রকাশ • লু নুভ্যে অবসার্ভেতা। ম্যাগাজিন, ফ্রান্স। ১৯৬৫
সূত্র [ফ্রেঞ্চ থেকে ইংরেজি অনুবাদ] • সাইট অ্যান্ড সাউন্ড। ফিল্ম ম্যাগাজিন, যুক্তরাজ্য। ৯ নভেম্বর ২০১৬

  ফিল্মমেকার গোদার-সিনেমাটোগ্রাফার কুতার । ফিল্মোগ্রাফি  

১৯৬০ • ব্রিথলেস [À bout de souffle]
১৯৬১ • অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান [Une femme est une femme] 
১৯৬২ • মাই লাইফ টু লিভ [Vivre sa vie]
১৯৬৩ • দ্য লিটল সোলজার [Le petit soldat]
১৯৬৩ • দ্য ক্যারাবিনার্স [Les Carabiniers]
১৯৬৩ • কনটেম্পট [Le mépris]
১৯৬৪ • ব্যান্ড অব আউটসাইডারস [Bande à part]
১৯৬৪ • দ্য ওয়ার্ল্ড'স মোস্ট বিউটিফুল সিন্ডলারস [Les plus belles escroqueries du monde]*
১৯৬৪ • অ্যা ম্যারিড ওম্যান [Une Femme Mariée]
১৯৬৫ • আলফাভিলা [Alphaville, une étrange aventure de Lemmy Caution]
১৯৬৫ • পিয়েরো লা ফু [Pierrot le fou]
১৯৬৬ • মেইড ইন ইউএসএ [Made in U.S.A.]
১৯৬৭ • টু অর থ্রি থিংস আই নো অ্যাবাউট হার [Deux ou Trois choses que je sais d'elle]
১৯৬৭ • লা শিন্যোয়াজ [La chinoise]
১৯৬৭ • উইকেন্ড [Week-end]
১৯৮২ • প্যাশন [Passion]
১৯৮৩ • ফার্স্ট নেম : কারমেন [Prénom Carmen]

* এপিসোডিক ফিল্ম
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনে-প্রেমী; শিক্ষার্থী। ঢাকা, বাংলাদেশ

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন