জোনাস মেকাস : আমেরিকান আভাঁ গার্দে সিনেমার গডফাদার

1
207

জন্ম : ২৪ ডিসেম্বর ১৯২২, লিথুনিয়া। লিথুনিয়ান-আমেরিকান এই ফিল্মমেকার, কবি ও আর্টিস্টকে ডাকা হয় ‘আমেরিকান আভা গাঁর্দে সিনেমার গডফাদার’ নামে। পৃথিবীর নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও আর্ট মিউজিয়ামে তার সৃষ্টির প্রদর্শনী হয়েছে।
২২ বছর বয়সে যুদ্ধমুখর জন্মভূমি লিথুনিয়া ছেড়ে দেশান্তরি হন জোনাস। যে ট্রেনে চেপে বসেছিলেন তিনি, সেটি জার্মানিতে থামলে তাকে ও তার ছোটভাই অ্যাডলফাস মেকাসকে [১৯২৫-২০১১। ফিল্মমেকার] গ্রেফতার করে হামবুর্গের শহরতলি এলমসহর্নের একটি শ্রমিক শিবিরে আট মাস বন্দি রাখা হয়। এরপর এই দুইভাই একদিন সেখান থেকে পালিয়ে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত দুই মাস ডেনিস সীমান্তবর্তী একটি খামারে। যুদ্ধ থেমে গেলে জার্মানির ভিজবাডন ও কাসলের উদ্বাস্তু শিবিরে দিন কাটতে থাকে জোনাসের। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত মেইঞ্জ ইউনিভার্সিটিতে দর্শনশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন তিনি। এর পরের বছর ছোটভাইকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে; আর বসবাস শুরু করেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের উইলিয়ামবার্গ এলাকায়। যুক্তরাষ্ট্রে আসার দুই সপ্তাহ পর, জমানো টাকায় একটা বলেক্স সিক্সটিন এমএম ক্যামেরা কিনে, সেটি দিয়ে নিজ জীবনের মুহূর্তগুলো ধারণ করতে শুরু করেন। নিউইয়র্ক সিটির সিনেপণ্ডিত অ্যামোস ভোগেল প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম সোসাইটি– ‘সিনেমা সিক্সটিন’-এর মাধ্যমে আভাঁ-গার্দে সিনেমা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি; এবং অ্যাভিনিউ এ ও হাস্টন স্ট্রিটের ‘গ্যালারি ইস্ট’ এবং ফিফটি সেভেন্থ স্ট্রিটের কার্ল ফিসার অডিটরিয়ামে অলাভজনক মুভি থিয়েটার ‘ফিল্ম ফোরাম’-এ আভাঁ গার্দে সিনেমার কিউরেটর হিসেবে কাজ করতে থাকেন।
১৯৫৪ সালে ছোটভাই অ্যাডলফাসের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ফিল্ম কালচার’ নামে একটি ফিল্ম-ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন [বলে রাখি, ১৯৯৬ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে সর্বমোট ৭৯টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ম্যাগাজিনটির]; এবং ‘মুভি জার্নাল’ কলামটি লিখতে শুরু করেন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্য ভিলেজ ভয়েস’-এ। ১৯৬২ সালে ‘ফিল্মমেকারস কোঅপারেটিভ’ ও এর দুই বছর পর ‘ফিল্মমেকারস সিনেমাটেক’ নামে দুটি ফিল্মগ্রুপ যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বলা বাহুল্য, পরে ‘ফিল্মমেকারস সিনেমাটেক’-এর নামকরণ করা হয় ‘অ্যানথ্রোপলজি ফিল্ম আর্কাইভ’; এবং এটি আভা-গার্দে সিনেমার সবচেয়ে বৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম সংগ্রহশালা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সমসাময়িক ফিল্মমেকার লায়নেল রগোজিনের [যুক্তরাষ্ট্র। ১৯২৪-২০০০] সঙ্গে তিনি ‘নিউ আমেরিকান সিনেমা’ নামে একটি ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মুভমেন্টের নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে, অ্যান্ডি ওয়ারহোল, নিকো, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ইয়োকো ওনো, জন লেনন, সালভাদর দালি এবং স্বদেশি জর্জ ম্যাকিউনাস প্রমুখ তুখোড় প্রতিভাবান শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ওঠা-বসা ছিল জোনাসের।
১৯৬৪ সালে অশ্লীলতার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন জ্যাক স্মিথ [যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৩২-১৯৮৯] নির্মিত এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম ‘ফ্ল্যামিং ক্রিয়েচারস’ ও জ্যঁ জানে [ফ্রান্স। ১৯১০-১৯৮৬] নির্মিত ‘অ্যা সং অব লাভ’ [Un chant d’amour] ফিল্মটি প্রদর্শন করে। এর প্রতিক্রিয়ায় সেন্সরশিপ বোর্ডের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন তিনি, এবং দ্য ফিল্মমেকারস সিনেমাটেক, জ্যুইশ মিউজিয়াম ও দ্য গ্যালারি অব মডার্ন আর্টে সিনেমা দেখানো অব্যাহত রাখেন পরের কয়েক বছর। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি ‘নিউ আমেরিকান সিনেমা এক্সপোজিশনস’-এর আয়োজন করে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা শহর চষে বেড়ান। বলে রাখি, ১৯৬৬ সালে এর সঙ্গে যোগ দেয় ‘৮০ উস্টার ফ্লাক্সহাউস কুপ’ও।
১৯৭০ সালে ৪২৫ লেফায়েট স্ট্রিটে অ্যানথোলজি ফিল্ম আর্কাইভস যাত্রা শুরু করে একটি ফিল্ম মিউজিয়াম, স্ক্রিনিং স্পেস ও লাইব্রেরি হিসেবে। এটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন জোনাস। গুরুত্বপূর্ণ ফিল্মি কাজগুলো সংরক্ষণের তাগিদে তিনি এখানে ‘এসেনসিয়াল সিনেমা’ নামে একটি উচ্চাকাক্সক্ষী প্রকল্প হাতে নেন যৌথভাবে স্ট্যান ব্রাখাজ, কেন কেলম্যান, পিটার কুবেলকা, জেমস ব্রাফটন ও পি. অ্যাডামস সিটনিকে সঙ্গে নিয়ে।
ফিল্মমেকার হিসেবে জোনাস মেকাসের কাজগুলোকে প্রথমদিকের ন্যারেটিভ ফিল্ম [‘গানস অব দ্য ট্রিজ’; ১৯৬১] থেকে শুরু করে ‘ওয়ালডেন’ [১৯৬৯], ‘লস্ট, লস্ট, লস্ট’ [১৯৭৫], ‘রেমিনিসেন্সেস অব অ্যা জার্নি টু লিথুনিয়া’ [১৯৭২], ‘জেফিরো তোর্না’ [১৯৯২] ও ‘অ্যাজ আই ওয়াজ মুভিং অ্যাহেড অকেশনালি আই স্য ব্রিফ গ্লিম্পসেস অব বিউটি’র [২০০০] মতো ডায়েরি-ফিল্ম পর্যন্ত একটি ব্যাপক বিস্তৃত কর্মপরিধির দেখা মেলে।
মাল্টি-মনিটর ইনস্টলেশন, সাউন্ড ইমারসন পিস ও ফ্রোজেন ফিল্ম প্রিন্টের মাধ্যমে, নিজের শেষ দিকের কাজগুলোতে এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ জোনাস গ্রহণ করেছেন। এগুলো সম্মিলিতভাবে তার ক্ল্যাসিক ফিল্মগুলোর একটি নতুন অভিজ্ঞতা এবং তার সাম্প্রতিকতম ভিডিও ওয়ার্কের একটি উপন্যাসধর্মী রূপ– উভয়ই জাহির করেছে। তার কাজগুলোর নিয়মিত প্রদর্শনী ঘটে ফিফটি ফার্স্ট ভেনিস বিনিয়াল, পিএস-ওয়ান কনটেম্পোরারি আর্ট সেন্টার, লুদভিগ মিউজিয়াম, সারপেনটিন গ্যালারি ও জোনাস মেকার ভিজ্যুয়াল আর্টস সেন্টারে।
২০০৭ সালে, ‘দ্য ৩৬৫ ডে প্রজেক্ট’ শিরোনামের অধীনে, জোনাস প্রতিদিন একটি করে ফিল্ম রিলিজ দিতে থাকেন তার ওয়েবসাইটে [www.jonasmekas.com]। ১৯৭০ দশক থেকে নিউ স্কুল ফর সোস্যাল রিসার্চ, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি [এমআইটি], কুপার ইউনিয়ন ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ফিল্ম কোর্সের পাঠ দিয়ে আসছেন তিনি।
ফিল্মমেকার ও ফিল্ম সংগঠকের বাইরে জোনাসের খ্যাতি আছে লিথুনিয়ানভাষী কবি হিসেবে। তার কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয়েছে লিথুনিয়ান, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইংরেজি ভাষায়। ‘আই হ্যাড নোহ্যয়ার টু গো : ডায়েরিস, ১৯৪৪-১৯৫৪’ ও ‘লেটার ফ্রম নোহ্যয়ার’সহ বেশ কিছু জার্নাল ও ডায়েরির পাশাপাশি সিনে-সমালোচনা, তত্ত¡ ও টেকনিক সংক্রান্ত অনেক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে তার লেখা। ২০০৭ সালের ১০ নভেম্বর তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে লিথুনিয়ার রাজধানী ভিলিনিয়াসে আভা-গার্দে আর্ট সেন্টার– ‘জোনাস মেকাস ভিজ্যুয়াল আর্টস সেন্টার’।

ফিল্মোগ্রাফি
টু ড্যান্সারস/রেডিও। গানস অব দ্য ট্রিজ। ফিল্ম ম্যাগাজিন অব দ্য আর্টস। দ্য ব্রিগ। অ্যাওয়ার্ড প্রেজেন্টেশন টু অ্যান্ডি ওয়ারহোল। রিপোর্ট ফ্রম মিলব্রুক। ওয়ালডেন [ডায়েরিস, নোটস, অ্যান্ড স্কেচস]। হরে কৃষ্ণ। নোটস অন দ্য সার্কাস। ক্যাসিস। দ্য ইতালিয়ান নোটবুক। টাইম অ্যান্ড ফরচুন ভিয়েতনাম নিউজরি। রেমিনিসেন্সেস অব অ্যা জার্নি টু লিথুনিয়া। লস্ট, লস্ট, লস্ট। ইন বিটউইন : ১৯৬৪-৮। নোটস ফর জেরোমি। প্যারাডাইস নট ইয়েট লস্ট। সেল্ফ-পোর্ট্রেট। স্ট্রিট সংস। এরিক হকিনস : এক্সসার্পট ফ্রম ‘হেয়ার অ্যান্ড নাউ উইথ ওয়াচারস’। হি স্ট্যান্ডস ইন অ্যা ডিজার্ট কাউন্টিং দ্য সেকেন্ডস অব হিজ লাইফ। সিনস ফ্রম দ্য লাইফ অব অ্যান্ডি ওয়ারহোল। অ্যা ওয়াক। মব অব অ্যাঞ্জেলস : ব্যাপ্টিজম। মব অব অ্যাঞ্জেলস অ্যাট সেন্ট আন। ড. কার্ল জি. ইয়ুং অর লাপিস ফিলোসফোরাম। কোয়ার্টেট নাম্বার ওয়ান। জেফিরো তর্না অর সিনস ফ্রম দ্য লাইফ অব জর্জ মাকিউনাস। দ্য এডুকেশন অব সেবাস্টিয়ান অর ইজিপ্ট রিগেইনড। ইমপারফেক্ট থ্রি-ইমেজ ফিল্মস। অন মাই ওয়ে টু ফুজিয়ামা। হ্যাপি বার্থডে টু জন। সিনেমা ইজ নট হানড্রেড ইয়ারস ওল্ড। মেমোরিজ অব ফ্রাঙ্কেনস্টেইন। লেটারস টু ফ্রেন্ডস। বার্থ অব অ্যা নেশন। সিমফোনি অব জয়। সিনস ফ্রম অ্যালেন’স লাস্ট থ্রি ডেজ অন আর্থ অ্যাজ অ্যা স্পিরিট। লেটারস ফ্রম নোহ্যয়ার। সং অব অ্যাভিগনন। ল্যাবরেটরিয়াম অ্যানথোলজি। দিস সাইড অব প্যারাডাইস। নোটস অন দ্য ফ্যাক্টরি। নোটস অব ফিল্মমেকার’স কোঅপারেটিভ। অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যা ম্যান হু ক্যারিড হিজ মেমোরি ইন হিজ আইজ। অ্যাজ আই ওয়াজ মুভিং অ্যাহেড অকেশনালি আই স্য ব্রিফ গ্লিম্পসেস অব বিউটি। মোজআর্ত অ্যান্ড ভিয়েন অ্যান্ড এলভিস। সাইলেন্স, প্লিজ। রিকুয়াম ফর অ্যা ম্যানুয়াল টাইপরাইটার। রিমেডি ফর মেলানকলি। লেটার টু পেনি আর্কেড। ই্যন মারশেন। আর বুবো কারাস?। মিস্টেরিজ। উইলিয়ামবার্গ, ব্রুকলিন। ট্রাভেল সংস। লেটার ফ্রম গ্রিনপয়েন্ট। নোটস অব ইউটোপিয়া। ফাদার অ্যান্ড ডটার। নোটস অন অ্যান আমেরিকান ফিল্ম ডিরেক্টর অ্যাট ওয়ার্ক : মার্টিন স্করসেজি। সিনস ফ্রম দ্য লাইফ অব হেরমান নিৎশে। ফার্স্ট ফোরটি। ৩৬৫ ডে প্রজেক্ট। স্লিপলেস নাইটস স্টোরিজ। মাই প্যারিস মুভি। মাই বারস বার মুভি। করেসপনডেন্সেস : হোসে লুই গরিন অ্যান্ড জোনাস মেকাস। রি : জর্জ মাকিউনাস অ্যান্ড ফ্লাক্সাস। ম্যঁ ভেত্যুঁ। হ্যাপি ইস্টার রাইড। রেমিনিজেঞ্জেন অস ডাচল্যান্ড। আউট-টেকস ফ্রম দ্য লাইফ অব অ্যা হ্যাপি ম্যান

সূত্র : উইকিপিডিয়াজোনাস মেকাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন