টনি গ্যাটলিফ : সিনেমার জিপসি-ম্যান

0
244

টনি গ্যাটলিফ

জন্ম : ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ । আলজিয়ার্স, আলজেরিয়া

লিখেছেন । রুদ্র আরিফ

বিত্র কবিতার মতো তুষার ঝরছে। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বেজে উঠছে লোকসঙ্গীতের মন কেমন-করা কথা ও সুর। জনৈক যুবক এসে দাঁড়ালেন রাস্তায়। তিনি এক আগন্তুক। ইতস্তত; তবু স্বতঃস্ফূর্ত। কোনদিকে যাবেন তিনি? ডানে? বামে? সামনে? পেছনে? নিশ্চিত নন; শুধু জানেন, বেড়িয়েছেন নোরা লুকার খোঁজে। নোরা লুকা– এক হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠশিল্পী। তাকে খুঁজে বের করতে যতদূর প্রয়োজন, যেতে হবে এই আগন্তুককে। আর এভাবে যেতে যেতেই, পথ ও পথিকের ঘোরে তিনি হাজির হন একটি জিপসি-বসতির ভেতর। সেখানে তার ভাষা না বোঝা সেই জিপসি-গাতকদের হাসি-কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি। তবু তার অনুসন্ধান চলতেই থাকে। তা তাকে নিয়ে যায় জীবনের অন্যতর গভীর ঘোরের ভেতর। অনিন্দ্য সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ, সিনে-ক্যামেরার কাব্যময় ইমেজ, নাটকীয়তার মধ্যে বাস্তবময় অভিনয়ের জাদু, অফুরান তবু তাগড়া উইট-হিউমার-স্যাটেয়ার আর লোকসঙ্গীত বা বলা ভালো, জিপসি-মিউজিকের পৌরাণিক ব্যবহার– এই নিয়ে ঋদ্ধ হয় একটি সিনেমা। আর তা সিনে-জগতের জাঁদরেল সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকের কাছে হয়ে ওঠে একটি অনবদ্য শস্য। দেখা পায় তারা সমকালীন সিনেমার একজন স্বতন্ত্র ও শক্তিমান কারিগরের। যদিও এটিই এই ফিল্মমেকারের প্রথম কাজ নয়; বলা ভালো, এ ধারার প্রথম কাজও নয় তার। তবু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটিই তার ও জিপসি-সম্প্রদায়ের তরফ থেকে ফেলে প্রথম ব্যাপক-বিস্তারি ঢেউ। সিনেমাটির নাম দ্য ক্রেজি স্ট্রেঞ্জার [Gadjo dilo]। আর ফিল্মমেকারের নাম টনি গ্যাটলিফ।

দ্য ক্রেজি স্ট্রেঞ্জার । বন্ধুর বাড়ি গিয়ে জানা গেলো, বন্ধু মৃত! অতএব, বন্ধুর কবর ঘিরে হয়ে যাক নাচ-গান!
দ্য ক্রেজি স্ট্রেঞ্জার । বন্ধুর বাড়ি গিয়ে জানা গেলো, বন্ধু মৃত! অতএব, বন্ধুর কবর ঘিরে, মদ আর নাচ-গানেই জানানো যাক বন্ধুকে ভালোবাসা!

রোমানি [আলজেরিয়ান জিপসি-জাতি] বংশোদ্ভুত ফরাসি ফিল্মমেকার, স্ক্রিপ্টরাইটার, মিউজিক কম্পোজার, অভিনেতা ও প্রডিউসার গ্যাটলিফের জন্মনাম মাইকেল ডাহমানি। জন্ম ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮; আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে; কাবাইল [আদিবাসি জাতিসত্ত্বা] জাতির বাবা আর রোমানি জাতির মার গরিব পরিবারে। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে জন্মভূমিতেই। কিন্তু আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ব্যর্থতার ফলশ্রুতিতে, পরাধীন স্বদেশের বেশির ভাগ অধিবাসীর মতোই, বেঁচে থাকার পথ খুঁজতে তিনি পাড়ি জমান শাসক-রাষ্ট্র ফ্রান্সে। সেটা ১৯৬০ সালের ঘটনা। পরনের জামা-কাপড় সম্বল করে এই কিশোর একা একা চষে বেড়ান প্যারিসের অলিগলি। আর একটু উষ্ণতায় ঘুমোনোর জন্য বেছে নেন রূপসী সে শহরের সিনেমা-হলগুলোকে।

অবশ্য, সিনেমার প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ তার মনে অজান্তেই বোনা হয়ে গিয়েছিল শৈশবের দিনগুলোতে। আর তার নেপথ্যে ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক– যিনি তখন একটি সিক্সটিন মিলিমিটার প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ফিল্ম দেখাতেন। এ প্রসঙ্গে গ্যাটলিফের ভাষ্য,

[জ্যঁ] ভিগো, [জ্যঁ] রোনোয়া থেকে শুরু করে জন ফোর্ড ও [চার্লি] চ্যাপলিনের সিনেমা দেখতাম তখন।… আর এ-ই হলো আমার সিনেমার পাঠ।

প্যারিসে এসে সেই ঘোর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আর ছিন্নমূলের মতো কাটানো বছরগুলোর একদিন তুমুল সাহস নিয়ে ঠিক করে ফেলেন– তার স্বপ্নের নায়ক, অভিনেতা মাইকেল সিমনের সঙ্গে দেখা করবেন। সেই সন্ধ্যায় একটি মঞ্চনাটকে অভিনয় শেষে ড্রেসিংরুমে ফিরে সিমন দেখেন, সেখানে শুয়ে আছে এক বালক। সেই ঘটনাকে পরে গ্যাটলিফ স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে,

মনে হচ্ছিল, আমি যেন সিনেমা দেখছি। বিশাল লাইটবক্সের উপর পর্দাটা সরে গেল, আর সামনে এসে দাঁড়ালেন সত্যিকারের মাইকেল সিমন। সব ভক্তরা চলে যেতেই আমার দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি; জানতে চাইলেন– কী চাই? তাকে বললাম, আমি সিনেমা বানাতে চাই। আপনার কি মনে হয়, আমার পক্ষে সম্ভব? অনেকক্ষণ চুপ মেরে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর ভেসে এলো তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর : অবশ্যই সম্ভব।

এরপর সিমন নিজ থিয়েটারের ম্যানেজারের বরাবর একটি চিঠি লিখে ধরিয়ে দেন গ্যাটলিফের হাতে। আর তারই প্রতিক্রিয়ায় ড্রামা কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান গ্যাটলিফ। সেটা ১৯৬৬ সালের ঘটনা।

এক্সাইলস । দেয়ালে ঠেকে গেছে পিঠ, দেয়ালে রক্তের দাগ!
এক্সাইলস । দেয়ালে ঠেকে গেছে পিঠ, দেয়ালে রক্তের দাগ! এখন তুমি কোথায় যাবে, জিপসি?

অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিজের স্বভাবজাত রোমানি জাতিগত প্রতিভার জোরে খুব দ্রুতই থিয়েটার স্কুলে নিজের একটি সুনিশ্চিত জায়গা করে নেন তিনি। মঞ্চে কাজ করেই জীবনের শুরুর দিকের অনেকগুলো বছর জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। আর কাজ শুরুর পাঁচ বছর পর, থিয়েটারে অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে নিজের প্রথম স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেন। কিন্তু মঞ্চের জীবন তার ভালো লাগছিল না। তাই সিনেমার টানে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। আর সুদীর্ঘ অন্তর্গত প্রস্তুতি শেষে ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করেন নিজের প্রথম শর্টফিল্ম Max l’Indien। একই বছর নির্মাণ করেন আরেকটি শর্টফিল্ম, Maussane

সিনেমার গতানুগতিক পথে হাঁটার কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের কোনো ইচ্ছে সংবেদনশীল এই ফিল্মমেকারের শুরু থেকেই ছিল না। ফলে আশির দশকের শুরুতে এসে নিজেকে ঝালিয়ে নিতে একটি অন্যতর উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯৮১ সালে চলে যান স্পেন ট্যুরে; আর পুরোটা সময় কাটান গ্রানাডা ও সেভিয়ার জিপসিদের সঙ্গে। সে সময় নিজের ভেতরে এতকাল এক রকম সুপ্ত থাকা জিপসি-সত্ত্বাকে সুতীব্রভাবে উপলব্ধি করেন তিনি। নির্মাণ করেন Corre Gitano। এ প্রসঙ্গে গ্যাটলিফের ভাষ্য,

এই ফিল্মটিতেই আমি প্রথমবারের মতো নিজের জিপসি অবস্থাকে তুলে ধরেছি। এই ফিল্মটিই প্রথম জানান দিয়েছে, আমিও জিপসি। উৎপীড়ন ও প্রলোভনের ভেতরেও আমি জিপসি। আমি টিকে আছি; আমরা টিকে আছি।

অন্যদিকে, ফিল্মমেকার হিসেবে তার জন্য প্রথম সাফল্য বয়ে আনে Les Princes [১৯৮৩]। প্যারিসের শহরতলীতে বসবাসরত জিপসিদের জীবন নিয়ে এর কাহিনী। ১৯৯০ সালে একজন ট্রাক ড্রাইভার ও এক বিতাড়িত বৃদ্ধার নিরুদ্দেশ ভ্রমণের কাহিনী নিয়ে নির্মাণ করেন গ্যাসপার্ড অ্যান্ড রবিনসন [Gaspard et Robinson]। বেকারত্বের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে একটি বন্ধুত্বের কাহিনী নিয়ে এটি একটি সোস্যাল কমেডি ফিল্ম। ১৯৯৩ সালে জিপসি-জগতের দরজা নতুন করে খুলে যায় গ্যাটলিফের সামনে। আর হৃদয়ে সে দোলাকে ধারণ করে ফিচার ফিল্ম ও ডকুমেন্টারির মধ্যে দোদুল্যমান ফরমেটে নির্মাণ করেন সেফ জার্নি [Latcho Drom]। ভারতের, বিশেষ করে রাজস্থানের অধিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী মিউজিকের সুর দিয়ে এ সিনেমার শুরু। এর শুটিং করতে ছোট্ট একটি টিম নিয়ে, সারা বছর ধরে মিসর, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সে ঘুরে বেড়ান এই ফিল্মমেকার। আর স্পেনের আন্দালুসিয়ায় গিয়ে শেষ করেন। এই সুদীর্ঘ জার্নিটি আদতে রোমা [জিপসি সম্প্রদায়] সংস্কৃতির একটি সুনিপুণ জার্নি হয়ে ফুটে উঠেছে এবং তাতে জিপসি মিউজিকের সম্ভাব্য সবগুলো ধরণ ও সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করেন গ্যাটলিফ। এভাবে ফিল্মটি ধারণ করে আছে হাজারও বছরের সংস্কৃতিকে। এ প্রসঙ্গে গ্যাটলিফের ভাষ্য,

আমার কাছে এই ফিল্মটি একটি প্রার্থনা সঙ্গীত। এটি হলো শব্দের প্রথম সেন্স। এটি হলো তেমনই এক ফিল্ম, যা কিনা মিউজিকের ভেতর দিয়ে সকল জিপসি মানুষের সঙ্গে একটি সংযোগকে পুনর্সৃষ্টি করেছে।

সেফ জার্নি । নাচো, জিপসি; কিন্তু হাততালিতে ক্ষুধা মেটবে তো?
সেফ জার্নি । নাচো, জিপসি; কিন্তু হাততালিতে ক্ষুধা মেটবে তো?

আর এই ফিল্মকে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা ‘জিপসি সংস্কৃতির একটি সুতীব্র গীতিকাব্যিক প্রতিকৃতি’ হিসেবে অভিহীত করেছে।

পরিবার-পরিজনহীন একটি দশ বছর বয়সী শিশুর ফ্রান্সের নিসে শহরে হাজির হওয়ার কাহিনী নিয়ে ১৯৯৫ সালে গ্যাটলিফ নির্মাণ করেন Mondo। এরপর মাঝখানে দুটি ডকুমেন্টারি বানানোর পর আবারও মনোনিবেশ করেন জিপসি-জগতে। বানান বিখ্যাত দ্য ক্রেজি স্ট্রেঞ্জার। আর ২০০৪ সালে যে এক্সাইলস-এর জন্য জিতে নেন কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বেস্ট ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড– সেটিতেও গাথা আছে জিপসিদের আনন্দ-বেদনা আর নিরন্তর জীবনসংগ্রামের অনবদ্য সব ইমেজ।

সিনেমায় জীবনের, বিশেষত জিপসি-জীবনের সুনিপুণ বুননি আর কাব্যময় ইমেজ ও পৌরাণিক মিউজিকের সন্নিবেশে, দারিদ্র ও প্রত্যাখানের ভেতর দিয়ে জীবনযাপন করা জিপসি সম্প্রদায়ের প্রতি আপসহীন পর্যবেক্ষণকারী ফিল্মমেকারের অপর নাম হয়ে উঠেছে টনি গ্যাটলিফ। ফিল্মের স্বতন্ত্র ভাষা, নিজস্ব নির্মাণ কৌশল ও সততা তাকে তুলে এনেছে অনন্য উচ্চতায়। চরিত্র ও প্লটের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ একই সিনেমায় ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি, রোমানিয়ানসহ বহু ভাষার ব্যবহার করা এই ফিল্মমেকারের অন্যান্য ফিল্মের মধ্যে রয়েছে– La Tête en ruines [১৯৭৫], La Terre au ventre [১৯৭৮], La Rue du départ [১৯৮৫], Pleure pas my love [১৯৮৯], Lucumi, l’Enfant Rumbeiro de Cuba [১৯৯৫], Je suis né d’une cigogne [১৯৯৯], Vengo [২০০০], Swing [২০০২], Visions d’Europe: Paris by Night [২০০৪], Transylvania [২০০৬], Korkoro [২০০৯], Indignados [২০১২] ও Geronimo [২০১৪]।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন