মারিয়া লুইসা বেমবার্গ : লাতিন সিনেমার বাতিঘর

0
169

মারিয়া লুইসা বেমবার্গ

জন্ম : ১১ এপ্রিল ১৯২২; বুয়েনোস আইরেস, আর্হেন্তিনা [আর্জেন্টিনা] ।  মৃত্যু : ৭ মে ১৯৯৫; বুয়েনোস আইরেস, আর্হেন্তিনা

মূল । কামিলা বেগলিন ।। অনুবাদ । মুনতাসির রশিদ খান

 

মারিয়া লুইসা বেমবার্গকে ধরা হয় আর্হেন্তিনার [ইংরেজি উচ্চারণ, আর্জেন্টিনা] সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিল্মমেকারদের একজন হিসেবে। তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান অস্কারে সেরা বিদেশি চলচ্চিত্র বিভাগে তার কামিলা [Camila] ফিল্মটি মনোনয়ন পাওয়ায়। তাকে অভিহিত করা হয় মৌলিক নারীবাদী আর অসাধারণ নারী হিসেবে; কেননা, তার সিনেমা যেমন আন্তর্জাতিক দর্শকদের নজর কেড়েছে, তেমনি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বিভিন্ন প্রজন্মের নারী ফিল্মমেকারদের : তার নিজের দেশ আর্হেন্তিনার ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

আমি সাধারণ একজন গল্প-কথক– যে নিজেকে প্রকাশ করেছি সিনেমার মাধ্যমে –আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর, এভাবেই নিজের পরিচয় দিতেন মারিয়া। তার প্রথম ছবি মোমেন্টোস [Momentos] পুরস্কার জিতে নেয় শিকাগো আর কার্টেঙ্গাতে; মিস মেরি [Miss Mary] টোকিও আর ভেনিসে; নোবডি’স ওয়াইফ [Señora de nadie] প্রদর্শিত হয়েছিল তাওরমিনা আর পানামার চলচ্চিত্র উৎসবে; আর সে সময়ই অস্কারে নমিনেশন পায় কামিলা

মারিয়ার সিনেমাকে আর্হেন্তাইন ফিল্মের অধ্যাপক কন্সট্যাঙ্গা বুরুশিয়া অভিহীত করেছেন ‘নারীসুলভ সৌন্দর্য আর পরিশীলিত’ হিসেবে। তার মতে, এই ফিল্মমেকারের সমাজবাদী বার্তা অনেক কম ক্ষতিকর। তিনি আরও বলেন, মারিয়ার অকপট ড্রামাটিক ফিল্মগুলো একটা প্রজন্মের নারীদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে

ক্যামিলা । ১৯৮৪
কামিলা । ১৯৮৪

ফিল্মমেকার হিসেবে মারিয়া বেছে নিয়েছিলেন বিভিন্ন সামাজিক প্রসঙ্গ; বিশেষ করে, অভিজাত সমাজে নারীর সংগ্রাম। তিনি দেখিয়েছেন অবদমিত সম্পর্কগুলোকে, যেখানে প্রধান চরিত্র হচ্ছে নারী– যে কিনা তথাগত লিঙ্গবৈষম্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করে দেয়। বুরুশিয়ার মতে, মারিয়ার সিনেমাকে বৈপ্লবিক না বলে উদ্ঘাটমূলক বলাই শ্রেয়; আর এই মৌলিকতা ও সৌন্দর্যবোধের কারণেই আর্হেন্তিনার সিনেমা সবার আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছে।

মারিয়ার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল লেখিকা হিসেবে; আর তিনি ফিল্মমেকিংয়ে আসেন– তার স্ক্রিপ্ট যেন সিনেমায় ঠিকমতো রূপান্তরিত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে। এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক প্রযোজক আর পরিবেশক রোজা বোশ্চের কথা থেকে। বোশ্চ আরও জানিয়েছেন, এই ফিল্মমেকারের ফিল্মমেকিং প্রক্রিয়ার নানা বাধা বিপত্তির কথা; বিশেষ করে নোবডি’স ওয়াইফ-এর ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, এই ফিল্মটি যখন মুক্তি পায়, ফকল্যান্ড [ইংল্যান্ড বনাম আর্হেন্তিনা] যুদ্ধ তখন তুঙ্গে; এর মধ্যেই আমরা সারা পৃথিবীতে ফিল্মটিকে পাঠাতে পেরেছি। তখন সিনেমা মানেই ছিল ২০টা বিরাট গোল বাক্স, যার ওজন সব মিলিয়ে প্রায় ২০ কেজি। জাহাজে করে পাঠাতে গাদা গাদা পেপারওয়ার্ক করতে হতো প্রতিবার দেশের সীমান্ত পার করানোর সময়। সে সময়ে মারিয়ার প্রায় অখ্যাত সিনেমা দেশ-বিদেশের নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বোশ্চ আর শিলা হুইটকারের চেষ্টায় পাঠানো হয়েছিল; শিলা ছিলেন তখন লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ডিরেক্টর।

মারিয়ার তৃতীয় সিনেমা কামিলা ছিল বাণিজ্য-সফল। এই ফিল্মের প্রযোজক লিটা স্টান্টিক ফিল্মটিকে অভিহীত করেছেন রিও ডি প্লাটার রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট হিসেবে। মারিয়া আর স্টান্টিক প্রতিষ্ঠা করেন আর্হেন্তিনার প্রথম নারীদের ফিল্ম কোম্পানি জিয়া। মারিয়ার প্রযোজক হিসেবে দশ বছর কাজ করেন স্টান্টিক; তিনি ভূমিকা রাখেন এই ফিল্মমেকারের পাঁচটি ফিল্মে। তিনি বলেন, মারিয়া লুইসার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোতেই মানুষ হিসেবে আমি সব থেকে বেশি শিখেছি আর পরিপক্ক হয়ে উঠেছি। তার সাথে কাজ করা ছিল সারা দুনিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ব্যাপার। অবশ্য মারিয়ার সঙ্গে প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরুর আগে থেকেই সিনে-জগতে খ্যাতিমান ছিলেন স্টান্টিক। তার এই পরিচিতি কাজে লেগেছে মারিয়ার সিনেমাকে শুরুর দিনগুলোতে পরিচিত করতে। মোমেন্টোস, মিস মেরি, নোবডি’স ওয়াইফ, কামিলা আর আই, দ্য ওর্স্ট অব অল [Yo, la peor de todas] –এই পাঁচটি সিনেমা এই ফিল্মমেকার-প্রডিউসার জুটির সৃষ্টি।

মিস ম্যারি । ১৯৮৬
মিস মেরি । ১৯৮৬

নিজের প্রায় সব সিনেমাতেই সেই সব নারী চরিত্রকে দেখাতে চেয়েছেন মারিয়া– যারা নিজের জন্য ঠিক করে দেওয়া রোল-মডেলকে অনুসরণ করে না। এ জন্যই আর্হেন্তিনার জনৈক রাষ্ট্রদূত তা্র সম্পর্কে বলেছেন, তিনি অসাধারণ নারী; তবে একইসঙ্গে মৌলিক নারীবাদীও।

মারিয়ার ফিল্ম-যাত্রার শুরুটা অদ্ভুত। অভিজাত এক আর্হেন্তাইন পরিবারে জন্ম নিয়ে তিনি সমাজের ঠিক করে দেওয়া শুধু স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকা পালন করতে রাজি ছিলেন না। যদিও সামাজিক প্রত্যাশা অনুযায়ী ২২ বছরে তিনি বিয়ে করেন; তবে তার প্রতিবাদ প্রকাশ পায় নিজের শুরুর দিকের শর্টফিল্মে, এবং ১৯৭৫ সালে আর্কিটেক্ট স্বামী কার্লোস মিগুয়েইনের সঙ্গে ডিভোর্সের মধ্য দিয়ে। এল মুন্ডো দে লা মুজের আর জুগুনেট শর্টফিল্ম-দুটিতে তিনি প্রকাশ করেছেন, সমাজের ঠিক করে দেওয়া চরিত্রের প্রতি অবাধ্যতা ও সংঘাত। তার নারীবাদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ পায় ইউএফএ-এ [ইউনিয়ন ফেমিনিস্টা আর্হেন্তিনা] সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে, আর ৫৮ বছর বয়সে তিনি নির্মাণ করেন নিজের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

নারীবাদের পটভূমিকায় গড়া মারিয়ার সিনেমা বিভিন্ন সমাজ আর সময়ের নারীদের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পেরেছে। পরিবার, যৌনতা আর সমকামের মতো বিতর্কিত বিষয় সিনেমার পর্দায় এনে তিনি যেমন ঝুঁকি নিয়েছেন, আর সে কারণেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তার কদর অনেক বেশি।

মিস মেরিতে শিক্ষিকার ভূমিকায় অভিনয় করা জুলি ক্রিস্টি এই ফিল্মমেকার সম্পর্কে বলেন, তার মনটা ছিল দারুণ, দুরন্ত আর সাহসী। তিনি নির্ভীকভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সমাজের শ্রেণীপ্রথা, ক্ষতিকর আর অপ্রাসঙ্গিকতার প্রতিমিস মেরি সিনেমায় এই ফিল্মমেকার যেন দেখাতে চেয়েছিলেন নিজেরই এক শিক্ষিকাকে। বনেদি পরিবারে বেড়ে ওঠা মারিয়া দেখাতে চেয়েছেন কিশোরীদের দমিয়ে রাখা যৌনতাকে। এ সিনেমা পরবর্তী প্রজন্মের ফিল্মমেকারদের অনেকের কাছেই প্রিয় হয়ে ওঠে, এখানে মারিয়ার আত্মজৈবনিক দিকটি রয়েছে বলে।

আই, দ্য ওর্স্ট অব অল । ১৯৯০
আই, দ্য ওর্স্ট অব অল । ১৯৯০

আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টক অ্যাবাউট ইট [De eso no se habla], ১৯৯৩ সালে নির্মিত মারিয়ার শেষ সিনেমা। যদিও তার পরবর্তী চিত্রনাট্য ইম্পোস্টার [El impostor] প্রমাণ করে, ততদিনে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে গেলেও, ফিল্মের প্রতি তার তীব্র আসক্তি রয়ে গিয়েছিল। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে মারা যান তিনি; কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, তার কাজের মধ্য দিয়ে তিনি রেখে গেছে নিজের অদম্য সত্তার স্বাক্ষ্য।


কামিলা বেগলিন । স্ক্রিনরাইটার, ইতালি

সূত্র লাতিনো লাইফ । জার্নাল । যুক্তরাজ্য
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কি-বোর্ডিস্ট; বেজিস্ট; ড্রামার; ব্যাংকার; সিনে-প্রেমী । ঢাকা, বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন