রানওয়ে : একটি জীবনবাদী চলচ্চিত্র; শিল্পের প্রকরণে বৃহৎ সত্যের অনুসন্ধান অথবা, সমকালীন বাংলাদেশের জীবনবৃত্তান্ত / প্রসূন রহমান

3
157
রানওয়ে
ফিল্মমেকার । তারেক মাসুদ
স্ক্রিপ্ট ও মিউজিক । তারেক মাসুদক্যাথরিন মাসুদ
প্রডিউসার ও এডিটর । ক্যাথরিন মাসুদ
সিনেমাটোগ্রাফার । মিশুক মুনীর
প্রোডাকশন কোম্পানি । জিঙ্গো ফিল্মস
অভিনয় [চরিত্র] । ফজলুল হক [রুহুল]; রাবেয়া আক্তার মনি [রহিমা]; আলী আহসান [আরিফ]; নাজমুল হুদা বাচ্চু [রুহুলের দাদা]; নাসরিন আক্তার [ফাতেমা]; রিকিতা নন্দিনী শিমু [শিউলি]; মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দীন [উর্দু ভাই]; জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় [রুহুলের মামা]; নুসরাত ইমরোজ তিশা [সেলিনা]
ডিস্ট্রিবিউটর । অডিও ভিশন
রানিংটাইম । ৯০ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । বাংলাদেশ
মুক্তি । ১৬ ডিসেম্বর ২০১০

লিখেছেন প্রসূন রহমান


নির্বাক যুগের বাক্সময় ছবিতে আমরা শিশিরের শব্দ শুনতে পেতাম, আর আজকের ছবি সারাক্ষণ বকবক করে।
-তারেক মাসুদ।

 

পাঠক ধরে নিন, আপনি একটি গল্পের নায়ক। আপনার বয়স অনুর্ধ্ব বিশ বছর। আপনার বাবা মধ্যপ্রাচ্যে চাকরী করতে গিয়ে যোগাযোগহীন। আপনার মা স্থানীয় একটি এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কেনা গরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চালান। আপনি বসে বসে ছোটোবোনের গার্মেন্টস্ যাওয়া দেখেন। আর রানওয়ের কাছে বাড়ি হওয়ায় দিন-রাত প্লেনের উঠানামা পর্যবেক্ষন করেন। আপনার নিজের কোনো আয় রোজগার নেই, এককালে মাদ্রাসায় পড়তেন। মামার সাইবার ক্যাফেতে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে ধর্মনির্ভর একজন রাজনৈতিককর্মীর সাথে আপনার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। এবার আপনি কী আপনার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারেন?

২.
ভোর রাতের আধো আলো আধো অন্ধকারে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দানবের মতো একটা প্লেন বিমান বন্দরে অবতরণের জন্যে এগিয়ে আসে। আমরা দেখি একটি ঝুপরি ঘরের বেড়া-সহ ঘরের মলিন তৈজসপত্র থরথর করে কাঁপছে। শব্দের প্রচণ্ডতায় ধড়ফড় করা বুক নিয়ে আচমকা ঘুম থেকে জেগে উঠে এক বৃদ্ধ। পাশ থেকে টিনের মগটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খায়। মাইকে তখন ফজরের আযান ভেসে আসে। আর এদিকে, অন্ধকার মিলনায়তনের ভেতর দর্শক তখন টানটান হয়ে বসে। একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হতে শুরু করে, অনেকের মাঝখানে বসে একা হতে শুরু করে। প্রথম দৃশ্যের এই হতচকিত অবস্থা কাটিয়ে খানিক সংশয়ের সাথে ভোরের পবিত্রতা ও রহস্যময়তার ঘোরলাগা অনুভুতি নিয়ে আমরা অনায়াসেই একটা গল্পের ভেতর ঢুকে যাই। একটা নতুন ভ্রমণের অংশ হয়ে যাই।

রানওয়ে । যে ছবির প্রতিটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে
রানওয়েযে ছবির প্রতিটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে

৩.
আমাদের আলোচ্য ছবিটি অকালপ্রয়াত বরেণ্য চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সর্বশেষ নির্মাণ– রানওয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সংযোজন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, চলচ্চিত্রের ছাত্র হিসেবে এই নিবন্ধের লেখক বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মাতা দম্পতির সৃষ্টিকর্মের একান্ত অনুসারী এবং সহযোগী। রানওয়ের নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত থাকবার সুযোগ হয়েছিল। ফলে রানওয়ের জন্ম পরিক্রমা এবং নির্মাতাদ্বয়ের ‘ক্রাফ্টস্ম্যানশিপ’ ভেতর-বাহির দু’দিক থেকেই নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ ঘটেছে।

তবে এই অংশগ্রহণ অথবা কাছে থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগটির কথা বাদ দিয়ে নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান থেকে একজন চলচ্চিত্রকর্মী এবং দর্শক হিসেবেও যদি দেখি, তাহলেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারি এই কারণে যে, দীর্ঘদিন পর আমরা এমন একটি ছবি পেয়েছিলাম– যে ছবির প্রতিটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে, শিল্পসম্মত বিতর্ক হতে পারে! বিতর্কে কোন পক্ষ জিতলো, তাতে কিছু আসে-যায় না; কিন্তু আলোচনাটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের চেয়ে কম কিছু হবে না– এমনটা বলা যায় নির্দ্বিধায়।

৪.
বিতর্ক হতে পারে এর বিষয় নিয়ে, বিতর্ক হতে পারে এর গল্প নিয়ে, গল্পের কাঠামো নিয়ে, গল্পের বিস্তৃতি নিয়ে! প্রশ্ন আসতে পারে– একটি গল্পে কতগুলো বিষয় একসাথে সন্নিবেশিত হতে পারে? আমাদের জীবনে কতগুলো গল্প একসাথে চলে? চলচ্চিত্র তো জীবন নয়; জীবনের ছায়া। সব গল্পও তো আর সরলরৈখিক নয়। যদি একটি বিষয় বা বা চরিত্রকে কেন্দ্র করে বহুমুখি বিষয়ের উপর আলো ফেলা যায়, ক্ষতি কী? রানওয়ে— আপনি, আমি অথবা, রুহুলের গল্প। রুহুলকে ঘিরে একটি পরিবারের গল্প। পরিবারকে ঘিরে বাংলাদেশের গল্প। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক সংকট, ক্ষুদ্র ঋণ, পোষাক শিল্পের অস্থিরতা, ধর্মের নামে রাজনৈতিক হানাহানি, বোমাবাজি– এ তো আমাদের দৈনন্দিন বিষয়। এর পেছনে যেসব আর্থ-সামাজিক কারণ, আর্ন্তজাতিক ঘটনাবলীর প্রভাব, কারণের পেছনে যে কারণ– সেসব বিষয়েও আলো পড়ে সহজেই। সে সবগুলো বিষয় নিয়েই আমাদের দিনযাপনের ইতিহাস লেখা হচ্ছে মহাকালের ডায়েরিতে। এই সবকিছুর একটি সমন্বিত শিল্পরূপ আমরা দেখতে পাই রানওয়ে ছবিতে।

জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মতো অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির গ্যাঁড়াকলে বাস করে জাতীয় জীবনের জ্বাজল্যমান সত্যঘটনা নির্ভর গল্প নির্বাচন নিংসন্দেহে দুরূহ অথবা, দুঃসাহসিক কাজ। লগ্নিকারক বা প্রযোজক না পাওয়া, নির্মাণ পর্যায়ে থমকে যাওয়ার শংকা, সেন্সরের চোখ রাঙানি, পরিবেশক না পাওয়া-সহ বাণিজ্যিক ব্যর্থতার সকল আশঙ্কা ছাড়াও সবসময়ই থেকে যায় অথর্ব দুস্কৃতিকারীর আক্রমণের আশংকা। এসব কাটিয়ে একটি বক্তব্যনির্ভর ভালো ছবি যখন আলোর মুখ দেখে, তখন শুরু হয় নতুন সংকট। ছবির বক্তব্যকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচানোর সংকট। গৎবাঁধা প্রতিবেদনের সহজ প্রকাশের সূত্রে একধরনের অতিসরলীকরণ এবং নির্দিষ্ট একটি ছকে আটকে ফেলার প্রবণতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতির কারণ। সৃজনশীল নির্মাতার বোধহয় সংকটের শেষ নেই!

রানওয়ে । নেতিবাচক বিষয়ের বিপরীতে জীবনের সৌন্দর্য কতটা প্রতিভাত হয়েছে– সেটাই এখানে মুখ্য হতে পারে...
রানওয়েনেতিবাচক বিষয়ের বিপরীতে জীবনের সৌন্দর্য কতটা প্রতিভাত হয়েছে– সেটাই এখানে মুখ্য হতে পারে…

রানওয়ের গল্পে একটি বৃহৎ জায়গা জুড়ে আছে কেন্দ্রীয় চরিত্র রুহুলের ধর্ম-নির্ভর উগ্র রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়া এবং তাদের ভেতরকার স্বরূপ আবিস্কারের বিশ্বাসযোগ্য চিত্রায়ণ। তাদের সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া, ট্রেনিং, আত্মঘাতী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দৃশ্যপট রয়েছে বলেই একে জঙ্গীবাদ-বিষয়ক বা, জঙ্গীবাদ-বিরোধী ছবি বলে ফেলাটা অতিসরলীকরণ হয়ে যায়। বরঞ্চ নেতিবাচক বিষয়ের বিপরীতে জীবনের সৌন্দর্য কতটা প্রতিভাত হয়েছে– সেটাই এখানে মুখ্য হতে পারে

রানওয়ের গল্প ও চরিত্রের বিন্যাস আমাদেরকে আরও দুটি ছবির কথা মনে করিয়ে দেয় অনায়াসে। তার প্রথমটি– একই নির্মাতার মাটির ময়না। সেখানে বারো-তেরো বছরের যে আনুকে দেখি ৭১ সালে, মাদ্রাসায় পড়া সে আনু হয়তো ২০০৪ সালের গল্পে আরেকটু বড় হতো। সেক্ষেত্রে রানওয়ের রুহুলের যে পরিণতি, তার চাইতে ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা দেখি না। মায়ের সে একাকিত্ব আর নিজস্ব সংগ্রাম এখানেও বলবৎ। বাবার দায়িত্বহীনতা, ছোটোবোনের অসহায়ত্ব এখানেও বর্তমান। রানওয়ে-এর গল্পটা সামান্য একটু বদলে নিলে অনায়াসে মাটির ময়নার সিক্যুয়াল হয়ে উঠতো।

রানওয়ে দ্বিতীয় যে ছবিটির কথা মনে করিয়ে দেয়, সেটা সত্যজিত রায়ের পথের পাঁচালি। অপু আর দুর্গা এখানে রুহুল আর ফাতেমা। হরিহরের মতো বাবা এখানেও অনুপস্থিত, অর্থ উপাজর্নের নিমিত্তে অন্যত্র অবস্থান। বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুন এখানে বৃদ্ধ দাদা। মায়ের নিরন্তর সংগ্রাম এখানেও চলছে। শুধু সময়টা ভিন্ন, অবস্থান ভিন্ন; সংকটগুলো একই। সময় হয়তো বদলাচ্ছে, সময়ের রঙ বদলাচ্ছে, এই উপমহাদেশিক জীবনের যে অর্ন্তগত বৈশিষ্ট্য, সামাজিক মূল্যবোধের যে মূল সুর, পারিবারিক জীবনাচরণের যে বিধি– সেটা এখনো একইভাবে বর্তমান

৫.
বিমানবন্দরের রানওয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে গল্পের শুরু। মূল লোকেশনটা রুহুলদের বাড়ি। সমতল ভুমি থেকে খানিকটা ঢালে একটা একচালা ঘর। ঘরের সামনে এক চিলতে উঠোন। বিমানগুলো যেমন ধীরে নীচে নেমে আসে, তেমনি উঠোনটা গড়িয়ে নেমে গেছে জলের কাছাকাছি। খাল নয়, বিল নয়; শান্ত জলাভূমি। জলের মাঝে রুহুল নিজের মুখ দেখে, দেখে চলমান বিমানের ছায়া। জলে হাঁস ভাসে, ভাসে নৌকা আর ভাসে রুহুলের স্বপ্নগুলো। একটা ভেসাল আছে মাছ ধরবার। খানিক বিরতি দিয়ে জলের ঝিলিক তুলে উঠানামা করে সেই ভেসাল। কখনো চিকচিক করে ওঠে স্বপ্নের মতো রূপালি মাছের শরীর, কখনো শুধুই শূন্যতা। যেন জীবনের আরেক রূপ।

যমুনার চর দেখা যায়, ব্রিজ ও আছে। পানির মাঝে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুঠোফোনের বিজ্ঞাপন। চরের পাশে আশ্রয়কেন্দ্র। ঢাকার অদূরে সারিসারি ইটের ভাটা। বিস্তীর্ণ হলুদ শর্ষের মাঠ। মসজিদ ও সিনেমা হলের সদর-অন্দর। গোপন আস্তানা, উচ্চপদস্থের অফিস। শহরের সম্প্রসারিত উপকণ্ঠ, গার্মেন্টস, সাইবার ক্যাফে, বিমানবন্দর আর বন্দরের অ্যাপ্রোচ রানওয়ে ধরে চরিত্রগুলোর বিচরণ।

রানওয়ে । বিস্তীর্ণ শর্ষে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আরিফের সাইকেল চালিয়ে শূন্যে মিশে যাওয়া...
রানওয়েবিস্তীর্ণ শর্ষে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আরিফের সাইকেল চালিয়ে শূন্যে মিশে যাওয়া…

আর এই সবকিছু আধুনিক প্রযুক্তির সিনে-আল্ট্রা ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন মিশুক মুনীর ও তার দল। নির্মাতার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা হিসেবে সুবিদিত মিশুক মুনীরের হাত ধরেই ক্যামেরাটি আমদানি হয় আমেরিকা থেকে; ২০০৮ সালে। ভোরের রহস্যময় আকাশ ও আলোর খেলা, মাথার খুব কাছ দিয়ে বিমানের অবিরাম উঠানামা, বিমান তাক করে কিশোরের গুলতি মারা, ভেসালে মাছ ধরা, বিস্তীর্ণ শর্ষে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আরিফের সাইকেল চালিয়ে শূন্যে মিশে যাওয়া, হেলিকপ্টার থেকে নেয়া বিশ্ব ইজতেমার এরিয়েল শট, বোমার আঘাতে ঘটমান ধ্বংসযঞ্জ– সবকিছুই তিনি ধরেছেন নিপুণ কৌশলে। নির্মাতার দৃশ্য বিভাজন এবং ক্যামেরার প্রতিটি ফ্রেমে রয়েছে সংবেদনশীল চিত্রবিন্যাস এবং মনোগ্রাহী ইমেজের প্রস্ফুটন, তাদের যৌথ অভিজ্ঞতা ও মননের সমৃদ্ধ বহিঃপ্রকাশ। এর সাথে যদি যোগ হয় ক্যাথরিনের সৃজনশীল সম্পাদনার প্রায়োগিক মেধা, তাহলে একটি সমন্বিত শিল্পরূপ আমরা সহজেই দেখতে পাবো– এটাই স্বাভাবিক। তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ও নির্মাণ অনুযায়ী এটি একটি ধারাবাহিকতা মাত্র।

প্রযুক্তি কোথায় পৌঁছেছে, কোথায় পৌঁছাবে, আমরা তার থেকে কতদূরে– এমন প্রশ্ন অনেক। কিন্তু সকল প্রশ্নের আড়ালের প্রশ্নটি হচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা কতটা দক্ষ? ডিজিটাল প্রযুক্তি ধারন করবার চেষ্টা করছি আমরা অনেকেই, তবে নির্মাতার সৃজনশীল স্বাধীনতার সাথে সাথে মেধার প্রয়োগটাও জরুরিরানওয়ের সাফল্য এই সত্যটি আরেকবার প্রমাণ করে।

৬.
রানওয়ের অভিনয় শিল্পীর তালিকায় তথাকথিত ‘তারকা’ নেই। তবে চমক আছে। তারকা নেই বলেই হয়তো আমরা চমকগুলো পাই, চরিত্রগুলোকে পাই জীবন্ত। রুহুল যখন কথা বলে, অভিনেতার নাম কী– আমাদের আলাদা করে জানতে ইচ্ছে করে না। রুহুল এখানে রুহুলই, হোক না বাইরে তার নাম ফজলুল বা অন্যকিছু। রুহুলের মা যখন রুহুলকে ডাকে, রান্না করে, গরুর দুধ দোহায়, শ্বশুরকে অজুর পানি এগিয়ে দেয়, ঋণের কিস্তির চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে, মাকে তখন রুহুলের মা-ই মনে হয়। মঞ্চের অল্পস্বল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রায় আনকোরা শিল্পীদের কাছ থেকে নির্মাতা তাদের শ্রেষ্ঠ অভিনয় নৈপুণ্য আদায় করে ছেড়েছেন। মায়ের চরিত্রে রাবেয়া আক্তার মণি, আরিফ চরিত্রে আলী আহসান তাদের স্বীয় চরিত্রে জ্বলজ্বল করেছেন প্রতিমুহূর্তে। এদের সাথে শিউলি চরিত্রে শিমু এবং ফাতেমা চরিত্রে নাসরিন-সহ আরও কয়েকটি নতুন মুখ ছিল একইভাবে সমুজ্জ্বল। পরিচিত মুখের মাঝে দাদার চরিত্রে নাজমুল হুদা বাচ্চুর উপস্থিতি ছিল সবচে আকর্ষণীয়। এছাড়া জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আব্দুল্লাহ রানা এবং নুসরাত ইমরোজ তিশাকে দেখা যায় কয়েকটি অতিথি চরিত্রে, যাদের উপস্থিতি অল্প হলেও প্রত্যেকেই ছিলেন চরিত্রানুগ। মাটির ময়নার ছোট-হুজুরকে দেখা যায় উর্দুভাই নামের ইন্টারেস্টিং একটি চরিত্রে, এতে অভিনয়ের সমস্ত সুযোগ তিনি সর্বতোভাবে ব্যবহার করতে পারেননি বলেই মনে হয়। শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গেট-আপে তিনি ছিলেন যথার্থ; শুধু জ্বলে উঠবার ব্যাপারটা ঘটেনি তার বেলায়। তবে শুধুমাত্র একটি দৃশ্যে অভিনয় করেও মনে রাখবার মতো উপস্থিতি ছিল কাস্টমার চরিত্রে ইকবাল হোসেনের। এছাড়া নামহীন অসংখ্য চরিত্রের উপস্থিতি ও প্রতিভা রয়েছে– যা মনে রাখবার মতো।

রানওয়ে । বাস্তবতা এখানে সত্য প্রকাশে তৎপর; অথচ এর প্রকাশ কখনো রুঢ় হয়ে ওঠে না...
রানওয়েবাস্তবতা এখানে সত্য প্রকাশে তৎপর…

উল্লেখ করা প্রয়োজন, এদের সবার সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছে হাঁস, মুরগি, গরু, বাছুর, বিড়াল, প্রজাপতি, ফড়িং, পিপড়া-সহ প্রাণীকূলের নানা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী। এদের সবার উপস্থিতি ছিল প্রাণবিক ও নান্দনিক। সবার উপরে অন্যতম চরিত্র হয়ে ছিল– বিভিন্ন আকৃতির বিমান। প্রতিটি উঠা-নামায় বিমানের হুংকারগুলো দৃঢ় সংলাপের চাইতেও কঠিন কিছু বলে গেছে প্রতিবার

৭.
রানওয়ের প্রধান লোকেশন– রুহুলদের বাড়ি। আবু আহমেদ নামে এক কৃষকের বাড়ি। পদ্মার ভাঙনে ভিটেহারা হওয়া এক জীবনসন্ধানী গৃহস্থ। ছবিতে রুহুলের পরিবার ও নদীর ভাঙনে ভেসে আসা। আবু আহমেদ গরুর সাথে একই ঘরে তার পরিবার নিয়ে বাস করতেন। রানওয়ের শিল্পনির্দেশক শহীদ আহমেদ মিঠু তার দল নিয়ে সেটাকে একটু গুছিয়ে নিয়েছেন কেবল। গোয়ালঘরটা তারা আলাদা করে নিয়েছেন। তৈরি করেছেন মাটির চুলা, উঠোন, সবজি বাগান। অন্য জায়গা থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছে মাছ ধরার ভেসাল। এর বাইরে সকলই অপরিবর্তিত। সকলই বাস্তবানুগ। পাত্র-পাত্রীরা যে শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের পোশাক সে অনুযায়ী ধারন করতে পেরেছেন সকলেই। কাউকে শ্রেণীবিচ্যুত বা আরোপিত কিছু বহন করতে দেখা যায়নি কখনো। ইংরেজি শব্দ ‘সিম্পলিসিটি’ বলতে যা বোঝায়, এর সৌন্দর্য ও প্রায়োগিক সাফল্য রয়েছে প্রতিটি জায়গায়, প্রতিটি দৃশ্যে– যা নান্দনিক উৎকর্ষের উদাহরণ হয়ে থাকবে।

শিল্প বিভাগের সবগুলো শাখার মধ্যে সবচাইতে বেশি শক্তিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় রূপসজ্জায়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সবচাইতে মেধাবী এবং সবচাইতে প্রবীণ রূপসজ্জাকর আবদুর রহমান সম্ভবত তার পরিমিতিবোধের জন্যেই নির্মাতার নিজেরও শ্রদ্ধাভাজন হয়েছিলেন। একসাথে কাজ করেছেন প্রতিটি প্রকল্পে। নির্মাতা নিজেই একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন প্রবীণ এই রূপসজ্জাকরের জীবন ও কর্মের উপর– যেখানে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসও ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন একই সাথে।

রানওয়ে । পানির মাঝে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুঠোফোনের বিজ্ঞাপন...
রানওয়েপানির মাঝে হাঁটু গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুঠোফোনের বিজ্ঞাপন…

৮.
সকল ধ্রুপদি চলচ্চিত্রেরই নিজস্ব সাংগীতিক সুর থাকে। রানওয়েরও তা আছে। আমাদের গ্রামবাংলার পুঁথির সুরটি এখানে ফিরে ফিরে আসে। দৃশ্য ও চরিত্রের গতির সাথে যন্ত্র ও সুরের গতি পরিবর্তিত হয়। যন্ত্র ও যেন গল্প বলে যায়, যন্ত্রের আড়ালে কেউ একজন হয়তো সেই পুঁথি লিখছেন। সজীবের সঙ্গীতায়োজনে আবহসঙ্গীত এই ছবির আরেকটি শক্তির দিক। আমরা কয়েকটি দৃশ্যে অসাধারণ আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার দেখি বিভিন্ন যন্ত্রানুসঙ্গে। বিশেষ করে মায়ের স্বপ্নদৃশ্যে পিয়ানোর কুশলি ব্যবহার, জঙ্গী ট্রেনিংয়ের দৃশ্যে মার্চের সুরের সাথে গাতামের বিদ্রূপাত্মক প্রয়োগ, শর্ষে ক্ষেতের মাঝ দিয়ে আরিফের সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যের তথা, আরবি লোকসুরের সাথে ভারতীয় ধ্রুপদি সঙ্গীতের মিশ্রণ এবং উচ্চ মার্গের সুরেলা হামিং– দৃশ্যগুলোকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। শেষোক্ত মিশ্রণটি যেন সর্বোতভাবেই ধারন করে আরিফের আত্মঘাতী প্রক্রিয়ায় শহীদ হওয়ার মাধ্যমে জান্নাত-গমনের গোপন বাসনাটি।

সত্যজিৎ রায়ের প্রথমদিককার বেশ কয়েকটি ছবির আবহসঙ্গীত তৈরি করেছিলেন পণ্ডিত রবিশংকর। চলচ্চিত্রের সঙ্গীতায়োজনটি যেহেতু ভিন্ন প্রক্রিয়ার, সেখানে একটা দৃশ্যের ম্যুড অনুযায়ী যন্ত্র নির্বাচন এবং দৃশ্যের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী নির্ধারিত দৈর্ঘ্য মেনে সঙ্গীত সৃষ্টি করতে হয়। দৃশ্যটি কুড়ি সেকেন্ড বা ত্রিশ সেকেন্ড– যা-ই হোক, এর একটি শুরু এবং শেষ থাকবে। তাই এই দৈর্ঘ্য মানার ব্যাপারটিতে রবিশংকর অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই অভিজ্ঞতার পর সত্যজিৎ রায় একটা সময় নিজেই দায়িত্ব নেন সঙ্গীতায়োজনের। রানওয়ে ছবিতেও সঙ্গীত পরিচালকের ক্রেডিটের জায়গায় দেখা যায় নির্মাতার নিজের নাম। সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এই অভিজ্ঞতা তার প্রথম কি-না, জানা নেই; তবে চলচ্চিত্রের অন্যান্য অনুসঙ্গের মতো এখানেও সমানভাবে সফল– এমনটা বলা যায়। জানা গেছে, এ ছবির সঙ্গীতায়োজনে এর আগে দেশের দুজন স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালক ব্যর্থ হয়েছেন নির্মাতার চাহিদা মেটাতে। এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত তরুণ সংগীতশিল্পী ও কম্পোজার তানভির আলম সজীবের সাফল্যটাও লক্ষণীয়।

বলা প্রয়োজন, শেষ টাইটেলে যে গীতটি ব্যবহৃত হয়েছে, এর যথার্থ ব্যবহার দেখি গৌতম ঘোষ পরিচালিত পদ্মা নদীর মাঝি ছবিতে কুবেরের মেয়ে গোপীর বিয়ের দৃশ্যে। এটি একটি প্রচলিত গীত থেকেই সংগৃহীত– যা বিয়ের গীত হিসেবে গাওয়া হয় বিভিন্ন অঞ্চলে। রুহুলকে দুধ দিয়ে মুখ ধোঁয়ানোর দৃশ্যে এ গানটির ব্যবহারে পরিচালক হয়তো রুহুলের ভবিষ্যৎ সংসারের সম্ভাবনার ইঙ্গিতটাই দিতে চেয়েছেন।

৯.
চলচ্চিত্রকে রন্ধনশিল্পের সাথে তুলনা করে দেখতে চেয়েছেন অনেক বোদ্ধা। নির্মাতা এখানে প্রধান পাচকের ভূমিকায়। সকল উপাদানের পরিমাণমতো ব্যবহার এবং যথাসময়ে আঁচ উস্কে না দিলে যেমন ব্যাঞ্জনটি স্বাদের হয় না, তেমনি যথাসময়ে আঁচ নামিয়ে না আনলেও সেটি নষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে। যখন সময়জ্ঞান ও পরিমিতিজ্ঞানের সফল সমন্বয় ঘটে, তখনি সে ব্যাঞ্জনটি উপাদেয় হয়ে উঠে সকলের কাছে, এবং পাচক পান শিল্পীর মর্যাদা।

রানওয়ে'র শুটিং । তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর
রানওয়ে’র শুটিংতারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর

রানওয়ের নির্মাতার প্রধানতম শক্তি তার পরিমিতি বোধ। একটি বিরাজমান সমস্যাকে গভীর থেকে দেখবার অর্ন্তদৃষ্টি, সমাজ ও সময়ের পুরো চেহারাটা পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা ও তাকে শিল্পে তুলে আনবার যথার্থ কৌশল– সবই নির্মাতার করায়ত্ত। বাস্তবতা এখানে সত্য প্রকাশে তৎপর; অথচ এর প্রকাশ কখনো রুঢ় হয়ে ওঠে না। আবেগ এখানে অর্ন্তজগতকে ছুঁয়ে যায়; তবে কখনো স্যাঁতস্যাতে হয়ে ওঠে না। কৌতুকপূর্ণ বিদ্রূপ এসে সুক্ষ্ম খোঁচা দিয়ে যায়; হাসি কখনো বেয়াড়া হয়ে ওঠে না। চাপা কান্না এসে জমতে থাকে বুকের ভেতর; তরল প্রকাশে গলে গলে পড়ে না। অভাব এসে থমকে দাঁড়ায় রুহুলদের দরজায়; আরোপিত উপোস এসে বেঁচে থাকা রুদ্ধ করে রাখে না। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া; সে প্রক্রিয়ায় আমরা কখনো বাঁধাগ্রস্ত হই না। অর্থহীন সংলাপ অথবা তথ্যের ভারে কখনো আক্রান্ত হ ইনা। এ ছবির কী তাহলে কোনো দুর্বল দিক নেই? চালুনি দিয়ে দেখলে নিশ্চয় থাকতে পারে। তবে আমরা এখানে শুধু একটি ভালো চলচ্চিত্র দেখবার আনন্দটাই হয়তো উপভোগ করতে চাইব সর্বাগ্রে

চলচ্চিত্রের ছাত্ররা নিশ্চয়ই জানেন, তবুও সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে আরেকটি জানা গল্প ভাগ করে নিই পাঠকের সাথে। রায় বাবুর জীবন সায়াহ্নে তার কাছে একজন ভিনদেশি সংবাদকর্মী জানতে চেয়েছিলেন– তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে নিজের সবচাইতে প্রিয় কোনটি? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন–
          সম্ভবত চারুলতায় আমি সবচেয়ে কম ভুল করেছি!
বলাবাহুল্য, এরপরেও বুঝি সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। সত্যজিৎ রায়ের যোগ্য উত্তরসূরী নির্মাতা তারেক মাসুদ তার নিজের নির্মাণ নিয়ে কী বলবেন, সে কথা শেষ পর্যন্ত আর জানা হয়নি। হয়তো আমাদের ভুল ধরবার চাইতে অনেক অসন্তুষ্টি অথবা, অতৃপ্তি তার নিজের মাঝে ছিল। সময় ও সুযোগমতো তিনি সেসব অনুভুতি আমাদের সাথে ভাগ করবেন; এমনটাই ছিল প্রত্যাশা। সে আর হলো না।

১০.
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের কাছ থেকে ফি বছর হয়তো ছবি পাওয়া যেতো না। তবে যখনই পাওয়া গেছে, সেটা ধ্রুপদী চরিত্র নিয়েই এসেছে, এবং দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী অবস্থান করে নিয়েছে। সে অনুযায়ী সংখ্যার হিসাব না করে আমরা বোধ হয় রবি ঠাকুরের কথা মনে করতে পারি অনায়াসেই। রবি ঠাকুর বলেছিলেন,
          জগতে ভালো জিনিস অল্প হলেই ভালো। নয়তো নিজেরই ভিড়ে সে হয়ে উঠে মধ্যম।
যে ছবি ইতিহাসকে ধারণ করে, যে ছবি ইতিহাস সৃষ্টি করে– এমন ছবির প্রত্যাশা সকলের। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের আগের কাজের সাথে যাদের পরিচয় আছে, তারা সকলেই হয়তো জানেন, তাদের পারফেকশনে পৌঁছার চেষ্টা থাকে নিরন্তর। এ ছবির শুধুমাত্র শব্দ ও আবহ সঙ্গীতের জন্যেই তিনি ব্যয় করেছিলেন চার মাসের বেশি সময়। একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রের প্রতিটি অনুষঙ্গের যথার্থ ব্যবহার ও বিচ্ছুরণ আমরা দেখতে পাই রানওয়ের প্রতিটি ফ্রেমে।

ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির একটি কথা পরিচালকের নিজেরও অনেক প্রিয় ছিল–
          চলচ্চিত্র হচ্ছে মিথ্যার মালা গেঁথে একটি বৃহত্তর সত্যের কাছে পৌছানোর চেষ্টা।
এক্ষেত্রে তারেক মাসুদের মালাটি পূর্বাপর সুগ্রন্থিত। তিনি সত্যের কাছাকাছি কতটা পৌছাতে পেরেছেন, সে সত্য আবিস্কারের ভার শেষ পর্যন্ত দর্শকের উপরই থেকে যায়।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক ও ফিল্মমেকার। ঢাকা, বাংলাদেশ। ডকু-ফিল্ম : রাইস অ্যান্ড প্রে [২০০৮]; দ্য ওয়াল [২০০৯]; বায়োস্কোপ [২০১০]; ফেরা [২০১২]। ফিচার-ফিল্ম : সুতপার ঠিকানা [২০১৫]। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান : ইমেশন ক্রিয়েটর। উপন্যাস : ধূলার অক্ষর [২০০৯]। কাব্যগল্প : ঈশ্বরের ইচ্ছে নেই বলে [২০০৯]। কলাম সংকলন : সৃজনশীলতার সংকটে স্যাটেলাইট চ্যানেল [২০১২]। ফিল্ম-বুক [সম্পাদনা] : চলচ্চিত্রযাত্রা [তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখার সংকলন]। নির্মিতব্য ফিচার ফিল্ম : ঢাকা ড্রিম

3 মন্তব্যগুলো

  1. […] করে শেষদিকের নির্মাণ নরসুন্দর কিংবা রানওয়েসহ প্রতিটি নির্মাণেই এই বিষয়গুলোর যে […]

মন্তব্য লিখুন