বার্গম্যান অথবা বারিমনের আত্মজীবনী [কিস্তি-৬]

2
123

ইংমার বারিমন। ইংরেজি উচ্চারণ ইঙ্গমার বার্গম্যান নামে অধিক পরিচিত সুইডিস মাস্টার ফিল্মমেকার। দ্য ম্যাজিক লেন্টার্ন শিরোনামে প্রকাশিত তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থটি সিনেবিশ্বের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটবুকও বটে। সেই গ্রন্থের এই ধারাবাহিক অনুবাদ…

  আগের কিস্তি    ।   আতঙ্ক ও বিস্ময়ের পারদ   

প্রেতিনীগণ

নানীর মুখটা একবার দেখতে চাই আমি। অনেক খুঁজে-টুজে একটা ফটো বের করলাম। ফটোতে আমার ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার নানা, সঙ্গে নানী ও তার তিন সৎপুত্র। অল্পবয়সী নববধূর পাশে নানাকে বেশ গর্বিত লাগছে দেখতে। তার সুসজ্জিত কালো দাঁড়ি, স্বর্ণের ফ্রেমের চমৎকার পিন্স-নেজ চশমা, হাই কলার আর অনবদ্য মর্নিং স্যুট পরনে। তার ছেলেরাও বেশ পরিপাটি; এই তিন অল্পবয়সী ছেলের চোখগুলো ঢুলো ঢুলো, আর শরীরগুলো দেখাচ্ছে নিস্তেজ। একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস এনে, নানীর ছবিটার ওপর রীতিমতো গবেষণা করতে থাকলাম। তার চোখ দুটো ঘোলাটে হলেও তীক্ষ্ণ; তার চেহারা মসৃণ গোলগাল; তার চিবুক– শক্ত; আর মুখে ফুটে আছে– স্টুডিও ফটো-টাইপ পরিপাটি হাসির বদলে বরং দৃঢ়তা। তার চুল ঘন ও কালো : বেশ যত্নে গোছানো। দেখতে তাকে সুন্দরী লাগছিল– বলব না; তবে আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধ শক্তির বিচ্ছুরণ ছিল তার মধ্যে। এই নবদম্পতির ছবিতে আত্মসচেতনতার বেশ জোরালো একটি ছাপ রয়ে গেছে : ‘আমরা আমাদের ভূমিকা গ্রহণ করে নিয়েছি, আর চেষ্টা করেছি নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের’। কিন্তু পুত্রগুলোকে দেখে মনে হলো, যেন তারা অপরিচিত, নিপীড়িত, এমনকি হয়তো বিদ্রোহী।

দালার্নার সবচেয়ে চমৎকার জায়গাগুলোর একটিতে, মানে, দুফনায় একটি গ্রীষ্মকালীন বাড়ি বানিয়েছিলেন নানা : সামনের খোলা প্রান্তরে দেখা মিলত নদী, বিস্তীর্ণ ভূমি, শস্যাগার ও পাহাড়, পাহাড়ের পেছনে অবারিত নীল। ট্রেন তার প্রিয় ছিল খুব। তার জমির ওপর দিয়ে, তার বাড়ির ১০০ মিটার দূরের এক ঢালুপথ ধরে বয়ে গেছে রেললাইন। মালবাহী দুটিসহ, আসা-যাওয়ার চারটি করে আটটি ট্রেনের ছুটে যাওয়ার সময়, বারান্দায় বসে চেয়ে থাকতেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাস্টারপিস সৃষ্টি– নদীর ওপরে থাকা রেলওয়ে ব্রিজটিও দেখতে পেতেন নানা– গর্ব ও আনন্দভরা চোখে। শোনা কথা, আমি নাকি তখন তার কোলে বসে থাকতাম; যদিও নানার কোনো স্মৃতি এখন আর মনে নেই আমার। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের প্রতি আমার আসক্তি, আর হাতের ছোট ছোট আঙ্গুল– এগুলো আমি তার কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।

নানী তো অল্পকালেই বিধবা হয়ে গেলেন। ফলে, কালো পোশাক পরতেন তিনি। সহসাই তার চুলগুলো সাদা হয়ে গেল। সন্তানদের বিয়ে দেওয়া হলো। তারা বাড়ি ছেড়ে গেলেন। লালাকে সঙ্গে নিয়ে, বাড়িতে নানী একা রয়ে গেলেন। মা আমাকে একবার বলেছিলেন, নিজের সবচেয়ে ছোট ছেলে এর্নস্টকে ছাড়া, আর কাউকে নাকি কোনোদিনই ভালোবাসেননি নানী। তার অনুকরণ করে, তার ভালোবাসা পাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টাই মা চালিয়ে গেছেন, কিন্তু যেহেতু তিনি [মা] ছিলেন নরম মনের মানুষ, ফলে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে, নানীকে বাবা দেখতেন একজন কর্তৃত্বপরায়ণ দজ্জাল মহিলা হিসেবে; অবশ্য নানী সম্পর্কে এ ধারণা শুধু বাবার একারই ছিল না!

নানী । নানীকে ঘিরেই কেটেছে আমার শৈশবের সেরা দিনগুলো
নানীকে ঘিরেই কেটেছে আমার শৈশবের সেরা দিনগুলো

তবুও, নানীকে ঘিরেই কেটেছে আমার শৈশবের সেরা দিনগুলো। আমাকে এক ধরনের কঠোর মমতা আর সহজাত বোঝাপড়া দিয়ে বিবেচনা করতেন তিনি। অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি, একটা নিখুঁত নিয়মনিষ্ঠ সময় কাটতো আমাদের– যেটির ব্যাত্যয় ঘটেনি কখনো। ডিনারের আগে আমরা তার সবুজ সোফাটায় বসতাম; সেখানে নানা বিষয় নিয়ে ‘আলোচনা’ করতাম এক ঘণ্টা ধরে। নানী আমাকে পৃথিবীর কথা, জীবনের কথা শোনাতেন; শোনাতেন মৃত্যুর কথাও [সে সময়ে এ বিষয়টি আমার মাথায় বেশ গভীরভাবে গেথে যায়]। আমার ভাবনাও জানতে চাইতেন তিনি। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন; খেয়াল রাখতেন আমার দমের দিকে, কিংবা সে সব এড়িয়ে গিয়ে, আয়রনি হলেও সত্য, হয়ে ওঠতেন বন্ধুবৎসল। তিনি চাইতেন, আমি যেন কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই নিজের মতামত একজন প্রকৃত ব্যক্তিত্বের মতো প্রকাশ করি তার সামনে। আমাদের এই ‘আলোচনা’ বরাবরই ঢেকে পড়ত গোধূলী, অন্তরঙ্গতা আর শীতকালীন বিকেলে।

আরেকটি চমৎকার গুণ ছিল নানীর। ‘মুভি’ দেখতে যেতে পছন্দ করতেন তিনি। শিশুদের দেখার অনুমতি আছে– এমন কোনো সিনেমা এলে, আমাকে নিয়ে যেতেন সঙ্গে। আমাদের সেই উপভোগকালীন সময়ে বিরক্তিকর উপাদান ছিল মাত্র একটাই। এক জোড়া ফালতু বুটজোতা পরে যেতেন নানী; আর লাভ-সিন তিনি একদমই পছন্দ করতেন না– অথচ, সেগুলো খুব ভালো লাগত আমার। নায়ক-নায়িকা যখনই অবিরাম ও উত্তেজিতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠত, প্রকাশ ঘটাত নিজেদের আবেগের– নানী তখন নিজের জুতো দিয়ে মেঝেতে শব্দ করতেন। এই বিশ্রী শব্দটা পুরো সিনেমা-হল দাপিয়ে বেড়াত।

পরস্পরের সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলতাম আমরা; খুঁজে বেড়াতাম গল্প– বিশেষ করে ভৌতিক কিংবা অন্য কোনো হরর ধরনের; আর ‘লোকজনের’ ছবির ড্রয়িংও করে বেড়াতাম একটার পর একটা। ধরা যাক, আমরা কেউ একজন একটা ছবির ড্রয়িং শুরু করেছি, আরেকজন তখন আঁকতে শুরু করতাম পরেরটা। এভাবে চলতেই থাকত। বেশ কয়েকদিন ধরে এসব ‘কর্মকাণ্ডের’ ড্রয়িং করেছি আমরা। সব মিলিয়ে সংখ্যায় চল্লিশ-পঞ্চাশটার মতো হবে। ছবির মাঝখানে এর ব্যাখ্যাও লিখে রাখতাম আমরা।

ট্র্যাডগার্ডসগ্যাটানের বাড়িটিতে আমাদের গৃহস্থালী রুটিন ছিল সময়-ধরা। টাইল-কৃত স্টোভগুলোতে যখন আগুন ধরানো হতো, তখন জেগে ওঠতাম আমরা। তার মানে, ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা। ঠাণ্ডা পানিতে ঘষে-ঘুষে গোসল সেরে, সকালের নাস্তায় জাউ ও কড়মড়ে রুটির স্যান্ডউইচ খেয়ে, সকালের প্রার্থনা সেরে, নানীর অধিনে হোমওয়ার্ক কিংবা পড়াশোনা সারতে হতো আমাদের। দুপুর একটা বাজলে চা আর স্যান্ডউইচ দেওয়া হতো আমাদের। তারপর ঘুরতে বের হতাম বাইরে। ঘুরতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতাম, সিনেমা-হলগুলোতে কোন সিনেমা চলছে। বিকাল পাঁচটায় সারতাম ডিনার। তারপর এর্নস্ট মামার ছোটবেলার খেলনাগুলো বের করে নিয়ে বসতাম। জোরে জোরে পড়তাম। সারতাম সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা। বেজে ওঠত গুনিলা ঘণ্টি। তার মানে, রাত নয়টা বেজে গেছে। ছোট খাটে শুয়ে নৈঃশব্দ শুনতে শুনতে, সড়কবাতির বিকিরণ থেকে সিলিংয়ে আলো-ছায়ার খেলা দেখা : উপসালার জমিনে যখন তুষার ঝরে পড়ত, তিরতির করে কেঁপে ওঠত ল্যাম্পের আলো, জড়িয়ে যেত ছায়া, আর টাইলকৃত স্টোভ থেকে ছড়িয়ে পড়ত একটা মিহি শব্দ ও আমোদ।

মামীদের দেখতে একেবারেই আমার মায়ের মতো লাগত না; যদিও তারাও মা হয়েছিলেন
মামীদের দেখতে একেবারেই আমার মায়ের মতো লাগত না; যদিও তারাও মা হয়েছিলেন

রোববারগুলোতে আমরা ডিনার সারতাম চারটায়, লটেন আন্টি আসার পর। ওল্ড মিশনারির একটি বাড়িতে তিনি থাকতেন; তিনি আর নানী একই হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন– তারা ছিলেন এ দেশে গ্রাজুয়েট করা প্রথম নারীদের দুজন। লটেন আন্টি চীন চলে গিয়েছিলেন; খুইয়ে এসেছেন নিজের চেহারার সৌন্দর্য, দাঁত ও একটা চোখ

নানী জানতেন, লটেন আন্টিকে আমি সহ্য করতে পারি না; তবে তিনি মনে করতেন, তার সঙ্গে আমার মানিয়ে নেওয়া উচিত। ফলে রোববারের ডিনারে, লটেন আন্টির পাশেই আমাকে বসাতেন তিনি। তার [লটেন] লোমভরা নাকের দিকে সরাসরি চোখ পড়ত আমার; নাসারন্ধ্রের ভেতরে সবসময়ই একটা সবুজাভ-হলুদ শ্লেষ্মার ফোঁটা দেখতে পেতাম! তার শরীর থেকে ভেসে আসতো শুকনো প্রস্রাবের গন্ধ। কথা বলার সময়, চিকচিক করে ওঠত তার নকল দাঁত; প্লেট একদম মুখের সামনে নিয়ে, গবগব করে খেতেন তিনি। তার পাকস্থলী থেকে, মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে আসত এক ধরনের গুরগুর শব্দ।

এই বিরক্তিকর মহিলাটি বেশ সম্পদশালী ছিলেন। ডিনার ও কফি পর্বের শেষে, কাঠের একটা হলুদ বাক্স থেকে একটা চায়নিজ শ্যাডো থিয়েটার বের করতেন তিনি। ড্রয়িংরুম ও ডাইনিংরুমের মাঝখানের দরজা দিয়ে একটা চাদর বিছিয়ে দেওয়া হতো; নিভিয়ে দেওয়া হতো সব লাইট, আর তারপর লটেন আন্টি তার শ্যাডো-প্লে পারফর্ম করতেন। আঙুল দিয়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, সবগুলো চরিত্র যেভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন– তাতে তার ভীষণ দক্ষতা ছিল, বলতেই হয়। স্ক্রিনটা প্রথমে লাল কিংবা নীল হয়ে যেত, তারপর হুট করেই লাল রঙ ধরে ছুটে আসত একটা দৈত্য, নীল রঙের ওপর দৃশ্যমান হয়ে ওঠত এক চিলতে চাঁদ; তারপর এক সময় সবকিছুই হয়ে যেত সবুজ, আর আজব সব মাছ সাঁতরিয়ে বেড়াত সমুদ্রের গভীরে। 

মামারাও মাঝে মধ্যে আসতেন বাড়িতে; সঙ্গে নিজেদের ভয়ঙ্কর স্ত্রীদের নিয়ে। দাঁড়িঅলা মামারা ছিলেন মোটাসোটা; কথা বলতেন জোরে জোরে। মামীদের মাথায় থাকত বড় হ্যাট; আর ঘর্মাক্ত শরীরের ভীষণ দুর্গন্ধ। যতটুকু সম্ভব, নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতাম আমি। আমাকে কোলে তুলে নিতেন, জড়িয়ে ধরতেন, চুমু খেতেন। আমার গালে টিপতেন, চিমটি কাটতেন। অস্বস্তিকর প্রশ্নের বানেও বিদ্ধ করতেন আমাকে। এই সপ্তাহেও ঘুমের মধ্যে হিসু করে দিয়েছে নাকি এই ছেলে? তার মানে, অনেক সপ্তাহ পরে, এ সপ্তাহে কাজটায় বিরতি দিয়েছে? হা করো তো দেখি, তোমার দাঁত পড়েছে নাকি? দেখি তো, ‘দুষ্টু জিনিসটা’ কতটুকু বড় হলো তোমার? তুমি তো সুপুরুষ হবে! আমার ধারণা, এই ছেলেটি ট্যারা। আমার এই আঙুলটার দিকে তাকাও তো দেখি; হ্যাঁ, এক চোখে তাকাও। তোমাকে জলদস্যুদের মতো তালি দেওয়া কাপড় পরতে হবে। মুখটা বন্ধ করো, ফালতু ছেলে, বেশি হা করে থাকো তুমি। আমাকেও গিলে ফেলবে নাকি? মুখ হা করে থাকা লোকগুলোকে দেখতে বেকুব লাগে। তোমার নানী একটা অপারেশনের ব্যবস্থা করবেন। তোমার এই মুখ হা করে রাখাটা খুবই বদ-অভ্যাস।

মামীরা তিড়িংবিড়িং করে ঘুরতেন আর অস্বস্তিকর চাহনি দিতেন। তারা ধূমপান করতেন; আর নানী সামনে এলে উৎকণ্ঠায় ঘেমে যেতেন। তাদের কণ্ঠস্বর ছিল তীক্ষ্ণ ও দ্রুতলয়; তাদের চেহারা ছিল রঞ্জিত। দেখতে তাদেরকে একেবারেই আমার মায়ের মতো লাগত না; যদিও তারাও মা হয়েছিলেন

অবশ্য, কার্ল মামা ছিলেন আলাদা কিসিমের।

অনুবাদরুদ্র আরিফ

পরের কিস্তি; আসছে শিগগিরই…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]