‘প্রেমিক, স্বামী, ফিল্মমেকার, অথবা, আমার গোদার’ ।। সাক্ষাৎকারে আনা কারিনা

5
770

আনা কারিনা যখন ফিল্মমেকার জ্যঁ-লুক গোদারের সঙ্গে প্রথমবার দেখা করেন, তখন তিনি ১৯ বছরের কিশোরী। জন্মশহর কোপেনহেগেন ছেড়ে প্যারিসে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন তখন বছর দুয়েক হলো। মডেল হওয়ার স্বপ্নে, পথে পথে ঘুরে, পকেট তার শূন্য তখন। অথচ গোদারের ‘দ্য লিটল সোলজার’ ফিল্মটিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে, গোদারের ফিল্মগুলোতে অভিনয় করে, রাতারাতি তিনি পরিণত হন ‘ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ’-এর একটি প্রতীকে। হয়ে ওঠেন এই মাস্টার ফিল্মমেকারের প্রেমিকা, স্ত্রী ও ক্রীড়ানক! সব দিক থেকেই তাদের সম্পর্কটি এত বেশি আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে; পরিণামে ১৯৬৫ সালে বিবাহ-বিচ্ছেদ টানেন তারা। কিন্তু ফিল্মগুলো, এবং বিশেষত কারিনার পারফরমেন্সের জাদু, দিন যত যেতে থাকে, ততবেশি দুর্মূল্য হয়ে ওঠে। জীবনের অনেকটা সময় পাড়ি দিয়ে, পচাত্তর বছর বয়সে পৌঁছে, আনা কারিনা জানান দিয়েছেন প্রথম জীবনের অনুভূতি, গোদারের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর মমত্ব ও আদরের বারতা। এ বছরেরই মে মাসে দেওয়া তার দুটি সাক্ষাৎকার হাজির করা হলো এখানে। সাক্ষাৎকার দুটি হওয়ায় কিছু প্রসঙ্গের পুনারাবৃত্তি ঘটলেও, তা অবিকল রেখে দেওয়া হলো– তাতে নতুন বাক্য, নতুন তথ্য সংযুক্ত হওয়ায়…

জ্যঁ-লুক গোদার ও আনা কারিনা
জ্যঁ-লুক গোদার ও আনা কারিনা

সাক্ষাৎকার-১

ক্রেইগ হুবার্ট : মডেলিংয়ে জড়িয়েছিলেন কীভাবে?

আনা কারিনা : ১৭ বছর বয়সে প্যারিস চলে আসি আমি। একদিন লাতিন কোয়ার্টারে, ‘লা দ্যু মাগো’ নামের এক ক্যাফেতে বসে ছিলাম। আমি তখন ইংরেজিতে কথা বললেও, ফ্রেঞ্চ ভাষায় একটা শব্দও বলতাম না। এক ভদ্রমহিলা আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ফ্যাশনের কয়েকটা ছবি তুলতে চাও?’ শুনে ঘাবড়ে গেলাম। বললাম, যদি তিনি সঙ্গে অনেক লোক নিয়ে আসেন, তাহলে রাজি আছি। [ছবিগুলোতে] আমি হয়তো গেঁয়ো ছিলাম; তবে গেঁয়ো হওয়াটা কখনো কখনো উপকারে আসে। ‘জ্যু দু ফ্রান্স’ নামের একটা পত্রিকায় সেই ছবিগুলো ছাপা হলো। টাকার দরকার ছিল আমার। কিন্তু ছাপা হওয়ার আগপর্যন্ত তারা আমাকে একটা পয়সাও দিতো না। তাই ছবিগুলোর কপি হাতে নিয়ে, আর কোনো জুতো ছিল না বলে নোংরা হয়ে যাওয়া সাদা হাই-হিল পরেই, পায়ে হেঁটে ‘এলে’ ম্যাগাজিন অফিসে হাজির হলাম। এর কিছুদিন পর, ‘এলে’র কাভারে জায়গা পেলাম আমি; আর হুট করেই সবাই আমাকে চাইতে লাগল : এ যেন এক অলৌকিক ব্যাপার!

হুবার্ট : আনা কারিনা নামটা পেলেন কীভাবে?

আনা কারিনা : ‘এলে’র একটা শুট করতে গিয়ে, ম্যাকআপ-লেডিকে জানালাম, অভিনেত্রী হওয়ার ইচ্ছে ছিল আমার। আচমকাই রুমটিতে আরেক ভদ্রমহিলা ঢুকে পড়লেন : দেখতে ভীষণ স্মার্ট, মাথায় বড় একটা হ্যাট আর ঠোঁটে সিগারেট ধরা। অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম– এ কথাটা তিনি শুনে ফেললেন। বললেন, ‘নাম কী তোমার?’ বললাম, ‘হানে কারিন বায়ার’। বললেন, ‘নিজের নাম তোমার বলা উচিত আনা কারিনা।’ ভদ্রমহিলাটি ছিলেন স্বয়ং কোকো শানেল [ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার; ‘শানেল’ ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাত্রী]। শুধুমাত্র পারফিউম থেকেই তার নাম জানতাম আমি।

হুবার্ট : কীভাবে দেখা হলো গোদারের সঙ্গে?

আনা কারিনা : ‘ব্রিথলেস’ ফিল্মটির একটি চরিত্রে অভিনয় করার জন্য একটি টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল আমার কাছে। কিন্তু সে [গোদার] বলল, আমাকে কাপড় খুলতে হবে। তখনকার দিনে চোখে কেউ চোখে কালো চশমা পরত না; অথচ কালো চশমা পরে থাকা এই আজব লোকটিকে মানা করে দিলাম। তিন-চার মাস পর আরেকটি টেলিগ্রাম পেলাম আমি; এ বেলা জানাল, একটি ফিল্মের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমাকে অভিনয় করাতে চায় সে। টেলিগ্রামটি আমার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবকে দেখালাম। তারা বলল : ‘গোদার! ওনার সঙ্গে তোর দেখা করা উচিত!’ আমি ভাবলাম, ‘কালো চশমা পরে থাকা আজব লোকটা?’

হুবার্ট : আপনাদের কাজের সম্পর্কটা কেমন ছিল?

আনা কারিনা : বরাবর একইরকম ছিল– কোনো স্ক্রিপ্ট নেই; একেবারে শেষ মুহূর্তে ডায়লগ বলে দেওয়া। সবাই সবসময় ভাবত, আমরা যা বলতে চেয়েছি, স্রেফ সে কথাগুলোই বলে গেছি। বিষয়টা ব্যাখ্যা করা কঠিন : কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী জানতে চান– কেন তাদের এটা বা ওটা করতেই হবে। গোদারের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি ভীষণ সহজ ও সহজাত ছিল।

হুবার্ট : আপনি একবার বলেছিলেন, ‘ব্যান্ড অব আউটসাইডারস’-এ কাজ করে প্রাণে বেঁচে গেছেন।

আনা কারিনা : এ এক দীর্ঘ ও বেদনার গল্প। আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গিয়েছিলাম বলেই গোদার আর আমি বিয়ে করে ফেলি। তারপর আমার বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায়। এ ব্যাপারে কারও কিছুই করার ছিল না। ফলে কোনো পাগলা বাড়ি নয়, বরং আমি এমন একটা জায়গা খুঁজছিলাম, যেখানে স্বস্তি পাব। [নিজের] বাড়িটা ভাল্লাগছিল না আমার। একদিন গোদার এসে আমাকে বের করে নিয়ে গেল; কেননা, আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলাম আমি। বলল; “একটা নতুন ছবি বানাচ্ছি; কেন্দ্রীয় চরিত্রে তুমিই অভিনয় করবে। ফিল্মটার নাম ‘ব্যান্ড অব আউটসাইডারস’।” এরপর যেন জীবনে ফিরে এলাম আমি।

হুবার্ট : এই কষ্টের বিষয়গুলো বাদ দিলে, সেই সময়কালটির কোনো স্মৃতি আপনাকে বিমোহিত করে?

আনা কারিনা : আমরা কখনোই ভাবিনি, এই ফিল্মগুলো এত দীর্ঘদিন ধরে এত বিখ্যাত হয়ে রবে। আমরা স্রেফ আনন্দের জায়গা থেকে কাজগুলো করে গেছি। এ ছিল বোহেমিয়ান ব্যাপার-স্যাপার। আমরা জানতাম, নিজেদের কাছে ভাল্লাগে– এমন কিছু করছি আমরা; আর এটি মোটেও অন্যকারও মতো ছিল না। এ ছিল এক আনন্দময় জগৎ।

আনা কারিনা ও জ্যঁ-লুক গোদার

সাক্ষাৎকার-২

প্যাট্রিসিয়া গার্সিয়া : এটি আপনার জন্য অনেক বড় একটি সপ্তাহ। বিএএম-সিনেমাটেকে [ব্রুকলিন একাডেমি অব মিউজিক (বিএএম) সিনেমা-হল] আপনার একটা বয়ান ছিল; আর তারপর ‘ফিল্ম ফোরাম’-এ ‘ব্যান্ড অব আউটসাউডারস’-এর একটা সদ্য রিস্টোরকৃত ভার্সনের প্রিমিয়ার হয়েছে।

আনা কারিনা : নিউইয়র্ক আমার বরাবরই ভালোলাগে। আবার এখানে ফিরতে পেরে খুশি লাগছে। শেষ এসেছিলাম বছর পনের আগে। ‘ব্যান্ড অব আউটসাউডারস’ উপস্থাপন করার জন্যও নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আমাকে। ‘দ্য প্লাজা’র একটি বিশাল স্যুটে উঠেছিলাম আমি; সেই হোটেলটি এখন আর নেই!

প্যাট্রিসিয়া : এই ফিল্মটির যখন শুটিং করছিলেন, ধারণা করতে পেরেছিলেন– এটি সিনেমার ইতিহাসে এমন একটি ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠবে?

আনা কারিনা : না; এ নিয়ে একদমই ভাবিনি। জ্যঁ-লুক গোদারের সিনেমায় কাজ করতে পারছি– এ বিষয়টি আমাদের সবসময় কেবলই আনন্দ দিতো। বরাবরেই মতোই কোনো স্ক্রিপ্ট ছিল না। শুটিং শুরু করার একেবারেই শেষ মুহূর্তে বলে দিতো ডায়ালগ। অবশ্য সামি ফ্রে ও ক্লুদ ব্রাসোর [ফিল্মটির দুই অভিনেতা] সঙ্গে নাচের রিহার্স করিয়েছিলাম আমরা। প্রত্যেকদিন শুটিং শেষ হলে, রাতে দুই ঘণ্টা ধরে রিহার্স করতাম, যেন তারা শিখতে পারেন। শুরুতে তাদের বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল।

প্যাট্রিসিয়া : এই যে, আপনাদের [আনা ও গোদার] একসঙ্গে [অভিনেত্রী ও ফিল্মমেকার হিসেবে] বানানো সিনেমাগুলো এখনো মানুষকে এত আলোড়িত করে– এ ব্যাপারটি কেমন লাগে?

আনা কারিনা : অসাধারণ! ভালোলাগে খুব। আমি একবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলাম; দেখি, বছর পনের বয়সী কিশোর-কিশোরীরা স্কুল পালিয়ে ‘ব্যান্ড অব আউটসাউডারস’ দেখতে এসেছে। হায় বাচ্চারা! ইতালিতেও একই ঘটনা দেখেছি; সুইজারল্যান্ডেও। আর লন্ডনে তো পাগলাটে ছিল ব্যাপারটা!

প্যাট্রিসিয়া : এই ফিল্মগুলোতে সময়ের স্বাদ রয়ে গেছে– এমনটা মনে করেন কেন?

আনা কারিনা : আমার ধারণা, এর কারণ হলো, এগুলো কোনো-না-কোনোভাবে আপনার [দর্শকের] ভাষাতেই কথা বলে। এগুলো সেকেলে নয়। এগুলোর কোনোকিছুই সেকেলে নয়; এমনকি যতগুলো পোশাক-পরিচ্ছদ আছে– সেগুলোও এখনকার পোশাকের মতোই। এটি ভীষণরকম বর্তমান এখন।

প্যাট্রিসিয়া : গোদারের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার কথা বলুন।

আনা কারিনা : দেখুন, সে আমাকে ‘ব্রিথলেস’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করতে ডেকেছিল। বলেছিল, ‘তোমাকে কাপড় খুলতে হবে’। কিন্তু নগ্ন হতে আমি চাইনি। শুনে সে বলল, ‘কিন্তু একটা সাবানে [সাবানের বিজ্ঞাপন] তোমাকে তো আমি তেমনটাই দেখেছি!’ তখন আমার কোনো টাকা ছিল না বলে, টাকা কামাতে কিছু পাবলিসিটি করেছিলাম। বয়স খুবই কম ছিল আমার। তাকে বললাম, ‘আমি নগ্ন ছিলাম না। এটা তোমার কল্পনা। তুমি কাঁধের একটু অংশ দেখেছ কেবল; কিন্তু তার নিচে বিশাল একটা বাথিং স্যুট পরনে ছিল আমার।’ যেহেতু ফিল্মটি আমি করব না, তাই চলে এলাম। এর তিন কি চার মাস পর নতুন একটা টেলিগ্রাম পেলাম : জ্যঁ-লুক গোদার আর প্রোডাকশন কোম্পানি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে, এবার সম্ভবত কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করতে দেবে। ভাবলাম, নিশ্চয়ই ইয়ার্কি করছে; নিজের বন্ধু-বান্ধবকে দেখালাম টেলিগ্রাফটা। ওরা বলল, “তুই কি পাগল? সবাই ওনাকে চেনে। তার সিনেমাটি এখনো মুক্তি পায়নি, তবে সেটির নাম ‘ব্রিথলেস’; আর জ্যঁ সেবার ও জ্যঁ-পল বেলমদোঁ তাতে অভিনয় করেছেন। তারা সবাই বলেছেন, ফিল্মটি ফ্যান্টাস্টিক। তোর উচিত তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া।” তাদের কাছে জানতে চাইলাম, কালো চশমা পরা লোকটাই গোদার কিনা? কেননা, তাকে ভীষণ আজব লোক মনে হয়েছিল আমার।

প্যাট্রিসিয়া : তার মানে, আরেকবার অডিশন দিতে গেলেন?

আনা কারিনা : আমি গিয়েছিলাম জ্যঁ-লুক গোদারকে দেখতে; সে আমার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি পার্ট পেয়ে গেছ। কালকে চলে এসো, কন্ট্রাক্ট সাইন করতে।’

প্যাট্রিসিয়া : এইটুকুই! অডিশন বা কোনোকিছু নয়?

আনা কারিনা : তো, আমি বললাম, এটা সম্ভব নয়। জানতে চাইল : ‘আবার কী সমস্যা? প্রথমবার তো বলেছিলে, তুমি নগ্ন হতে চাও না।’ এ কথা শুনে জানতে চাইলাম, এই সিনেমায়ও আমাকে নগ্ন হতে হবে কিনা। বলল, “না, না; এটা রাজনৈতিক ফিল্ম। তুমি কালকে স্রেফ চলে এসো, কন্ট্রাক্ট সাইন করে যেও।’ আমি বললাম, ‘পারব না’। আমার সমস্যা কোথায়– জানতে চাইল সে। তাকে বোঝালাম, আমি তখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক; কোনো কন্ট্রাক্টে সাইন করতে হলে বয়স অন্তত ২১ হতে হয়, অথচ তখন আমার বয়স সাড়ে ১৮ বছর। সে জানাল, এটা কোনো সমস্যা হবে না; কন্ট্রাক্টে সাইন করানোর জন্য আমি যেন আমার বাবা কিংবা মাকে সঙ্গে নিয়ে আসি। আমি বললাম, “পারব না!”

“ওহ, লা, লা… কী সমস্যা আবার?’

“আমার মা ডেনমার্ক থাকে, কোপেনহাগেন!’

সে বলল, ‘কোনো অসুবিধা নেই; এখানে, অফিস থেকে তোমার মাকে ফোন করো, আর বলো এক্ষুনি রওনা দিয়ে দিতে।’ তো, আমি ফোন করে বললাম, ‘আম্মু, জ্যঁ-লুক গোদারের একটা রাজনৈতিক সিনেমায় আমি কাজ করছি। তোমাকে এখানে এসে, কন্ট্রাক্টে সাইন করতে হবে।’ মা ভাবলেন, আমি হয়তো মিথ্যে বলছি; তাই ফোন রেখে দিলেন। তবে এর আগে, জীবনে কোনোদিনই বিমানে না ওঠলেও, পরের দিনই চলে এলেন তিনি। প্যারিসে পৌঁছে, আমার কন্ট্রাক্টে সাইন করে দিলেন।

গোদার-কারিনা। প্যারিসে, নিজেদের ঘরে। ১৯৬৩
গোদার-কারিনা। প্যারিসে, নিজেদের ঘরে। ১৯৬৩

প্যাট্রিসিয়া : গোদারের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করলেন কখন?

আনা কারিনা : ধীরে ধীরে আমরা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আমাদের মধ্যে ভীষণরকম বিশেষ এমন কিছু ছিল, যা থেকে পালানোর উপায় ছিল না কোনো। এ ছিল চুম্বকধর্মী কিছু। এ সব শুরু হয় ‘দ্য লিটল সোলজার’-এর সময় থেকেই। লুসানে [সুইজারল্যান্ড] ক্রু-সহ আমরা সবাই মিলে ডিনার পার্টি করছিলাম; তখন সে আমাকে একটা চিরকুট পাঠায় : ‘আই লাভ ইউ; ক্যাফে দে লা প্রেজ [প্যারিস, ফ্রান্স] নামের  ক্যাফেটিতে মাঝরাতে, দেখা করতে এসো তুমি।’ আমি তখন অন্যকারও সঙ্গে [সম্পর্কে] ছিলাম; কিন্তু করার কিছুই ছিল না আমার। একেবারেই আলাদা একটা জগতে যেন চলে গিয়েছিলাম আমি। জানি না, ব্যাপারটা আপনি ঠিক বুঝবেন কিনা। এড়িয়ে যেতে পারিনি আমি। পুরোপুরি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এরপর আমি আমার সব বন্ধু-বান্ধবকে হারাতে থাকি; কেননা, তারা আমার আগের প্রেমিকটিকে বেশি পছন্দ করত। তাই এরপর আমরা দুজন প্যারিস চলে এলাম। জ্যঁ-লুক জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে, তুমি এখন যাবে কোথায়? কোথায় নিয়ে যাব তোমাকে আমি?’ বললাম, ‘তুমি আমাকে কোথাও নিতে পারবে না; আমাকে তোমার সঙ্গেই থাকতে হবে! আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই!’

প্যাট্রিসিয়া : সিনেজগতে তো এই ‘দ্য লিটল সোলজার’ আপনাকে একটা বড় ধরনের ব্রেক এনে দেয়?

আনা কারিনা : ‘দ্য লিটল সোলজার’ ফিল্মটি প্যারিসে নিষিদ্ধ হয়েছিল; এটিকে সিনেমা-হলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। আলজেরিয়ান যুদ্ধের কথা বলা হয়েছিল বলে এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ফিল্মটি থেকে আমার আসলে কিছুই পাওয়ার ছিল না। কিন্তু ফিল্মটি প্রাইভেট প্রজেকশন রুমগুলোতে দেখানো হয়েছিল। মিশেল দেভিলা নামের আরেক ফিল্মমেকার এটি দেখে, আমাকে তার প্রথম সিনেমায় কাস্ট করেন। অবশ্য, তার আগে জ্যঁ-লুকের সঙ্গে তিনি কথা বলে নিয়েছেন; কেননা, আমার দেখ-ভাল জ্যঁ-লুকই তখন করত; আমি তখনো অপ্রাপ্তবয়স্কা ছিলাম।

প্যাট্রিসিয়া : আপনি অন্য ফিল্মমেকারদের সঙ্গে কাজ করলে গোদার কখনো ঈর্ষায় ভুগতেন না?

আনা কারিনা : হ্যাঁ, ভীষণ ঈর্ষায় ভুগত সে! আমাকে বলত, ‘এই লাইনগুলো কীভাবে বলবে তুমি? যাচ্ছেতাই সব লাইন! এটা একটা কমেডি ফিল্ম; এটা তুমি কখনোই ঠিকঠাক করে ওঠতে পারবে না।’ ‘টুনাইট অর নেভার’ শিরোনামের এই ফিল্মটির কাজ যখন শেষ হলো, সে বলল, তার মনে হচ্ছে ফিল্মটিতে আমি বেশ ভালো করেছি। এরপর আমার কাছে জানতে চাইল, তার ‘অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান’ সিনেমায় অভিনয় করব কিনা।

প্যাট্রিসিয়া : একসঙ্গেই যখন থাকছিলেন, তখন তার সঙ্গে আবার কাজ করতে পারাটা কেমন ছিল আপনার জন্য?

আনা কারিনা : প্রথম দিন ভীষণ নার্ভাস ছিলাম আমি; হাঁটুতে একদমই বল পাচ্ছিলাম না! তবে এর কারণ, আমার সামনে তখন সাক্ষাৎ দুই তারকা– জ্যঁ-পল বেলমদোঁ ও জ্যঁ-ক্লদ ব্রেয়লি হাজির! তবে তারা ভীষণ ভালো ছিলেন; আধঘণ্টার মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায় আমার জন্য। তারপর আমরা [আনা ও গোদার] বিয়ে করি। তখনো আমি অপ্রাপ্তবয়স্কা; বয়স সাড়ে ১৯ আমার। আমার কন্ট্রাক্টগুলোতে তখনো জ্যঁ-লুককে সাইন করতে হতো। সবকিছুতে সাইন করার জন্য নিজের স্বামী– এমন কারও একজনের দরকার ছিলই আমার।

প্যাট্রিসিয়া : তিনি কি ওভার-প্রটেক্টিভ ছিলেন?

আনা কারিনা : আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে সে। আমাকে বলে দিতো, কোন ধরনের বই পড়া উচিত। আমাকে সিনেমা-হলে নিয়ে যেত। অটো প্রিমিঙ্গারের ‘কারমেন জোনস’ [১৯৫৪] ফিল্মটি দেখাতে, আমাকে লন্ডন নিয়ে গিয়েছিল সে। ফিল্মটি ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিল তখন।

প্যাট্রিসিয়া : আপনি বলেছেন, অনেকটা সময়ের জন্য তিনি উধাও হয়ে যেতেন। কোথায় যেতেন– সে কথাটি আদৌ বলে যেতেন আপনাকে?

আনা কারিনা : না; কেননা, তখনকার দিনে আপনি যদি টেলিফোনের পাশে সারাক্ষণ বসে না থাকেন, তাহলে যোগাযোগে থাকা সম্ভব হতো না। কত কী-ই-না ভাবতাম আমি : ভাবতাম, সে বুঝি কোনো অ্যাকসিডেন্ট করেছে; কিংবা চলে গেছে অন্যকোনো মেয়ের সঙ্গে; আরও কী সব!

প্যাট্রিসিয়া : এ সময়টা কাটাতেন কী করে?

আনা কারিনা : অপেক্ষা! আর কী-ই-বা করতে পারতাম? বসে বসে অপেক্ষা করতাম। তবে এ সময়ের মধ্যে, জ্যঁ-লুকের বাইরেও, অনেক কাজ করেছি আমি। পরে বুঝতে পেরেছি, কখনো কখনো সে ইতালি চলে যেত [রোবের্তো] রোসেল্লিনির সঙ্গে দেখা করতে, কিংবা [ইঙ্গমার/ইংমার] বার্গম্যানের/বারিমনের সঙ্গে দেখা করতে চলে যেত সুইডেন, কিংবা নিউইয়র্কে চলে যেত [উইলিয়াম] ফকনারের সঙ্গে দেখা করতে। কেননা, সবখানেই বন্ধু ছিল তার; সে এভাবেই যাওয়া-আসা করত। সঙ্গে সবসময়ই নিজের পাসপোর্ট রাখত সে। সে ঠিক কোথা থেকে ঘুরে এলো, বাড়ি ফিরলেই বুঝে যেতাম আমি; কেননা, [পাসপোর্টে] স্টাম্পস দেখতাম। তাছাড়া, আমার জন্য সবসময়ই কোনো কোনো ছোট-মোট উপহার নিয়ে আসত সে।

প্যাট্রিসিয়া : আপনি নিজে কখনো উধাও হয়েছেন?

আনা কারিনা : না। কারণ, চেক আর টাকা-পয়সা– সবকিছু ওর কাছেই থাকত। যতদূর মনে পড়ে, সে সময়ে, মানে, ১৯৬৭ সালের আগে পর্যন্ত নারীদের চেক কাটার অধিকার ছিল না। এ একেবারেই আলাদা জগৎ ছিল। আপনাদের বয়স কম; আপনারা বুঝবেন না! তখনকার দিনে স্রেফ মুখ বুজে বসে থাকা ছাড়া, নারীদের আর কিছু করারই অধিকার ছিল না।

প্যাট্রিসিয়া : তার সঙ্গে আপনার সেই গভীর বন্ধনের কথা ভাবলে এখন কেমন লাগে?

আনা কারিনা : আমি বলতে চাই, এ ছিল এক উপহারের মতো ব্যাপার! সে এর সবই আমাকে দিয়েছে। ভীষণ আনন্দে ছিলাম আমি; কেননা, প্রত্যেকটি ফিল্মেই আলাদা আলাদা ব্যক্তি হিসেবে হাজির হতাম– নানা ধরনের এত এত চরিত্র আমি করেছি। তবে এর সবই ছিল তার আইডিয়া। আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ; আর, সারাজীবনই ভীষণ কৃতজ্ঞ রয়ে যাব। নিশ্চয়ই যেহেতু সে একজন বিশেষ মানুষ, ফলে এমন একজন মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানো কঠিন ছিল; বুঝলেন?

প্যাট্রিসিয়া : তার সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছে কবে?

আনা কারিনা : ওহ, অনেক-অনেক বছর আগে। সে বলেছিল, কারও সঙ্গেই দেখা করতে চায় না। সে বলে, সবকিছুই একটা পুরনো গল্প।


সূত্র

১. নিউইয়র্ক টাইমস। ৫ মে ২০১৬  ।  ২. ভোগ ম্যাগাজিন। ১০ মে ২০১৬

জ্যঁ-লুক গোদার ও আনা কারিনা
জ্যঁ-লুক গোদার ও আনা কারিনা

ফিল্মোগ্রাফি

জ্যঁ-লুক গোদার+আনা কারিনা : ফিল্মমেকার+অ্যাকট্রেস

১৯৬০– দ্য লিটল সোলজার [Le Petit Soldat]

১৯৬১– অ্যা ওম্যান ইজ অ্যা ওম্যান [Une femme est une femme]

১৯৬২– মাই লাইফ টু লিভ [Vivre sa vie]

১৯৬৪– ব্যান্ডস অব আউটসাইডারস [Bande à part]

১৯৬৫– পিয়েরো লা ফু [Pierrot le Fou]

        — আলফাভিলা [Alphaville]

১৯৬৬– মেড ইন ইউএসএ [Made in U.S.A]

১৯৬৭– দ্য ওল্ডেস্ট প্রফেশন [Le Plus Vieux Métier du monde] (এপিসোডিক ফিল্মের ‘অ্যান্টিসিপেশন‘ এপিসোড)


অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

Save

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

5 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন