মৌনা রাগাম, একজন রেবতী এবং একটি সংবেদী নারী চরিত্র

1
215

ভূমিকা ও অনুবাদ আরিফ মাহমুদ


ভূমিকা

শুরুতে ছবিটি লিখা হয়েছিল একটি ছোটগল্প হিসেবে । তখন তিনি তার প্রথম ছবি পাল্লাবি আনু পাল্লাবি [১৯৮৩] শুটিং নিয়ে ব্যস্ত। ছবির ভাবনা ছিল এমন– আমাদের সমাজে আমরা মেয়েদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে রেখে বড় করি। আমাদের করে দেওয়া পূর্বনির্ধারিত গণ্ডিতে বেড়ে ওঠে মেয়েটির প্রতিটি পদক্ষেপ : কীভাবে পোশাক পরবে, কীভাবে ছেলেদের সাথে কথা বলবে; তারপর একদিন একজন অপরিচিত পুরুষের সাথে বিয়ে করতে বাধ্য করি এবং তার সাথে সংসার করতে পাঠিয়ে দেই। আমরা মেয়েদের শিক্ষিত করে তুলি, দুনিয়ার সাথে তাল মিলাতে বলি, আবার এমন উদ্ভট পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিবে– এও আশা করি! বিয়ের রাতে একটি অপরিচিত পুরুষ যখন মেয়েটির হাত স্পর্শ করে, তখন সে কেমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়– তখন পর্যন্ত দিব্যা শিরোনামে গল্পটির ভাবনা ছিল এতটুকুই।

তখনো মণি রত্নম গল্পটা নিয়ে ফিচার করার কথা ভাবেননি। গল্পের একটা পর্যায়ে এসে তার মনে হলো, এটি নিয়ে চাইলে তো পুরো ছবি করা যায়। যেই চিন্তা সেই কাজ। পাশাপাশি পাল্লাবি আনু পাল্লাবি শুটিং শিডিউলে পেয়ে গেলেন এক মাসের ছুটি। হাতে ছিল না তেমন কোনো বাড়তি কাজ । বসে পড়লেন দিব্যার স্ক্রিপ্ট নিয়ে ।

এবার দিব্যা চরিত্রে আসি । সদ্য বিশে পা দেওয়া সংবেদনশীল এক মেয়ে, যে নিজের আদর্শ, মতামত তার রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত মা-বাবাকে জানাতে পারছে না, আবার তাদের সাথেই জুড়ে থাকতে চাইছে। যেন নিজের ঘরেই সে বেমানান। তার কাছের মানুষগুলো হয়তো তার চারপাশে আছে, তবু কেউ যেন কাছে নেই। যেন দিব্যার চঞ্চলতার মধ্যে কোথাও কোনো কষ্ট চাপা পড়ে আছে । দিনভর আনন্দে আমোদে মেতে থাকা দিব্যার মনের গভীরতাকে তাই আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না । অনিচ্ছাসত্ত্বেও পরিবারের পছন্দ করা পাত্রকেই তার বিয়ে করতে হয় । একদিকে তার আঁকড়ে ধরা অতীত, অন্যদিকে বর্তমানকে গ্রহণ করতে না পারা– এই দুইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব যে মৌনতায় আবৃত, সেই মৌনতার সুর মণি রত্নম আমাদের এই ছবি দিয়ে শুনিয়ে গেছেন

মৌনা রাগাম
মৌনা রাগাম

এ ছবির কিছু দৃশ্য নির্মাণে মণি রত্নম কতটা পূর্বপ্রস্তুতিসম্পন্ন ছিলেন, তার নমুনা দিতে গেলে যেতে হবে ছবিতে মনোহরের [কার্তিক অভিনীত] প্রথম উপস্থিতি দৃশ্যে । দৃশ্যতে দেখা যায়, মনোহর দলবল নিয়ে একটা মার্কেটের ভেতর এগিয়ে আসছে। মার্কেটের ভেতরের অন্ধকারে আমরা কেবল কয়েকজন লোকের অবয়ব দেখতে পাই। ক্যামেরা ছিল হ্যান্ডহেল্ড অবস্থায়। চিত্রগ্রাহক পি.সি. শ্রীরাম লো-অ্যাঙ্গেল ওয়াকিং-ইন শট পেতে একটি বিছানা চাদরে শুয়ে আছেন, আর শুটিংয়ে বাকিরা সেই চাদরকে পেছনে টেনে নিচ্ছেন দৃশ্যটি এগিয়ে আসার সাথে সাথে। যার ফলে দৃশ্যটিতে একটি স্প্যানিশ ফিল পাওয়া যায়। দৃশ্যটিকে আরও যথাযথ করতে তিনি ছবির সঙ্গীত পরিচালক ইল্ল্যারাজাকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিলেন। কারণ, দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে আবহ সঙ্গীত কোথায় আসবে বা থামবে– এই দু’য়ের সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। খেয়াল করলে দেখবেন, উক্ত দৃশ্যে কখনো পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, আবার পরের মুহূর্তেই কেবল একটি বিটের আওয়াজ পাওয়া যায়; এবং ধীরে ধীরে এই দুই শব্দের সংযোজন গতি বাড়তে থাকে। এতে করে উক্ত দৃশ্যে জন ছয়েক তরুণের বিদ্রোহীভাব আরও স্পষ্ট হয়ে দৃশ্যমান হয়।

ছবিতে একটি দৃশ্য আছে, যে দৃশ্যের একটি সংলাপের বুননে পুরো ছবির বুনিয়াদ। দৃশ্যটির শুরুতে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চন্দ্রকুমার [মোহন অভিনীত] যখন দিব্যার হাত ধরে– বৃত্তাকার সিঁড়িটির আকৃতি জানান দিতেই তা আমাদের দেখানো হয় লো-অ্যাঙ্গেল শটে । সংলাপ শেষে দিব্যা যখন চন্দ্রকুমারের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিচে নেমে আসে, তখন আবারও সেই বৃত্তাকার সিঁড়ি; তবে এবার হাই-অ্যাঙ্গেল শটে। এই ‘দুই চরিত্র’ এবং ‘বৃত্তাকার সিঁড়ি’ একত্রে দেখে আমরা অনায়াসে তাদের মানসিক অবস্থা বুঝে ফেলি । বুঝে নিই যে, তাদের মন কোন বৃত্তের ভ্রান্তিতে আটকে আছে।

মণি রত্নম পরিচালিত মৌনা রাগাম ছবিটি ২০১৬-তে এসে ৩০ বছরে পা দিলো। এতগুলো বছর পরেও ছবিটার স্বতন্ত্রভাষা বা তার আধুনিকতা ততটাই তীব্র ও উজ্জ্বল হয়ে আছে। ছবিটির ৩০ বছর পূর্তিতে দিব্যা চরিত্রে অভিনয় করা সুঅভিনেত্রী রেবতীর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সুধীর শ্রীনিবাসন।

রেবতী । মৌনা রাগাম
রেবতী [মৌনা রাগাম]

সাক্ষাৎকার

দিব্যা অনেকটা আমার মতোই ছিল : রেবতী

সুধীর শ্রীনিবাসন
ভাবতে পারছেন মৌনা রাগাম মুক্তির ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে?

রেবতী
ওইভাবে ভেবে দেখা হয়নি। কেউ একজন বলছিল, ছবিটির বার্ষিকী নিয়ে কিছুই করা হয়নি। আমি বলেছি, যতক্ষণ লোকে ছবিটা দেখছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এসব কোনো ব্যাপারই না। মৌনা রাগাম এখনো আমাকে সতেজ অনুভুতি দেয়। যখনই মোহন বা মিস্টার মণি রত্নমের সাথে আমার দেখা হয়, মনে হয় যেন এই তো ক’দিন আগেই ছবিটার শুটিং করলাম। পাশাপাশি, আমার জীবনের অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে ছবিটা আমি করেছিলাম। এটা ছিল আমার বিয়ের ঠিক আগে।

সুধীর শ্রীনিবাসন
আপনি নিশ্চিত তো, দিব্যা [কেন্দ্রীয় চরিত্র] যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, আপনি তা যাননি?

রেবতী
[হাসি…] না। আমি যে ব্যক্তিটিকে ভালোবেসেছি, তাকেই বিয়ে করেছি । তবে দিব্যা জীবনকে পরিপূর্ণভাবে বাঁচায় বিশ্বাসী ছিল, আমিও তেমন। একটি দৃশ্য ছিল, যেখানে তাকে সংঘাত ও নিজের অস্ফুটতার মধ্য দিয়ে বের হতে হয়েছিল। আমিও এমনটা করতাম। আমার মা প্রায়ই সন্দেহ বোধ করে বলেন, মণি রত্নম নিশ্চয়ই আমার মধ্যের এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছেন।

সুধীর শ্রীনিবাসন
এমনকি ছবিটা শুরু হয় আপনার শৈশবের ছবির শট দিয়ে…

রেবতী
তাদের কাছে ছবিগুলো ছিল– আমি তাও জনতাম না! প্রথমদিনের শুটিং ছিল পি.সি. শ্রীরামের বাসায়। আমি ঘর গুছিয়ে রাখছিলাম, যেমনটা দিব্যা রাখবে। হঠাৎ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার ছবি টাঙ্গানো। আমার মা ওগুলো থোট্টা থারানিকে [শিল্প নির্দেশক] দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপারটায় কিছু মনে করিনি। আমি দিব্যা সম্বন্ধে সবকিছু বুঝে নিয়েছিলাম, সেই সঙ্গে তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধও। সে জন্যে দেখবেন, ওহো, মেঘাম বান্ধাদো গানে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে আমি আমার ঘড়িকে একটি রুমাল দিয়ে বেঁধে রেখেছি। আমার মনে হয়েছে, দিব্যাও তাই করতো।

সুধীর শ্রীনিবাসন
যখন একটি চরিত্রের সাথে অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন, সেটি কি আপনার মতো হয়ে উঠে?

রেবতী
আমার মনে হয়, সেসব স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমার প্রথম ছবির [মান ভাসানাই] গ্রাম্য চরিত্রটি মোটেও আমার মতো না। আমি শহরে বড় হয়েছি। কিন্তু আজ, যদি আমাকে একটি খড়ের ছাদের নিচে থাকতে হয় এবং মদ পান করতে হয়, আমি করতে পারব। কারণ, ওই চরিত্রের খাতিরে। কিন্তু দিব্যা কার্যত আমিই ছিলাম।

মৌনা রাগাম
মৌনা রাগাম

সুধীর শ্রীনিবাসন
তাহলে, আপনি সবসময় দিব্যার পছন্দের দিকেই ছিলেন?

রেবতী
সবসময় নয়। সে তার স্বামীকে বলে, ‘যখন তুমি আমাকে স্পর্শ করো, মনে হয় একটি কীট আমাকে স্পর্শ করছে’। আমার মনে হয় না– দিব্যা তাকে অতটা আঘাত করার উদ্দেশ্যে বলেছিল।

সুধীর শ্রীনিবাসন
মণি রত্নম বলেন, এই লাইনটি দিব্যা বিয়ের রাতে কেমন বোধ করবে– তার উপর ভিত্তি করে ছিল।

রেবতী
এটাই আমাকে অবাক করেছে যে, একটা পুরুষও এসব নিয়ে ভাবতে পারে! এমনকি আমার বান্ধবীরাও যখন বিয়ে করেছে, আমি এসব ব্যাপারে চিন্তা করিনি। আমরা কেউ করি না। আমরা আমাদের মেয়েদেরকে যথাসম্ভব সীমাবদ্ধতা তৈরি করে বড় করি। এবং তারপর আমরা তাদের হঠাৎ করে বলি– যাও, একটা অপরিচিত পুরুষের সাথে রাত কাটিয়ে আসো। আমি নিশ্চিত ছিলাম না– দৃশ্যটা কীভাবে করব। আমি প্রেমের মধ্যে ছিলাম, বিয়ে করতে যাচ্ছি, এবং আমি কখনোই এ সম্বন্ধে চিন্তা করতাম না– যদি না মৌনা রাগাম-এ এটা থাকত।

সুধীর শ্রীনিবাসন
মণি রত্নম উল্লেখ করেছেন, কার্তিকের চরিত্রটা অনেক পরে এসে ছবিতে সংযোজন করা হয়েছিল।

রেবতী
আমি যখন স্ক্রিপ্টটা প্রথম পড়ি, চরিত্রটা তাতে ছিল না। তা যাই-ই হোক, দিনশেষে আপনি চাইবেন, লোকে আপনার ছবিটা দেখুক।

সুধীর শ্রীনিবাসন
আপনি আজ ওই চরিত্রে কাকে বেছে নেবেন?

রেবতী
আমার মতে, কার্তিক [হেসে]। কিছু ব্যাপার তো বদলে যাবেই। কেউ আপনার জীবনে প্রাণবন্ততা নিয়ে আসবে, আপনি এমন কাউকেই চাইবেন।

সুধীর শ্রীনিবাসন
আপনি কি বলবেন, আপনার মধ্যে অল্প হলেও দিব্যা এখনো বিদ্যমান?

রেবতী
না; সে আর নেই। আমি এখন একদম ভিন্ন একজন মানুষ। আমার ক্যারিয়ারও এখন আলাদা জায়গায়। আমি বছরে এক বা দু’টি ছবি করছি। আশির দশকটা স্বর্ণযুগ ছিল; কারণ, তখন ছবি তৈরি হতো ভালো স্ক্রিপ্টে। ছবিতে অভিনয় করা তখন আমাকে আরও বেশি আনন্দ দিত। সুহাসিনী, রাধিকা, রাধা… আমরা সবাই তখন শক্তিশালী, নারীকেন্দ্রিক ছবি করেছি।

রেবতী
রেবতী

সুধীর শ্রীনিবাসন
গানগুলো অসাধারণ ছিল। কোনটা আপনার পছন্দের ছিল?

রেবতী
সম্ভবত মান্দারাম ভান্ধা? যখন রাজা স্যার এবং আমি একসাথে চিনি কম [আর. বাল্কি; ২০০৭] দেখছিলাম, আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি ছবিটিতে সুরটি ব্যবহার করেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীভাবে আপনি এই গানটা তাদের দিলেন?’ গানটা নিয়ে আমি বেশ পজেসিভ ছিলাম।

সুধীর শ্রীনিবাসন
যখনই আপনি মৌনা রাগাম নিয়ে ভাবেন, তৎক্ষণাৎ আপনার মনে কী আসে?

রেবতী
দিল্লির সেই বাসাটা। এটি আসলে কিলপকে [স্থান] ছিল। আমার এখনো মনে আছে, ঘরের দরজাটি দেখে অবাক হয়েছিলাম, যেটি তার ক্ষুদ্র কীলক দ্বারা ঘোরে। দিব্যা আর সেই ঘরটা যেন একত্রে বিস্তৃত। আমার এও মনে আছে পানিভিযহুম ইরাভু গানের জন্য আগ্রায় একদিনের ট্রিপে বের হওয়া। দিব্যার চরিত্রটাও সবকিছুকে উপভোগ্য করে তুলছিল। এতগুলো বছর পরে, চরিত্রটার কদর আরও বেশি বেশি করে উপলব্ধি করি।

সুধীর শ্রীনিবাসন
এখনকার অনেক অভিনেত্রীই যে কোনো মূল্যে এমন একটি চরিত্র করতে চাইবে।

রেবতী
দেখুন, আমি আর কি বলবো? আমি দুঃখিত। আমি বুঝতে পারছি।


মৌনা রাগাম । Mouna Ragam। ইংরেজি শিরোনাম : সাইলেন্ট সিম্ফনি
স্ক্রিপ্টরাইটার ও ফিল্মমেকার : মণি রত্নম। ভাষা : তামিল । দেশ : ভারত । মুক্তি : ১৫ আগস্ট ১৯৮৬
সাক্ষাৎকার-সূত্র • দ্য হিন্দু । জাতীয় দৈনিক পত্রিকা; ভারত । ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সিনে-লেখক। সিলেট, বাংলাদেশ

১টি কমেন্ট

  1. […] এই লেখাটি মূলত প্রকাশিত হয়েছিল ‘ফিল্মফ্রি’ অনলাইন ফিল্ম জার্নালের জন্য। সেই লেখা পড়তে যেতে হবে এই লিংকে […]

মন্তব্য লিখুন