কাজী হায়াতের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার । তৃতীয়/শেষ কিস্তি

1
464

কাজী হায়াৎ। জন্মঃ ১৯৪৭; গোপালগঞ্জ। বাংলাদেশি সিনেমার কিংবদন্তি ফিল্মমেকার। ২৮ মে ২০১৬, বৃষ্টিস্নাত দুপুরে, তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে মুখোমুখি হয়েছিলাম পঞ্চাশটি ফিচার ফিল্মের এই রাগি নির্মাতার। একটানা আড়াই ঘণ্টার সেই আলাপের তিন কিস্তির শেষটি মুদ্রিত হলো আজ। বলে রাখি, আলাপের সহজাত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে, ট্রান্সক্রিপ্ট করা হলো অবিকল; ফলে, বাক্যে অসঙ্গতি থাকাই স্বাভাবিক…

আগের কিস্তি
পোস্টার । সিপাহী
পোস্টার । সিপাহী

রুদ্র আরিফ : ন্যারেশনের ইউজটা আপনার সিনেমায় প্রায়ই দেখা যায়। এবং আরেকটা জিনিস দেখা যায় যে, আমরা সাধারণত যাত্রায় একটা চরিত্র দেখি– ‘বিবেক’। আপনার সিনেমায় একটা চরিত্র প্রায়ই… হয়তো, কবি; যেমন, ‘ধর’-এ কবি; বা কেউ একজন– এ রকম একটা চরিত্র সৃষ্টি করেন।

কাজী হায়াৎ : আমি সহজে বোঝাতে চাই সবকিছু; কঠিন করতে চাই না কিছুই। আমি জানি, আর্টিস্টিক বিষয়টাই, নান্দনিক বিষয়টাই একটু কষ্ট করে বুঝে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু আমি চাই না দর্শককে কষ্ট দিতে। সহজে বুঝিয়ে দিতে চাই– হোয়াট আই ওয়ান্ট টু স্যে।

রুদ্র আরিফ : আমরা যদি অ্যাভারেজে ‘ফাদার’ থেকে লাস্ট সিনেমা পর্যন্ত ধরি, আপনার সিনেমায় দুটি মেইন থিম আলাদা করা যায়। একটা হচ্ছে– জিদ; আরেকটা হচ্ছে– স্পর্শকাতর বিষয়গুলা নিয়ে আপনি কাজ করেন। ‘ফাদার’-এও কিন্তু স্পর্শকাতর বিষয়টা ছিল– ইমোশনাল জায়গা থেকে। তারপরে আপনি কনসাস হলেন যে, রাজনৈতিক বিষয়গুলা নিয়ে। এখন আবার সামাজিক…। এই যে স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করা– এই প্যাশনটা কীভাবে ঢুকল মাথায়?

কাজী হায়াৎ : আমি মনে করি, সিনেমার লোক হিসেবে এবং এ দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে প্রত্যেকেরই, শুধু আমার না, প্রত্যেকেরই উচিত– সমাজে বিনোদনের মাধ্যমেও কিছু ম্যাসেজ জানিয়ে দেওয়া; কিছু মানুষকে যদি সচেতন করা যায়, যদি সমাজকে বিশুদ্ধ করার একটা প্রচেষ্টা থাকে, তাহলে সাম পিপল মে বি মুটিভেটেড। যেমন, ‘আম্মাজান’-এর বেলায় ঘটেছিল একটা ঘটনা– ইনফ্রন্ট অব মি : আমি, মান্না সবাই উপস্থিত ছিলাম। এক মহিলা একদিন এই এফডিসিতেই শুটিংয়ের সময়, মান্না আর আমি শুটিংয়ে ছিলাম… এক মহিলা আসছে; এসে মান্নাকে… আমাকে তো কেউ খুব একটা চিনে না… মান্নাকে বলতেছে, “ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যে ‘আম্মাজান’ ছবিটা করছেন না? আমার ছেলেটা ভালো হয়ে গেছে আপনার ছবিটা দেখে! আপনারে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব!’

মান্না বলল, ‘কীভাবে? ভালো হইছে কীভাবে?’

বলল, “সে আপনার ‘আম্মাজান’ ছবি দেখছে। খুব দুষ্ট ছেলে; খুব জ্বালাইত আমারে। হঠাৎ দেখি একদিন, রান্নাঘরে সে ফ্যান আইনা… ফ্যানের লাইন টাইনা আইনা… আমার যাতে বাতাস লাগে… আমারে বাতাস দিতেছে। আমি অবাক হইলাম ওর দিক তাকাইয়া। ‘তুই বাতাস দিতেছিস ক্যান?’ কয়, ‘মা, আমি আম্মাজান ছবি দেখছি। মা আমি আইজ থিকা আর দুষ্টামি করব না। তোমারে কষ্ট দিমু না।’…”

–তো, ইট’স অ্যা লেসন। আমি একটা ছেলেরে তো মোটিভেটেড করতে পেরেছি?

রুদ্র আরিফ : কিন্তু কমার্সিয়াল সিনেমার কি এর বিপরীত একটা প্রভাবও থাকে না; যেমন ধরেন, হয়তো ডিপজলের কোনো একটা খুনের দৃশ্য… ঐটা কাউকে… অভিযোগ আরকি…

কাজী হায়াৎ : একটা কথা মনে রাখবেন আপনি, যেটা আমি অনেক জায়গায় বলেছি, অনেক ইন্টারভিউতেও বলেছি, সে হলো– সিনেমা এমন একটি বিষয় : একটি ভালো, একটি মন্দ; মন্দের মধ্যে দ্বন্দ্ব; মন্দের পরাজয়, ভালোর জয়। আপনি যখন সিনেমা-হলে ঢুকবেন, তখন কিন্তু আপনি কোন সমাজের লোক– আপনি হিন্দু কি মুসলমান, কি রাজনীতি করেন, কোন রাজনীতি করেন, কী করেন– সমস্ত কিছু ডিসকার্ড হয়ে যাবে আপনার থেকে। আপনি একক একজন ভালোমানুষ। সেই ভালোমানুষটা সিনেমার থেকে যতটুকু ভালো, ততটুকুই গ্রহণ করে; খারাপটা বর্জন করে। এবং যখন একজন খারাপ মানুষ শাস্তি পায়, তখন সে আনন্দিত হয়, উৎফুল্ল হয়, তালি দেয়। এবং যদি শাস্তি না পায়, তাহলে সে খুব মনে কষ্ট পায়। ভিলেন যদি না মরে, বা তার কোনো শাস্তি না হয়, তখন দেখবেন যে, সেই সিনেমাটা চলে না। একজন মহিলা– শাশুড়ি, মনে করেন, বেটার বউকে যদি দুষ্টমি করে, অমুক করে, তমুক করে, তাকে যদি শেষ পর্যন্ত মার কিংবা চুল-টানাও না দেয়, তাও কিন্তু ছবি চলে না। অর্থাৎ, মন্দের পরাজয় দেখতে চায় [দর্শক]।

তাহলে কী হলো? একজন দর্শক কী গ্রহণ করল শেষ পর্যন্ত সিনেমা দেখে? মন্দটা না; ভালোটা। এবং এটাই নিয়ম। সব সিনেমায় এটাই নিয়ম। ভালোটাই গ্রহণ করে।

পোস্টার । আব্বাজান
পোস্টার । আব্বাজান

রুদ্র আরিফ : আমাদের সিনেমায় ধরেন জনপ্রিয়তা বা দর্শকপ্রিয়তা কমার জন্য মোটা দাগে একটা বিষয়কে মার্ক করা হয়, সেটা হচ্ছে– মান্নার মৃত্যু।

কাজী হায়াৎ : …অনেকটা তা-ই। একটা বিগ খালি হয়ে গেছে।

রুদ্র আরিফ : …আমাদের এখনকার সিনেমার… আমি একটা ইন্টারভিউতে দেখতেছিলাম যে, সোহেল রানা বা মাসুদ পারভেজ– উনি বলতেছিলেন যে, এফডিসি বা বাংলাদেশি সিনেমা কিনিক্যালি ডেড; ওটা কোমায় চলে গেছে; নতুন করে করতে হবে। আপনি কি একমত– আপনার অবজারভেশনের জায়গা থেকে?

কাজী হায়াৎ : হ্যাঁ, কিনিক্যালি ডেড। এখন যে সিনেমাগুলো হচ্ছে, তারা… দেশের তথাকথিত প্রযোজকরা সিনেমা বানাচ্ছে না; নতুন ক্যাপিটাল আসছে : যারা [যাদের] বিজনেস সম্পর্কে আইডিয়া নাই, তারা আসছে। নাইনটি নাইন পারসেন্ট এ রকম। [আবার ফোন ও মুহূর্তের বিরতি….]

রুদ্র আরিফ : …কিনিক্যালি ডেড নিয়ে কথা হচ্ছিল…

কাজী হায়াৎ : কিনিক্যালি ডেড– দ্যাট মিনস, সিনেমা হচ্ছে; সিনেমা ব্যবসা হচ্ছে [করছে] না। একটা তথ্য আপনাকে বলে দেই : আজ থেকে দুই বছর আগে এ দেশে প্রতিদিন সিনেমা ওয়াচার ছিল, এভরিডে চার থেকে তিন লক্ষ। সেটি নেমে এখন… এটি সিনেমা হলে গিয়ে দেখা… সেটি নেমে এখন অনলি টুয়েন্টি ফাইভ থাউজেন্ডে এসেছে। টোটাল সিনেমা হলের অকোপেন্সি এখন সারা উইক মিলে টেন পারসেন্ট। তাহলে এটিকে কিনিক্যালি ডেড বলা হবে না কেন? ইট ইজ নট কিনিক্যালি ডেড, মানে ঐ যে, সোহেল রানা তো বলছে– মাস্ক পরাইয়া অক্সিজেন দিচ্ছে; আমি বলব, না, ইট ইজ ডেড। এখন একে কবর দেওয়া হবে– সেই আয়োজন চলছে।

রুদ্র আরিফ : এইখান থেকে উত্থানের আপনি জায়গাগুলা কী দেখেন?

কাজী হায়াৎ : জায়গাগুলো হলো, সিনেমা দেখার ক্ষেত্রের পরিবর্তন করতে হবে। ক্ষেত্র পরিবর্তন করতে হবে। যেমন, গিমিক আনতে হবে সিনেমায়। ওয়ার্ল্ড সিনেমায় গিমিক আছে। পারহ্যাপস, আপনি আপনার মোবাইলে খুঁজলে পাবেন, ইন্টারনেট থাকলে– ভিআর ফিল্ম। ভিআর ফিল্ম দেখার জন্যে আপনাকে, ঐ যে, একটা ভিআর কিনতে হবে; পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটা ভিআর কিনতে হবে। এবং ভিআর ফিল্ম আপনার মোবাইলে সাপোর্ট করে কিনা, জানি না; যদি ভিআর কিনে দেখেন আপনি, তাহলে দেখবেন– থ্রি সিক্সটি, লেখা আছে, থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে শুটিং করা। ঠিক এইভাবে [হাত নাড়িয়ে দেখিয়ে বলছেন] ক্যামেরাটা এইখানে ধরা তো, এইখান থেকে টোটাল এইটা এইটা শুট করতাছে। মানে একটা লোক হেঁটে এই জায়গা দিয়ে যেয়ে, এই জায়গা যেয়ে, এই জায়গা দিয়ে, এই জায়গা দিয়ে চলে গেল।

প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নয়ন হয়েছে সিনেমার। সেই প্রযুক্তি আনতে হবে। আপনি ঐ যে, সিনেমার হলের ছোট একটা পর্দায় বসে একটা সিনেমা দেখবেন– যার সাউন্ড ভালো না, স্টেরিও সাউন্ড না– এইসব সিনেমা দেখতে আমাদের দেশের লোক প্রস্তুত না। এইটা মোবাইলেই আছে। তারা কেন এই গরমের মধ্যে সিনেমা-হলে যাবে? আর, মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে। আমার কসিমুদ্দির ছেলেটা, যে কৃষকের ছেলে, সেও এখন ফুলপ্যান্ট পরে; জিন্সের প্যান্ট পরে, তার পায়ে জুতো। বাংলাদেশের শতকরা নিরানব্বই ভাগ লোকের পায়ে জুতো আছে– যেটা আজ থেকে দশ বছর আগেও ছিল না। একজন কৃষকেরও একটা মোবাইল আছে। এই যে আমার বাড়ির কামলা, কাজ করে– তারও একটা মোবাইল আছে। সেও ২০ টাকা, ৩০ টাকা খরচ করে দৈনিক মোবাইলে।

অর্থাৎ, আমি বলছি যে, মানুষের একটা পরিবর্তন হয়েছে এখন। আপনার সিনেমা-হলগুলো তৈরি হয়েছিল ষাটের দশকে। কিংবা পরবর্তীতে আপনি সত্তরের পরে করেছেন। তখন দর্শকদের চাটাইতে বসতে দিয়েছেন, এবং গরম : ফ্যান নাই, সাউন্ড নাই, পর্দা ছোট, দুইটা মাইকের হর্ন কিনে আপনি শব্দ শোনাইতেছেন… দে আর নট প্রিপেয়ার টু সি দ্যাট মুভি। ঐ জায়গায় তারা বসতে রাজি না। আপনাকে বসার জায়গায় সোফা দিতে হবে; এয়ার কন্ডিশন দিতে হবে; আপনার প্রযুক্তিগতভাবে উন্নয়ন হতে হবে। তাহলে সিনেমা চলবে। আর এটা এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে, আমি বলছি দাফনের কথা, এখন প্রাইম মিনিস্টার এসে যদি দাফন করে দেন– ভালো; আর প্রাইম মিনিস্টার যদি বলেন যে– ‘না, মাস্কটা খুলে একটু দেখা যাক; জীবিত থাকলে আমি চেষ্টা করব ওকে বিদেশে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করতে’। এটি একমাত্র প্রাইম মিনিস্টার পারেন– জীবিত রাখতে। কীভাবে?

আই হ্যাভ অ্যা প্রজেক্ট অলসো; আইডিয়া অলসো। কমপক্ষে একশোটি… আনন্দভুবন বলেন, যে কোনো নামে হয়, হাইওয়ের পাশে একশোটি কমপ্লেক্স হতে হবে। যে কমপ্লেক্সের প্রথমেই থাকবে দুটো সিনেমা-হল। আর যার এরিয়া থাকবে কমপক্ষে দুই থেকে তিন একর জায়গা। সেখানে একটা ডিপার্টমেন্টাল শপ থাকবে। ফার্স্টফুডের দোকান থাকবে। একটা ব্যাংক থাকবে। একটা এটিএম বুথ থাকবে। যার মেইন একটা… চতুর্দিকে জেলখানার ওয়াল দিয়ে ঘেরাও করা থাকবে। যার মেইন গেট দিয়ে ঢুকতেই একটা প্রবেশমূল্য থাকবে। ছোট্ট একটা শিশুপার্ক থাকতে হবে। তারপর ছোট্ট একটা জু থাকলে ভালো।

হাইওয়ের পাশে মানে, জেলা-শহর থেকে দুই থেকে আড়াই মাইলের মধ্যে। এ রকম একশোটি কমপ্লেক্স করতে, যেখানে বাংলাদেশের দুই লক্ষ হাজার কোটি টাকার বাজেট হচ্ছে, সেখানে আমার মনে হয়, এই সেক্টরে যদি প্রাইম মিনিস্টার ইচ্ছা করেন যে, ‘পনের হাজার কোটি টাকা আমি এই সেক্টরে খরচ করব’; তাহলে এতে হবে কি– অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেটা, সেটাও দেখতে পাবে লোকে; রাস্তার পাশে একটা বিনোদন ক্ষেত্র। গাড়ি চালিয়ে লোকে চলে যাবে। এই মাওয়া রোডে যদি দুইটা করা হয় : একটা কেরাণীগঞ্জে, একটা মাওয়ার পয়েন্টে। একটা গোপালগঞ্জ, একটা খুলনায়। ওদিকে যশোর। এদিকে ফরিদপুরের কাছে একটা। এদিকে আরিচার কাছে একটা। মানিকগঞ্জের কাছে একটা…

রুদ্র আরিফ : …তাহলে ছড়ায়াও যাবে…

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ। এদিকে চিটাগাং হাইওয়েতে কাঁচপুরে একটা। কুমিল্লায় একটা। সীতাকুণ্ডের কাছে একটা। চিটাগাংয়ের অদূরে একটা। এদিকে ‘এই’ রাস্তায় গেল। তারপর কুষ্টিয়ার রাস্তায় গেল। এইসব রাস্তার পাশে যদি করা যায়, তাহলে সিনেমা বেঁচে যাবে। আদারওয়াইজ সিনেমার বাঁচার কোনো পথ আমি দেখি না। তবে, হ্যাঁ, এফডিসিতে একটা কেন্দ্রীয় সার্ভার থাকবে। এফডিসিতে একটা বিল্ডিং তৈরি করা হবে দোতলা, কিংবা একটা বিল্ডিং ফাঁকা আছে– সেই বিল্ডিংয়ে সার্ভার থাকবে। এবং এর নিজস্ব একটা স্যাটেলাইট চ্যানেল থাকবে। সিনেমার জন্যে, এই কোম্পানির জন্যে একটা স্যাটেলাইট চ্যানেল। সেই স্যাটেলাইট চ্যানেলে সব সময় সিনেমার খবর থাকবে, যে– এই সিনেমা তৈরি হচ্ছে, এই সিনেমা এত এত হাউজে কালকে রিলিজ হবে… একশোটা হলে চলবে, অমুক হলে। দুইটা চ্যানেলে সপ্তাহে দুটো ছবি রিলিজ হবে। প্রতিটা স্পটে দুইটা সিনেমা-হল। পাঁচশো সিটের।

আর এর ইনকামের জায়গাও আছে কিন্তু অনেক। ব্যাংক আছে; ভাড়া দিলেন আপনি। তারপর, ওখানে একটা অফিস বিল্ডিং হবে; যেখানে, আমার মনে হয়, টু-অর-থ্রি স্টার অ্যাকোমোডিশনের যদি চার-পাঁচটা… দুই-তিনটা তলা করা যায়, হোটেলের মতো, আপনি বিগ বিগ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালও করতে পারবেন। ওয়ার্ল্ডের নামকরা একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের নাম দিতে পারবেন আপনি– এখানে যে ফেস্টিভ্যালটা হবে। ওয়ার্ল্ডের ভালো ভালো সিনেমা আপনি দেখাইতে পারবেন এই ফেস্টিভ্যালের মাধ্যমে– সাধারণ দর্শকদের, ভালো দর্শকদের। এতে সিনেমা-শিল্পটা বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। [এছাড়া] আর কোনো বাঁচার সম্ভাবনা নেই।

দৃশ্য । দায়ী কে?
দৃশ্য । দায়ী কে?

রুদ্র আরিফ : হায়াৎ ভাই, অনেক সময় নিয়া নিছি আপনার… শেষ কইরা ফেলব… আপনার তো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রথম জীবনেই যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, এবং অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে…

কাজী হায়াৎ : আছে। ‘দায়ী কে’ ছবি নিয়া। ‘দায়ী কে’ ছবি নিয়া আমি গেছিলাম কারলোভিভেরি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে; ইনফরমেশন সেকশনে। আমি পুরস্কার পাইনি; সার্টিফিকেট পেয়েছিলাম। পুরস্কার নিয়ে অনেক মিথ্যাচার হয় আমাদের দেশে; অনেক মিথ্যাচার হয়! অনেক ছবি অনেক জায়গায় দেখানোই হয় না; কিন্তু ফেস্টিভ্যালে অ্যাটেন্ড করলে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। দ্যাট সার্টিফিকেট ইজ নট অ্যাওয়ার্ড; নেভার অ্যাওয়ার্ড। আর ফেস্টিভ্যালে কম্পিটিশনে থাকতে হবে ছবিটি। উইদাউট কম্পিটিশনে ছবি পুরস্কৃত হয় না কিন্তু। মেইনলি কম্পিটিশনে যেতে হবে ছবিটিকে। সেই কম্পিটিশনে যাওয়ার মতো, এবং কম্পিটিশনে সিলেক্ট হওয়ার মতো ছবি… [আবারও ফোন। আবারও মুহূর্তের বিরতি…]

রুদ্র আরিফ  : লাস্ট দিকে একটা কোশ্চেন করতে চাই, সেটি হচ্ছে– আমাদের এখানে একটা টেনডেন্সি ইদানিং দেখা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই, সেটা হচ্ছে, ফেস্টিভ্যাল ডিপেনডেন্ট সিনেমা বানানো; যেটা আমরা বিকল্প ধারা বলার ট্রাই করি, বা অ্যাওয়ার্ড পাইছি, বা এ নিয়ে আলোচনা…

কাজী হায়াৎ : এটা নিয়া আমি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাই না। তবে ফেস্টিভ্যালে অ্যাটেন্ড করা, আর পুরস্কার পাওয়া… ফেস্তিভ্যালে কম্পিটিশনে ছবি শো হয়েছে কিনা, সেটাও একটা দেখার বিষয়। ফেস্টিভ্যালে অনেক সেকশন থাকে। অ-নে-ক সেকশন থাকে। সবচাইতে দুঃখের বিষয় হলো কি, জানেন? আমি যে কয়টা ফেস্টিভ্যালে অ্যাটেন্ড করেছি, সেই কয়টা ফেস্টিভ্যালে… তখন তো ভিন্ন ছিল ফেস্টিভ্যালের ধারা, আর বিখ্যাত কয়েকটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ছিল, এখানে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হতো। এখন পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে; হাজার-হাজার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে। তো, তখন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ থাকা-খাওয়া-হোটেল ভাড়া ও টিকেটও দিত। আর, প্রত্যেকটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ডেলিগেট যে যেত, দর্শক… মানে, বাংলাদেশ থেকে মনে করেন পাঁচজন ডেলিগেট গেল; পাঁচজন ডেলিগেটের মধ্যে একজন সাংবাদিক থাকত। প্রত্যেক দেশের ডেলিগেটের মধ্যে একজন সাংবাদিক থাকে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে সাংবাদিকদের কখনোই ইনক্লুড করা হয় না। গেছে, ডেলিগেট গেছে; কিন্তু সাংবাদিকদের ইনক্লুড করা হয় না। যার ফলে এই সাংবাদিকরা জানেও না; ঘটনাগুলো জানে না– সেখানে কী হয়।

সেই ছবি পুরস্কৃত হয়, যেটা কম্পিটিশনে… হয়তো ছবির শো হবে ফেস্টিভ্যালে এক থেকে দেড়শো; কিন্তু কম্পিটিশনে দেখা যাবে যে, হয়তো আঠারোটি ছবি সিলেক্ট হয়েছে। সেই আঠারোটা সিলেকশনের মধ্যে, মানে, প্রিভিউ কমিটি থাকে, আপনি কম্পিটিশনে দিয়ে পাঠাইলেই যে কম্পিটিশনে শো হবে– তা না। তাদের আবার প্রিভিউ কমিটি থাকে। সেই কমিটি সেই ছবি দেখে। হয়তো কম্পিটিশনে দেখা গেল যে, পঞ্চাশটা ছবি জমা পড়েছে কম্পিটিশন সেকশনে। সেই প্রিভিউ কমিটি দেখে, ছবি দেখে বাছাই করে বলল যে, না, এগুলা অনুপযুক্ত; এই আঠারোটি ছবি উপযুক্ত– দেখার জন্যে।… এখন এই কম্পিটিশনেই যদি তুমি টিকে যেতে পার, কোনো-না-কোনো পুরস্কার একটা পাবেই।

রুদ্র আরিফ : …ক্যাটাগরি যেহেতু অনেকগুলা…

কাজী হায়াৎ : …হ্যাঁ, অনেকগুলো ক্যাটাগরিতে পুরস্কার হয়। তারা ধরেই নেয়, জুরি বোর্ড ধরেই নেয় যে, এইগুলো পুরস্কৃত হবে। আর, কম্পিটিশনে চান্স পাওয়া মানেই হলো একটা বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর বাকি ছবিগুলো চলে যায়– ইনফরমেশন আছে, কমার্সিয়াল সেকশন আছে, অনেক সেকশন আছে… জার্নালিস্ট সেকশন আছে, অনেক সেকশন আছে। এখন এইসব সেকশনে ছবি যাইয়া আর একটা সার্টিফিকেট পাইয়া বলতেছে যে, ‘আমি গেছিলাম; পুরস্কার পাইয়া গেছি!’ এই সার্টিফিকেটই পুরস্কার!

সার্টিফিকেট– উইদাউট ফিল্ম, আপনিও যদি অ্যাটেন্ড করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে, ইউ উইল গেট অ্যা সার্টিফিকেট। লাস্টডে, যখন সার্টিফিকেট দেবে, সেইদিন আপনিও একটা সার্টিফিকেট পাবেন যে, আপনি অ্যাটেন্ড করেছেন, এই হলো সার্টিফিকেট। এখন আপনি যদি বলেন যে, ‘আমি পুরস্কার পাইছি’– কিছুই বলার নেই। ইট’স হ্যাপেনিং। ইট’স হ্যাপেনড। আমি জানি, ছবিটি প্রদর্শিতই হয়নি, ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়নি, এবং এখান থেকে যারা গিয়েছিল, তারা বলেছে যে, “আমি চেষ্টা করে ছবিটি… কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছি, ছবিটি খুঁজেই পেলাম না। এবং ফেস্টিভ্যাল কমিটি বলল যে, ‘আমাদের কাছে আসে নাই। আমাদের হাতে পৌঁছায় নাই’।” অতএব, শো-ই হয়নি। তারা একটা সার্টিফিকেট নিয়া আসছে। সেই সার্টিফিকেট দেখাইয়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে বলা হয়েছে, পুরস্কার পাইছে! কিছুই বলার নেই! কে দেখবে!

এখন আপনে সাংবাদিক, আপনি এক পত্রিকায়… এই যে ফিল্মের এইখানে যা ঘটেছে আগে… সেভেন পাস; আইসা কইতেছে, ‘আমি এমএ পাস!’ এখন, সার্টিফিকেট দেখার তো সুযোগ নাই। এখন আপনি কইলেন যে, ‘আমি পুরস্কার পাইয়া আইছি, টরোন্টো থেইকা…!’

‘কই, কোথায়?’

‘আমার ঘরে!’

‘সার্টিফিকেট?’

‘আমার ঘরে!’

–আমার তো বলার কিছু নাই : ‘হ্যাঁ, পাইছেন!’ আপনি টেলিভিশনে ফলাও করে, প্রেস কনফারেন্স করে বললেন যে, ‘আমি পুরস্কার পাইছি।’

‘ঠিক আছে, পাইছেন!’

এখন আপনি বললেন যে, ‘ভাই, আমি ডক্টরেট করেছি অমুক সাবজেক্টে। জার্নালিজমে ডক্টরেট করেছি।’ আমি তো বলতে পারব না যে, ‘ভাই, সার্টিফিকেটটা দেখান তো!’ এই বলার সিস্টেম তো নাই। তো, আমি বলব, ‘হ্যাঁ, ভাই, হ্যাঁ, ঠিক আছে, থ্যাংক ইউ! কংগ্রেচুলেশন!’ এই!

তো, ফেস্টিভ্যালের বেলায় আমাদের দেশে এ রকম ঘটনা ঘটেছে; অনেক ঘটেছে এবং ঘটে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, ওয়ার্ল্ড সিনেমা থেকে আমরা, শুরুর থেকেই অনেক পেছনে। ১৯৫৭ সালে আমাদের এখানে প্রথম ছবি হলো– অই যে… [পোস্টার দেখিয়ে] আবদুল জব্বার খান তৈরি করলেন ‘মুখ ও মুখোশ’। তিনি যে সিনেমাটা তৈরি করলেন, তখন কিন্তু কালার হয়ে গেছে সিনেমা, তিনি একটা সিনেমা তৈরি করলেন– যার মধ্যে ছাতা দেখা যায়, ফ্রেম ব্যাঁকা, ইনাম আহমেদ অভিনয় করে– ‘অ্যাই… তোকে মেরে ফেলব…!’ [চিৎকার দিয়ে]।… অপেরাও না। যাত্রাও না, অপেরাও না। একটা উদ্ভট একটা কী বিষয় নিয়ে তিনি গল্প বানাইল! দ্যাট ওয়াজ আওয়ার স্টার্টিং পয়েন্ট। কিন্তু ওয়ার্ল্ড সিনেমা তখন অনেক দূরে। ওয়ার্ল্ড সিনেমা তখন কালার সিনেমা হচ্ছে। ‘পথের পাঁচালি’ তৈরি হয়ে গেছে। ইভেন, ‘কাবুলিওয়ালা’র মতো ছবি তৈরি হয়ে গেছে। বায়ান্ন সালে ‘কাবুলিওয়ালা’ তৈরি হইছে। বায়ান্ন সালের ‘কাবুলিওয়ালা’ দেখেন আপনি এখন : মনে হইবে যে, কালকে বানাইছে।

যেমন, আমি এইটি এইটের কথা বলি, এইটি এইটে আমার প্রথম ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গেলাম আমি– বিং অ্যা ডিরেক্টর। আমি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গেলাম– কারলোভিভেরি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। এখন, ফেস্টিভ্যালে ওপেনিং ছবি, ‘পাথ ফাইন্ডার’ নামে একটা ছবি, হাঙ্গেরির। ফেস্টিভ্যালের হল তো বিরাট হল। হলে আবার হেডফোন আছে। হেডফোন লাগাইয়া আমি চ্যানেল– কোন চ্যানেলে শব্দ শুনব, সেই চ্যানেল আছে : ইংরেজি…। কমেন্ট্রি করে। ডায়ালগ তো আর বলতে পারে না; ডায়লগ কমেন্ট্রি করে– একটা ছেলে, একটা মেয়ে। মেয়ের ডায়ালগ মেয়ে বলে, ছেলের ডায়ালগ ছেলে বলে। তো, আপনি যে ল্যাঙ্গুয়েজে শুনতে চান, সেই ল্যাঙ্গুয়েজটা নব ঘুরাইলে আপনি পেয়ে যাবেন। গেল। ছবি দেখতেছি, বিরাট স্ক্রিন। সিনেমাস্কোপ। আমি নিয়ে গেছি এক ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ছবি– ‘দায়ী কে?’।

সিনেমাস্কোপ। বিরাট পর্দা। প্রাচীন আমল নিয়ে ছবি। অই, বরফ পইড়া আছে, কুকুরের গাড়ি, তীর ছোড়াছুড়ি…। তো, তীর ছুড়ে এইখান থিকা, এই কোণা থিকা তীর ছোড়ে, সাঁই করে তীরটা যে যায়, আমার মাথার কাছ দিয়া শো… করে চলে যায়। যাইয়া, ঐ জায়গায় যাইয়া লাগে যে, ধাপ করে শব্দ হয়! আরে, এ কী! ডাক দেয়, ‘এই…’ : ‘হেই-হেই-হেই-হেই…’! এ কী ব্যাপার! কী রে ভাই! এ কী এক সিনেমার মধ্যে আসলাম! আমি অবাক হচ্ছি বিষয়টায়; এবং আমি অবাক হলাম, আই অ্যাম বিং অ্যা ডিরেক্টর, আমি অবাক হলাম। কারণ, এই সিনেমার সাথে আমি পরিচিত না। কখনোই দেখি নাই। এমন সিনেমা আমার ভাগ্যে জুটেই নাই দেখার।

তো, আমি, এইটি এইটের কথা, আমি ঐ ডাইরেক্টরকে খুঁজে বের করলাম। তারে জিজ্ঞেস করলাম যে, ‘তুমি… তোমার ছবি দেইখা আমি অবাক হইলাম।’

‘কেন?’

‘এই শব্দ, এই সাউন্ড সিস্টেম তুমি… কী সিস্টেম?’

কয়, ‘আমরা তো চার বছর ধরে এই সাউন্ড সিস্টেম ইউজ করছি! বিফোর ফোর ইয়ারস। তোমরা এই সাউন্ড করো না?’

আমি শুনিও নাই কোনোদিন। এইটি এইটে… তাহলে হিসেব করেন? [আমাদের দেশে] আজও আসে নাই সেই সিস্টেম। আমরা কত বছর পিছানো? গেল!

আমার ছবি… তিন দেশে থেকে তিনজন, একজন-একজন করে গেছিল; একজন মোজাম্বিকের– গ্র্যাবিয়েল নাম, আর অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা মেয়ে– অ্যানা নাম; আর আমি বাংলাদেশ থেকে কাজী হায়াৎ– একজন। তো, তিনজনকে একজন ইন্টারপ্রিটার দিয়েছিল। তো, তিনজনে একসাথেই থাকি। তো, দুইজনকে স্বভাবতই আমাকে ইয়ে দিতে হলো… ব্রুশিয়ার দিতে হলো– আমার ছবির ডেট কোথায়, কোন হলে দেখানো হবে– সেটা ডেট দেওয়া হলো। অস্ট্রেলিয়ার যে মেয়েটি, অ্যানা, সে আমার বুকলেট পড়ে বলতেছে, ‘ইজ ইট ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট মুভি, কাজী?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। ইয়েস।’

‘ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট! দিস ইজ অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল?’

বলল যে, ‘ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ছবি? তুমি কি ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইটে এক্সপেরিমেন্ট করছ?’

আমি বললাম, ‘না। নরমাল ফিল্ম।’

‘ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ইয়ে পেলে কোথায় তুমি… ফিল্ম? ল্যাবরেটরি?’

আমি বললাম, ‘আমাদের দেশে তো ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইটই চলছে।’

‘ইজ ইট?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

কয়, ‘আমাদের দেশে অনেকেরা এক্সপেরিমেন্ট করার জন্যে ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ফিল্ম এবং ল্যাব পায় না। আমি তাদের সাজেস্ট করব, তোমার দেশে যেতে। ভেরি মাচ ইন্টারেস্টিং থিং!’

লিবিয়ার একজন, ঐ যে… আমার ছবিটা প্রিভিউ কমিটিতে দেখানো হয়েছিল, পরে ইনফরমেশনে গেছিল…। আমার ছবিরও কালার একটা গান ছিল; ঐটা বাদ দিয়া দিছিলাম। রি-এডিট করে নিছিলাম। তো, ঘটনা হলো, লিবিয়ার একজন জুরি বোর্ডের মেম্বার, তার সাথে পরিচয় হলো, চুল-টুল লম্বা… দেইখা একদম মনে হইল মুসলমান-টোসলমান হবে নাকি; আর একটু ব্ল্যাক : ইন্ডিয়ান-টিন্ডিয়ান হবে নাকি? আলাপ করলাম। শুনলাম সে জুরি বোর্ডের মেম্বার। তারে ব্রুশিয়ারটা দিলাম। তখন বলল, ‘ও… আই হ্যাভ সিন ইউর মুভি। বাট ভেরি ইল-লাক! ইউ আর অ্যা মুসলিম?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

‘বাট ইউর ইল-লাক!’

আমি বললাম, ‘হোয়াই?’

কয়, ‘আমি এবং আমরা অনেকটা সদয় ছিলাম তোমরা পুওর কান্ট্রি হিসাবে, তোমার ছবিটা কম্পিটিশনে যাওয়ার জন্যে। বাট ইট ইজ ভেরি মাচ… মানে, দুঃখের বিষয় এই যে, তোমার ছবিটির টুয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট শট আউট-অব-ফোকাস। হোয়াই দিস আউট-অব-ফোকাস শট? দিস ইজ অ্যাবসুলটলি এনজি শট।’

আমি তারে কী বুঝাব? তখন তাকে আমি বললাম, ‘দেখো, আমার স্টুডিও, আমাদের ফিল্ম একটি অদ্ভুত বিষয়।’

‘কী বিষয়?’

‘আমাদের স্টুডিওটা সরকারি। একেবারে, অ্যাবসুলটলি গভঃমেন্টের। আর ফিল্ম বানাই আমরা প্রাইভেট। আমাদের ল্যাবরেটরি যেটা, সেটা গভঃমেন্ট পরিচালিত। আর আমাদের মতো অনুন্নত দেশের গভঃমেন্ট ল্যাবরেটরি, গভঃমেন্ট ওয়ার্কাররা কতটা পারদর্শী, আর কতটা অ্যাফিসিয়েন্ট, তা তো তুমি বুঝতে পারো। তো, ল্যাক অব অ্যাফিসিয়েন্সি, আমাদের ক্যামেরাগুলোর লেন্স– ল্যাক অব অ্যাফিসিয়েন্সি এটা হয়েছে।’ এটা হয়। হচ্ছে। এখনো হচ্ছে। এবং, তখন ছিল; প্রতিটা ছবিতে মিনিমাম টুয়েন্টি ফাইভ পারসেন্ট শট আউট-অব-ফোকাস থাকত। এটি হলো আমাদের ফেইট। কিছুই করার নেই! আমরা তিরিশ বছর পেছনে সিনেমায়। আজও সেই তিরিশ বছরের এক বছরও আগাইতে পারি নাই।

পোস্টার । ওরা আমাকে ভালো হতে দিলো না
পোস্টার । ওরা আমাকে ভালো হতে দিলো না

রুদ্র আরিফ : হায়াৎ ভাই, শেষের দিকে একটা কোশ্চেন করছি; সেটা হলো– বাংলাদেশি সিনেমার বৈশিষ্ট্য আপনার কাছে কী রকম? যে সিনেমাটাকে ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ বলা যেতে পারে?

কাজী হায়াৎ : এটি নিয়ে কিন্তু আমি প্রাউড ফিল করি। এটি নিয়ে একটা ছোট গল্প বলি : বেশি প্যাঁচাল পারি তো! এইখানে, পরিচালক সমিতিতে মোহাম্মদ হান্নান আর আজহারুল ইসলাম খান যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসি থেকে একটা ইনভাইটেশন আসলো। আমি তখন পরিচালক সমিতির কেউ না। কিন্তু মোহাম্মদ হান্নান এবং আজহারুল ইসলামের খুব প্রিয়পাত্র ছিলাম। ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসির কালচারাল অ্যাটাচি আমাদের সাথে কথা বলতে চায়– অ্যাবাউট ফিল্ম। পরে জানলাম, সে, ঐ অ্যাটাচিটা একজন ফিল্ম-এডিটর ছিল। গেলাম। সে খুব যত্ন-টত্ন করল; এবং ফ্রান্সের অ্যাম্বাসিডর বলল, যে, ‘আমরা ইন্টারেস্টেড ফিল্ম কো-প্রোডাকশন করার জন্য, তোমাদের সাথে; এবং তোমাদের ফিল্মকে আমরা ফাইন্যান্স করব।’

তখন আমি বললাম, ‘কোন ফিল্মকে তুমি ফাইন্যান্স করবা? আমাদের দেশের ফিল্মের স্টাইল কিন্তু আলাদা। পারহ্যাপস সিন ইউ।’

তখন বলল, ‘তুমি বলো না যে, কী?’

তখন আমি বললাম যে, “দেখো, ওয়ার্ল্ড সিনেমা আর ইন্ডো-পাক সাব-কন্টিনেন্টের সিনেমা এক না। ইন্ডো-পাক সাব-কন্টিনেন্টের সিনেমায় পাঁচ থেকে ছয়টা গান থাকে। মারামারিগুলো যে থাকে, তার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না। অ্যাক্রোবেটিক মারামারি! দিস ইজ আওয়ার সিনেমাটিক কালচার। অ্যান্ড, মাই ফিল্ম ইজ মাই প্রাউড। তোমাদের সিনেমা আলাদা কালচারে তৈরি হয়, আলাদাভাবে তৈরি হয়; ওটাও একটা বিনোদন মাধ্যম, এটাও একটা বিনোদন মাধ্যম। ওটাও তোমাদের দেশের লোকদের বিনোদন দিচ্ছে; এটাও আমাদের দেশের লোকদের বিনোদন দিচ্ছে। আমাদের বিনোদন মাধ্যম হলো এইটি, এবং এই বিনোদন মাধ্যম এইভাবে না হলে এটি… চলচ্চিত্র যখন ১৯৩২ সালে সবাক হইছিল, তখন থেকেই এই ধারাটা প্রচলিত হইয়া আসছিল। ফার্স্ট মুভি ওয়াজ ‘আলমআরা’। ‘আলমআরা’ ছবিতে, পৃথিবীতে যে সব ছবি তৈরি হচ্ছে, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, বোম্বেতে একটা ছবি তৈরি হলো– তেরোটা গান নিয়ে। তার [সেটির পরিচালকের] কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে যদি বেঁচে থাকত, যে, ‘তুই তেরোটা গান লাগাইলি কেন!’ সেই গান এখন আসতে আসতে হয়ে গেছে হলো– শাহরুখ খান কেবল বলবে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’; ব্যাস, চলে গেলে বোম্বে থেকে অ্যামেরিকা, অ্যামেরিকা থেকে সুইজারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়া হইয়া গান-টান গাইয়া তারপর আসলো সিক্যুয়েন্সে। দিস ইজ অ্যাবসুলটলি অ্যানাদার ওয়ান পার্ট অফ, অ্যানাদার ওয়ান বিনোদন; আর এগুলা না থাকলে ছবি চলবে না। দিস ইজ আওয়ার সিনেমাটিক কালচার। অ্যান্ড, উই ফিল প্রাউড, আই ফিল প্রাউড– ওয়ার্ল্ড সিনেমা থেকে আমাদের সিনেমা আলাদা। মাই ফিল্ম ইজ মাই প্রাউড।”

ও কিন্তু অভিভূত হয়ে শুনল। তারপর বলল, ‘ইয়েস, কাজী ইউ ফিল্ম ইজ ইউর প্রাউড।’

তারপরে সে তিন-না-চার বছর ছিল [বাংলাদেশে]। প্রতি বছর তাদের ন্যাশনাল ডে’তে কার্ড পাঠাইত। আমার ঠিকানা ছিল ওর কাছে। কার্ড পাঠাইত– স্পেশালি কাজী হায়াতরে আলাদা। আর গেলেই সে খুঁজত, ন্যাশনাল ডে’তে, ‘কাজী! কাজী আইছে! কাজী, ইউর ফিল্ম ইজ ইউর প্রাউড; রিয়েলি, ইউর ফিল্ম ইজ ইউর প্রাউড। আই ফিল ইট।’

অ্যাম আই কিয়ার, অর নট? প্রশ্নের উত্তর পেয়েছ?

রুদ্র আরিফ : লাস্ট প্রশ্নটা হচ্ছে যে, আপনি ইয়াং ফিল্মমেকারদের আপনার এক্সপেরিয়েন্স থেকে কী অ্যাডভাইস দিবেন?

কাজী হায়াৎ : ইয়াং ফিল্মমেকাররা, যারা আসছে সিনেমায় এখন, দে আর সাম এডুকেটেড বয়; কিন্তু তারা ঐ সত্যজিৎ রায় মাথায় নিয়া আসতেছে! এটাই হলো আমাদের দুর্ভাগ্য। আমি… ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াজ… আমার কিন্তু চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই; আপনি খারাপ লিখলেও আসে-যায় না কিচ্ছু : আমি কাজী হায়াৎ, কাজী হায়াতই।…

তুমি আর আমি কত সময় ধরে কথা বলছি?

দৃশ্য । সর্বনাশা ইয়াবা
দৃশ্য । সর্বনাশা ইয়াবা

রুদ্র আরিফ : দুই ঘণ্টার উপর…

কাজী হায়াৎ : দুই ঘণ্টা? উঠছি আমি? এই সিকুয়েন্সটা যদি শ্যুট করা হতো বাংলাদেশের, এই ইন্ডো-পাক সাব-কন্টিনেন্টের সিনেমায়– যদি শুট করা হইত, তাহলে কী করা হইত, জানো? হ্যাঁ?

আমাকে ডিরেক্টর সেকেন্ড শটেই উঠাইত। [বলতে বলতে প্রথমবারের মতো বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি এবং অভিনয় করে দেখাতে থাকলেন] বলত যে, ‘হায়াৎ ভাই, শটটা হবে এখন, এইভাবে উঠে, এখানে গিয়ে, এইভাবে ঘুরে, তারপর এইখানে ডায়লগটা দেবেন; আমি ক্লোজ কাটব। তারপর আবার আপনি ঘুরে গিয়ে বসবেন। আবার আপনি উঠবেন।’

–দিস ইজ স্টাইল অপেরা। অপেরা স্টাইলের ফিল্ম এই সাব-কন্টিনেন্টের লোকে তৈরি করে। এর মধ্য থেকে ব্যতিত্রক্রম একটা লোক বেরিয়ে এলো। অপেরা ছাড়া। কে? সত্যজিৎ রায়। একঘণ্টা ধরে বসেই কথা বলছে! এরা [চরিত্রগুলো] বসেই কথা বলছে। এ কী! ইউরোপিয়ান স্টাইল। অ্যান্ড, হি ওয়াজ অ্যাওয়ার্ডেড বাই দেম। আমার সিনেমাকে কিন্তু অ্যাওয়ার্ড দিলো না।… ইউরোপিয়ান স্টাইল মেকারের ছবিকে তারা অ্যাওয়ার্ড দিলো। দিস ইজ মাই ক্যালকুলেশন। বাবা, আমার বিরুদ্ধে লিখলে, আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইলে আমার কিচ্ছু করার নেই!

সেই সিনেমা অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার কারণে সত্যজিৎ রায় খ্যাতি পেল সারাবিশ্বে। এখন আমার যে শিক্ষিত ছেলেটি ফিল্মে ঢুকল, স্ট্যামফোর্ড থেকে পাশ করল, ব্রিলিয়ান্ট, স্কলার ছেলে, তাকে আমাদের যে মহিউদ্দিন ফারুক হলো ডিন– ওখানকার; মানে, হেড অব ডিপার্টমেন্ট… চেয়ারম্যান…; উনি কিন্তু শিক্ষা দিয়েছেন, প্রথমেই সত্যজিৎ রায়ের মতো করে। সে এখানে [ফিল্মমেকিংয়ে] এসে ঢুকতেই ‘পথের পাঁচালি’র মতো একটা ছবি তৈরি করতে চাইছে। সে যদি ফিল্ম-স্টাইল-ইন্ডিয়া বানাইত… আমাকে কিন্তু কোথাও পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়, সেমিনার রুমে বসা : ‘যে যার পরিচয় দেন’…, আমি হাত তুলি– ‘আই অ্যাম কাজী হায়াৎ; ফিল্মমেকার– স্টাইল-ইন্ডিয়া’!… পরে আমারে সাংবাদিকরা কয়, ‘ভাই, এই কথা কন ক্যান? ইন্ডিয়ার কথা কন ক্যান?’ আমি বললাম, ‘আমি তো… স্টাইল-ইন্ডিয়া আলাদা একটা… দিস ইজ অ্যাবসুলটলি আলাদা; পৃথিবীর সমস্ত সিনেমার থেকে আলাদা; আমি সেই ধারার সিনেমা নির্মাণ করি। তো আমি বলব না কেন?’ [আবার ফোনের বিরতি… মুহূর্তকাল…]

তো, আমরা আমাদের সিনেমাকে নিয়ে গর্ব করি না; এবং আমাদের ছেলে-পেলেরা, যারা আছে নতুন-নতুন, তারা মাথায় ঢুকায়্যা আসে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তারপর গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ… –এদের মাথার মধ্যে নিয়া আসে। নিয়া আইসা তারা আর না পারে ঐডা বানাইতে, না পারে সিনেমা বানাইতে; কিছুই হয় না। তালগোল পাকাইয়া কেউ বুদ্ধিজীবী হয়, কেউ আবার ঐ যে চুরি কইরা গল্প আইনা ধরা পড়ে : জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাতিল হয়, মামলা-মোকদ্দমা হয়, কত কিছু হয়– তা তো দেখতে পাচ্ছো তোমরা! এই হচ্ছে আমাদের দেশের…।

ইয়াং জেনারেশন নিয়া আমি খুব একটা বেশি সেটিসফাইড না। ইয়াং জেনারেশনরা যদি আসত, এডুকেটেড ছেলে-পেলেরা যদি আইসা বলত যে, ‘আমি মূলধারার সিনেমা তৈরি করব’, এবং তারা ভালো করতে পারত। দে আর টেলেন্টেড বয়। তারা ভালো করতে পারত; অবশ্যই ভালো করতে পারত। এই যে ডিওপিগুলো, মানে, ডাইরেক্টর অব ফটোগ্রাফি– যেসব ইয়াং ছেলেদের আমি কাজ করতে গিয়ে দেখি, এরাও অনেক ভালো কাজ করত। আমাদের এই [এফডিসির] ক্যামেরাম্যানরা, বেসিক্যালি, সত্যি কথা বলতে, এখানে কোনো ক্যামেরাম্যান নাই! আমাদের যে ক্যামেরাম্যানরা, এই ডিজিটাল ক্যামেরা আসার আগে, আসার সাথে সাথে এদের সমস্ত লোকের বিদায় হওয়া উচিত ছিল। কারণ, এরা জানেই না; এদের লেখাপড়াও নাই। ইট ইজ অ্যাবসুলটলি কম্পিউটারাইজড ক্যামেরা। হাজারও অপশন আছে ক্যামেরায়। কী করে ফটোগ্রাফি এরা? ঐ ক্যামেরার সাথে হাউস থেকে একটা লোক আসে, তারে কয়, ‘এই, কী কী আছে– কইয়া দে! আমি এই শট নেব।’ সে-ই ঐ বোতাম টিপে-টিপে, টিপে-টিপে ঠিক করে দেয়। হেয় খালি অপারেট করে।

এই অপশনস জানা ছেলেগুলো, ইয়াং বয়েজ, তারা যদি এই ফিল্মটাকে অবজ্ঞা না করে এখানে [এফডিসিতে] আসত, তাহলে এখানকারও টেকনোলজির অনেক উন্নতি হতো। তারপর, গ্রাফিক্স জানা ছেলে… এডিটিংয়ে এখন নরমাল এডিটর হলে হবে না; ইউ হ্যাভ টু নো গ্রাফিক্স। হাতেও কিছু তৈরি করতে হবে তোমাকে। এই ছেলেগুলোও যদি আসত এখানে এডিটিংয়ে! আমাদের সেই প্রাচীন আমলের এডিটর কোনো রকমে টিপে-টুপে এডিটিংটা কম্পিউটারে শিখছে; তারাই এখন এডিটর। তো, দিস ইজ দি রিয়েল সিনারিও অফ আওয়ার ফিল্ম। আমাদের ফিল্মের অবনতি-উন্নতি এখন কী হবে– সেটা তুমিই বুঝে নাও!

দৃশ্য । ইতিহাস
দৃশ্য । ইতিহাস

রুদ্র আরিফ : মানে, আপনার অ্যাডভাইজটা কী?

কাজী হায়াৎ : আমার অ্যাডভাইজ ঐ একটা– গো টু প্রাইম মিনিস্টার… ‘ [ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি] মরে গেছে… আপনি জানাজা করবেন! আমরা ইনটেনসিভ কেয়ারে রাখছি! আপনি এটাকে খোলার নির্দেশ দেবেন। খুলে ফেললেই মারা যাবে। আর, না হয় ডাক্তার বলেছে, অ্যামেরিকা নিয়ে গেলে ট্রিটমেন্ট আছে। এ ভালো হয়ে যেতে পারে। আপনি কী করবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন যদি, যে, ‘আমি জানাজা করতে আসছি। জানাজা করে যাব।’

‘ঠিক আছে, আমরা শরিক হইলাম। জানাজা করে যান।’

আর যদি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না। একে আমি অ্যামেরিকা নিয়ে ট্রিটমেন্ট করব। ভালো করব। ভালো করার চেষ্টা করব।’

–তাহলে সে কোনো প্রজেক্ট হাতে নেবে। সে কোনো বিগ প্রজেক্ট হাতে নেবে– ফর সিনেমা অনলি। তাহলে সিনেমা বাঁচবে। আদারওয়াইজ, অই ইনটেনসিভ কেয়ারে ধুঁকে ধুঁকে একদিন [অক্সিজেন-মাস্ক] খুলে নিয়ে যাবে! খুলবে! ডাক্তাররা বিরক্ত হয়ে খুলবে। শেষে প্রাইম মিনিস্টার আইসা জানাজা পড়বে!

রুদ্র আরিফ : এটা তো ইন্ডাস্ট্রি বাঁচানোর জন্য। আর, মানে, ইয়াং মেকারদের প্রতি অ্যাডভাইজটা কী?

কাজী হায়াৎ : ইয়াং মেকারদের প্রতি অ্যাডভাইজ এইটা, যে, তারা এই উপমহাদেশীয় ছবিতে শাহরুখ খান… দেখেন আমি বলি, আপনাদের মতো একজন সাংবাদিক, দাউদ হায়দার, জার্মানিতে থাকে…

রুদ্র আরিফ : …হ্যাঁ; কবি…

কাজী হায়াৎ : …কবি; তার একটা আর্টিক্যাল পড়েছিলাম দুই বছর আগে, ‘যুগান্তর’-এ লিখেছিল। পুরা পৃষ্ঠাব্যাপি আর্টিক্যাল। জার্মানে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শাহরুখ খান যাবে। প্রথমেই লিখছে, ‘শাহরুখ খানের সেই বস্তাপচা সিনেমাগুলো দেখানো হবে। নাচ-গানের সিনেমাগুলো দেখানো হবে সেখানে। একটি নাচ-গানের সিনেমা দেখানো হবে।’ মানে, সেখানে একটা উন্নাসিকতা ছিল। কিন্তু সেই লোকটিই আবার কী বলেছে, সেটি শোনো– “আমি দেখে অবাক হলাম, সিনেমাটির শেষে শাহরুখ খান স্টেজে উঠবেন খোলা জায়গায়, এবং সেই স্টেজে সে পাঁচ মিনিট পারফর্ম করবে; তারপর চলে যাবে। এবং সেই টিকেট নেওয়ার জন্যে রাত দশটার সময় কনকনে শীত, বরফ পড়ছে, কমপক্ষে দশ থেকে বারো হাজার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাইন দিয়ে। এবং দ্যাট ওয়াজ হাউসফুল। এবং শাহরুখ খান যখন তার পারফর্মেন্স শেষ করে বিদায় নিতে যাচ্ছে, তখন সমস্বরে ঐ মেয়েগুলো চিৎকার করে বলছে– ‘ম্যারি মি… ম্যারি মি… ম্যারি মি… ম্যারি মি…’। তখন শাহরুখ খান বলল, ‘আই অ্যাম স্যরি! আমি মুসলমান তো, শেরওয়ানি-পাঞ্জাবি লাগে, শেরওয়ানি-টুপি লাগে। এবার আনিনি; পরের বার নিয়ে আসব’!” –দাউদ হায়দারই লিখেছে। ওখানে নাসিরউদ্দিন শাহ গেলে কিন্তু এত লোক হবে না। ওখানে গৌতম ঘোষ গেলে কিন্তু এত লোক হবে না। এখন তুমি কোনটা নেবে, কোনটা ফেলবে; বলো?

আমাদের এখানে দুইটি ধারা তৈরি হয়ে গেছে। দুটি ধারা তৈরি করেছি আমরা। আমরা উদ্ভট বলছি না ঐ যে ক্যারাৎ-কুরুৎ লোহার ছবি– কী যেন কী লোহার পাখি! ক্যাক কইরা আইসা মাইরা ফেলে! হলিউডের উদ্ভট ছবি। উদ্ভট! তাকে আমরা উদ্ভট বলি না। ভাল্লাগে আমাদের! ‘স্পাইডারম্যান’! হাউসফুল! তাকে উদ্ভট বলি না আমরা। উদ্ভট বলি আমার দেশের গান-বাজনার ছবিরে। কী দুঃখের বিষয়! তুমি কিন্তু ওটাকে ভালো বলছ, সমালোচনা করছ– কী নান্দনিক, কী সৌন্দর্য! আরে, কীসের সৌন্দর্য! আকাশ দিয়া উইড়া বেড়ায়– একটা সৌন্দর্য হইল নাকি, একটা লোক! এটা কী অবাস্তব ঘটনা : সে যেইখানে যাইতেছে, মইরা যাইতেছে; আবার জ্যান্ত হইয়া, রাবারের মতো গইলা-গইলা আবার জ্যান্ত হইয়া গেল! এইটা কী?

তো, এর থেকে আমরা যতক্ষণ না [এই মনোভাব থেকে] বের হয়ে আসতে পারছি– আমাদের উন্নতি নাই। আমাদের ইয়াং ছেলে-মেয়েদের উন্নতি হবে না। ওর থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সত্যকে সত্য বলতে হবে। সাদাকে সাদা বলার মতো তাদের সাহস থাকতে হবে। কালোকে কালো বলার মতো সাহস থাকতে হবে। এই উপমহাদেশে সিনেমা, এই বাঙালি অন্তত, বাঙালিরা সিনেমা দেখে ইন্সপায়ার্ড কার সিনেমায়, বলো তো? উত্তম-সুচিত্রার। উত্তম-সুচিত্রা কোনো আর্ট-ছবি করছে? একটা খবর কি রাখো : সুচিত্রা সেন সত্যজিৎ রায়কে রিফিউজ করেছিল? একটা ছবিতে সুচিত্রা সেনকে কাস্ট করেছিল। সে বলেছিল, ‘না।’

সত্যজিৎ রায় অবাক হয়েছিল : ‘অ্যা… বলে কি সুচিত্রা!’ মানে, ‘আমি ওয়ার্ল্ড ফেমাস! আমার ছবি সে ডিনাই করছে!’ সুচিত্রাকে ফোন করেছিল, ‘তুমি নাকি আমার ছবিটি করবে না?’

ও বলল, ‘হ্যাঁ, দাদা, করা সম্ভব হচ্ছে না।’

‘কেন, বলো তো?’

‘আমি তো বাণিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করি, আমার তো অনেক ফ্যান আছে; আর আপনি যে ছবি বানান, সকল জনগণের জন্যে তো বানান না; তো, আমার ফ্যানরা অনেক সময় দুঃখিত হবে। আমি চাই না, আমি কোনো আন-পপুলার সিনেমায় অভিনয় করি।’

‘তুমি মুখের ওপর বলতে পারলা?’

‘দাদা, আই অ্যাম স্যরি! আই অ্যাম স্যরি।’

অ্যান্ড, দ্যাট ওয়াজ রিয়ালিটি। সুচিত্রা সেন, যেদিন চেহারা খারাপ হইছে, অন্তর্ধান হইয়া গেছে, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সে বের হয়নি। এবং তার মতো মেয়ের পক্ষেই বলা উচিত, বলার মতো সাহস ছিল বলেই সে বলেছিল। হ্যাটস অফ টু হার।

পোস্টার । ছিন্নমূল
পোস্টার । ছিন্নমূল

কাজী হায়াতের ফিল্মোগ্রাফি 

১৯৭৯ । দি ফাদার
১৯৮০ । দিলদার আলী
১৯৮২ । খোকন সোনা
১৯৮৩ । রাজবাড়ি
১৯৮৪ । মনা পাগলা
১৯৮৫ । পাগলি
১৯৮৬ । বেরহম
১৯৮৭ । দায়ী কে?
১৯৮৮। যন্ত্রণা 
১৯৮৯ । আইন আদালত
১৯৯১ । দাঙ্গা 
১৯৯২ । ত্রাস
১৯৯৩ । চাঁদাবাজ
১৯৯৪ । সিপাহী
১৯৯৪ । দেশ প্রেমিক
১৯৯৫ । লাভ স্টোরি
১৯৯৭ । দেশদ্রোহী
১৯৯৭ । লুটতরাজ 
১৯৯৭ । পাগলা বাবুল
১৯৯৮ । তেজী
১৯৯৯ । আম্মাজান 
১৯৯৯ । জবর দখল
১৯৯৯ । ধর
২০০০ । জখম 
২০০০ । কষ্ট
২০০০ । ঝড় 
২০০০ । ধাওয়া
২০০০ । বর্তমান 
২০০১ । ক্রোধ
২০০১ । আব্বাজান 
২০০১ । পাঞ্জা 
২০০১ । তাণ্ডবলীলা
২০০২ । ইতিহাস 
২০০৩ । মিনিস্টার
২০০৩ । অন্ধকার
২০০৪ । অন্যমানুষ 
২০০৫ । সমাজকে বদলে দাও 
২০০৬ । কাবুলিওয়ালা
২০০৭ । ক্যাপ্টেন মারুফ
২০০৯ । শ্রমিক নেতা
২০১০ । অশান্ত মন
২০১০ । আমার স্বপ্ন
২০১০ । ওরা আমাকে ভালো হতে দিলো না 
২০১১ । পিতা পুত্রের গল্প 
২০১২ । মানিক রতন দুই ভাই
২০১৩ । ইভটিজিং 
২০১৪ । সর্বনাশা ইয়াবা
২০১৬ । ছিন্নমূল  

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]