ফেল্লিনি ও আন্তোনিওনির সঙ্গে, ডিনারে / শার্লট শ্যান্ডলার

6
258
মূল : শার্লট শ্যান্ডলার । অনুবাদ : রুদ্র আরিফ

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ও ফেদেরিকো ফেল্লিনি। ইতালিয়ান দুই মাস্টার ফিল্মমেকার। সমসাময়িক হলেও, ‘নিওরিয়ালিজম’-এর উড়ুক্কু সময়ে সিনেমা বানালেও, তারা ছিলেন পরস্পর বিপরীতধর্মী; আর সেটা প্রকাশ্যেই। কিন্তু এই দুজনেরই বন্ধু এই লেখিকার দৃষ্টিতে, শিল্প ও মহাকাব্যিক রোমান্সের প্রতি এ দুজনের ভঙ্গিমার বিচারে, তারা কাটিয়েছেন সমান্তরাল জীবন…

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ইতালিতে উত্থান ঘটা দুই শ্রেষ্ঠতম ফিল্মমেকার মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ও ফেদেরিকো ফেল্লিনির মধ্যে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আমজনতার মনে একটা কাল্পনিক ধারণা, কোনো-না-কোনোভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে; অথচ তাদের দুজনের মধ্যে সত্যিকারঅর্থে কোনো দ্বন্দ্বই কাজ করেনি। সিনেমাপ্রেমীরা এখনো মাঝে মধ্যে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি ব্যক্তি ফেল্লিনি কিংবা ব্যক্তি আন্তোনিওনির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন?’; ঠিক যেমন করে তলস্তয় কিংবা দস্তয়েভস্কির সম্পর্ক সম্পর্কে প্রায়শই প্রশ্ন তোলা হয়।

ফেল্লিনির সঙ্গে ডিনারে শার্লট শ্যান্ডলার
ফেল্লিনির সঙ্গে ডিনারে শার্লট শ্যান্ডলার

এই দুই অতি গুরুত্বপূর্ণ সিনে-শিল্পী ও তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব ছিল আমার। তাদের একজনকে নিয়ে আই, ফেল্লিনি [১৯৯৫] নামে একটা বইও লিখেছি; এবং আশা রাখি, ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করা অন্যজনকে নিয়েও বই লেখার। সত্য হলো, তারা কাটিয়ে গেছেন সমান্তরাল জীবন। তাদের দুজনেরই ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল সাংবাদিকতা দিয়ে, আর দুজনেই ছিলেন দক্ষ শিল্পী। অল্পবয়সে আন্তোনিওনি আর্কিটেকচারের স্কেচ আঁকতেন; অল্পবয়সে ফেল্লিনি ড্রয়িং করতেন কার্টুন। ইতালিয়ান নিও-রিয়ালিস্ট সিনেমার তুখোড় মেধাবী ফিল্মমেকার রোবের্তো রোসেল্লিনির [১৯০৬-১৯৭৭] কাছ থেকে দুজনেই পেয়েছিলেন অনুপ্রেরণা; এবং দুজনেরই ক্যারিয়ারের শুরুতে মেন্টরের ভূমিকা পালন করেছিলেন রোসেল্লিনি। যদিও নিজেদের মধ্যে কখনোই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি, তবু পরস্পরের কাজের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাবোধ ছিল এ দুটি মানুষের। ১৯৫২ সালে ফেল্লিনি দ্য হোয়াইট শেখ সিনেমাটি বানিয়েছিলেন আন্তোনিওনির লেখা একটি ছোটগল্প অবলম্বনে; আর, ১৯৮২ সালে ফেল্লিনি যখন অ্যান্ড দ্য শিপ সেইলস অন-এর শুটিং করছিলেন, তখন সিনেসিত্তার সেই সেটে হাজির হন আন্তোনিওনি। সাদা-কালো ও রঙিন– উভয় ধরনের সিনেমাতেই মাস্টারপিস সব কাজ করে গেছেন এই দুই ফিল্মমেকার। লা স্ত্রাদা [১৯৫৪], নাইটস অব কাবিরিয়া [১৯৫৭], লা দোলচে ভিতা [১৯৬০], ৮ ১/২ [১৯৬৩], জুলিয়েট অব দ্য স্পিরিটস’ [১৯৬৫], ফেল্লিনি স্যাটিরিকন [১৯৬৯] ও আমারকর্ড [১৯৭৩] বানিয়ে, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন ফেল্লিনি। অন্যদিকে, আন্তোনিওনির সৃষ্ট চমৎকারতম ফিল্মগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্য অ্যাডভেঞ্চার [১৯৬০], দ্য নাইট [১৯৬১], এক্লিপস [১৯৬২], রেড ডিজার্ট [১৯৬৪], ব্লো-আপ [১৯৬৬] ও দ্য প্যাসেঞ্জার [১৯৭৫]। তাদের ফিল্মগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়ার ঘটনা ভীষণ বিরল; এর মধ্যে এ ধরনের সবচেয়ে স্মরণযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৯৬০ সালের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে– দ্য অ্যাডভেঞ্চার ও লা দোলচে ভিতার মধ্যে– বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরিতে। এ ক্ষেত্রে জয় হয় লা দোলচে ভিতার।

‘ফেল্লিনি আর মিকেলাঞ্জেলো ছিলেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’— একবার, আন্তোনিওনির বিধবা স্ত্রী এনরিকা এমনটাই বলেছিলেন আমাকে– লোকজন বলে, পরস্পর বিপরীত ছিলেন তারা; কিন্তু তারা তো ছিলেন যমজ ভাই– যদিও সে কথা কখনোই জানা হয়নি তাদের। আমার মিকিকে [মিকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনি] এমন একজন ফিল্মকোর হিসেবে গণ্য করা হয়, যে নাকি অতি বিদ্বানধর্মী সিনেমা বানাতে চাইত স্বল্পসংখ্যকের [দর্শক] জন্য; অথচ সেও ঠিক ফেল্লিনির মতোই চাইত, সবাই যেন তার সিনেমাগুলো দেখতে ভালোবাসে।’

আন্তোনিওনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, নিজের সিনেমায় মানুষের বাহ্যিক জীবনকে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে বেশি মনোযোগী ছিলেন ফেল্লিনি। আমার মনোযোগ তাদের ভেতরের জীবনের প্রতি– তারা কী করে, কেন করে।’

ফেল্লিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি অনুভব করি, ফিল্মমেকার হিসেবে আমি শিল্পের উত্তরাধিকারী, আর মিকেলাঞ্জেলো হলেন সাহিত্যের। আমার সিনেমাগুলো আমার জীবনের মতোই সার্কাস, স্পাগেত্তি, সেক্স আর সিনেমার সংকলন।’

তাদের দুজনকেই নিউইয়র্কের ‘ফিল্ম সোসাইটি অব লিংকন সেন্টার’ সম্মাননা দিয়েছে– ফেল্লিনিকে ১৯৮৫ সালে, আন্তোনিওনিকে ১৯৯২ সালে; আর আকিরা কুরোসাওয়া [১৯১৯-১৯৯৮; জাপান] থেকে শুরু করে ইংমার বারিমন [ওরফে, ইঙ্গমার বার্গম্যান; ১৯১৮-২০০৭; সুইডেন] পর্যন্ত, পৃথিবীর নানা প্রান্তের ফিল্মমেকারেরা এ দুজনের সিনেমার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ১৯৬৩ সালে স্ট্যানলি কুব্রিক [ফিল্মমেকার; ১৯২৮-১৯৯৯; যুক্তরাষ্ট্র] বলেছেন, ‘দ্য নাইট’ তার পছন্দের দশটি সিনেমার একটি। তরুণ বয়সে স্টিভেন স্পিলবার্গ [ফিল্মমেকার; ১৯৪৬-; যুক্তরাষ্ট্র] লিখে জানিয়েছেন, ফেল্লিনি ছিলেন তার অন্যতম অনুপ্রেরণা। আলফ্রেড হিচকক [ফিল্মমেকার; ১৮৯৯-১৯৮০; যুক্তরাজ্য] ছিলেন এ দুজনের কাছেই একজন উদ্যমী উপাসক; তিনিই বলেছেন সেরা কথাটি। ১৯৭৮ সালে যখন আমি তার জীবনী লিখছিলাম, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘এই দুই ইতালিয়ান সহকর্মী তো আমাদের চেয়ে একশো বছর এগিয়ে আছেন। ব্লো-আপ আর ৮ ১/২ তো ভয়াবহ-রকমের মাস্টারপিস ফিল্ম।’

লা দোলচে ভিতা
লা দোলচে ভিতা । অভিনয়ে মাস্ত্রোইয়ান্নি ও আনিতা এডবার্গ 

১৯৯৩ সালে অভিনেতা মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ান্নি [১৯২৪-১৯৯৬; ইতালি] আমাকে বলেছিলেন, ‘অতীতের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, সৃষ্টিশীলতার বিচারে ফেদেরিকো ও মিকেলাঞ্জেলো ছিলেন অভিন্ন সত্তা– যদিও তাদের কাজের ভঙ্গিমা ছিল আলাদা। মিকেলাঞ্জেলোর কাছে এটি ছিল যেন হার্ট সার্জারি করার মতো ব্যাপার, তবে সেটা আপনার নিজের নয়। ফেদেরিকোর কাছে ছিল যেন কোনো পিকনিকের মতো ব্যাপার।’

মাস্ত্রোইয়ান্নিকে কাস্ট করে দুটি ফিল্ম বানিয়েছিলেন আন্তোনিওনি– দ্য নাইটবিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস [১৯৯৫]; আর ফেল্লিনি বানিয়েছিলেন চারটি ফিল্ম– লা দোলচে ভিতা, ১/২, সিটি অব উইমেন [১৯৮০] ও জিঞ্জার অ্যান্ড ফ্রেড [১৯৮৬]।

অভিনেতাদের কাস্ট করার আগে, সিনেমার চরিত্রগুলোর কার্টুন এঁকে ভিজ্যুয়ালাইজ করতে অভ্যস্থ ফেলেন্নি আমাকে বলেছিলেন, লা দোলচে ভিতার ক্ষেত্রে মাস্ত্রোয়াইন্নির কথা শুরু থেকেই মাথায় ছিল তার : “কিন্তু স্ক্রিপ্ট চেয়েছিলেন মার্সেল্লো। আমি তাকে মোটা একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট দিয়েছিলাম; সেটির প্রথম পাতা ছাড়া বাকি সব পাতাই ছিল ফাঁকা। আর প্রথম পাতায় আমি শুধু এঁকে দিয়েছিলাম তার [অভিনীত] চরিত্রটিতে তাকে যেভাবে ভাবছি– সে রকম একটি ছবি : মহাসমুদ্রের মাঝখানে, একটা ছোট্ট নৌকায় এক পড়ে গেছে মাস্ত্রোইয়ান্নি; সেটির ফুটো তাকে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে নেওয়ার পথ করে দিয়েছে; আর নৌকাটি ঘিরে সাঁতরে বেড়াচ্ছে সুন্দরী মৎসকন্যারা। মার্সেল্লো ছবিটির দিকে তাকালেন, আর বললেন, ‘চরিত্রটি ইন্টারেস্টিং। আমি এটা করব’।”

জিঞ্জার অ্যান্ড ফ্রেড-এ, ফেল্লিনির স্ত্রী ও তার চারটি মেজর সিনেমার অভিনেত্রী জ্যুলিয়েত্তা মাসিনার বিপরীতে অভিনয় করেছেন মাস্ত্রোইয়ান্নি। ১৯৪৩ সালে ফেল্লিনি নিজের লেখা একটি রেডিও সিরিয়ালে শুনেই এ নারীর কণ্ঠ পছন্দ করে ফেলেন; এবং তাকে নিমন্ত্রণ জানান ডিনারের। কয়েক মাস পরেই তারা বিয়ে করেন; এবং একসঙ্গে জীবনকাটিয়ে দেন  ৫০ বছর। বিয়ের প্রথম দিকে মাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন; গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায় তার। এরপর দ্রুতই আরেকটি সন্তান নিয়ে নেন তিনি; তাকে তারা ফেদেরিকো নামে ডাকতেন; কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহ বয়সেই সেই পুত্রটি মারা যায়। জ্যুলিয়েত্তাকে জানানো হয়, তিনি আর কখনোই মা হতে পারবেন না। ফেদেরিকো আমাকে বলেছেন, ‘জ্যুলিয়েত্তার বয়স খুবই কম ছিল; আর ফেদেরিকো মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত ওকে ওর বয়সের চেয়ে কমবয়সী, নিষ্পাপ মেয়ে লাগত দেখতে। এরপর আর ওকে কখনোই তেমনতর কচি খুকি লাগেনি। কোনোদিনই বেড়ে না ওঠা বাচ্চা ফেদেরিকো আমাদের মধ্যে একটা বন্ধন গড়ে দিয়ে গেছে।’

১৯৫০ দশকের শেষভাগে অভিনেত্রী মনিকা ভিত্তিকে আবিষ্কার করেন আন্তোনিওনি; পরের দশকে তার অসাধারণ চারটি সিনেমার অভিনেত্রী ছিলেন এ নারী : দ্য অ্যাডভেঞ্চার, দ্য নাইট, এক্লিপস ও রেড ডিজার্ট। ফেল্লিনি ও মাসিনার মতোই, এ দুজনের মধ্যেও গভীর অন্তরঙ্গ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। আন্তোনিওনির রোমের অ্যাপার্টমেন্টটি থেকে মনিকার অ্যাপার্টমেন্টের মাঝখানে দূরত্ব ছিল একটি ট্র্যাপডোর ও স্পাইরাল সিঁড়ি : নিচের তলায় থাকতেন মনিকা। ফলে পরস্পরের কাছে তাদের আসা-যাওয়া ছিল অবাধ। এই সম্পর্কটি যখন ভেঙ্গে যায়, দরজাটি ফ্লোরের সঙ্গে একেবারেই আটকিয়ে দেন আন্তোনিওনি। মনিকার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বিয়ে করেন এনরিকাকে। তার এই দ্বিতীয় স্ত্রী একবার কার্পেট সরিয়ে, জায়গাটা দেখিয়েছিলেন আমাকে। ১৯৭১ সালে, মিলান শহরের আর্টের ছাত্রী এনরিকা চলে আসেন রোমে, চাকরি খুঁজতে। ‘জগতের সবচেয়ে সুন্দর পায়ের অধিকারী সে’– এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে, আন্তোনিওনি তাকে কাজ দেন নিজের সিনেমার ওয়ারড্রব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে; এবং এই ফিল্মমেকারের মৃত্যুর আগপর্যন্ত, দুজনে একসঙ্গেই জীবন কাটান।

ফেল্লিনি ও আন্তোনিওনি– দুজনেই পেয়েছেন ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট’ অস্কার; আর এ পুরস্কার গ্রহণকালে, দুজনের সঙ্গেই আমি হাজির ছিলাম। ১৯৯২ সালে ফেল্লিনি জানতে পারেন, এ বছর তাকে অস্কার দেওয়া হবে; ইতোমধ্যেই নাইটস অব কাবিরিয়ার জন্য ‘বেস্ট ফরেন ফিল্ম’ ক্যাটাগরিতে অস্কার-জয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভীষণ আনন্দিত ছিলেন তিনি; তবে পুরস্কার নিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় উড়াল দেওয়ার ব্যাপারে ভীষণ নাখোশ হয়ে পড়েন। বাতের অসুখের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি ফেল্লিনির মনে দীর্ঘযাত্রার ব্যাপারে আতঙ্কের জন্ম দেয়; এবং তিনি নিজের পুরস্কার-গ্রহণকালীন বক্তৃতা ঠিক করতে পারছিলেন না। সমাধান হিসেবে ঠিক করেন, জ্যুলিয়েত্তা গিয়ে তার পক্ষে পুরস্কারটি গ্রহণ করবেন। কিন্তু এ ঘোষণার পর, রোমের প্রত্যেকটি ট্যাক্সি ড্রাইভার তাকে বলতে থাকেন, ‘ফেফে [ফেদেরিকোর আদুরে নাম], ইতালির জন্য আপনার যাওয়া উচিত!’ ফলে মন নরম হয় তার। অস্কারের একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দিয়ে, ভাষণদানের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে, দর্শক সারিতে বসে থাকা জ্যুলিয়েত্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি– এই ভদ্রমহিলা তখন ভীষণ গর্ব ও আনন্দে কাঁদছিলেন। মাইক্রোফোনে ফেল্লিনি বলেন, ‘ধন্যবাদ, প্রিয়তমা জ্যুলিয়েত্তা। দয়া করে কান্না থামাও।’ পরে তিনি আমাকে বলেছেন, ‘সেই মুহূর্তটিই আমাদের জীবনের সংক্ষিপ্ত রূপ।’

ফেদেরিকো ফেল্লিনি ও জ্যুলিয়েত্তা মাসিনা
ফেদেরিকো ফেল্লিনি ও জ্যুলিয়েত্তা মাসিনা

এনরিকা যখন জানতে পারেন, ১৯৯৪ সালের স্পেশাল অস্কারের জন্য মিকেলাঞ্জেলোকে বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন আমিও ছিলাম উমব্রিয়ায় অবস্থিত আন্তোনিওনির গ্রামের বাড়িতে। এনরিকা আমাকে বললেন, ‘সেন্ট ফ্রান্সিসের কাছে আশীর্বাদ চাওয়া উচিত আমাদের।’ নিকটবর্তী সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির গির্জায় হাজির হলাম আমরা। এনরিকা আমার হাত ধরে রেখেছিলেন। আমরা প্রার্থনা করলাম। বাড়িতে ফিরতেই, হাসিমুখে মিকেলাঞ্জেলো আমাদের জানালেন, তিনি মাত্রই জানতে পেরেছেন– তাকে অস্কার দেওয়া হচ্ছে।

হলিউডে, আন্তোনিওনি-দম্পতির জন্য তাদের হোটেল স্যুইটে এক বোতল শ্যাম্পেন অপেক্ষা করছিল। একটা কার্ডে লেখা ছিল, ‘উল্লাস!’; আর তাতে স্বাক্ষর ছিল– ‘জ্যাক’। ১৯৭৫ সালে দ্য প্যাসেঞ্জার সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন জ্যাক নিকোলসন [১৯৩৭-; যুক্তরাষ্ট্র]। শ্যাম্পেনের বোতলটি তারা হোটেলে খোলেননি, বরং নিয়ে এসেছিলেন রোমে; সেখানে আন্তোনিওনির পরবর্তী সিনেমা বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস-এর মহরত-পার্টিতে সেটি পরিবেশন করা হয়।

১৯৮৫ সালে একটি ম্যাসিভ স্ট্রোকের শিকার হন আন্তোনিওনি। হাসপাতালে শুয়ে, কথা বলতে অক্ষম এ মানুষটি এনরিকার আঙ্গুলে ওয়েডিং ব্যান্ড এঁকে দেন; আর তাতে সাড়া দেন এনরিকা। সময় যত যেতে থাকে, কথা বলা ও চলাফেরার কিছু ক্ষমতা ফিরে পেতে থাকেন আন্তোনিওনি; যদিও এ দুটি কাজ করা তার জন্য ভীষণ দুরূহই থেকে যায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘স্ট্রোক করার একটা সুবিধা আছে। বাল্যকাল থেকেই আমার ঠোঁট কাঁপত। স্ট্রোকের পর সেটা ভালো হয়ে গেছে!’

যদিও অস্কার গ্রহণকালীন বক্তৃতা তিনি লিখে নিয়েছিলেন, তবে জানতেন, সেটি পড়তে পারবেন না; ফলে তার পক্ষে পড়ার দায়িত্ব এনরিকাকে দেন। এনরিকা যখন পড়া শেষ করেন, আন্তোনিওনি ঠিক করে রেখেছিলেন শুধু একটি শব্দ বলবেন : ধন্যবাদ।

অস্কার রিহার্সালের আগে, পদক তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া জ্যাক নিকোলসন, বড় বড় পা ফেলে আন্তোনিওনির ড্রেসিং রুমে ঢুকে পড়েন, বাঁকা-হাসিমুখে। এর আগে দীর্ঘদিন দেখা হয়নি তাদের দুজনের। তারা হাত মেলান; আর নিকোলসন বলে ওঠেন, ‘কুত্তার বাচ্চা!’

আন্তোনিওনি ও এনরিকা যখন পুরস্কার বিতরণীর রাতে, স্টেজে ওঠার অপেক্ষা করছিলেন, নিকোলসন তাকে ফিসফিস করে বলেন, ‘যদি দেখেন আপনার ময়দান ফাঁকা, কিছু মনে করবেন না মিকি। সবাই কিন্তু এনরিকার দিকেই তাকিয়ে থাকবে।’ আন্তোনিওনি আপনা-আপনি মাথা নিচু করে ফেললে নিকোলসন হেসে ওঠে বলেছিলেন, ‘গর্দভ!’ এর কিছুক্ষণ পর আন্তোনিওনি ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এবং কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তুমুল অভিবাদন।

দ্য প্যাসেঞ্জার । অভিনয়ে মারিয়া স্নেইডার ও জ্যাক নিকোলসন
দ্য প্যাসেঞ্জার । অভিনয়ে মারিয়া স্নেইডার ও জ্যাক নিকোলসন

১৯৯৩ সালে ফেল্লিনিও স্ট্রোক আক্রান্ত হন। সে সময় জ্যুলিয়েত্তা ভীষণ অসুস্থ ছিলেন; আর কয়েক সপ্তাহ পরেই ছিল তাদের পঞ্চাশতম বিবাহবার্ষিকী; ফলে দিনটি উপযাপন করার জন্য হাসপাতাল ছাড়তে উন্মুখ হয়ে পড়েন ফেল্লিনি। দিনটি ছিল রোববার। তাদের পছন্দের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকলেও, শেষ পর্যন্ত একটি উপযুক্ত রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করেন তিনি। ডাক্তার তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন তার অন্যতম পছন্দের খাবার– মজারেলা [পনির] না খাওয়ার ব্যাপারে; কিন্তু ম্যানুতে সেটি দেখে তিনি অর্ডার করে বসেন। এক টুকরো সাবাড় করে দেন; আর পরের দিনই মেসিভ স্ট্রোক করে চলে যান কোমায়। এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি তার।

ফেল্লিনি মারা যান ১৯৯৩ সালের ৩১ অক্টোবর; ৭৩ বছর বয়সে। এর চার মাস পর মারা যান জ্যুলিয়েত্তা। তার শেষ কথা ছিল, ‘ফেদেরিকোর সঙ্গে ইস্টার উদযাপন করতে যাচ্ছি আমি।’

ফেল্লিনির মৃত্যুর পর ১৪ বছর বেঁচে ছিলেন আন্তোনিওনি। দৃষ্টিশক্তির ক্ষয়ে আসা তার পেইন্টিং কিংবা ড্রয়িংয়ের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কেড়ে নেয়। মৃত্যুর দুইদিন আগে তিনি এনরিকাকে অনুরোধ করেন, যেন গাড়িতে করে তাকে রোম শহরটি ঘুরিয়ে দেখানো হয়, যেন নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ‘দেখে’ যেতে পারেন। এনরিকা বলেছিলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ড্রাইভে, আমাদের কোনো বন্ধুকে ডেকে নিই।’

‘না। আমি আর কাউকেই চাই না। শুধু তুমি থাকবে।’

এর পরের দিন, মিকেলাঞ্জেলোর আবদার মতো সব জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন এনরিকা। এনরিকা যা যা দেখছেন, সবকিছুর বর্ণনা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন আন্তোনিওনি; আর [শুনতে শুনতে] নিজের মুখটা, গাড়ির জানালার কাঁচে ঠেসে ধরে রেখেছিলেন তিনি।

২০০৭ সালের ৩০ জুলাই, আন্তোনিওনির জীবনের শেষ দিনে, এই দুজন হাতে হাত ধরে বসে ছিলেন তাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালার পাশে। আন্তোনিওনির বয়স হয়েছিল ৯৪।

এনরিকা পরে আমাকে বলেছেন, ‘ক্যামেরা বসাতে পারবে, এমন জায়গা সবসময় খুঁজে বেড়াত মিকেলাঞ্জেলো; এমনকি যখন আমরা হাঁটতে বের হতাম কিংবা কফি খেতাম, তখনও। ব্যাপারটি মাঝে মধ্যে আমার কাছে বিরক্তিকর লাগত; কেননা, আমার প্রতি কোনো মনোযোগ থাকত না তার। ক্যামেরাই ছিল তার প্রেমিকা; আর সেটির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমি কোনোদিনই করে ওঠতে পারিনি। পরে দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকে সে। মিকেলাঞ্জেলো যখন ক্যামেরা রাখার জায়গা খোঁজা থামিয়ে দিলো, তখন আমি তাকে ভালো ভালো জায়গার কথা বলার চেষ্টা করতাম; কিন্তু সে শুনতেও চাইত না। আজব ব্যাপার হলো, আমি এখনো, সবসময়ই তার জন্য এমনতর জায়গা খুঁজে বেড়াই– যেখানে সে ক্যামেরা বসাতে পারবে। একেকটা জায়গা দেখি, আর ভাবি, মিকেলাঞ্জেলো, এ জায়গাটা কেমন, বলো তো?’

মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ও এনরিকা আন্তোনিওনি
মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ও এনরিকা আন্তোনিওনি

সূত্র : ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিন। মার্চ ২০১২

শার্লট শ্যান্ডলার। জন্ম : ২২ এপ্রিল ১৯২৩; মৃত্যু : ২৯ মার্চ ২০১৫। আমেরিকান জীবনীকার; নাট্যকার। ফিল্মগ্রন্থ : আই, ফেল্লিনি [১৯৯৫]; নোবডি’স পারফ্যাক্ট : বিলি ওয়াইল্ডার, অ্যা পারসোনাল বায়োগ্রাফি [২০০২]; ইট’স অনলি অ্যা মুভি : আলফ্রেড হিচকক, অ্যা পারসোনাল বায়োগ্রাফি [২০০৫]; দ্য গার্ল হু ওয়াকড হোম অ্যালোন : বেটি ডেভিস, অ্যা পারসোনাল বায়োগ্রাফি [২০০৬]; ইঙ্গরিড : ইঙ্গরিড বার্গম্যান, অ্যা পারসোনাল বায়োগ্রাফি [২০০৭] প্রভৃতি

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

6 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন