সিনেমাটোগ্রাফার বিলি উইলিয়ামসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

0
203
সিনেমাটোগ্রাফার বিলি উইলিয়ামসের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ জুন; ইংল্যান্ডের লন্ডনে। বাবা বিলি উইলিয়ামস সিনিয়রও ছিলেন সিনেমাটোগ্রাফার। ১৪ বছর বয়সে তারই অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে সিনে-জগতে যাত্রা শুরু হয় এই ব্রিটিশ কিংবদন্তির… 

সাক্ষাৎকার : ডেভিড এ. এলিস অনুবাদ : রুদ্র আরিফ


জানি, আপনার বাবাও সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন। কোন কোন সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি?

বিলি উইলিয়ামস : ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি কাজ শুরু করেন ১৯১০ সালে; লন্ডনের ওয়ালথ্যাম্পসটোইয়ের একটি স্টুডিতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন; ১৯১৯ সালে, স্ক্যাপা ফ্লোতে জার্মান নৌবহরের আত্মসমর্পনের দৃশ্য ধারণ করেছেন। সে সব এখন আর্কাইভ ম্যাটেরিয়াল। এরপর তিনি ডকুমেন্টারির শুটিং করতে থাকেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধযাত্রামূলক ফিল্মগুলো; যেমন, ১৯২৮ সালে নির্মিত ‘জেনারেল মটরস কোম্পানি’র ধৈর্য্য পরীক্ষার উপর সিনেমা– ক্যাপ টাউন টু কায়রো। আরও আছে ১৯২০ ও ’৩০ দশকের ফিচার ফিল্মগুলো। ফলে, ফিল্ম ইক্যুপমেন্ট, ক্যামেরা, লেন্স ও ফিল্টার– এ সবের ভীড়েই বেড়ে ওঠা আমার। যুদ্ধের সময় আমি স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়ে, বাবার শিক্ষানবিশ হিসেবে এ কাজে নেমে পড়ি।

বাবা সিনেমা জগতে কাজ করতেন বলেই কি এ মাধ্যমে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলার ইচ্ছে আপনার ভেতর বরাবরই কাজ করত?

বিলি উইলিয়ামস : যখন স্কুল ছাড়ি, তখন আমার বয়স ১৪ বছর। আমি জানতাম না– ঠিক কী করতে চাই। যতদূর মনে পড়ে, সিনেমায় ডুবে ছিলাম আমি; ফলে এ জগতে চলে আসাটা খুবই স্বাভাবিক মনে হয় আমার কাছে। সামনে অবশ্য আরেকটা পথ খোলা ছিল। কারণ, মা চেয়েছিলেন, আমি যেন [সিনেমার তুলনায়] অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো কর্মক্ষেত্র খুঁজে নিই। শহরে গিয়ে, একটা স্টকব্রোকিং ফার্মে চাকরি করার প্রস্তাব ছিল আমার কাছে। কিন্তু সেটিকে একঘেয়ে কাজ বলেই মনে হয়েছে। ফলে ঠিক করেছিলাম, বাবার সঙ্গে কাজে নামার একটা সুযোগ নিয়ে দেখি!

তখন তো আপনার বয়স ১৪?

বিলি উইলিয়ামস : হ্যাঁ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বয়সটা নিতান্তই কম ছিল; তবে মনে রাখতে হবে, সেটি কিন্তু যুদ্ধকালীন স্কুলত্যাগের সময়ের কথা।

বাবার সঙ্গে কাজে, কিশোর বিলি উইলিয়ামস
বাবার সঙ্গে কাজে, কিশোর বিলি উইলিয়ামস

বাবার সঙ্গে কতদিন কাজ করেছেন?

বিলি উইলিয়ামস : চার বছরের মতো হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, সতের বছর বয়সে পূর্ব আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলাম– ‘কলোনিয়াল ফিল্ম ইউনিট’-এর হয়ে শিক্ষামূলক ফিল্ম নির্মাণের কাজে।

স্যার সিডনি স্যামুয়েলসনের [ব্রিটিশ ফিল্ম প্রডিউসার] সঙ্গে কথা হয়েছে আমার; তিনিও তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

বিলি উইলিয়ামস : তিনি এসেছিলেন আমার এক বছর পরে। চমৎকার একটি প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র ছিল এটি। সেই বয়সে মাটির কুঁড়েঘরে, ত্রিপলের নিচে বাস করাটা সত্যিই তুখোড় এক অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য; খুব বুনো মনে হতো।

ফিচার ফিল্মে ঢুকলেন কী করে?

বিলি উইলিয়ামস : ফিচার ফিল্মে ঢোকার আকাঙ্ক্ষা আমার বরাবরই ছিল। কিন্তু তখনকার দিনে ফিচার মানে ছিল ঠিক যেন প্রিমিয়ার লিগের মতো ব্যাপার; আর আমি তো প্রিমিয়ার লিগের কেউ ছিলাম না তখন! ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারের পক্ষে ফিচার ফিল্মে কাজ করা [তখন] বলতে গেলে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার ছিল। কারও যদি স্টুডিও সিস্টেমের অধীনে ক্ল্যাপার/লোডার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকত, তাহলে তার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ পাওয়াটা ছিল বিরল। আমার ক্ষেত্রে, আমি বাবার সঙ্গে কাজ করার পর ন্যাশনাল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলাম এবং ফটোগ্রাফার হিসেবে আরএএফ-এ [রয়েল এয়ার ফোর্স; যুক্তরাজ্য] কাজ করেছিলাম।

সেখান থেকে বের হয়ে এসে, ‘ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট ফিল্মস’ কোম্পানিতে চাকরি নিই আমি। তারা তখন ট্রান্সপোর্টেশনের সকল ফর্মের উপর সিনেমা বানাতো। সেখানে আমি পাঁচ বছর কাজ করেছি। তারপর মনে হলো, এবার একটা ব্রেক দরকার। এরপর ইউরোপের ‘ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’ থেকে প্রস্তাব পেলাম একটা ফিল্মের ফটোগ্রাফি করার। ফলে এতদিনের নিয়মিত চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে, নিজের সকল সঞ্চয় বিনিয়োগ করে একটা থার্টি ফাইভ এমএম অ্যারিফ্রেক্স ক্যামেরা কিনলাম। বাবার পদচিহ্নগুলো আমি অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করছিলাম। কেননা, তিনি সবসময় নিজের ক্যামেরাই ব্যবহার করতেন। তখনকার দিনে এমনটাই করার ছিল; কারণ, তখন তো [ক্যামেরা] ভাড়া দেওয়ার মতো কোনো কোম্পানি ছিল না। এ সব স্যামুলেসন আসার অনেক আগের কথা। তো, এই ক্যামেরার পেছনে আমি নিজের সর্বস্ব বিনিয়োগ করলাম, এবং ফিল্মটির শুট করতে পাড়ি দিলাম ইউরোপে।

এরপর ইরাকে, এই একই কোম্পানির আরেকটি ফিল্মের কাজ করেছি। ইরাক আর সিরিয়ায় যাওয়ার সেই অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের চমৎকার। এরপর কয়েক বছর নানাবিধ ডকুমেন্টারি ফিল্মের শুটিং করে কাটিয়েছি আমি; আর ফিচার ফিল্মে সুযোগ পাওয়ার আশা ও প্রচেষ্টা জিইয়ে রেখেছি। কিন্তু ভাগ্যে তা ঘটছিলই না। অবশেষে ১৯৫০ দশকে যখন কমার্সিয়াল টেলিভিশনের আবির্ভাব ঘটল, তখন একটি কমার্সিয়ালস কোম্পানিতে চাকরির প্রস্তাব পাই। এখানে একদিন, তো, ওখানে একদিন– এভাবে কাজ করছিলাম তখন। অবশ্য সহসাই এটি নিজের কাছে একটি রেগুলার জবে পরিণত হয়েছিল। ‘টেলিভিশন অ্যাডভারটাইজিং’ নাম ছিল সেই ফার্মটির। লন্ডনের ওয়ারডুর স্ট্রিটের বেজমেন্টে কাজ করত তারা। এ সময়ে লাইটিংয়ের উপর কিছু পড়াশোনা শুরু করি আমি। সেখানে চাকরি করার সময়, ভবিষ্যতে বিখ্যাত ফিল্মমেকার হয়েছেন– এমন অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে ছিলেন কেন রাসেল, জন স্কলসিঙ্গার ও টেড কোসেফ। এদের সঙ্গে কয়েক বছর কমার্সিয়ালে কাজ করার পর, তাদেরই ফিচার ফিল্মে ক্যামেরা চালানোর সৌভাগ্য লাভ করি।

স্যান ফেরি আন
স্যান ফেরি আন

ফিচার ফিল্মে আমি প্রথম কাজ করি ১৯৬৫ সালে। রন গুডউইনের কনডাক্টে, বার্নেল হুইব্লের অরিজিনাল মিউজিকে নির্মিত হয়েছিল সাদা-কালো এই নির্বাক ফিল্মটি। স্যান ফেরি আন নামের এই কমেডি ফিল্মটিতে ক্যারি অন নামের জনপ্রিয় সিরিজের অনেক অভিনেতা অভিনয় করেছেন। কাজটা পেয়েছিলাম ডেভিড অ্যান্ডারসনের মাধ্যমে; তার বেশকিছু কমার্সিয়াল ফিল্মে এর আগে কাজ করেছিলাম আমি। তিনি ছিলেন ফিল্মটির প্রোডাকশন ম্যানেজার। এরপর বেশকিছু লো-বাজেট ফিচার ফিল্মে আমি কাজ করেছি। তারপর বড় ধরনের ব্রেক-থ্রু পাই কেন রাসেলের কাছ থেকে। ফিল্ম প্রডিউসার হ্যারি সল্টম্যানের জন্য, মাইকেল কেইনকে অভিনয়ে নিয়ে, বিলিয়ন ডলার ব্রেন [১৯৬৭] নামে একটা সিনেমা বানাতে যাচ্ছিলেন তিনি। অটো হেলার [১৮৯৬-১৯৭০] নামের একজন ভীষণ খ্যাতিমান সিনেমাটোগ্রাফার নিযুক্ত হয়েছিলেন ফিল্মটির শুটিংয়ের দায়িত্বে। ফিনল্যান্ডে শীতকালীন দৃশ্যের প্রচুর পরিমাণ শুটিংয়ের ব্যাপার ছিল ফিল্মটিতে; তখন সেখানে ভয়াবহ রকমের ঠাণ্ডা পরতো বলে ফিল্মটির প্রোডাকশন ম্যানেজার ইভা মনলে গোঁ ধরেছিলেন– অটো যেন একটা মেডিক্যাল টেস্ট দিয়ে যান। কিন্তু অটো সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারা ফিল্মটিতে তার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারেননি বলে, সুযোগটা খুলে যায়। কেন রাসেলের কাছে হ্যারি সল্টম্যান জানতে চান, ‘ফটোগ্রাফির দায়িত্বটা আপনি কাকে দিতে চান?’ রাসেল তখন আমার নাম প্রস্তাব করেন। আমি তখন ফিল্মমেকার টনি রিচার্ডসনের রেড অ্যান্ড ব্লু [১৯৬৭] ফিল্মটিতে কাজ করছিলাম। আমাকে ডাকা হলে, সঙ্গে করে সেই ফিল্মটির একটি-কি-দুটি রিল নিয়ে গিয়েছিলাম। কাজটি দেখে তাদের ভালোই লাগল। হ্যারি সল্টম্যান বললেন, ‘ঠিক আছে, এই বাচ্চাটাকে একটা ব্রেক দেওয়াই যায়।’ আমার বয়স তখন ৩৮ বছর!

ফোকাস পুলার ও অপারেট স্টেজকে আপনি বাইপাস করে গেছেন, তাই না?

বিলি উইলিয়ামস : ডকুমেন্টারিগুলোতে অপারেট করেছি আমি। তখন ডকুমেন্টারিতে ক্রু বলতে থাকত মাত্র দুজন মানুষ। ফলে কোনো স্টুডিও অপারেটর কিংবা কোনো স্টুডিও ফোকাস পুলার কখনোই ছিল না আমার। কেন রাসেলের সঙ্গে, ফিনল্যান্ডে এবং পাইনউড স্টুডিওতে বিলিয়র ডলার ব্রেন-এর কাজ করেছি। পাইনউডের সেটগুলো এতই বিশাল ছিল যে, ভড়কে গিয়েছিলাম; তবে জনি সোয়ান নামে এক চমৎকার গ্যাফার এবং ডেভিড হারকোর্ট নামে এক চমৎকার অপারেটর পেয়েছিলাম সেখানে– তাদের সঙ্গে একজীবনের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। সেই পর্যায়ে কাজ করাটা যথেষ্ট মাথানষ্ট করে দেওয়ার মতো চাপের ব্যাপার ছিল; কারণ, বড় স্টুডিওতে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। এর পরে উল্লেখ করার মতো যে সিনেমাটিতে কাজ করেছি, সেটিও কেন রাসেলের বানানো। নাম, উইমেন ইন লাভ [১৯৬৯]। এটি ছিল আমার জীবনের সেরা ভিজ্যুয়াল স্ক্রিপ্ট। একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আকাঙ্ক্ষা করা যেতে পারে– এমন সকল সুযোগ ছিল এটিতে। আরও ছিল স্ট্রেটফরোয়ার্ড ডে ইন্টারিয়র ও ডে এক্টারিয়র, নাইট ইন্টারিয়র, নাইট এক্সটারিয়র, এবং ভীষণ বিস্তৃত একটি ম্যাজিক আওয়ার সিন। প্রচুর পরিমাণ ফায়ারলাইট ও ক্যান্ডললাইটের ব্যবহার ছিল ফিল্মটিতে, এবং আরও ছিল সুইজারল্যান্ডে তুষারপাতের মধ্যে একটি বিশাল লং-সিকুয়েন্স। ফলে কাজ করার জন্য একটি সুবিস্তৃত ও ইন্টারেস্টিং প্যালেট ছিল এটি। এ নিয়ে রাসেলের সঙ্গে কথা বলেছি আমি; আর তিনি একবাক্যে রাজি হয়ে গেছেন– যা কিনা ভীষণরকম কমলা– সেই ফায়ারলাইটের কালারের মতো, ভীষণ স্ট্রং কালার ইফেক্টে কাজ করার ব্যাপারে। ফিল্মটির বিখ্যাত রেসলিং সিকুয়েন্সে, সবগুলোতে বাতিতে আগুনের মতো একই রঙের ফিল্টার আমি করেছি, এবং তৈরি করেছি একটি ফ্লিকারিং ইফেক্ট। অ্যালান বেটস ও অলিভার রিড অভিনীত রেসলিং দৃশ্যটির শুটিং হয়েছে অন-লোকেশনের একটি বিশাল রুমে।

উইমেন ইন লাভ
উইমেন ইন লাভ

রেসলিং সিকুয়েন্সটির শুট করতে সময় লেগেছিল কেমন?

বিলি উইলিয়ামস : তারা বরাদ্দ রেখেছিল স্রেফ একদিন; তবে পরে আমরা আরেকটা দিন পেয়েছিলাম। দুটি হ্যান্ডহেল্ড অ্যারিফ্লেক্স ক্যামেরায় মিউট-মুডে শুট করেছি আমরা; আর তাতে অ্যাকশনটিকে যথেষ্ট ক্ষিপ্রতার সঙ্গে শুট করা গেছে। দুই দিনে শুটিং করেছি সিকুয়েন্সটির। এর পরপরই আমরা চলে গেছি সুইজারল্যান্ডে। যখন ফিরেছি সেখান থেকে, রাসেলকে এডিটর বলেছেন, আরও কিছু অংশ সংযুক্ত উচিত আমার। রাসেল চেয়েছিলেন হাই-স্পিডের একটা সিকুয়েন্স শুট করতে; কিন্তু সেই লোকেশনটি আর পাইনি আমরা। আমাদের কেবল ছিল মেঝেয় পাতার একটা কম্বল; সেটির উপরই রেসলিং করাতে হতো। ফলে লন্ডনের মারটন পার্কের একটা ছোট্ট স্টুডিওতে গিয়ে হাজির হই। সেখানেই ফ্লিকারিং ফায়ারলাইটের ইফেক্টটার রিক্রিয়েশন করতে হয় আমাকে। লাইটিংয়ের সেই একই টেকনিক ব্যবহার করে, এ বেলা ভীষণ ক্লোজশটে সবকিছুর শুটিং করতে হয়েছে আমাদের; আর স্রেফ কয়েকটি ডার্ক ফ্ল্যাট, ক্যান্ডল আর কম্বল– এগুলো নিয়েই বিষয়টি হয়ে উঠেছে নিখুঁত।

কোন কোন অন-লোকেশনে আপনি শুট করেছেন?

বিল উইলিয়ামস : ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই আমি শুট করেছি। ওয়েস্টার্ন ফিল্মের শুট করতে মেক্সিকোতে বেশ কয়েকবার গিয়েছি আমি। প্রথমবার গিয়েছিলাম ডেনিস হোপারের কিড ব্লু [১৯৭৩] সিনেমার শুট করতে; সে বার বেশ রোমাঞ্চিত ছিলাম। এর বছর কয়েক পর আবারও গিয়েছি, ‘র‌্যাঙ্ক অর্গানাইজেশন-এর ঈগলস উইং [১৯৭৯] নামের একটি ব্রিটিশ ওয়েস্টার্ন ফিল্মের শুট করতে। এই ফিল্মটির জন্য ‘ব্রিটিশ সোসাইটি অব সিনেমাটোগ্রাফারস [বিএসসি]’-এর কাছ থেকে ‘বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলাম আমি।

ওয়েস্টার্ন ফিল্মের শুটিং করতে ভালোলাগত আপনার?

বিলি উইলিয়ামস : ওয়েস্টার্ন ফিল্মের শুটিং করতে ভালোই লাগত। ঘোড়া আমার খুবই প্রিয়। এই প্রাণীটি ভিজ্যুয়ালি চমৎকার। তাছাড়া, ল্যান্ডস্কেপও আমার প্রিয়। আমি ভারতে গিয়েছি গান্ধী সিনেমার শুট করতে; ল্যান্ডস্কেপ ও মানুষজন মিলিয়ে, ভীষণ মনোমুগ্ধকর ছিল এ অভিজ্ঞতা। এই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে [মহাত্মা গান্ধী] নিয়ে ছিল ফিল্মটি; ফলে আমরা চেষ্টা করেছি তার জীবনের যত কাছাকাছি করে তাকে সিনেমায় হাজির করতে। নিউজরিল ম্যাটেরিয়াল দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছে আমাদের। ফিল্মটির বিভিন্ন চরিত্রে যে অভিনেতাদের নিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদেরকে বাস্তব চরিত্রগুলোর মতো করেই সাজিয়ে তোলা হয়েছে। গান্ধী চরিত্রে বেন কিংসলি তো ছিলেন এক কথায় অতুলনীয়। তিনি যখন এই লোকটির [গান্ধী] সত্তর বছর বয়সের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, রিহার্সেল ও সেটে তিনি ঠিক বুড়ো মানুষটি হয়েই থেকেছেন। যখন অভিনয় করছিলেন না, তখনো চরিত্রটির মধ্যেই থেকে গিয়েছিলেন তিনি।

গান্ধী
গান্ধী

শটের লাইন-আপ করে ফেলার পর কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, ‘হায় রে! সেট-আপ করার জন্য আরেকটু সময় নেওয়া নিশ্চয়ই দরকার ছিল আমাদের।’ আমি তখন বেনকে বলতাম, চলুন, আরেকটু বসে সেট-আপটা আরেকবার পরখ করে নেওয়া যাক। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতেন; মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেন। যদিও তার বয়স তখন ছত্রিশ বছর, তবু বুড়োর চরিত্রে দুর্দান্ত মানিয়েছে তাকে।

গান্ধীর শুটিংয়ে সময় লেগেছে কেমন?

বিলি উইলিয়ামস : খুব সম্ভবত তেইশ সপ্তাহের মতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাড়ে চিড় ধরেছিল আমার; ফলে চিকিৎসা নিতে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসতে হয়েছিল। ভাগ্য ভালো, সিনেমাটোগ্রাফার রনি টেইলরকে তখন পাওয়া গিয়েছিল; তিনি ফিল্মটির অনেকটুকু অংশের শুট করেছেন। তারপর আমি ফিরে এসে বাকিটা শেষ করেছি। আর ফিল্মের ক্রেডিট লাইনে [সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে] নাম ভাগাভাগি করে নিয়েছি দুজনে।

গান্ধীর শুটিংয়ের সপ্তাহ কয়েক আগে, ক্যাথেরিন হেপবার্ন ও হেনরি ফন্ডা অভিনীত অন গোল্ডেন পন্ড [১৯৮১] সিনেমায় কাজ করেছি আমি। অস্কারে আমি প্রথমে নমিনেশন পেয়েছিলাম উইমেন ইন লাভ-এর জন্য; আর তারপর পেয়েছিলাম অন গোল্ডেন পন্ড-এর জন্য। আর অস্কার পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে গান্ধীর জন্য। রনি আর আমি– দুজনেই অস্কার পেয়েছি। ক্যাথেরিন হেপবার্ন ও হেনরি ফন্ডার সঙ্গে কাজ করতে পারার কারণে, অন গোল্ডেন পন্ড আমার কাছে স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।

তাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোলাগার কারণটা কী?

বিলি উইলিয়ামস : তারা ভীষণ প্রাণবন্ত ছিলেন। নারীটি [হেপবার্ন] ছিলেন ভীষণ রকম একগুঁয়ে; তার মধ্যে প্রাণশক্তি ছিল; ছিল নিখুঁত উদ্যম। আমার ধারণা, তার বয়স তখন ৭৩ বছর; অথচ ভীষণ কর্মচাঞ্চল্য ছিল তার মধ্যে। হেনরি ফন্ডার বয়স তখন ৭৬ বছরের মতো; তবে শরীর খুব একটা ভালো ছিল না তার। তবু, তার সঙ্গে কাজ করতে কোনো ঝামেলা হয়নি; যে কোনো কাজ করার জন্য তিনি ছিলেন সদাপ্রস্তুত। হেপবার্নের কিছু কুস্বভাব ছিল; তিনি সবকিছু নিজের মতো করে চাইতেন। আমার জন্য চমৎকার এক অভিজ্ঞতা ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি শান্ত-সুনিবিড় লোকেশনের শুটিং হয়েছে ফিল্মটির; আর শুটিং যেখানে করতাম, সেখান থেকে লেকের অপরপ্রান্তে ছিল আমার আবাস। পুরো ফিল্মটিই অন-লোকেশনে শুট করা। লেকের পাড়ের চমৎকার একটি বাড়িতে আমরা শুট করেছি; আর এ ফিল্মটিতেও প্রচুরসংখ্যক ইন্টারেস্টিং সুযোগ তৈরি হয়েছে আমার সামনে। ইন্টারিয়রও অন-লোকেশন হওয়ায়, ইন্টারিয়রের সঙ্গে এক্সটারিয়রের লিংক-আপ আমরা এমনভাবে করেছি– যেটি স্টুডিওতে করা সম্ভব নয়। একটা প্রাণবন্ত ফিল্ম, একটা আনন্দমুখর অভিজ্ঞতা ছিল এটা।

অন গোল্ডেন পন্ড-এর সেটে, অভিনেত্রী ক্যাথেরিন হেপবার্নের সঙ্গে, শটের আগে লাইট চেক নিচ্ছেন বিলি
অন গোল্ডেন পন্ড-এর সেটে, অভিনেত্রী ক্যাথেরিন হেপবার্নের সঙ্গে, শটের আগে লাইট চেক করে নিচ্ছেন বিলি

যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে আপনার পছন্দের কোনো ফিল্মমেকার আছে কি?

বিলি উইলিয়ামস : দেখুন, ‘পছন্দ’– শব্দটি যদি বলেন, [মনে রাখতে হবে] একেকজন ফিল্মমেকার একেক রকম। কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি কিছু দাবী করেন; তবে শেষ পর্যন্ত এ সবই আপনার কাছে অর্থময় হয়ে ওঠবে– যদি রেজাল্টটি ভালো হয়। কেন রাসেল ছিলেন ভীষণ রকম ডিমান্ডিং, আর ভীষণ ইমাজিনেটিভ; তবে তার সঙ্গে কাজ করার সময় আমি নিজের পায়ের নিচের মাটি যথাযথভাবে শক্ত করে নিতাম, আর দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দিতাম– আমাদের কেমন করে [কোনো দৃশ্য বা সিকুয়েন্সের শটটি] নেওয়া উচিত।

উইমেন ইন লাভ-এর একটা বিশেষ ঘটনার কথা বলি : অ্যালান বেটস, অলিভার রিড ও গ্লেন্ডা জ্যাকসন অভিনীত একটা দীর্ঘ ও কমপ্লিকেটেড সিন ছিল– যেখানে সবাই একটা বীচবৃক্ষের নিচের বিশাল এক টেবিলে বসে থাকবেন। দৃশ্যটিতে একটা ব্যাপার ছিল। অ্যালান বিটসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পেছনের একটা ভীষণ উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ডের ছায়া তাকে ঢেকে দিচ্ছে। অন্যাদিকে, উল্টোদিকে বসা অলিভার রিড ও গ্লেন্ডা জ্যাকসনের দিকে যদি তাকালে তুলনামূলকভাবে একটা ব্যালেন্সড পিকচারের দেখা পাবেন আপনি। ফলে রাসেলকে আমি বললাম, ‘অ্যালান বেটসের ওপর পড়া ছায়াটাকে বাড়িয়ে তুলতে, কিছু লাইট ঢুকিয়ে দিচ্ছি।’ তিনি বললেন, ‘না। আমি চাই না আপনি কোনো লাইট খেয়ে দিন! আমি চাই না, এটিকে লাইটিংয়ের মতো দেখাক।’

রাসেলকে আমি বললাম, ‘আমি এমনভাবে লাইটিং করব, আপনি বুঝতেই পারবেন না– এখানে কোনো লাইটের ব্যবহার হয়েছে।’ আমার কাছে ১২ ফুট স্কয়ারের একটা বিশাল হোয়াইট-সিল্ক ছিল; সেটি ব্যবহার করে উজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দিলাম আমি। ভীষণ সফট আর ডিফিউজড লাইট ছিল সেটি; এবং এটিকে মোটেও লাইট বলে মনে হচ্ছিল না; আর তা দৃশ্যটির সঙ্গে চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তা দেখে রাসেল বেশ খুশি হয়ে গেলেন; যদিও এর আগে দুজনের মধ্যে ভালো একটা বাহাস হয়ে গেছে!

আরেকজন ইন্টারেস্টিং ফিল্মমেকার ছিলেন জন স্কলসিঙ্গাল। উইমেন ইন লাভ-এর এক বছর বা তারও কিছুকাল পরে, সানডে ব্লাডি সানডের [১৯৭১] শুট করেছি আমি। উইমেন ইন লাভ ও গান্ধীর জন্য বিএএফটিএ [ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস] নমিনেশন পেলেও, আমি কখনোই এই অ্যাওয়ার্ড জিতিনি। উইমেন ইন লাভ-এর একটা প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন জন; তখন তিনি আমাকে তার পরবর্তী ফিল্মের ব্যাপারে আলাপ করার জন্য নিজের অফিসে আসার নিমন্ত্রণ করে আসেন। আমাকে তিনি সানডে ব্লাডি সানডের শুট করার প্রস্তাব দেন। বলেন, ‘উইমেন ইন লাভ-এর মতো কালারফুল কিংবা ফ্ল্যামবয়ান্ট কিছু আমি চাই না। এগুলো আমার কাছে একেবারেই মেকি লাগে।’ যেহেতু এটি ছিল লন্ডনভিত্তিক এবং অল্পকিছু ছোট্ট স্টুডিও সেটের একটা আলাদা স্টাইল; কিন্তু এর ব্যবহার মূলত হতো অন-লোকেশনের শুটিংয়ে। আমার ধারণা, অন-লোকেশনে শুট করতেই আমার ভালোলাগত বেশি; যদিও স্টুডিওতেও বেশিকিছু সিনেমার কাজ করেছি। তবু, স্ক্রিপ্টে নেই– অপ্রত্যাশিত এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া বা কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষায় থাকার যে চ্যালেঞ্জটা অন-লোকেশনে থাকে, সেটি আমার প্রিয়।

অন গোল্ডেন পন্ড
অন গোল্ডেন পন্ড

উইমেন ইন লাভ-এ অ্যালান বেটস ও অলিভার রিড অভিনীত একটা দৃশ্য আছে; সেটি লেখা হয়েছিল স্ট্রেটফরোয়ার্ড সিন হিসেবে। যেখানে রেসলিং সিনটির শুট করেছিলাম, অন-লোকেশনের সেই একই বাড়িটিতে একটা রুম পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা; এর চারপাশ ছিল আয়নায় ভরা। আমরা সেই আয়নাগুলো ব্যবহার করেছি। তাতে একটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং এফেক্ট পাওয়া হয়ে গেছে আমাদের। এ রকম সেট ডিজাইন কোনো আর্ট ডিরেক্টরের পক্ষে করা কখনোই সম্ভব নয়; ফলে অন-লোকেশনে শুটিংয়ের বিষয়টি কাজে খানিকটা অধিকতর রোমােঞ্চের যোগান দেয়।

নিজে ফিল্ম ডিরেকশন দিতে চাননি?

বিলি উইলিয়ামস : কয়েকটা কমার্সিয়ালের ডিরেকশন দিলেও, না, [ফিল্ম ডিরেকশন দেওয়ার মতো] মেধা বা অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে– এমনটা অনুভব করিনি। অভিনেতাদের বুঝতে পারা ও তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়াটা ফিল্মমেকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এরসঙ্গে স্ক্রিনপ্লে ঠিকঠাক আত্মস্থ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সেই ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে বলে মনে হয়নি আমার। সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতে পেরেই আনন্দিত ছিলাম।

আরেকজন ফিল্মমেকারের সঙ্গে কাজ করাটা ভীষণ উপভোগ করেছি। তার সঙ্গে অবশ্য দুটি ফিল্ম করেছি। তিনি গাই গ্রিন। ফিল্মমেকার হওয়ার আগে সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন। চমৎকার এক মানুষ ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করাটা ভীষণ ভালোলাগার ছিল। আমাকে আমার কাজটা তিনি করতে দিতে; কখনো বলতে আসতেন না– আমার কীভাবে করা উচিত। মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে ভাবি, তিনি যদি আমাকে সামান্য কিছু হিন্টস দিতেন, তাহলে হয়তো কাজটা আরও ভালো হয়ে ওঠতে পারত।

কোন ফিল্মের শুটিং করাটা বেশি কঠিন লেগেছে?

বিলি উইলিয়ামস : খুব সম্ভবত উইমেন ইন লাভ-এর শুট করাটা আমার জন্য সবচেয়ে দুরূহ ছিল; কারণ, কমার্সিয়ালগুলোতে এক ধরনের এক্সপেরিমেন্টের কথা যদি বাদ দিই, সে ক্ষেত্রে এখানে আমি সেই কাজগুলো করছিলাম– যা আগে করিনি। এই ফিল্মটি দুরূহ হলেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আমার জন্য। কারণ, অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে এটি; তাছাড়া, রাসেল ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন অনুপ্রেরণাদানকারী এবং এক ধরনের তুখোড় স্বপ্নদর্শী। চমৎকার দূরদৃষ্টি ছিল তার। এ কারণেই ফিল্মটি এত তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। আর শারীরিক বিবেচনায় গান্ধী ছিল কষ্টসাধ্য; তবে শারীরিক বিবেচনায় হিসেব করলে আমি এরচেয়েও দুরূহ পরিস্থিতিতে পরেছি আরেকটা সিনেমায়– কানাডার মনট্রিলে শীতকালে ও তারপর আর্কটিকে শুট করতে গিয়ে। ফিল্মটির নাম শ্যাডো অব দ্য উল্ফ [১৯৩২]। চরম ঠাণ্ডার মধ্যে, ইগলুতে [এস্কিমোসদের গম্বুজাকৃতির কুটির] শুট করতে হয়েছিল আমাদের। সত্যিকারের ইগলুতে শুট করেছিই, আবার স্টুডিওতেও ইগলু বানিয়ে নিয়েছিলাম। এটা খুব দুরূহ ছিল; যদিও এটির ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ভালো ছবির মর্যাদাটা আমরা পাইনি।

থার্টি ইজ ডেঞ্জারাস এইজ, সিনথিয়া
থার্টি ইজ ডেঞ্জারাস এইজ, সিনথিয়া

নিজের কাজ করা সিনেমার মধ্যে আপনার প্রিয় সিনেমা কোনটা?

বিলি উইলিয়ামস : আমার ধারণা, উইমেন ইন লাভ। আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার সম্ভবত, ১৯৭৮ সালের কথা, ইংল্যান্ডের বিকনসফিল্ডের ‘ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন স্কুল’-এর তখনকার ডিরেক্টর– কলিন ইয়ং আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন একটা ওয়ার্কশপ করাতে; সেটি আমার সামনে একটা নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে, তাদেরকে যৎসামান্য ট্রিক দেখিয়ে দিয়ে, এবং তাদের উৎসাহিত করতে পেরে খুব ভালোলেগেছে আমার। এটি আমার সামনে দ্বিতীয় ক্যারিয়ারের পথ খুলে দেয়– যে ক্যারিয়ারে এখনো আছি; আমি এখন পৃথিবীর নানা দেশে ওয়ার্কশপ করি, সেমিনার করি, নিই মাস্টার ক্লাস।

আমার এ ক্যারিয়ারের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো ২০০০ সাল। পোল্যান্ডের ক্যামেরিমেজ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমাকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়– যা কিনা আমাকে ভীষণ রকম রোমাঞ্চিত ও শিহরিত করেছে। ২০০১ সালে এএসসি [আমেরিকান সোসাইটি অব সিনেমাটোগ্রাফারস] আমাকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছে– যা কিনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কাজ করা সিনেমাটোগ্রাফারদের দেওয়া হয়ে থাকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে আমি অনেক সিনেমায় কাজ করেছি, তবে বেশিরভাগ কাজ আমার যুক্তরাজ্যেই করা হয়েছে।

গান্ধীতে স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরোগের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

বিলি উইলিয়ামস : মানুষ হিসেবে তিনি চমৎকার। অভিনেতাদের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিশেছেন; ছিলেন খুব যত্নশীল এবং সুবিবেচক। তার সঙ্গে কাজ করতে পেরে সত্যি ভালোলেগেছে আমার। সবাই তাকে ‘ডিকি’ নামে ডাকত।

বিলিয়ন ডলার ব্রেন
বিলিয়ন ডলার ব্রেন

কোন কোন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন এ পর্যন্ত?

বিলি উইলিয়ামস : গান্ধীর জন্য অস্কার পেয়েছি; আর অস্কারে নমিনেশন পেয়েছিলাম উইমেন ইন লাভ ও অন গোল্ডেন পন্ড-এর জন্য। বিএএফটিএ’র নমিনেশন পেয়েছিলাম গান্ধী, সানডে ব্লাডি সানডে, উইমেন ইন লাভ ও দ্য মাগুস-এর [১৯৬৮] জন্য। বিএসসি [ব্রিটিশ সোসাইটি অব সিনেমাটোগ্রাফারস] নমিনেশন পেয়েছিলাম বিলিয়ন ডলার ব্রেন ও সানডে ব্লাডি সানডের জন্য। তবে বিএসসি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি ঈগল’স উইংগান্ধীর জন্য।

পিটার ইয়েটস হলেন আরেকজন ফিল্মমেকার– যার সঙ্গে কাজ করাটা উপভোগ করেছি আমি। তার সঙ্গে ইলেনি [১৯৮৫] ফিল্মের শুট করেছি স্পেনে; আর ওয়াশিংটনে করেছি কোর্টরুম ড্রামা ফিল্ম সাসপেক্ট-এর [১৯৮৭] শুট। আরেকটা সিনেমায় কাজ করা বেশ উপভোগ করেছি– শন কনারি ও ক্যানডিস বার্গেন অভিনীত দ্য উইন্ড অ্যান্ড দ্য লায়ন [১৯৭৫]। প্রচুর অ্যাকশন দৃশ্যে ভরা এই সিনেমার শুটিং হয়েছে স্পেনে। ফিল্মটির স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ও নির্মাণ করেছেন জন মিলিয়াস। এখানে স্যার জোসেফ নামের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছি আমি। ফিল্মটির পটভূমি মরোক্কো; এখানে একটা অ্যাকশন দৃশ্য আছে আমার– একটা অটোমেটিক গান দিয়ে অজস্র গুলি করছি! আমার পরনে ছিল একটা হোয়াইট সুট আর ইটোন টাই। ক্যানডিস বার্গেন অভিনীত ইডের পেডেকারিসকে অপহরণ করতে আসা গুণ্ডাদের গুলি করতে হয়েছে আমাকে। এটা ছিল আমার জন্য এক বিপথগমন!

অভিনয় করাটা উপভোগ করেছেন?

বিলি উইলিয়ামস : তা করেছি! ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোটা যথেষ্ট কঠিন কাজ; কারণ, আপনাকে অনেককিছু মনে রাখতে হবে। একটা ক্রুশিয়াল পয়েন্টে পাঁচটা ক্যামেরার সামনে একজন স্টান্টকে দাঁড় করাতে হয়েছিল; আর সেই নির্দিষ্ট পয়েন্টটিতে গুলি করার কথা ছিল আমার। সবই ঠিকঠাক করেছি, শুধুমাত্র গুলি করা ছাড়া! স্টান্ট প্রস্তুত, অথচ আমি গুলি করিনি। ফলে, পরে দৃশ্যটি কাভার করতে, ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে এর শুট করতে হয়েছিল আমাদের।

কোনো অভিনেতাকে না নিয়ে, আপনাকে অভিনয় করতে হলো কেন?

বিলি উইলিয়ামস : জানি না। ফিল্মমেকার হয়তো ভেবেছিলেন, আমাকে দেখতে ব্রিটিশ কূটনীতিকের মতো লাগে! আমি একদিন অফিসে গিয়েছিলাম। ফিল্মমেকার তখন কাস্টিং করছিলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার জোসেফের চরিত্রে অভিনয়টা আপনিই করুন।’ আমি বললাম, ‘এ কী বলছেন জন? আমি তো অভিনেতা নই।’ তিনি বললেন, ‘রাখুন তো! আপনি পারবেন।’ আমি তাই মজা করতেই স্যার জোসেফ হয়ে গেলাম।

সাসপেক্ট
সাসপেক্ট

এর কয়েক বছর পরে, আমি যখন পিটার ইয়েটসের সাসপেক্ট-এ কাজ করছি, কোর্টরুমের একটা দৃশ্য করে উঠতে পারছিলাম না আমরা। আমাদের যে অভিনেতা ঠিক করা ছিল, পরের দিনের সিডিউল ছিল না তার; ফলে তার জায়গায় আমিই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। এভাবে ক্যামেরার সামনে, ছোট্ট চরিত্রে আবারও আমার দাঁড়িয়ে পড়া।

এলিজাবেথ টেইলরের [১৯৩২-২০১১] সঙ্গে দুটি সিনেমায় কাজ করেছি আমি; বেশ মজা নিয়েই। চমৎকার এক মানুষ ছিলেন তিনি। তার মতো টেকনিক্যালি এত দক্ষ আর কারও সঙ্গে, কখনোই কাজ করা হয়নি আমার। তাকে যেটাই করতে বলবেন, করে দেবেন; সবকিছু তিনি একবারেই নিখুঁতভাবে করে ফেলতে পারতেন। ক্যামেরা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান ছিল তার; আর ছিলেন ভীষণ মজার মানুষ।

অবসর নিলেন কেন?

বিলি উইলিয়ামস : ১৯৯৬ সালের নববর্ষের দিন অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যদিও শুটিংয়ের দিনগুলো খানিকটা মিস করি, তবু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যস্ত থাকতে পারাটা মন্দ নয়। ফলে বছরে কয়েকটা সপ্তাহ তাদের সঙ্গে কাটাই। এভাবেই এ জগতের কর্মকাণ্ড ও সর্বশেষ অগ্রগতিসমূহ সম্পর্কে অবগত থাকতে পারি।

ব্লু-স্ক্রিনের কোনো কাজ করেছিলেন?

বিলি উইলিয়ামস : ব্লু-স্ক্রিনে যথেষ্ট পরিমাণ কাজ করেছি আমি। এ ডিপার্টমেন্টে যদিও আমি কোনো বিশেষজ্ঞ ছিলাম না। কখনো কখনো কোনো বিশেষজ্ঞের তলব করতাম। ডিজিটালের অগ্রযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই আমি অবসর নিয়েছি; ফলে ডিজিটাল সংক্রান্ত আমার অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার্থীদের মধ্য দিয়ে এবং ‘কামেরিমেজ’-এর মতো জায়গাগুলোতে গিয়ে অর্জন করা– যেখানে লেটেস্ট টেকনোলজির প্রদর্শনী ঘটানো হয়।

আপনার শখের তালিকায় কী কী আছে?

বিলি উইলিয়ামস : কার্পেন্ট্রির প্রতি আমার ঝোঁক বরাবরই। এ কাজটি আমি স্কুলজীবনে ভালোই করতাম; তাছাড়া, কাঠ নিয়ে কাজ করতে আমার সবসময়ই বেশ ভালো লাগে। অবসর নেওয়ার পর আমি একটা লেদমেশিন কিনেছি; আর এভাবেই হয়ে উঠেছি একজন উড-টার্নার আর পাত্র প্রস্তুতকারক। বাগান করতেও আমার ভালো লাগে। আমি মনে করি, ফিল্মমেকিংয়ে একটা ভীষণ সৌভাগ্যবান ক্যারিয়ার কাটাতে পেরেছি আমি; এটি আমার কল্পনার মতোই সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক, মর্যাদাদায়ক ও রোমাঞ্চকর কর্মক্ষেত্র।


বিলি উইলিয়ামস
বিলি উইলিয়ামস
বিলি উইলিয়ামসের ফিল্মোগ্রাফি
সান ফেরি আন [জেরেমি সামারস; ১৯৬৫]
রেড অ্যান্ড ব্লু [টনি; রিচার্ডসন; ১৯৬৭]
জাস্ট লাইক অ্যা ওম্যান [রবার্ট ফস্ট; ১৯৬৭]
বিলিয়ন ডলার ব্রেন [কেন রাসেল; ১৯৬৭]
থার্টি ইজ অ্যা ডেঞ্জারাস এইজ, সিনথিয়া [জোসেফ ম্যাকগ্রাথ; ১৯৬৮]
দ্য মাগুস [গাই গ্রিন; ১৯৬৮]
টু জেন্টলমেন শেয়ারিং [টেড কসেফ; ১৯৬৯]
উইমেন ইন লাভ [কেন রাসেল; ১৯৬৯]
দ্য মাইন্ড অব মি. সমস [অ্যালেন কুক; ১৯৭০]
দ্য ব্যালাড অব ট্যাম লিন [রডি ম্যাকডোয়েল; ১৯৭০]
সানডে ব্লাডি সানডে [জন স্কলসিঙ্গার; ১৯৭১]
জি অ্যান্ড কো [ব্রায়ান জি. হাটন; ১৯৭২]
পোপ জোয়ান [মাইকেল অ্যান্ডারসন; ১৯৭২]
নাইট ওয়াচ [ব্রায়ান জি. হাটন; ১৯৭৩]
কিড ব্লু [জেমস ফ্রলি; ১৯৭৩]
দ্য গ্লাস মেনেজারি [অ্যান্থনি হার্ভে; ১৯৭৩]
দ্য উইন্ড অ্যান্ড দ্য লায়ন [জন মিলিয়াস; ১৯৭৫]
ভোয়েজ অব দ্য ডেমনড [স্টুয়ার্ট রোজেনবার্গ; ১৯৭৬]
দ্য ডেভিল'স অ্যাডভোকেত [গাই গ্রিন; ১৯৭৭]
দ্য সাইলেন্ট পার্টনার [ডেরিল ডিউক; ১৯৭৮]
ব্রডওয়াক [স্টিফেন ভেরোনা; ১৯৭৯]
ঈগল'স উইং [অ্যান্থনি হার্ভে; ১৯৭৯]
গোয়িং ইন স্টাইল [মার্টিন ব্রেস্ট; ১৯৭৯]
স্যাটার্ন থ্রি [স্ট্যানলি ডোনেন; ১৯৮০]
অন গোল্ডেন পন্ড [মার্ক রাইডেল; ১৯৮১]
মনসিগনর [ফ্রাঙ্ক পেরি; ১৯৮২]
গান্ধী [রিচার্ড অ্যাটেনবরোগ; ১৯৮২]
দ্য সারভাইভারস [মাইকেল রিচি; ১৯৮৩]
অর্ডিয়াল বাই ইনোসেন্স [ডেসমন্ড ডেভিস; ১৯৮৫]
ড্রিম চাইল্ড [গ্যাভিন মিলার; ১৯৮৫]
এলেনি [পিটার ইয়েটস; ১৯৮৫]
দ্য ম্যানহাটন প্রজেক্ট [মার্শাল ব্রিকম্যান; ১৯৮৬]
সাসপেক্ট [পিটার ইয়েটস; ১৯৮৭]
দ্য লটারি [গ্যারি মার্শাল; ১৯৮৯]
দ্য রেইনবো [কেন রাসেল; ১৯৮৯]
উইমেন অ্যান্ড মেন : স্টোরিজ অব সিডাকশন [ফ্রেডরিক রাফায়েল, টনি রিচার্ডসন, কেন রাসেল; ১৯৯০]
স্টেলা [জন এরম্যান; ১৯৯০]
জাস্ট আস্ক ফর ডায়মন্ড [স্টিফেন বেলি; ১৯৯০]
শ্যাডো অব দ্য ওলফ [জ্যাকুয়েস ডর্ফম্যান, পিয়ের ম্যাগনি; ১৯৯২]
রিইউনিয়ন [লি গ্র্যান্ট; ১৯৯৪]
ড্রিফটউড [রোন্যান ও'লিয়ারি; ১৯৯৭]
লাইটস কিপ মি কোম্পানি [Ljuset Haller Mig Sallskap; কার্ল-গুস্তাভ নিকভিস্ট; ২০০০]

গ্রন্থ-সূত্র । কনভারসেশনস উইথ সিনেমাটোগ্রাফারস/ ডেভিড এ. এলিস
দ্য স্কেয়ারক্রো প্রেস । যুক্তরাজ্য । ২০১২

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন