ফ্রিৎস্ লাং : মাস্টার অব ডার্কনেস / জেন ডি. ফিলিপস

2
326

মূলঃ জেন ডি. ফিলিপস । অনুবাদঃ রুদ্র আরিফ

ফ্রিৎস্ লাং তার জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন বেভারলি হিলসের চূড়োয়, ঝমকালো এক নির্জন বাড়িতে। সিনেমার ইতিহাসে তার জায়গাও তেমনই উঁচুতে। তাকে এক নামে গণ্য করা হয় মোশন পিকচার ইতিহাসের অন্যতম খাঁটি অগ্রদূত হিসেবে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যখন বেড়ে উঠছিল, তিনিও বেড়ে উঠেছেন সেটির সঙ্গে; আর নিজে একজন আর্টিস্ট হয়ে এটিকে একটি আর্ট ফর্ম হিসেবে গড়ে ওঠতে রেখেছেন ভূমিকা। বস্তুতপক্ষে ফ্রিৎস্ লাংয়ের মতো এমন অতিমানবের দেখা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আর কখনোই পাবে না।

লাংয়ের জন্ম ১৯৮০ সালের ৫ ডিসেম্বর, ভিয়েনায়; আন্তোন ও পলা লাং দম্পতির ঘরে। যদিও জন্মগতভাবে অস্ট্রিয়ান, তবে পরবর্তী সময়ে লাং পাড়ি জমান জার্মানিতে; আর হয়ে ওঠেন জার্মান নাগরিক। লাংয়ের বংশপরম্পরা ছিল ইহুদি, কিন্তু তার মা বেড়ে উঠেছিলেন রোমান ক্যাথলিক হিসেবে; ফলে ক্যাথলিন পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন লাং। তার বাবা ছিলেন ভিয়েনিজ আর্কিটেক্ট; পুত্রও তার মতোই আর্কিটেক্ট হবে_ এমনটা চাওয়া ছিল আন্তোনের। বাবাকে খুশি করতে কিছুদিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন লাং; কিন্তু যেহেতু পেইন্টিং ছিল প্রথম প্রেম, ফলে কিছুদিন পর সেটির জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। পরে স্মৃতিচারণায় বলেছেন, “পেইন্টার হওয়ার স্বপ্নে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম আমি। আর্ট নিয়ে পড়তে প্রথমে পাড়ি জমিয়েছিলাম ব্রাসেলসে।”

তারপর প্রায় এক বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর নানাপ্রান্তে : “শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছি প্যারিসে, ১৯১৩ সালে; আর একটি প্রাইভেট স্কুলে আর্ট নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাই। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে, শেষ ট্রেনে প্যারিস ছেড়ে পালাতে সক্ষম হই। ফিরে আসি ভিয়েনায়। অস্ট্রিয়ায় ফেরার পর, বাধ্যতামূলকভাবে অস্ট্রিয়ান ইমপেরিয়াল আর্মিতে যোগ দিতে হয় আমাকে; আর ১৯১৫ সালে যুদ্ধ করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইতালিয়ান ফ্রন্টে।”

এ সময়ে লেফটেন্যান্ট রেঙ্ক অর্জন করেন লাং। যুদ্ধে আহতও হন একাধিকবার। যুদ্ধের এক আঘাতে ডান চোখের জ্যোতি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন তিনি। এর পর থেকে এই চোখটিতে সাধারণত মনোকল বা এক-চোখি চশমা পরে থাকতেন। ১৯১৮ সালে তাকে আর্মিতে অ্যাকটিভ থাকার ক্ষেত্রে আনফিট ঘোষণা করা হয়; ফেরত পাঠানো হয় ভিয়েনায়। এমনই এক সময়ে, রেড ক্রস থিয়েটার প্রযোজিত একটি নাটকে ফরাসি আর্মির হাতে বন্দি অস্ট্রিয়ান লেফটেন্যান্টের ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব আসে তার কাছে : “প্রোডাকশনটি মোটামুটি সফল হয়। নাটক চলাকালে আমার এক বন্ধু আমাকে এরিস পোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন_ পোমার তখন বার্লিনে ‘ডেকলা-বায়োস্কোপ’ নামে নিজের একটি ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানি ছিল।”

তাদের এই প্রথম সাক্ষাৎ অবশ্য সুখকর ছিল না; কেননা, লাংয়ের মনোকল পরাকে পোমা গণ্য করেছিলেন অহমিকার প্রতীক হিসেবে। লাং পরে বলেছেন, “পোমা যখন আমাকে প্রথমবার দেখলেন, তখন আমার চোখে পরে থাকা মনোকলের দিকে তাকিয়ে নিজের সঙ্গীকে বললেন, ‘এই কুত্তার বাচ্চার সঙ্গে আমি কোনো কাজ করতে চাই না। ওর চেহারাটাই আমার পছন্দ নয়।’ তবুও তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, এবং পরবর্তী সময়ে আমাকে চাকরিও দিয়েছিলেন স্ক্রিপ্ট ডিপার্টমেন্টে, একজন স্ক্রিপ্ট-ডক্টর হিসেবে।”

তারুণ্যে ফ্রিৎস্ লাং
তারুণ্যে ফ্রিৎস্ লাং

পোমার কোম্পানিতে চাকরি করতে, ১৯১৮ সালে বার্লিনে হাজির হন লাং। সেখানে বেশ কয়েকটি স্ক্রিপ্ট লিখেন তিনি। কিন্তু তার স্ক্রিপ্টগুলোর শুটিং চলাকালে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে প্রায়ই নাখোশ হতেন। অবশেষে, যখন তিনি ‘হাফ ব্রিড’ শিরোনামের একটি স্ক্রিপ্টের কাজ শেষ করেন, তখন পোমার কাছে সরাসরি প্রস্তাব রাখেন, ফিল্মটিও যেন তাকেই বানাতে দেওয়া হয়। এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান পোমা। সেটিই ছিল ফিল্মমেকার হিসেবে লাংয়ের ক্যারিয়ার শুরু। এরপর তিনি আরও কয়েকটি ফিল্মের পাশাপাশি, ‘দ্য স্পাইডারস’ শিরোনামের অধীনে দুই পর্বের ফিচার ফিল্ম নির্মাণ করেন। এই শিরোনামে পরিচিত অপরাধীদের একটি গুপ্ত সমাজকে ঘিরে এর কাহিনী। সিনে-জগতে ফিল্মমেকার হিসেবে লাংকে টিকিয়ে দিতে ভূমিকা রাখে ফিল্মটি।

ল্যান্ডমার্ক সাইলেন্ট ফিল্ম ‘দ্য ক্যাবিনেট অব ড. ক্যালিগরি’ [Das Kabinett des Dr. Caligari; রবার্ট ভিনা; ১৯২০] নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু দ্বিতীয় স্পাইডার ফিল্মটি নির্মাণের ব্যস্ততায় সেটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবে তার অনবদ্য অবদান দৃশ্যমান হয়ে আছে ‘ক্যালিগরি’র শেষাংশে : যে এপিলগে উন্মুক্ত হয়_ কাহিনীটির আগের সবকিছুই জনৈক উন্মাদের হ্যালুসিনেশন; ফলে ফিল্মটিতে এতণ ধরে ন্যারেটর যা যা বলে আসছিলেন, তার কোনোকিছুরই গুরুত্ব থাকে না আর।

১৯২০ সালে সিনারিস্ট থিয়া ফন হার্বার সঙ্গে কাজ শুরু করেন লাং; আর এর পরের বছর বিয়ে করেন তারা দুজন। ১৯৩৩ সালে জার্মানি ছাড়ার আগপর্যন্ত, দেশটিতে থাকাকালে যত সিনেমাই লাং বানিয়েছেন, তার সবগুলোর স্ক্রিপ্টই এই দুজনের মিলে লেখা। এই জুটির প্রথমটি ছিল এক ফ্যান্টাসি ফিল্ম। ‘ডেসটিনি’ শিরোনামে ফিল্মটি লাং বানান ১৯২১ সালে। এই বিদেশীয় ফ্যান্টাসিটিতে যে টেকনিক্যাল ইফেক্টের ব্যবহার তিনি করেছেন, সেটির মধ্যে নতুনত্ব ও উদ্ভাবনী বিষয়ের সন্ধান পেয়েছেন সমালোচকেরা। ফিল্মটি তাকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দেয়। তাছাড়া, ১৯২০ দশকে জার্মান সিনেমার গোল্ডেন এইজ বা স্বর্ণযুগের অভিষেক ঘটাতে ভূমিকা রাখে ‘ডেসটিনি’। বলে রাখা ভালো, লাং ছাড়াও এফ. ডব্লিউ. মুরন্যু ও এর্নস্ট লুবিচের মতো ফিল্মমেকারেরা জার্মানির যে সেরা মানের সাইলেন্ট ফিল্মগুলো নির্মাণ করেছিলেন_ সেগুলো পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

জার্মান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে যতই দিন কাটছিল লাংয়ের, নিজেকে তিনি ততই একজন খাঁটি জার্মান উপলব্ধি করতে পারছিলেন। এ সময়ে জার্মান নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন তিনি। এর অল্পকাল পরে, ‘দ্য নিবেলুং সাগা’ নির্মাণ করেন তিনি_ যেখানে জার্মানির কিংবদন্তিতুল্য অতীত ইতিহাস প্রতিকৃত হয়ে আছে। এ সময়ে নিজেদের ডেকলা-বায়োস্কোপ স্টুডিওকে ইউনিভার্সেল ফিল্ম এজেন্সির [অরিজিনাল, Universum-Film-Aktiengellschaft; সংক্ষিপ্ত নাম ‘ইউএফএ’-এই অধিক পরিচিত] সঙ্গে অঙ্গীভূত করে নেন পোমা। লাং তার ‘দ্য নিবেলুং সাগা’র শুটিং করেন বার্লিনের বাইরে প্রতিষ্ঠিত ইউএফ-এর সুবৃহৎ বাবেলসবার্গ স্টুডিওতে।

ফিল্মটি দুই পর্বে বিভক্ত। প্রত্যেক পর্বই ফিচার লেন্থের। ‘নিবেলুং সাগা’র প্রথম পর্বটির শিরোনাম ‘জিগফ্রিড’। অবশ্য লাংকে নিয়ে লেখা গ্রন্থে ফ্রেডেরিক ডব্লিউ অট ভুল করে প্রথম পর্বের নাম “জিগফ্রিড’স ডেথ” উল্লেখ করেছেন; তবে ফিল্মটির এ নামকরণ করা হয়েছে অনেক পরে, ১৯৩৩ সালে এটিকে, “ক্রিমহাইল্ড’স রিভেঞ্জ” শিরোনামের দ্বিতীয় পর্বটিকে বাদ দিয়েই, একটি সিঙ্গেল ফিচার বা একক-ফিল্ম হিসেবে পুনঃমুক্তি দেওয়ার সময়। ‘জিগফ্রিড’ ফিল্মটি শুরু হয় এর নায়কের [পল রিসটার অভিনীত] কানে কয়েকজন দিনমজুরের কথোপকথন ভেসে আসার মধ্য দিয়ে; তারা ক্রিমহাইল্ড নামের এক সুন্দরী বালিকাকে নিয়ে কথা বলছিল : মেয়েটি আধিবাসী বুরগুন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের রাজা গুন্টারের বোন। এ আলাপ শুনে জিগফ্রিড খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে, এবং ক্রিমহাইল্ডকে বিয়ে করার উদ্দেশে গুন্টারের রাজসভায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিজের সাদা ঘোড়ায় চেপে, বন বাদাড় পেরিয়ে ছুটে যেতে যেতে, জিগফ্রিড এক দানবীয় ও নিঃশ্বাসে আগুন-ছড়ানো ড্রাগনের তল্লাটে প্রবেশ করে। সে তার তলোয়ার দিয়ে জন্তুটিকে আক্রমণ করে। প্রথমেই সেটির একটি চোখ কেটে ফেললে সেই রক্তে চোখের কোটর ভরে যায়। এরপর জিগফ্রিড তার অস্ত্রটি জন্তুর তলপেটে বসিয়ে দেয়; ফলে আরও বেশি রক্তের বিচ্ছুরণ ঘটে সেটির শরীর থেকে। শেষ পর্যন্ত ড্রাগনটি মারা যায়। ব্রিটিশ ফিল্মমেকার কেন রাসেল স্বীকার করেছেন, নিজের ফিল্মমেকিংয়ের শুরুর দিনগুলোতে, ‘ফ্রিৎস্ লাংয়ের ওয়াইল্ড ইমেজারি অনুপ্রেরণা’ জুগিয়েছিল তাকে; এ কথার স্বপক্ষে উদাহরণ হিসেবে ‘মধ্যযুগীয় আগুন-ছড়ানো জন্তুকে সুসজ্জিত যোদ্ধা হয়ে এলোপাথাড়ি আঘাতে ধ্বংস করে ফেলা’ জিগফ্রিডের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

যদি পৌরাণিক ড্রাগনের রক্ত দিয়ে নগ্নস্নান করা যায়, তাহলে তলোয়ার ও বর্ম চালনায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে_ এ কথা মাথায় রেখে নিজেকে রক্তের ডোবায় ডুবিয়ে ফেলে জিগফ্রিড। কিন্তু ওপর থেকে ঝরে পরা গাছের একটি পাতা ভেসে যেতে যেতে তার কাঁধের ব্লেডে আটকে যায় এবং তাকে আপাদমস্তক নিমজ্জিত হওয়ার পথে বাধাগ্রস্ত করে; অর্থাৎ সে স্থানটিতে ড্রাগনের রক্তের স্পর্শ পড়েনি।

জিগফ্রিড এরপর নিজেকে আবিষ্কার করে বামনদের রাজ্য ‘দ্য নিবেলুংস’-এ। এটির নাম থেকেই ‘নিবেলুং সাগা’র নামকরণ করা হয়েছে। এই নিবেলুংস রাজ্য শাসন করে নিষ্ঠুর শাসক আলবেরিস; জিগফ্রিডকে সে অহেতুক শত্রু মনে করে এবং সন্দেহবশত আক্রমণ করে বসে। তবে আলবেরিসকে পরাজিত করে নিজ পথে এগিয়ে যায় অজেয় যোদ্ধা জিগফ্রিড।

জিগফ্রিড যখন বুরগুন্ডিয়ান রাজা গুন্টারের রাজসভায় প্রবেশ করে, তখন সে আর ক্রিমহাইল্ড [মার্গারেট শ্যুন অভিনীত]_ দুজন দুজনের প্রেমে পড়ে যায়। এ সময়ে জমকালো এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ক্রিমহাইল্ডকে বিয়ে করে জিগফ্রিড। সব আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেলে, বুরগুন্ডিয়ান সম্প্রদায়ে জিগফ্রিডের জনপ্রিয়তা ও গুন্টারের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্বে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে গুন্টার ও ক্রিমহাইল্ডের চাচা হেগেন [হান্স আডাইবার্ট ফন শ্লেটো অভিনীত]। ফলে জিগফ্রিডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কষতে থাকে সে।

দৃশ্য । নিবেলুং সাগা
দৃশ্য । নিবেলুং সাগা

হেগেন জানতে পারে, শরীরের শুধুমাত্র একটি আঘাতযোগ্য স্পট ছাড়া, জিগফ্রিড বস্তুতপক্ষে অজেয়। ফলে ক্রিমহাইল্ডের কাছ থেকে সে কৌশলে জেনে নেয়_ নিজের শরীরের সেই আঘাতযোগ্য জায়গাটির খোঁজ; কেননা, এ কথা শুধু স্ত্রীকেই জানিয়েছিল জিগফ্রিড। এর পরদিন শিকারে গিয়ে, ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত জিগফ্রিড যখন একটি জলাধার থেকে পানি পান করছিল, তখন তার শরীরের সেই আঘাতযোগ্য স্পটটির উপর বল্লম নিপে করে হেগেন। জিগফ্রিড কোনোমতে উঠে দাঁড়ায় এবং তার বর্মটি মাথার উপরে ওঠায়_ হেগেনের দিকে সজোরে ছুড়ে মারার উদ্দেশ্যে; তারপর ঢলে পরে মৃত্যুর কোলে। জিগফ্রিডের এই ভাবমূর্তি, এই যে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা_ এটির প্রতিফলন লাংয়ের ফিল্মগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা সেই থিমটিকে জাহির করে : নিয়তির মুখোমুখি হয়ে লড়তে লড়তে একটা মানুষ হয়তো হেরে যেতে পারে, তবু তার মানে এই নয় যে, তার আত্মা হার মেনেছে। এ প্রসঙ্গে লাং নিজেই বলেছেন, নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াই করাটাই বড় কথা; জয়-পরাজয় নয় : “কখনো কখনো শক্তিধর কোনো ইচ্ছের মাধ্যমে নিয়তিকে আপনি বদলে দিতে পারবেন হয়তো, কিন্তু আপনি যে সেটি পারবেনই_ তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।… আপনাকে অন্তত এটির [নিয়তির] বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে।”

অন্যভাবে বললে, জীবনে নিয়তির বিরুদ্ধে কোনো লড়াইয়ে লাংয়ের সৃষ্ট কোনো চরিত্র হয়তো হেরে বসতেই পারে; সেই চরিত্রটি যদি মুখ থুবড়েও পড়ে, তবু সেখানে গর্ব করার মতো কিছু-না-কিছু নিশ্চিতভাবেই থাকবে। সুতরাং, নিয়তির সঙ্গে লড়াইয়ে জিগফ্রিডের পরাজয়টিতে অমর্যাদার কিছু ছিল না; কেননা, হেগেনের হাতে খুন হওয়ার কারণে তার আত্মা কিছুতেই পরাজিত হয়নি; বরং তরঙ্গায়িত হয়েছে।

জিগফ্রিড ও হেগেনের লড়াইকে সমালোচক ভিক্টোরিয়া এম. স্টাইলস নিরূপন করেছেন, ‘আলো ও অন্ধকারের ক্ষমতার মধ্যে চলমান প্রাগৈতিহাসিক পৌরাণিক লড়াই’য়ের সমতুল্য হিসেবে_ যা কিনা এখানে ভালো ও মন্দের ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেছে। পুরো সিনেমাতে জিগফ্রিডকে সাদারঙের পোশাক পরিয়েছেন লাং, আর তাকে অবিরাম হাজির করেছেন ব্রাইট বা উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ডে। অন্যদিকে, হেগেনের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন কালো পোশাক, আর তাকে হাজির করেছেন ডার্ক বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডে। ফলে, সেই দৃশ্যটিতে একদিকে সৌন্দর্যময় সাদা বার্চ গাছগুলো ঘিরে থাকা সাদা পোশাকের জিগফ্রিডকে উপস্থাপন করা হয়েছে, অন্যদিকে কালো পোশাকের হেগেনকে দেখানো হয়েছে একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন নার্লেড গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে। ফলে প্রথম পর্বের কাইমেক্সটিতে জিগফ্রিডকে খুন করে হেগেন, সেটি আলোর শক্তির উপর অন্ধকারের শক্তির বিজয়গাথার প্রতিনিধিত্ব করেছে। জিগফ্রিডকে যেখানে শুইয়ে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরটিতে হেগেন যখন প্রবেশ করে, তখন ক্রিমহাইল্ড দেখতে পায়, জিগফ্রিড যেন তাগড়া হয়ে উঠছে। প্রাগৈতিহাসিক উপকথা অনুসারে, হেগেনই যে খুনি_ এ ঘটনা সেই ইঙ্গিত বহন করে। ক্রিমহাইল্ড তখন স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয়।

লাংয়ের ‘নিবেলুং সাগা’র প্রথম পর্ব ‘জিগফ্রিড’ ভরে আছে জাঁকজমকে। এর শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ হয়ে আছে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিগফ্রিডের দাফন করার সুদীর্ঘ দৃশ্যটি। ‘ফ্রম ক্যালিগরি টু হিটলার’ গ্রন্থে জিগফ্রিড ক্রাকোয়্যা উল্লেখ করেছেন, ফিল্মটির এ রকম দৃশ্যগুলোই সম্ভবত নাৎসি রেলির প্যারেড ও প্রসিকিউশন নিয়ে লেনি রিফেনস্টালের বানানো ডকুমেন্টারি ‘ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল’-এর [Triumph des Willens; ১৯৩৫] জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্যগুলোর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে লাং অবশ্য বলেছিলেন, “আমার মতে, এই বইটি ভুলে ভরা। নিবেলুং সাগা বানিয়ে আমি দেখাতে চেয়েছিলাম, ফিল্মটি যখন বানিয়েছি, সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরবর্তী দুর্বিষহ সময়গুলোতে জার্মানি নিজ অতীত থেকে কোনো আদর্শ খুঁজে বেড়াচ্ছে। জিগফ্রিডের মহাকাব্যিক উপকথা নিয়ে ফিল্মটি বানাতে চেয়েছিলাম আমি, যেন জার্মানি নিজের অতীত থেকে কোনো অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে পারে; কিন্তু মিস্টার ক্রাকোয়্যা যেমনটা উল্লেখ করেছেন, হিটলারের মতো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উত্থানের স্বপ্নে কিংবা এ রকম কোনো জঘণ্য উদ্দেশে ফিল্মটি বানাইনি আমি। বরং জার্মানির কিংবদন্তিতুল্য ঐতিহ্যকে নিয়ে কাজ করছিলাম।”

ফিল্মটির দ্বিতীয় পর্ব “ক্রিমহাইল্ড’স রিভেঞ্জ” শুরু হয় প্রথম পর্ব যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখান থেকে। ক্রিমহাইল্ড তার স্বামীর হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে হেগেনকে; এবং সে জিগফ্রিডের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয়। এরপর, নিজ রাজ্যের বাইরে অ্যাট্টিলা দ্য হান নামে পরিচিত হান্স রাজ্যের শাসক রাজা ইৎসেলের কাছ থেকে একজন গুপ্তচর এসে পৌঁছে ক্রিমহাইল্ডের দরবারে তার কাছে রাজদূত পেশ করে ইৎসেলের বিয়ের প্রস্তাব। আগের স্বামীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইৎসেল সাহায্য করবে_ এমন শর্তে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয় ক্রিমহাইল্ড।

ইৎসেলের রাজ্যের উদ্দেশে ক্রিমহাইল্ড ও তার অনুচরবর্গ শুরু করে যাত্রা, এবং সেখানে গিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় ক্রিমহাইল্ড ও ইৎসেল [রুডলফ্ কেইন-রগা অভিনীত]। এর কিছুদিন পর তারা নিজেদের রাজসভায় ভোজের নিমন্ত্রণ জানায় গুন্টার ও হেগেনকে। দিনক্ষণ দেখে, একদল বুরগুন্ডিয়ান সৈন্য সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছে তারা দুজন। ক্রিমহাইল্ডের আশা, নিজের রাজসভায় হেগেনের উপস্থিতি তাকে জিগফ্রিডহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে। দরবার হলে ভোজসভা চলাকালে, হান্স ও বুরগুন্ডিয়ান সৈন্যদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ লেগে যায়। বুরগুন্ডিয়ানেরা হান্স সৈন্যদের দরবার হল থেকে বিশাল প্রাসাদের বাইরে বের করে দিয়ে সেটির দরজা বন্ধ করে দিতে সমর্থ হয়।

ক্রিমহাইল্ড এরপর অবরুদ্ধ দরবার হলে প্রবেশ করে, ভেতরে আটকা পড়া বুরগুন্ডিয়ান সৈন্যদের আল্টিমেটাম দেয়_ যদি হেগেনকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সব সৈন্যকে অত ছেড়ে দেওয়া হবে। এ কথায় তারা রাজি না হলে দরবার হলে অগ্নিশিখাযুক্ত তীর নিক্ষেপের জন্য হান্স সৈন্যদের নির্দেশ দেয় ক্রিমহাইল্ড। আগুনের শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে দালানটি, এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে বেড়িয়ে আসে গুন্টার আর হেগেন; তখন সেখানেই হেগেনের শিরচ্ছেদ করে ক্রিমহাইল্ড।

কিছু কিছু পণ্ডিত এমন ভ্রান্ত তথ্যও দিয়ে থাকেন যে, নিজেরই কোনো এক প্রজার ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে ক্রিমহাইল্ড। কিন্তু ১৯৯৭ সালে লাংয়ের জীবনী নিয়ে প্রকাশিত ‘ফ্রিৎস্ লাং’ গ্রন্থে প্যাট্রিক ম্যাকগিলিগ্যান৪২ যথার্থই নিশ্চিত করেছেন, সেই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সাফল্যে বিস্মিত হয়ে, হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিল ক্রিমহাইল্ড। এ দাবির সপরে প্রমাণ হিসেবে ফিল্মটির সেই দৃশ্যের উদাহরণ টানেন তিনি_ যেখানে ইৎসেল তার স্ত্রীর লাশ দেখে, হতাশায় আর্তনাদ করে ওঠে, ‘ওকে ওর দেশে নিয়ে গিয়ে, জিগফ্রিডের পাশে সমাহিত করো। শুধু তার [জিগফ্রিডের] হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পুরুষেরই হতে পারে না সে [ক্রিমহাইল্ড]।’ এ দৃশ্যের মধ্য দিয়েই ফিল্মটির ট্রাজিক পরিসমাপ্তি ঘটে।

‘দ্য নিবেলুং সাগা’সহ লাংয়ের প্রথম দিকের বেশ কিছু সিনেমা সে সময়ে নির্মিত হয়েছে_ যখন জার্মান সাইলেন্ট সিনেমায় এক্সপ্রেশনিজম মুভমেন্টটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। লাংয়ের জার্মান ফিল্মগুলোতে এক্সপ্রেশনিজমের প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনায় না গিয়ে বরং দেওয়া যাক হালকা নজর। ‘দ্য হান্টেড স্ক্রিন : এক্সপ্রেশনিজম ইন দ্য জার্মান সিনেমা’ [Die Dämonische Leinwand] গ্রন্থে লটো আইজনার এই মুভমেন্টটিকে বর্ণনা করেছেন এইসব টার্মে : ‘স্রেফ ঘটনাবলির প্রতি প্রচণ্ড প্রিতার বৈশিষ্ট্য ধারণ করা ন্যাচারালিজমের বিরুদ্ধে এক্সপ্রেশনিজম নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেয় না’; বরং সেই সব বৈশিষ্ট্যের জায়গায় এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা ঘটনাবলিকে গাঢ় করে তোলা বিষয়আশয়ের সিম্বলিক বা প্রতীকি অর্থ খোঁজে বের করার প্রচেষ্টা চালান। আরও গভীরভাবে বললে, একটি সিম্বলিক পয়েন্ট তৈরি করার উদ্দেশে বাস্তবতার উপরিতলকে অতিরঞ্জিত করে তোলে এক্সপ্রেশনিজম।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘নিবেলুং সাগা’র প্রথম পর্বে জিগফ্রিডকে স্পষ্টতই বাস্তব-জীবনের-চেয়েও-বড় এক নায়ক হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; আর তা করা হয়েছে জার্মান উপকথার নায়কদের সম্মানিত করার ক্ষেত্রে বীরত্বের গুণকে প্রতীকি অর্থে ব্যবহার করার উদ্দেশে। তাছাড়া, জিগফ্রিডকে কিংবদন্তির এক মহানায়কের রোমাঞ্চের মধ্যে ফুটিয়ে তোলার বিষয়টিকে বড় করে তুলে, একটি বৃহৎ ও এক্সপ্রেশনিস্ট প্রোপটে হাজির করে বড়পর্দায় নায়কোচিত স্বদেশী মহাকাব্যের বিশালতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছেন লাং। ফিল্ম-ইতিহাসবিদ জ্যাক এলিস এ প্রসঙ্গে সেই সুবিস্তৃত অরণ্যের পটভূমির উল্লেখ করেছেন, যেটির দৃশ্যায়ন করা হয়েছে স্টুডিওর ভেতর, যেখানে ড্রাগনটিকে হত্যা করে জিগফ্রিড : “বৃক্ষরাজির শাখা-প্রশাখার উপর ক্লেইগ-লাইটের আলোর ফোয়ারা সেগুলোকে বাস্তবের চেয়ে বড় করে তুলেছে– এমন এক সুবিশাল অরণ্যের রি-ক্রিয়েশন সত্যিই অবিশ্বাস্য রকম তুখোড়। এখানে সুদর্শন জিগফ্রিড একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে ধীরে ধীরে ফ্রেমে ঢুকছে– যেন সুস্পষ্ট ও সুবৃহৎ বাস্তব ঝর্ণাধারায়।”

এ প্রসঙ্গে নিজ ভূমিকার প্রশ্নে লাং জোর দিয়ে বলেছেন, তার নির্মিত জার্মান সিনেমাগুলোর মাত্র কয়েকটিতেই একটা প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করেছে এক্সপ্রেশনিজম। তাছাড়া, হলিউডে কাজ শুরু করার পর, তার সিনেমায় জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের উপাদানের দেখা মিলেছে কালেভদ্রেই।

‘দ্য নিবেলুং সাগা’ সারা ইউরোপে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্রে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে লাং ঠাট্টা করে বলেছেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো, ড্রাগনের সঙ্গে জিগফ্রিডের লড়াইয়ে প্যাসাডিনার [লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি শহর] কী-ই-বা আসে যায়?” এখন অবশ্য ফিল্মটিকে জার্মান সিনেমার একটি ল্যান্ডমার্ক হিসেবে সারা পৃথিবীতেই গণ্য করা হয়।

দৃশ্য । মেট্রোপলিস
দৃশ্য । মেট্রোপলিস

‘দ্য নিবেলুং সাগা’র মতো ‘মেট্রোপলিস’ও এক্সপ্রেশনিজমের কিছু নিরব উদাহরণ ধারণ করে আছে। তিন স্তরের মেট্রোপলিস শহরটিসহ এ ফিল্মের দর্শনীয় এক্সপ্রেশনিস্টিক প্রোপট এবং বিশেষ করে ড. রোটওয়াং নামের উন্মাদ বিজ্ঞানীসহ ফিল্মটির বাস্তবের-চেয়েও-বড় চরিত্রগুলোর মধ্যে এই উপাদান উপস্থিত। ফিল্মটির প্রেক্ষাপট ২০০০ সালের; অলীক এক শহরের স্কাইলাইন শট দিয়ে এর শুরু। এই শহরটিকে পল গোল্ডবার্গার অভিহিত করেছেন, সিনেমায় দেখানো ‘আর্কিচেকচারের সবচেয়ে উদযাপনমুখর উদাহরণ’ হিসেবে। এখানে নিচের হাইওয়েতে যখন ট্রাফিক জ্যামের নাভিশ্বাস, তখন আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আর ইলেভেট ট্র্যাক দিয়ে সাঁই সাঁই ছুটে যাওয়া ট্রেনের ইমেজগুলো শ্বাসরুদ্ধকর। মেট্রোপলিস শহরটির এই অংশ, অর্থাৎ, এই অ্যাবোভগ্রাউন্ডটি সেই অভিজাত শ্রেণি অধিবাসিদের_ যারা শহরটিতে বিলাসিতা করে বেড়ায়। অন্যদিকে, শহরটির যে অংশে দারিদ্রের মধ্যে বাস করে খেটে খাওয়া মানুষেরা, সেটির অবস্থান মাটির নিচে; অর্থাৎ বিলোগ্রাউন্ডে। শহরটির এই দুটি অংশের মাঝখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অংশের অবস্থান_ যেখানে শ্রমিকেরা দৃশ্যতই কাটায় দাসত্বের জীবন। তাদের শিফট যখন চেঞ্জ হয়_ সেই দৃশ্যের মধ্যেই এই ক্রিতদাসত্বের স্বাক্ষ্য সুস্পষ্ট। তাতে নিকষ কালো পোশাক পরা বিধ্বস্ত একদল শ্রমিকের দেখা আমরা পাই; ফ্যাক্টরি এরিয়া থেকে নিজেদের কনকনে ঠাণ্ডা ভূগর্ভস্থ বাড়িঘরে তাদের নিয়ে যাওয়ার এলিভেটরের দিকে ভূগর্ভস্থ টানেল দিয়ে যখন তারা হেঁটে যায়, প্রত্যেকের মাথা তখন বিষাদে নতজানু। যে দুটি অঞ্চলে শ্রমিকেরা বাস আর কাজ করে, সেটিকে লাংয়ের সৃষ্ট ‘শহুরে জাহান্নামের’ একটি সম্ভাব্য অন্তর্দর্শন_ টার্মটি দিয়ে অভিহিত করেছেন গোল্ডবার্গার।

শহরটির অ্যাবোভগ্রাউন্ডের এক সুখজাগানিয়া বাগানের দৃশ্য দিয়ে এ দৃশ্যের বদল ঘটে_ যেখানে মেট্রোপলিসের শাসক জন ফ্রেডারসেনের [আলফ্রেড আবেল অভিনীত] ছেলে ফ্রেডার [গুস্তাফ ফ্রোলিস অভিনীত] তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করে অবসর কাটাচ্ছে। তাদের এই আনন্দমুখরতায় ব্যাঘাত ঘটে বিলোগ্রাউন্ডের শ্রমিক কোয়ার্টার থেকে আসা নোংরা পোশাকের ছোট একদল শিশুর সঙ্গে নিয়ে মারিয়ার [ব্রিগিটা হেম অভিনীত] আবির্ভাবে। শিশুদেরকে মারিয়া জানায়, এখানে সে তাদের নিয়ে এসেছে তাদের ‘ভাইদের’ দেখাতে। নিজের নামের মতোই ম্যাডোনাতুল্য নিষ্পাপ এই মারিয়াকে নিঃসন্দেহে [খৃষ্টধর্মীয়] নিউ টেস্টামেন্টের ম্যারি, অর্থাৎ যিশুর মায়ের সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব। বস্তুত পক্ষে খ্রীষ্টধর্মীয় প্রতীকিবাদ ফিল্মটির যতিচিহ্ন কীভাবে টেনে দিয়েছে, সেটি শিগগিরই টের পাব আমরা। এই আদুরে তরুণীর প্রতি ফ্রেডার মুগ্ধ; এই মেয়েটিই তাকে ফ্যাক্টরি এরিয়াতে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে, সেখানে থাকা তার [ফ্রেডারের] ‘ভাইদের’ দেখতে।

ফ্রেডার যখন ঢালাই-কারখানায় প্রবেশ করে, তখন দেখা পায় পরিশ্রান্ত শ্রমিক জর্জের_ যে কিনা অবিরাম একটা জায়ান্ট ডায়াল ঘুরানোর কাজের চাপে ভেঙে পড়েছে; কেননা, এই যন্ত্রকে গতিময় রাখার মতো গতি তার নেই। জর্জের এই ভেঙে পড়া ফিল্মটিতে যে অমানবিক ও যান্ত্রিক সমাজে শ্রমিকেরা বাস করে, তাতে তাদের প্রযুক্তির বশবর্তী হয়ে পড়ার সবচেয়ে অনস্বীকার্য ইমেজের একটির প্রতিনিধিত্ব করে।

এ ঘটনা দেখে, জর্জের ইউনিফর্ম পরে, তার জায়গায় ডায়ালের কাজটি শুরু করে দেয় ফ্রেডার। তার অপারেটিং পিরিয়ডের একেবারে শেষবেলায়, সে নিজেও মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর তখন তার প্রসারিত বাহুগুলো একটি ক্রুশিফর্ম ভঙিমায় পড়ে থাকে; যার মাধ্যমে ঠিক যেন যিশুর মতোই সেও তার ‘ভাইদের’ জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে_ এই ইঙ্গিত ফুটে উঠে। ফ্রেডার এরপর কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কাছে মিনতি করে, তাকে এই দুরাবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। ক্রুশবিদ্ধ হয়ে নিজের বাবার কাছে যিশুর মিনতিভরা কান্নার একটি সুস্পষ্ট প্রতিরূপ এটি। এক কথায়, এই সিনেমায় ফ্রেডারকে একজন যিশুতুল্য ব্যক্তিত্বের প্রতিমা হিসেবে হাজির করার উদ্দেশ্য লাংয়ের স্পষ্টতই ছিল।

কারখানায় শ্রমিকের জায়গা দখলে নেবে_ এমন রোবট আবিষ্কারে ব্যস্ত পাগলাটে বিজ্ঞানী রোটওয়াংয়ের [রুডলফ্ কেইন-রগা অভিনীত] সঙ্গে দেখা করতে যায় ফ্রেডারসেন। রোটওয়াংয়ের মধ্যে ফিল্ম-ইতিহাসবিদ বি. উর্গোজিকোভা যে ব্যাপক জটিলতায় ভরা এক চরিত্র ও ‘সিনেমার পর্দায় দেখা মেলা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং প্রতিদ্বন্দ্বীদের অন্যতমের’ দেখা পেয়েছেন, তা যথার্থই। ঘটনার দোহাইয়ে লাং দৃশ্যত দেখিয়েছেন, এই পাগলাটে বিজ্ঞানী তার অলুক্ষণে ও অন্ধকারাচ্ছন্ন গবেষণাগারে নিজের পৈশাচিক নিরীক্ষাগুলো সাজিয়ে রাখে, ‘শয়তানি শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো তান্ত্রিকের কাজের মতোই’। কথা প্রসঙ্গে ফিল্মমেকার স্ট্যানলি কুব্রিক একবার জানিয়েছিলেন, এই কালো-গ্লাভস পরা হাত ও যন্ত্রচালিত বাহুঅলা উন্মত্ত বিজ্ঞানী রোটওয়াংয়ের কাছ থেকেই তিনি ১৯৬৪ সালে নিজের বানানো ‘ড. স্ট্রেঞ্জলাভ’ সিনেমাটির সেই একটি চন্ত্রচালিত বাহু ও কালো গ্লাভস পরা হাতের, শিরোনামধারী চরিত্রটি সৃষ্টির প্রেরণা পেয়েছিলেন।

রোটওয়াংকে ফ্রেডারসেন জানায়, তার কাছে শ্রমিক বিদ্রোহের পরিকল্পনা চলার খবর রয়েছে; আর শ্রমিকদের গোপন মিটিংটি যেই গহবরে হওয়ার কথা_ সেখানে রোটওয়াংকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয় সে। মিটিংস্থলের চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে তারা দুজন_ যেন তাদের উপস্থিতি কেউ টের না পায়। ফ্যাক্টরিতে কাজ করার সময় এই মিটিংয়ের কথা ফ্রেডারও শুনেছিল; ফলে মারিয়ার নেতৃত্বে সেও হাজির হয় সেই জনসমাগমে।

শ্রমিকদের প্রবল উৎসাহ যোগানো মারিয়া তার বয়ানে বিদ্রোহ তক্ষুনি শুরু না করার পরামর্শ দেয়; বরং তাদের মধ্য থেকে এমন একজন ‘মেসিয়াহ’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নিতে বলে_ যে কিনা এই ‘নকশার মাথার’ [বা, মেট্রোপলিসের শাসকের] সঙ্গে ‘এটির নির্মাণকারী হাতগুলো’র [বা, শ্রমিকদের] প্রতিনিধি হয়ে কথা বলতে পারবে। তার মতে, এভাবে কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যে একটা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। মারিয়ার পরামর্শে এই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এগিয়ে আসে ফ্রেডার; আর এক্ষেত্রে আরও একবার, ফ্রেডার হয়ে ওঠে ঠিক যেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী যিশুর প্রতিরূপ।

মিটিং শেষে, শ্রমিকরা যাকে আদর্শ মানে– সেই মারিয়ার প্রতিরূপ হিসেবে একটি রোবট বানানোর নির্দেশ রোটওয়াংকে দেয় ফ্রেডারসেন। ফ্রেডারসেন জানে, এই বানানো-মারিয়ার মাধ্যমে শ্রমিকদের উপর আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে; কেননা, রোবটটি তো তারই নির্দেশ পালন করবে। ফ্রেডারসেন চলে যাওয়ার পর, সেই গহবর থেকে মারিয়াকে অপহরণ করে নিজের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যায় রোটওয়াং। একটা রোবটের মধ্যে মারিয়ার প্রতিরূপ ঘটানোর এক্সপেরিমেন্ট প্রস্তুত করে ফেলে সে। ল্যাবরেটরিতে একটা টেবিলের উপর মারিয়াকে বেঁধে রাখা হয়, তার পাশেই রাখা হয় রোবটটিকে; আর উন্মাদ উচ্ছ্বাসে রোটওয়াং নিজের এক্সপেরিমেন্ট সফল করার লক্ষ্যে ইনস্ট্রুমেন্ট প্যানেলের সবকিছু ঠিক করে নিতে থাকে। পরবর্তীকালের অনেক হরর সিনেমায় এই দৃশ্যটি অনুকরণের দেখা অনেকবারই পেয়েছে সিনেমা-বিশ্ব; যেমন, জেমস হোয়েলের ‘ফ্রাঙ্কেনস্টেইন’ [১৯৩১] ও ‘দ্য ব্রাইড অব ফ্রাঙ্কেনস্টেইন’ [১৯৩৫]।

দৃশ্য । মেট্রোপলিস
দৃশ্য । মেট্রোপলিস

রোটওয়াংয়ের এক্সপেরিমেন্ট সফল হয়। রোবটটি ধীরে ধীরে ধারণ করে বাস্তব মারিয়ার প্রতিরূপ। এই যান্ত্রিক মারিয়া [এটিও ব্রিগিটা হেম অভিনীত] অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, এবং শ্রমিকদেরকে বিদ্রোহ করতে উসকে দিতে থাকে। ক্রুব্ধ শ্রমিকেরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেন্টারে বিক্ষোভে ফেটে পরে, এবং বেপরোয়া ও সহিংসভাবে যন্ত্রপাতি ধ্বংসে মত্ত হয়। ব্যাপারটিকে জে. পি. টেলোটা ব্যাখ্যা করেছেন, ‘যে মেকানিজম তাদেরকে ক্রিতদাস করে রেখেছে, সেটি তাদেরকে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড শহর থেকে আসা বানের জলে ধাবিত করে।’ ফলে, যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার সময়, শাসক গোষ্ঠী শ্রমিক কোয়ার্টারে নির্দয়ভাবে বন্যা বইয়ে দেয়; তাতে তাদের পরিবারগুলো হয়ে পড়ে বিপণ্ন। রোটওয়াংয়ের বন্দিশালা থেকে পালিয়ে আসতে সম আসল মারিয়া সেই দাঙ্গা দমনে ফ্রেডারের সঙ্গে যোগ দেয়, এবং শ্রমিক পরিবারগুলোকে বানের জল থেকে বাঁচাতে থাকে। শ্রমিকেরা যখন বুঝতে পারে, কীভাবে তারা নকল মারিয়ার ধোকা খেয়েছে, তখন এমন বিধ্বংসী দাঙ্গায় নিজেদের প্রলুব্ধ করার প্রতিশোধ তারা সেটির উপর নেয়। টেলটো লিখেছেন, ‘লোকগুলো রোবট মারিয়াকে আটকে ফেলে এবং ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে’ একটা ক্যাথেড্রালের সামনে নিয়ে। ‘রোবটটির নকল মানব-আস্তরণ পুড়ে গিয়ে তাতে মেকানিজমের আভা মৃদুভাবে ফুটে উঠতে দেখে শিউড়ে ওঠে’ তারা, আর নকল মারিয়া ফিরে পায় একটা রোবটের অবয়ব।

উন্মত্ত রোটওয়াংকে ক্যাথেড্রালের ছাদে ধাওয়া করে ফ্রেডার, আর তার সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হয়। এ লড়াই শেষ হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে রোটওয়াংয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। রোটওয়াংয়ের পতন শেষে, ক্যাথেড্রালের রাস্তায় ফ্রেডারকে মারিয়া নিয়ে যায় ফ্রেডারসেনের সঙ্গে দেখা করাতে; শ্রমিকেরা তখন তাদের সর্দার গ্রটের নেতৃত্বে হাজির হয় এই বাবা-ছেলের সামনে। শ্রমিকদের কাছে মারিয়ার দেওয়া পরামর্শ অনুসারে, কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ফ্রেডার তার ‘মসিহে’ ভূমিকা সম্পন্ন করে। সে তার বাবা, মেট্রোপলিস শাসকের হাত আঁকড়ে ধরে, এবং সেই হাতের সঙ্গে শ্রমিকদের প্রতিনিধি গ্রটের হাত মিলিয়ে দেয়। সেই করমর্দন তাদের পুনর্মিলনীর একটা প্রতীক হয়ে ওঠে। পর্দায় ভেসে ওঠা একটি প্রিন্টেড ইন্টারটাইটেল জানান দেয়, মাথা [ফ্রেডারসেন] ও হাতের [শ্রমিক] মধ্যে মধ্যস্থতা করার কাজটি আসলে হৃদয়ের [ফ্রেডার]। এ প্রসঙ্গে সিনেমার অধ্যাপক মার্ক সিলবারমান ইঙ্গিত করেছেন, ‘শ্রমিক ও চাকরিদাতার মধ্যে করমর্দনটি’ কোনো ‘আপসে’র ক্ষেত্রে খুবই সহজ কাজ; বস্তুতপক্ষে শ্রমিক কিংবা তাদের কর্তা_ কেউই অতটা প্রস্তুত ছিল না ঘটনাটির জন্য।

ফিল্মটির এই বার্তার মধ্যে নিজের কোনো প্রতিফলন ছিল কিনা_ এমন প্রশ্নের জবাবে লাং একবার বলেছেন, “ফিল্মটির শুটিং শেষ করার পর এটি যখন দেখলাম, তখন মেনেই নিলাম, এ রকম বার্তা দিয়ে কোনো দেশের সামাজিক সমস্যাবলির সমাধান করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এখনো মনে করি, এই আইডিয়াটি ভীষণ আদর্শবাদী ছিল। যে মানুষের সবই আছে, তার পক্ষে কীভাবে যে মানুষের রয়েছে সামান্য_ তাকে বুঝতে পারা সম্ভব?”

‘মেট্রোপলিস’ নির্মাণে তখনকার হিসেবে জার্মান সিনেমার সবচেয়ে ব্যয়বহুল, অর্থাৎ ২০ লাখ ডলার খরচ হয়েছিল। বস্তুতপক্ষে সিনেমাটির এমন জাঁকজমক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটিকে বড় সাফল্য এনে দেয়। বার্লিনে ফিল্মটির প্রিমিয়ার শোতে এর রানিং টাইম ছিল পুরো ২ ঘণ্টা। তবে পরে বিশ্বব্যাপী মুক্তি দেওয়ার সময় এর রানিং টাইম আধঘণ্টারও বেশি কেটে কমিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে ফিল্ম কম্পোজার জর্জো মরোদের এই সিনেমার নতুন একটি মিউজিক্যাল স্কোর কম্পোজের সিদ্ধান্ত নেন; এ কাজটি করতে গিয়ে তিনি নানা আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করে ফিল্মটির যতটুকু সম্ভব মিসিং ফুটেজ রি-স্টোর করে নিয়েছিলেন। মরোদেরের এই পুনঃসংযোজন সহকারে ফিল্মটির রানিং টাইম দাঁড়ায় ৮৭ মিনিট। ফিল্মটির মিউজিক্যাল ট্র্যাকের অংশ হিসেবে আটটি গান কম্পোজ করেন মরোদের। অবশ্য ফিল্মটির জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সৃষ্টির সময় তিনি খেয়াল রেখেছেন, যেন সেগুলো কোনোভাবেই প্রার্থনাসভার মিউজিক্যাল স্কোরের মতো হয়ে না উঠে। তাছাড়া, কম্পোজার কুর্ট ভাইল একবার যেমনটা বলেছিলেন, ‘শুষ্ক খাদ্যশস্যের যেমন ক্রিম লাগে, সাইলেন্ট ফিল্মেরও তেমনিভাবে দরকার পরে মিউজিকের।’ ফলে মরোদেরের এই রি-স্টোরেড ‘মেট্রোপলিস’ ভার্সনটি সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়ার পর ফিল্মটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

লাংয়ের বানানো মেজর সাইলেন্ট ফিল্মগুলোর মধ্যে অন্যতম, ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’। ফিল্মটিকে লাং নিজেই বর্ণনা করেছেন, “জনৈক আর্চক্রিমিনালকে নিয়ে বানানো একটি থ্রিলার [ফিল্ম]; আর এ কারণেই লোকে এটিকে পছন্দ করেছে।” তাছাড়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে অপরাধ কীভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল, তারও একটি চিত্র এটি। [যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর] জামার্নির নীতিভ্রংশ পরিবেশের প্রতিফলন ঘটেছে সিনেমাটিতে। এ এমনই এক পরিবেশ ছিল– যা মাবুজার মতো অপরাধীদের বেড়ে ওঠার জন্য ছিল অনুকূল।

দৃশ্য । ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার
দৃশ্য । ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার

নিবেলুং সাগার মতো ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’ও বানানো হয়েছে দুই পর্বে; প্রতিটিই ফিচার লেন্থের। প্রথম পর্বের শিরোনাম, ‘অ্যা পিকচার অব দ্য টাইম’। এখানে দুনিয়ার একনায়ক হিসেবে গড়ে উঠতে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ একজন তুখোড় শয়তান হিসেবে ড. মাবুজাকে [রুডলফ্ কেইন-রগা অভিনীত] জাহির করা হয়েছে। পৈশাচিক শক্তি হিসেবে অগ্নিকুণ্ডের উপর ঝুলে থাকা শয়তানের এক প্রতিকৃতির নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাকে ভিজ্যুয়ালি ক্যারেক্টারাইজ করেছেন লাং। এর পাশাপাশি, চুল্লিতে যে অগ্নিশিখা জ্বলছিল_ সেটি একদিকে যেমন মাবুজার মধ্যে, অন্যদিকে শয়তান ও জাহান্নামের মধ্যে শক্তিবৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠেছে।

শিকার বশ করার জন্য হিপটোনাইজ বা সম্মোহনের সবিশেষ দক্ষতা অর্জন করে এই মাবুজা। যেহেতু ছদ্মবেশ ধারনে ওস্তাদ সে, তাই পুলিশের চোখে ধুলো দিতে কোনো অসুবিধা হয় না তার। ফিল্মটির শিরোনামই জানান দেয়, মাবুজা বেশ কয়েকটি গেম্বলিং ক্যাসিনো বা জুয়া আখড়ার মালিক; পাশাপাশি সে একজন ধূর্ত তাস খেলোয়াড়ও। তবে পল জেনসেন আরও যোগ করে বলেছেন, মাবুজা এমনই এক জুয়াড়ি, যে ‘জুয়াড়ি’ শব্দটির পরিসীমাকেও ছাড়িয়ে যায়। একটা দৃশ্যে নিজের জীবনের অর্থ দাঁড় করাতে গিয়ে সে নিজেই বলে, ‘সব কিছুই সুযোগের খেলা’; তার মানে, যেভাবে সে জীবন কাটায়, সেটিও খেলা তার কাছে। তার মানে, এই মাস্টার ক্রিমিনাল মাবুজা নিয়তির সঙ্গে এমন জুয়া খেলে_ যা ‘মানুষকে খরচযোগ্য বন্ধকী মাল’ এবং ‘ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বড় খুঁটি’ হিসেবে গণ্য করে।

সাইলেন্ট যুগের সকল গ্রেট ফিল্মমেকারের মতো, লাংও দর্শকদের সামনে কাহিনীকে যতটা সম্ভব ইমেজারির মাধ্যমে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ফলে অপরাধের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলা ব্যক্তিত্ব হিসেবে মাবুজার যে ভাবমূর্তি_ সেটির দেখা ফিল্মটির একেবারে প্রথম দৃশ্যেই মেলে। যেন তাসের কোনো পাটাতনের উপর, নানাবিধ ছদ্মবেশে তার একগুচ্ছ ফটোগ্রাফের স্তূপের পাশ দিয়ে সে এগিয়ে যায়_ পরের অপরাধটি সংঘঠিত করার ক্ষেত্রে কোন ছদ্মবেশ ধারণ করবে_ সেটি খুঁজে নিতে। ব্যাপারটা এমন, যদি সে সঠিক ছদ্মবেশ বেছে নিতে পারে এবং অপরাধটা করার সময় নিজ হাতে নিপুণভাবে খেলতে পারে_ তাহলে এ জুয়ায় বড় ধরনের বাজিমাত করতে পারবে।

মাবুজার শত্রু হলো বার্লিনে অবৈধ গেম্বলিং ক্যাসিনোর অনুসন্ধানকারী, স্টেট প্রসিকিউটর নরবার্ট ফন ভিঙ্ক [বার্নহার্ড গোৎস্কি অভিনীত]। এ রকম বেশ কিছু ক্যাসিনোর পরিচালক যে আর্চক্রিমিনালটি_ তার পরিচয় উদ্ঘাটনে বিশেষ আগ্রহী এই ফন ভিঙ্ক। এই চতুর অপরাধ-শিরমণিকে ‘দ্য গ্রেট আননৌন’ বা ‘ভীষণ অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে অভিহিত করে সে; কেননা, মাবুজাকে সে চিহ্নিত করতে পারেনি তখনো।

কাউন্টেস টোল্ড [গার্টরুড ভেলসার অভিনীত] একদিন বাসার এক পার্টিতে নিমন্ত্রণ জানায় ফন ভিঙ্ককে। সেই পার্টিতে কাউন্টেস ও তার স্বামী কোর্ট টোল্ডের [আলফ্রেড আবেল অভিনীত] অতিথিদের একজন হিসেবে হাজির হয় ড. মাবুজা_ যে কিনা নিজেকে একজন মর্যাদাপূর্ণ মনোচিকিৎসক হিসেবে ইতোমধ্যেই সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। ঘটনা হলো, কাউন্টেসের প্রতি গোপন লালসা ছিল মাবুজার। তাই নিজের রাস্তা থেকে কাউন্টকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হিপটোনাইজ করে কার্ড চিটিংয়ে সামিল করে মাবুজা। কিন্তু কাউন্টের স্বপরে কার্ড প্লেয়ার যখন টের পায় সে চিটিংয়ের শিকার হয়েছে, সেই সোরগোলের ফাঁকে কাউন্টেসকে বাড়ি থেকে বের করে নিজের দুর্গে নিয়ে আসে মাবুজা। সেখানে কাউন্টেসকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে রাখার ফন্দি আঁটে সে।

দ্বিতীয় পর্বের শিরোনাম, ‘ইনফার্নো’। এখানে কাউন্ট নিজের অসম্মানিত হওয়ার যাতনায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। ইতোমধ্যে ‘ভীষণ অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে ড. মাবুজাকে চিহ্নিত করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তাকে ধাওয়া করে ফন ভিঙ্ক। ফিল্মটির রোমাঞ্চকর কাইমেক্সে, ফন ভিঙ্ক ও তার বাহিনী মাবুজার গোপন আস্তানা ঘিরে ফেলে। এরপর শুরু হওয়া চূড়ান্ত গান-ফাইটের দৃশ্যায়ন একদিক থেকে নিউজরিলের মতো সিক্যুয়েন্সটিকে একটি ডকুমেন্টারির অকৃত্রিম রূপ দান করেছে। এ কথা বিশেষভাবে সত্য হয়ে ওঠে তখন, যখন ফন ভিঙ্কের তলবে সরকারি সৈন্যরা শেষ পর্যন্ত এসে জড়ো হয়, এবং মাবুজার দূর্গের বাইরের রাস্তাগুলো রাইফেলের গুলি আর গ্রেনেড বিস্ফোরনে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অবশেষে দুর্গের ভেতর ঢুকতে সম হয়ে কাউন্টেস টোল্ডকে উদ্ধার করে ফন ভিঙ্ক। কিন্তু একটা আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল দিয়ে বাড়িটি থেকে পালিয়ে যায় মাবুজা; এটি তাকে এমন একটি বানানো দুর্গে নিয়ে যায়_ যেটি তার অপরাধ সাম্রাজ্যেরই অংশ। সেই দূর্গে প্রবেশের পর মাবুজা হঠাৎ খেয়াল করে, যে স্টিলের দরজা দিয়ে সে এখানে ঢুকেছে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে নিজের বানানো দূর্গে নিজেই আটকা পড়ে সে।

এ প্রসঙ্গে নোরা স্যের আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ভাগ্যের বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যক্তিমানুষেরা লড়াই করে_ সেটির প্রকাশ ঘটানো লাংয়ের একটি প্রিন্সিপাল থিম ছিল। আর এই সিনেমায়ও তেমনটাই ঘটেছে। আর এটির দুটি সাউন্ড সিক্যুয়েন্স ভরে আছে আবদ্ধ পরিমণ্ডলে ব্যক্তিমানুষের আটকে গিয়ে সেখান থেকে পালানোর ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের যত চিত্রকল্পে। নোরা লিখেছেন, “বদ্ধ দরজার পেছনে নিজেদের ছুড়ে ফেলে, তারা [চরিত্রগুলো] যে মরিয়াপনাকে বহন করে_ সেটি লাংয়ের সিনেমার একটি অনিবার্য মোটিফ।” নিজের নিয়তির কাছ থেকে পালাতে সচেষ্ট এক ব্যক্তিমানুষকে ঘিরে নির্মিত তিনটি মাবুজা-ফিল্মের মধ্যে, এই ফিল্মে পুলিশ এসে গ্রেফতার করার আগপর্যন্ত নিজেরই বানানো দূর্গ থেকে পালানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করা ড. মাবুজার চেয়ে এটির সুস্পষ্ট উদাহরণ আর নেই।

ফন ভিঙ্ক ও তার বাহিনীর আক্রমণে নিজের অপরাধ-সাম্রাজ্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে_ এ কথা জেনে মাবুজা কিছু সময়ের জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠে, আর শেষ পর্যন্ত হয়ে যায় আপাদমস্তক পাগল। তার এই চূড়ান্ত অধঃপতনকে লাং কিছু ভিজ্যুয়াল ইমেজের মধ্য দিয়ে পাগলামিতে চিত্রায়িত করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, এ সময়ে মাবুজাকে দুটি হ্যালুসিনেশনের ভেতর দিয়ে নিয়েছেন লাং। প্রথমটি, কাউন্ট টোল্ডসহ নিজের শিকার হওয়া বেশ কয়েকজনের আত্মাকে মাবুজার সামনে হাজির করে। তারা জুয়াড়ি ড. মাবুজাকে তাদের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত তাস খেলতে বাধ্য করে_ যতক্ষণ না তার প্রতি পরিহাস ভরা চিৎকার করে উঠতে পারে, ‘চিট’! এই হ্যালুসিনেশনটি নিজের অপরাধের শিকার হওয়া অসহায় মানুষদের ব্যাপারে মাবুজার মনে অনুভূত অপরাধবোধের একটি ভিজ্যুয়াল প্রজেকশন।

এরপর দ্বিতীয় আত্মার সাক্ষাৎ পায় মাবুজা। তার নিজের বানানো গুহার যন্ত্রপাতি জীবন্ত ও প্রকাণ্ড দানব হয়ে উঠে তাকে ভয় দেখাতে থাকে। এই উদ্ভট হ্যালুসিনেশনটি মাবুজার পাগলামির আরেকটি ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন। ফন ভিঙ্ক ও তার বাহিনী যখন গুহাটিতে প্রবেশ করে, তারা মাবুজাকে দেখতে পায় ফোরে বসে নিজের বানানো জাল টাকা বুনো উন্মাদনায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেগুলোসহ মাবুজাকে নিজের জিম্মায় নেয় ফন ভিঙ্ক। এখানে অন্যতর এক রিয়েলিস্টিক ক্রাইম মেলোড্রামার মধ্যে ফ্যান্টাসিকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন লাং, সে প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে রচিত গবেষণায় লটো আইজনার মন্তব্য করেছেন, “ডকুমেন্টারি ও ফ্যান্টাসির মধ্যে এমন সমন্বয় লাং ছাড়া কেউ ঘটাতে পারেনি।” তাছাড়া, ফিল্মটির এই কাইমেটিক দৃশ্যে মাবুজার হ্যালুসিনেশনের মধ্যে এক্সপ্রেশনিজমের স্বাদও বিদ্যমান।

যদিও ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’-এর একটি এডিটেড ভার্সনের মুক্তি সেই সময়েই দেওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে, তবে ফিল্মটির দুটি পর্বই ভিডিও ক্যাসেট ফরম্যাটে সহজলভ্য এখন। নিজের সাইলেন্ট মাবুজা ফিল্মটি মুক্তির ১১ বছর পর, অরিজিনাল ফিল্মটির সিক্যুয়েল হিসেবে ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা’ শিরোনামে একটি সাউন্ড ফিল্ম নির্মাণ করেন লাং। এই সিক্যুয়েলটির প্রস্তাব যখন তার কাছে জনৈক প্রডিউসার নিয়ে আসেন, তখন এই ফিল্মমেকার ঠিক করেন, ফিল্মটির শুরু হবে সেখান থেকে_ যেখানে শেষ হয়েছিল আগেরটি; অর্থাৎ, মাবুজার বানানো গুহার সেই কারখানায়। ড. মাবুজার অপরাধ সাম্রাজ্য তখনো ব্যবসাযোগ্য মনে হওয়ায়, চরিত্রটিকে একটি মানসিক হাসপাতালে দেখানো হয় এবার।

রাষ্ট্রীয় এক পাগলাগারদের একটি সেলে বন্দি অবস্থায় দেখা মেলে উন্মাদ ড. মাবুজার [এবারও চরিত্রটিতে অভিনয় করেন রুডলফ্ ক্লেইন-রগা]_ এখানে সে ভূতে ধরা মানুষের মতো লিখছিল নিজের উইল। এটির মধ্যে সে অপরাধের নানা পরিকল্পনা বিশদভাবে লিখছিল_ যেগুলোর মধ্যে বাদবাকি মানুষের উপর একজন মাস্টার ক্রিমিনালের ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েমের সমস্ত হিসেব-নিকেশ রয়েছে। তার লিখিত পৃষ্ঠাগুলো জনৈক অ্যাটেনডেন্ট পৌঁছে দেয় তার [মাবুজার] মনোচিকিৎসক ড. বামের [ওস্কার বেরেগি অভিনীত] কাছে।

বামের ডেস্কের উপর পেয়ে মাবুজার এই উইলের কয়েকটি পাতা নিয়ে গবেষণা করে পাগলাগারদের আরেক কর্মকর্তা, ড. ক্রাম। এর পরপরই সে বামকে জানায়, নিজের উইলের মধ্যে যেসব শয়তানি নকশা মাবুজা সাজিয়ে রেখেছে, সেগুলো অন্য কেউ বাস্তবায়ন করছে_ এমনটা সে [ক্রাম] ধারণা করে। ক্রাম এরপর বামকে পরামর্শ দেয়, যেন সন্দেহভাজনদের মধ্যে অপরাধীকে খুঁজে বের করার জন্য তুনি পুলিশকে জানানো হয়। বাম নিজেই যে গোপনে মাবুজার অপরাধ সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল, এবং সে-ই যে মাবুজার উইলে বর্ণিত পাপিষ্ঠ অপরাধগুলো বাস্তবায়ন করছিল_ এ কথা জানা ছিল না ক্রামের। ফলে, পুলিশ স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই ক্রামকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করে বাম। ট্রাফিক জ্যামে নিজের গাড়িটি ক্রাম যখন একটা ইন্টারসেকশনে দাঁড় করায়, তখন আরেকটি গাড়ি এসে আটকে দেয় সেটির পথ। জ্যাম ছুটানোর জন্য কয়েকটি যানবাহনের চালক অধৈর্যভাবে হর্ন বাজাতে থাকলে তাদের সঙ্গে ক্রামও যোগ দেয়। তখন পথ আগলে পাশে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে জনৈক খুনি ক্রামের দিকে বন্দুক তাক করে। ঘটনাটি সম্পর্কে নোরা স্যের মন্তব্য করেছেন, “গাড়ির হর্ন বাজানোর ছন্দে পুলক বোধ করে হাসছিল ক্রাম, আর নিজের যাওয়ার পথটি নির্দেশিত করতে অবচেতনেই হর্নে হাত রেখেছিলেন ততক্ষণ_ যতক্ষণ না বন্দুকের গুলির শব্দটি এসে তাকে থামিয়ে দিল।”

খুনির গুলি ক্রামকে হত্যা করলেও, অন্যান্য যানবাহনের চালকরা টের পেল না_ এখানে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। এরপর একটি হাই অ্যাঙ্গেল শটে লাং দেখান, ক্রামের গাড়িটিকে পেছনে রেখে, বাদবাকি সব গাড়ি চলে যাচ্ছে। এরপর শটটি কাট করে লাং দেখান, ক্রামের গাড়ির দিয়ে এগিয়ে আসছে এক ট্রাফিক পুলিশ; সে এসে ক্রামকে আবিষ্কার করে স্টিয়ারিং হুইলের উপর মৃত পড়ে থাকা অবস্থায়। কোনো সংলাপ ব্যবহার না করেই পুরো দৃশ্যটি এমন চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন লাং, এতে আমাদের মনে পড়ে যায়, সাইলেন্ট সিনেমার দিনগুলোতে ফিল্মমেকার হিসেবে যে প্রশিণ পেয়েছিলেন, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের সেই দক্ষতা তিনি হারাননি কখনোই। [এর প্রায় তিন দশক পর, ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’-এর দ্বিতীয় সাউন্ড সিক্যুয়েল ‘দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা’-এ এই সিক্যুয়েন্সটির অনুকরণ লাং বেশ আনন্দের সঙ্গেই করেছেন।]

এ সময়ে ইন্সপেক্টর লোমান [অটো ভ্যেরনিকা অভিনীত] জানতে পারে, হোফমাইস্টার নামের এক পুলিশ ইনফরমার দৃঢ়ভাবে মনে করে, পাগলাগারদের ভেতর একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এখনো নিজের গ্যাংয়ের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে মাবুজা। ফলে সেই মেন্টাল ইনস্টিটিউশনে ড. বামকে ফোন করে ইন্সপেক্টর, যেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্দি আছে মাবুজা; কিন্তু ইন্সপেক্টরকে বাম জানায়, মাবুজা সদ্যই মারা গেছে। লোমান স্বাভাবতই ধরে নেয়, অন্তত এখন থেকে মাবুজার গ্যাং দুর্বল হয়ে যাবে।

পরে, যখন মাবুজার ম্যানুস্ক্রিপ্ট হাতে নিয়ে ড. বাম অফিসে নিজের ডেস্কে বসে, তখন মাবুজার প্রেতাত্মার দেখা পায় সে। বাম ধরে নেয়, মৃত মাবুজার ভূতটি তার সামনের চেয়ারে বাস্তব হয়ে আছে। মাবুজার ভূতটি ওঠে, ড. বামের চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়ায়, এবং এরপর প্রবেশ করে বামের শরীরে। এভাবে লাংয়ের প্রতীকি পন্থা জানান দেয়, ড. বামের চেতনা ও আত্মার পুরো দখল নিয়ে নিয়েছে মাবুজা। ফলে মাবুজার টেস্টামেন্ট বা ইচ্ছেপত্রের প্রভাব পড়েছে তার উপর। এক কথায় বললে, ড. বামের মধ্যে এখন পুরোপুরি মূর্তমান হয়ে আছে মাবুজা। এভাবে, একটি প্রিডমিনেন্টলি রিয়ালিস্টিক ক্রাইম ফিল্মকে একটি সিম্বলিক পয়েন্টের ভেতর দিয়ে দেখিয়ে আরও একবার এক্সপ্রেশনিজমের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন লাং।

মাবুজা গ্যাংয়ের, টমাস কেন্ট নামের এক সদস্যের প্রবল সন্দেহ ছিল মাবুজা মবের সদস্য হিসেবে নিজের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা নিয়ে। ফলে গ্যাংয়ের নেতাকে ধরিয়ে দিতে ইন্সপেক্টর লোমানকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। মাবুজার গ্যাং আগের মতোই কাজ-কারবার অব্যাহত রেখেছে_ কেন্টের কাছ থেকে এমন তথ্য জেনে লোমান চমকে যায় ঠিকই, কিন্তু তাদের দুজনের কেউই তখনো জানত না_ মাবুজার জায়গায় তার আন্ডারওয়ার্ল্ড পরিচালনা গোপনভাবে করছে ড. বাম। কেন্টের সঙ্গে ফুটনোটগুলোর যাচাই শেষে লোমান অবশ্য সন্দেহ করতে শুরু করে, পর্দার আড়ালে থেকে, মাবুজার গ্যাংয়ের গোপন নিয়ন্ত্রণ ড. বামই করছে।

এই দুই অকুতোভয় ব্যক্তি বামের অফিসে তল্লাশি চালিয়ে তার ক্রিমিনাল অপারেশনের তথ্য-প্রমাণ আবিষ্কার করে; এরপর তক্ষুনি বামকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছে তারা। এরইমধ্যে বাম ফিরে আসে পাগলাগারদে; মাবুজার প্রতি তার আচ্ছন্নতা শেষ পর্যন্ত তাকেও উন্মাদ করে তুলেছে। তাছাড়া মাবুজাকে দেখতে পাওয়ার আরেকটি হ্যালুসিয়েনেশন ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে তার। এ বেলা বামের কাছ থেকে নিজের উইল ফিরিয়ে নিতে নিতে মাবুজার ভৌতিক অবয়ব তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে ওঠে, ‘তুমি ব্যর্থ হয়েছ।’ তার মানে, দুনিয়ায় শাসন কায়েমের ব্যাপারে মাবুজার যেসব পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোকে সফলভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে বাম। এর মাধ্যমে, মাবুজার ভূতটি বামকে সেই সেলে নিয়ে যায়_ যেখানে একদা সে নিজে থাকত।

এর অল্প কিছুক্ষণ পর লোমান যখন পাগলাগারদে ফিরে আসে, তখন উন্মাদ ড. বামকে সে মাবুজার পুরনো সেলে বন্দি অবস্থায় দেখতে পায়। বাম তখন সুচারুভাবে মাবুজার টেস্টামেন্টের পাতাগুলো ছিঁড়তে থাকে। আর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে, এই ডকুমেন্টটিতে যে রূপরেখা লিপিবদ্ধ ছিল, সেটি তার অর্জন করতে না পারার ব্যর্থতাজনিত নৈরাশ্য প্রতিফলিত হয়। এই দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে মাবুজা সাগার পূর্ববর্তী ফিল্মটি সেই দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে নিজের বানানো গুহায় নকল টাকা ছুড়ে ফেলছিল উন্মত্ত মাবুজা। সেই ব্যাপ্তির বিবেচনায়, নিজের মধ্যে মাবুজাকে ধারণ করা বামের উন্মত্ততা পুরো বৃত্তটিকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে।

এই ফিল্মটি বানানোর সময়, ড. বামের মতো, স্বয়ং লাংয়ের মধ্যেও ড. মাবুজার ভূত ভর করেছিল যেন! মাবুজার মুখের কথাকে লাং ‘থার্ড রাইশের [নাৎসি জার্মানের] স্লোগান ও মতবাদ’_ এই টার্মে অভিহিত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মাবুজার টেস্টামেন্টের বুলি আওড়িয়ে বাম বয়ান দিয়েছে_ ব্যক্তিমানুষের কোনো অস্তিত্ব নেই, যদি না সে গণতন্ত্রকে অবজ্ঞা করতে নাৎসিবাহিনীর সরকারি প্রতিফলনের যান্ত্রিকতার একটি অংশ হয়ে উঠে। ফিল্মটিতে নাৎসি মতবাদের প্রচারণা করা হয়েছে নাৎসি পার্টির দুজন পাপাচারী বিকারগ্রস্তের মর্মপীড়ার মধ্য দিয়ে_ এই দায়ে ১৯৩৩ সালের ২৯ মার্চ, নাৎসি সরকার জার্মানিতে ফিল্মটিকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, এটির জার্মান ভার্সনের হুবহু একটি ফিল্ম ফ্রেঞ্চ ভাষায় নির্মাণ করেন লাং। লোথার ভল্ফ নামের এক জার্মান ফিল্মমেকারের তথ্য মতে, এ ক্ষেত্রে ফ্রেঞ্চ ভার্সনটির আনএডিটেড ফুটেজগুলো জার্মানি থেকে ফ্রান্সে পাচার করে দিয়ে, সেখানে গিয়েই এডিটিং সম্পন্ন করেছিলেন লাং। তাছাড়া, সেই ভার্সনটিই ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শিত হয়। অন্যদিকে, লাংয়ের অরিজিনাল জার্মান ভার্সনটি জার্মানিতে অবশেষে দেখানো হয় দীর্ঘকাল পর, ১৯৫১ সালে। তার পর থেকে সেটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ভিডিও ক্যাসেট ফরম্যাটে ছড়িয়ে পড়ে।

ক্যারিয়ারের শেষ বেলায়, জার্মানিতে ফিরে গিয়ে, ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’-এর দ্বিতীয় সাউন্ড সিক্যুয়েল_ ‘দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা’ নির্মাণ করেন লাং। এই সিনেমায় ‘ত্রাসের নিয়ন্ত্রণ-আরোপের’র ক্ষেত্রে ড. মাবুজার পরিকল্পনাগুলো এমন একজন ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড এগিয়ে নিয়ে যায়_ যে নিজেকে মাবুজার যোগ্য আত্মিক উত্তরাধিকারী ভাবতে পছন্দ করে। যেকোনো দিক থেকেই, লাংয়ের তৃতীয় মাবুজা ফিল্মটি অনিবার্যভাবে এটির আগের দুটি ফিল্মের সঙ্গে তুলনার মুখোমুখি হয়।

টকিং বা সাউন্ড সিনেমা আবির্ভাবের পর, বিদেশে ফিল্ম ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার লক্ষে জার্মানি ছেড়ে যাওয়ার আগে, দেশটিতে দুটি সাউন্ড ফিল্ম বানিয়েছিলেন লাং। ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা’র আগে তিনি নির্মাণ করেন ‘এম’; আর এটিই ছিল তার প্রথম সাউন্ড সিনেমা। তার ‘এম’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে রয়েছে একটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। ‘দ্য ওম্যান ইন দ্য মুন’ নামের সায়েন্স ফিকশনটি ছিল তার সর্বশেষ সাইলেন্ট ফিল্ম। এটি নির্মাণের সময় স্টুডিও কর্তৃপক্ষের বড় ধরনের হস্তক্ষেপের শিকার হন লাং। ব্যাপারটিকে তিনি স্মরণ করে বলেছেন, এ কারণে ‘ফিল্মমেকিংয়ের উপর ভীষণ অভক্তি চলে এসেছিল আমার; চেয়েছিলাম বরং একজন কেমিস্ট হতে।’ ঠিক সে সময়েই, লাংকে সিম্যুর নিবনসাল নামে এক ইন্ডিপেনডেন্ট প্রডিউসার আমন্ত্রণ জানান, একটি সিনেমা বানিয়ে দেওয়ার জন্য। জবাবে প্রডিউসারকে লাং বলেন, “আমি একটা প্রস্তাব রাখতে চাই : আপনাকে একটা ফিল্ম বানিয়ে দেবো, ঠিক আছে; কিন্তু সেটিতে টাকা ঢালা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না আপনার। ফিল্মটি আমি যেমন বানাব, ঠিক অবিকল দেখাতে হবে।” নিবনসাল সম্মতি দেন এ প্রস্তাবে। আর ‘অথর’ টার্মটির আবির্ভাব ঘটার অনেক আগেই, একজন সত্যিকারের ‘অথর’ হয়ে নিজের মতো করে সিনেমা বানানোর জেঁদটি ‘এম’-এর মাধ্যমে সম্পন্ন করেন লাং।

3. M

কাজ চলাকালে এম ফিল্মটির নাম ছিল ‘দ্য মার্ডারারস অ্যামং আস’। ছোট বালিকাদের নির্যাতন ও হত্যা করা জনৈক সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথকে নিয়ে এর কাহিনী। পরে ‘মার্ডারার’ শব্দটির প্রথম অক্ষর ‘এম’ দিয়েই ফিল্মটির নামকরণ করেন লাং। আর এটির সাইকোপ্যাথিক মার্ডারার বা খুনিকাহিনী ভ্যাম্পায়ার অব ডুসেলডর্ফ নামে কুখ্যাত পিটার ক্যুর্টেনের উপর ভিত্তি করে রচিত_ যে কিনা ১৯২০ দশকের মধ্যভাগে শহরটিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিল। [উল্লেখ্য, ডুসেলডর্ফ ভ্যাম্পায়ারের উপর, ১৯৯৫ সালে নির্মিত ‘কপিক্যাট’ (জন অ্যামিয়েল) নামের এক সিনেমায় জনৈক সিরিয়াল কিলার নিজেকে ‘পিটার কুর্টেন’ বলে দাবী করেছিল।]

ফিল্মটির শুরুতে আমরা দেখি, শিশুহত্যাকারীকে ধরিয়ে দেওয়ার পুরস্কার ঘোষিত এক পোস্টারের উপর বল নিয়ে খেলা করছে এলজি বেকমান নামের এক ছোট্ট বালিকা। হুট করেই জনৈক পুরুষের ভৌতিক ছায়া এসে পড়ে পোস্টারটির উপর, আর এলজি সেই আগন্তুকের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। এই ছায়াটি সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথ হান্স বেকার্টের [পিটার ল্যর অভিনীত]। সে জনৈক অন্ধ বিক্রেতার কাছ থেকে এলজিকে একটি বেলুন কিনে দেওয়ার লোভ দেখায়। বেলুনটি কেনার পর গ্রিগের ‘পির জিন্ট স্যুট থেকে দ্য হল অব দ্য মাউন্টেন কিং’-এর সুরে শীস বাজায় বেকার্ট। আসলে, যখনই কোনো শিকারকে অনুসরণ করে, শীস দিয়ে এই সুরটি বাজাতে থাকে সে।

মধ্যাহ্নভোজের জন্য স্কুল থেকে মেয়ের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন এলজির মায়ের ইন্টারকাটিং শটের মাধ্যমে বেকার্টের খপ্পড়ে এলজির পড়াকে দেখিয়ে দৃশ্যটির সাসপেন্সকে বাড়িয়ে তুলেছেন লাং। রেলিংয়ের উপর থেকে ঝুঁকে পড়ে এলজির নাম ধরে যখন ডাকতে থাকে মিসেস বেকমান; আর তখন ক্যামেরাকে সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে আসতে, এবং ডিনার টেবিলে এলজির বসার জায়গাটি ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখি। এই দৃশ্যগুলো প্রকৃতপক্ষে নিজের কন্যা সম্পর্কে মিসেস বেকমানের বাড়ন্ত উদ্বেগকেই ভিজ্যুয়ালি ইঙ্গিত করেছে।

এ সময়ে, এলজিকে প্রলোভন দেখিয়ে একটা ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে যায় বেকার্ট। ক্যামেরার ফোকাস তখন থমকে থাকে ঝোঁপের উপর। আর আমরা সেই ঝোঁপ থেকে প্রথমে বলটাকে দ্রুত বেগে বেড়িয়ে আসতে, এবং তারপর আকাশে উড়ে যেতে দেখি। বাতাসের মৃদু ঝাপটায়, শিশুর আদলের বেলুনটির এভাবে উর্ধ্বমুখি উড়ে যাওয়া বস্তুতপক্ষে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর পর বেচারি এলজির আত্মার স্বর্গপানে উড়ে যাওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে। হতভাগ্য শিশুর উপর নির্যাতন ও হত্যা নিঃসন্দেহে পুঙ্খাপুঙ্খভাবে সিনেমার পর্দায় ফুটিয়ে তোলা খুবই অনুচিত ব্যাপার হবে_ এই বিবেচনায়, এভাবেই দৃশ্যটিকে ধারণ করে, এলজির উপর যা ঘটেছিল_ সেটি সম্পর্কে দর্শককে নিজের মতো করে ভেবে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার পথটি এখানে গ্রহণ করেছেন লাং।

এরপর ফিল্মটি পুরো শহরজুড়ে সেই সাইকোটিক খুনিকে তল্লাশি করার ডকুমেন্ট হাজির করে, যে তল্লাশি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইন্সপেক্টর লোমান [‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা’য় একই চরিত্রে অভিনয় করা সেই অটো ভ্যেরনিকা]। ঘটনা হলো, শিশু-শিকারি সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথ_ যাদেরকে অপরাধীদের মধ্যে নিকৃষ্টতম হিসেবে গণ্য করা হয়, বাকি অপরাধীরা এ তালিকায় সন্দেহভাজন হিসেবে সাতজনের নাম উল্লেখ করে। ফলে, শ্রেঙ্কার নামের জনৈক আন্ডারওয়ার্ল্ড সর্দার শহরটিতে অপরাধী উপাদানকে সাহায্য করার একটি তালিকা তৈরি করে, অপরাধীকে পালিয়ে যেতে দিতে। ইতোমধ্যে, বেকার্ট আবারও শিকার ধরার প্রস্তুতি নেয়। নিজের আরেকটি নিষ্ঠুরতা সম্পন্ন করার সময় সে নিজস্ব নিয়মমতো আবারও ‘দ্য হল অব দ্য মাউন্টেন কিং’য়ের সুরে শীস দিতে শুরু করে; তবে এবার সে ছিল নার্ভাস। এই শীস ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শককে বেকার্টের আরেকটি অপরাদের ব্যাপারে সঙ্কেত দেন লাং। এটি নিজের প্রথম সাউন্ড ফিল্মেই সাউন্ড ট্র্যাককে সৃষ্টিশীলভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তার দতার একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। ঘটনা হলো, শুটিংয়ের সময় শীস বাজাতে পারতেন না ল্যর। লাং বলেন, “খুনির অশনিসংকেতময় শীস বাজানোটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ; কেননা, এটি তার পাপিষ্ঠ চরিত্রটিকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে লেগেছে। ফলে ডাবিংয়ে শীস বাজানোর দায়িত্বটা আমি নিজেই পালন করার সিদ্ধান্ত নিই। আমি একজন মিউজিক-মুর্খ_ যে কিনা সুরে বাজাতে জানি না; ফলে আমার বাজানো শীস হয়ে উঠেছে বেসুরো। কিন্তু কাজটি আমি ঠিকঠাকই করতে পেরেছি, যেন এই সাইকোপ্যাথটি যে অনিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যহীন মানসিকতার_ সেটি বোঝা যায়। এ ছিল একটি সৌভাগ্যজনক দুর্ঘটনা_ যা আমি ভেবে চিন্তে করে করিনি। ফলে, আপনি দেখবেন, নিজের সিনেমাগুলোতে আমার করা সব কাজের ক্রেডিট আমি নিই না।”

বেকার্ট যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় সম্ভাব্য শিকারের খোঁজে, তখন তার সন্দেহ হয়, কেউ হয়তো তাকে অনুসরণ করছে। এই আতঙ্কের মধ্যে সে হঠাৎ উপলব্ধি করে, ব্যাপক পরিসরের চলা তল্লাশিটির কাছাকাছিই রয়েছে সে। এর পরপরই একটা দোকানের জানালার উপর পড়া নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায় বেকার্ট। যখন সে জানালা থেকে সরে যায়, তখন আতঙ্কের সঙ্গে খেয়াল করে, তার অজ্ঞাতেই কেউ তার পেছনে চক দিয়ে ‘এম’ [মার্ডারার] লিখে রেখেছে। ফলে সে সচেতন হয়ে যায় একজন চিহ্নিত মানুষ হিসেবে; কেননা, এই চিহ্নের কারণে সে সেই পলায়নপরদের একজন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে_ যার খোঁজে চলছে তল্লাশি। এই দৃশ্যটিকে ফিল্মটির টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে যথার্থই চিহ্নিত করেছেন জোসেফ চ্যাং। এটিকে তিনি অভিহিত করেছেন, ‘শিকারি এখন চিহ্নিত’ হিসেবে। এ বাক্যের সঙ্গে ফস্টার হার্স যোগ করে বলেছেন, এ দৃশ্যে লাং ‘শিশুহত্যাকারীর প্যারানয়া ও নিঃসঙ্গতাকে’ প্রকাশ করেছেন বেকার্টকে একটি হাই অ্যাঙ্গেল থেকে দেখিয়ে : একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তার ছায়াসমুহের মধ্যে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে; তাছাড়া, দৃশ্যটির মৃত্যুসম নীরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে শুধুমাত্র দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির শব্দ।

শ্রেঙ্কার ও তার সহযোগী অপরাধীরা শিগগিরই বেকার্টকে ধরে ফেলে। পুলিশের জনৈক ইনফরমারের কাছ থেকে লোমান জানতে পারে, বেকার্টকে ধরে, পরিত্যক্ত কারখানায় অবস্থিত অপরাধীদের একটি আদালতে বিচারের জন্য নিয়ে গেছে শ্রেঙ্কার। এর বিচারালয়ের প্রধান হিসেবে সে রায় দেয়, শিশুদের শিকার করা ব্যক্তির জীবনকে ‘মোমবাতির মতো নিভিয়ে দিতে হবে’। ঠিক তক্ষুনি লোমান ও পুলিশ হাজির হয় সেখানে, এবং বেকার্টকে নিজের জিম্মায় নিয়ে আসে। এরপর বেকার্টের আইনি বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার মুহূর্তে কাট করে এমন এক দৃশ্যে নিয়ে যান লাং, যেখানে দেখা যায়_ এই রায় শুনে মিসেস বেকমান বিলাপ করে বলছে, ‘ওর জীবন নিলেই কি আর আমাদের সন্তানেরা ফিরে আসবে?’ সেই মর্মান্তিক আর্তনাদের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ফিল্মটি।

বলা হয়ে থাকে, বেকার্ট চরিত্রটিতে অভিনয় নয়, বরং এটিকে যেন আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন পিটার ল্যর। বস্তুতপক্ষে লাংয়ের এই ফিল্মটির ভূয়সী প্রশংসা পলিন কিল করেছেন এ কারণে, কেননা, এখানে একজন সেক্সুয়াল সাইকোপ্যাথের গ্রেফতার হওয়াকে দেখানো হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, [এই সিনেমায়] একজন বেটে-মোটা লোক পরে ছিল অস্বস্তিকর পোশাক’_ যে কিনা সাইকোটিক খুনিকে ধরার এক গণতল্লাশিতে ধরা পড়েছে, আর সেই চরিত্রে ‘পিটার ল্যরের অভিনয় এক তুখোড় মেধাবীর স্বাক্ষর’। এরসঙ্গে অ্যান্ডি ক্লেইন যোগ করেছেন, ল্যরের এই ‘ব্রিলিয়ান্ট পারফরমেন্স’কে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে লাংয়ের ছিল মাস্টারফুল দক্ষতা। এক কথায় বললে, মানুষের মনোজগতের অন্ধকারতম বিরামের এই কঠিন গবেষণাটি লাংয়ের জার্মান ফিল্মগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

জার্মানিতে লাংয়ের ফিল্ম ক্যারিয়ারে সহসাই যবনিকা নেমে আসে ১৯৩৩ সালে, যখন তাকে হিটলার ও হিটলারের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার ইয়োসেফ গ্যেবেলস আমন্ত্রণ জানান সদ্যই নাৎসি সরকারের করায়ত্ব হওয়া জার্মান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। গ্যেবেলস ব্যাখ্যা করেন, ‘মেট্রোপলিস’-এর মহাকাব্যিক গুণে মুগ্ধ হয়ে আছেন ফুরার হিটলার, এবং ঠিক করেছেন, এই ফিল্মটির নির্মাতাই থার্ড রাইশের সিনেমাগুলো বানানোর যোগ্য দাবিদার। এ ক্ষেত্রে নাৎসি শাসনকে নাশকতামূলক হিসেবে দেখানোর দায়ে ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা’কে যে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল_ এ বিষয়টি ইচ্ছেকৃতভাবেই এড়িয়ে যান হিটলার। গ্যেবেলসের কথা শুনে, সদ্যই জাতীয়করণকৃত জার্মান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাজ করতে রাজি হওয়ার ভান করেন লাং; অন্যদিকে একইসঙ্গে গ্যেবেলসের কাঁধের উপর দিয়ে ঘড়ির দিয়ে গোপনে রাখেন চোখ_ যেন দেশ ছেড়ে পালানোর আগে ব্যাংকে জমা থাকা নিজের সব টাকা উঠিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু লাং যতক্ষণে গ্যেবেলসের অফিস থেকে বের হতে পারলেন, ব্যাংক ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; ফলে পকেটে যা টাকা ছিল, তা নিয়েই পরের ট্রেন ধরে প্যারিস চলে আসেন তিনি। অন্যদিকে, তার স্ত্রী ও স্ক্রিপ্টরাইটার থিয়া ফন হার্বা দেশেই থেকে যান; যোগ দেন নাৎসি পার্টিতে।

প্যারিসে থাকার সময় ‘লিলিয়াম’ নামে একটা সিঙ্গেল ফিল্ম বানান লাং। এরপর ‘মেট্রো-গোল্ডউইন-মায়ের’-এর [সংক্ষিপ্ত নাম, ‘এমজিএম’-এই অধিক পরিচিত] তৎকালীন কর্তা ডেভিড ও. সেলজনিকের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পান হলিউডে যাওয়ার। ১৯৩৪ সালের ১ জুন, লন্ডনে সেলজ্নিকের সঙ্গে দেখা করেন লাং, এবং হলিউডে এমজিএম-এর হয়ে সিনেমা বানানোর চুক্তিতে স্বার করেন। মেট্রোতে পৌঁছে নানাবিধ প্রজেক্টে সম্পৃক্ত হন এই ফিল্মমেকার; কিন্তু সেগুলোর একটিও সম্পন্ন হয়নি। তবু আমেরিকাতে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতীজ্ঞ থাকেন তিনি; কেননা, জার্মানিতে ফেরার কোনো উপায় ছিল না তার। এ সময়ে আমেরিকান নাগরিকত্বের আবেদন করেন তিনি; এবং ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাগরিকত্ব লাভ করেন। এ সময়ের স্মৃতিচারণায় লাং বলেছেন, “পুরো এক বছর এমজিএম-এর চুক্তির অধীনে থাকলেও, কোনো প্রজেক্টই চালু করতে পারিনি আমি।”

অবশেষে কর্তৃপক্ষকে লাং জানান, বিচারবহির্ভূত আইন নিয়ে নরম্যান ক্রেজনার লেখা মব রুল গল্পটি অবলম্বনে চার পৃষ্ঠার একটি সিনোপসিস লিখেছেন তিনি। এ বেলা স্টুডিও কর্তৃপক্ষ তাকে সবুজ সংকেত দেয়। বারলেট করম্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে স্ক্রিপ্ট লিখেন লাং। আর ফিল্মটির নাম রাখেন, ‘ফিউরি’। স্ট্র্যান্ডের একটি ছোট্ট ওয়েস্টার্ন শহরে, বাগদত্তা ক্যাথেরিন গ্র্যান্টের [সিলভিয়া সিডনি অভিনীত] সঙ্গে জো উইলসন [স্পেনসার ট্রেসি অভিনীত] নামের শিকাগোর এক সার্ভিস স্টেশন অ্যাটেনডেন্টের দেখা করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফিল্মটি। জো যখন স্ট্র্যান্ডে পৌঁছে, তখন স্থানীয় এক শেরিফ বা আইনি-কর্মচারী [এডওয়ার্ড এলিস অভিনীত] তাকে গ্রেফতার করে_ সম্প্রতি ঘটা এক তরুণী অপহরণের ঘটনায়। জোর গ্রেফতার হওয়া নিয়ে আলাপরত একদল গৃহিনীকে দেখিয়ে, তাদের সেই গল্প-গুজবের উপর একটি ভিজ্যুয়াল কমেন্ট হিসেবে মুরগির কয়েকটি ডাকের উপর শটটি কাট করেন লাং।

এই শহুরে লোকদের জো-কে অপরাধী মনে করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল একেবারেই ভুল। ভিজ্যুয়াল ইমেজারির সতর্ক সিলেকশনের মাধ্যমে লাং এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটিকে নিজের ড্রামাটিক শক্তির গুণে হাজির করেছেন বলে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ঔপন্যাসিক-স্ক্রিপ্টরাইটার ও ১৯৩০ দশকের সিনে-সমালোচক গ্রাহাম গ্রিন। অর্থাৎ, এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকারী গুণ্ডাবাহিনী ‘রাস্তা দিয়ে মার্চপাস্ট করে হেঁটে যাওয়া নারী-পুরুষের একটি রেজিমেন্ট_ [যারা] কোনো যুদ্ধে আসা নতুন সৈন্যদলের প্রথম দিনের উচ্ছ্বাস নিয়ে, হাতে হাত রেখে, হাসতে হাসতে [হাঁটতে হাঁটতে] ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ায়।’ এই ইমেজটি জোর দুরাবস্থার প্রতি জনসমাগমের বিচারবোধশূন্যতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। গ্রিন যে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটিকে ‘অনেকটা সুতীব্র ঘৃণা’– এই টার্মটি দিয়ে অভিহিত করেছেন, তা খানিকটা বিস্ময়েরই বটে।

এই উন্মত্ত মবের রিংলিডার_ কারবাই ডসন [ব্রুস ক্যাবট অভিনীত] সবাইকে হটিয়ে, জো-কে নিজের কবজায় করে জেলে নিয়ে যায়। আর লোকগুলো জো’র সেলটি ভাঙতে না পেরে, জেলখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়– যেন জো-সহকারে পুরো বিল্ডিংটিই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অগ্নিশিখায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেলে, জেলখানা থেকে পালিয়ে যায় জো।

জো-কে সবাই মৃত ধরে নিলেও, যারা তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল_ তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার নতুন ফন্দি আঁটে সে। প্রতিশোধের প্রতি তার তিক্ত আচ্ছন্নতা আমাদেরকে ‘দ্য নিবেলুং সাগা’র দ্বিতীয় পর্ব “ক্রিমহাইল্ড’স রিভেঞ্জ”-এর টাইটেল-ক্যারেক্টারের তীব্র যাতনার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর এভাবে, নিঃসন্দেহে, নিজের জার্মান সিনেমাগুলোর সঙ্গে নিজেরই প্রথম আমেরিকান সিনেমাটির মধ্যে একটা কন্টিউনিটি জাহির করেছেন লাং। সেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকারী চক্রের ২২ সদস্য জো-হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়। ইতোমধ্যে, স্ট্র্যান্ডের একটি জীর্ন হোটেল রুমে নিজেকে লুকিয়ে রাখে জো_ যেন সে মারা গেছে_ এ কথা প্রমাণিত হয়, এবং অভিযুক্ত খুনিরা শাস্তি পায়। উইলিয়াম জনসন ইঙ্গিত করেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বরং এটির শিকার হয়ে গোপনে বেঁচে থাকা ও নিজের খুনের দায়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে চাওয়া একজন মানুষের একটি নৈতিক উভয়সংকটের প্রতি ফোকাস বেশি করেছে’ ‘ফিউরি’। এভাবে, জো নিজেও আসলে হয়ে ওঠে একজন ওয়ান-ম্যান লিঞ্চ মব বা এক-সদস্যের বিচারবহির্ভূত হত্যাকারী গুণ্ডাদল।

ফিল্মটিতে এভাবে এক্সপ্রেশনিস্টিক একটি ফ্লেভারকে হাজির করেছেন লাং। যেমনটা বলা হয়ে থাকে, কোনো দৃশ্যের গভীরতর প্রতীকি অর্থ জাহির করার জন্য অবজেক্টিভ রিয়েলিটিকে বিকৃত করার প্রবণতা রয়েছে এক্সপ্রেশনিজমে_ সেই বিবেচনায়, এই দৃশ্যটিতে, যেখানে, বিচার যখনো শেষ হয়নি_ এমন সময়ের এক সন্ধ্যায় জো যখন হাঁটতে বের হয়, একটু দাঁড়িয়ে একটা দোকানের জানালা দিয়ে উঁকি দেয় সে। আর হুট করে স্টোরের জানালায় সেই ২২ অভিযুক্তের বিকট ও শিকারি চেহারার প্রতিবিম্ব দেখতে পায় : যেন তারা দাঁড়িয়ে আছে তারই পেছনে, তাকিয়ে আছে তার কাঁধের উপর দিয়ে। জো মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়ায়; কিন্তু দেখে, সেখানে কারও অস্তিত্ব নেই। জোর এই হ্যালুসিনেশন, নিঃসন্দেহে, নিজের প্রতিহিংসাকে চরিতার্থ করার জন্য এই লোকগুলোকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেওয়ার কারণে নিজেরই ভেতর অবচেতনে গড়ে ওঠা অপরাধবোধের একটি প্রতিফলন। নিজের আমেরিকান ফিল্মগুলোতে এক্সপ্রেশনিজমের পরো আবির্ভাব লাং কালেভদ্রে ঘটালেও, ফিউরির এই এক্সপ্রেশনিস্টিক দৃশ্যটি সেই রীতির একটি ব্যতিক্রম উদাহরণ।

এই দৃশ্যটির পরই ফিল্মটির কাইমেক্সের আবির্ভাব ঘটে। ব্যাপারটিকে রেনল্ড হামফ্রিজ বর্ণনা করেছেন এভাবে_ মৃত্যুদণ্ড যখন ঘোষিত হয়, কারবাই ডসন তখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে, এবং ‘আদালত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। হুট করেই সে থমকে দাঁড়ায় এবং চোখে-মুখে রাজ্যের আতঙ্ক নিয়ে সরাসরি তাকায় ক্যামেরার দিকে। সে পিছু হটতে শুরু করে, আর ক্যামেরা স্লো-মুভ করে এগিয়ে যায় সামনে। আদালতের মধ্যে কারবাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দৃশ্যটির কাট করা হয় : আমরা দেখি, সদ্যই দরজা খোলা জো উইলসন নিজের লক্ষ্যের [অর্থাৎ, ডসনের] দিকে এগিয়ে আসছে।’ হামফ্রিজ মন্তব্য করেছেন, সিনেপ্রেমীরা জানে, ডসনের এই আতঙ্কগ্রস্ত অবয়ব দেখানোর মধ্যেই ‘এ রকম একটি খুনি চাহনির মুখোমুখি হওয়ার’ অর্থ কী হতে পারে।

সেই এক্সপ্রেশনিস্টিক দৃশ্যটিতে আমরা যা দেখেছি, তার প্রতিক্রিয়ায়, অর্থাৎ, নিজের অপরাধবোধে অনুতপ্ত জো আদালতে এসে হাজির হয়, এবং জানান দেয়, সে সত্যি সত্যি জীবিত এখনো। বিচারককে সে জানায়, আদালতে তার হাজির হওয়ার কারণ_ সে চায় না মিথ্যের উপর ভর করে বেঁচে থাকতে; কেননা, সে জানে, এই এতগুলো অভিযুক্তের শাস্তির দায় একমাত্র তারই।

দৃশ্য । ফিউরি
দৃশ্য । ফিউরি

আদালতে উপস্থিত ক্যাথেরিন ছুটে আসে জোর কাছে; তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকে, আর ফেডআউট হয়ে যায়_ ফিল্মটির এই ফাইনাল শটটি লাং নিতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রডিউসার জোসেফ ম্যানকিউইচের [যিনি নিজেও পরে ফিল্মমেকার হয়েছিলেন] নির্দেশে। জবাবে লাং বলেছিলেন, ‘বিচারকের প্রতি আলোড়ন জাগানিয়া বয়ান দিয়ে, তারপরই নিজের প্রেমিকার দিকে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরছে স্পেন্সার ট্রেসি_ এটা ভাবা যায়? কিন্তু মিস্টার ম্যানকিউইচ এমনটাই চেয়েছিলেন’; ফলে ফিল্মটির এই এন্টিকাইমেক্সটি রয়ে যায়। এই আবেগাত্মক সমাপ্তি সত্ত্বেও, ‘ফিউরি’ যে একেবারেই একটি লাংধর্মী ফিল্ম, তার কারণ, এটিও ভাবনা-জাগানিয়া। নিজের প্রতিহিংসা-মানসিকতাকে জয় করে, আরও একবার সেই ভদ্র ও সভ্য মানুষটি হয়ে ওঠা_ যে ব্যক্তিত্বের দেখা ফিল্মটির শুরুতে মেলে, তেমন একজন মানুষের প্রতিকৃতি গ্রাফিক্যালি ফুটিয়ে তুলেছে এটি।

‘ফিউরি’র কাস্ট ও ক্রুদের নিয়ে কাজ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে লাং এতটাই মরিয়া ছিলেন, সেটি খুব দ্রুতই তাকে একজন প্রুশিয়ান উৎপীড়কের বদনাম এনে দেয়! ১৯৪০ দশকে তার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করা হিল্ডে রলফ্ লিখেছেন, এ রকম সমালোচনাকে গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, লাং ছিলেন একজন পারফেকশনিস্ট। আর জানেনই তো, ‘পারফেকশনিস্টকে কেউ পছন্দ করে না’_ লাংয়ের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সহমত পোষণ করে, ‘ফিউরি’র সিনেমাটোগ্রাফার জোসেফ রুটেনবার্গ জানিয়েছেন, ডিটেইলের প্রতি নির্ভুল মনোযোগ লাংকে একজন সত্যিকারের টাস্কমাস্টার করে তুলেছে। এই ফিল্মে কাজ করার ফলে লাংয়ের প্রতি একটি স্থায়ী শ্রদ্ধাবোধ জন্মে যায় রুটেনবার্গের মনে। এই ফিল্মমেকারকে তিনি, ‘সবচেয়ে বড় কথা, [লাং] একজন গ্রেট টেকনিশিয়ান এবং একজন দুর্ধর্ষ ফিল্মমেকার’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

অবশ্য, মব রুলের ভূমিকার উপর লাংয়ের সুনিপুণ স্টাডির ফলে ‘ফিউরি’র যে চেহারা দাঁড়িয়েছিল, সেটি দেখে স্টুডিও কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছে_ এই ফিল্মটি আমজনতার পক্ষে হজম করা কঠিন হবে খুব। সে সময়ের স্মৃতিচারণায় লাং জানান, ‘হলিউড রিপোর্টার’-এর প্রকাশককে স্টুডিওর এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করে বলেছিলেন, “‘ফিউরি’ একটা জঘণ্য সিনেমা; এর সব দায় মনোকল পরা সেই জার্মান কুত্তার বাচ্চা ফ্রিৎস্ লাংয়ের”। তবুও, সমালোচক মহলে সাড়া ফেলে ফিল্মটি; গ্রাহাম গ্রিনসহ প্রথমসারির সিনে-বোদ্ধাদের এটি মোহিত করে। গ্রিন তো লিখেই ফেলেন, সাউন্ড আর ইমেজ দিয়ে ‘কাহিনীর অনুকম্পা ও আতঙ্ককে’ এমন পরিপূর্ণভাবে আর কোনো সিনেমা ধারণ করতে পেরেছে বলে তার মনে পড়ে না। তিনি শেষ করেছেন এই লিখে, “হের [মহান] লাংয়ের এই অসাধারণ অর্জনের কাছে এ বছরের অন্য যেকোনো সিনেমাকেই বামন ঠেকবে।”

জন রাসেল টেইলর জোরের সঙ্গে বলেছেন, আমজনতার মধ্যে ‘ফিউরি’ এতই সাড়া ফেলে দেয়, এটি হয়ে ওঠে ‘সাউন্ডের যুগে হলিউডে কোনো অভিবাসীর বানানো প্রথম সত্যিকারের সফল সিনেমা’। ফলে, ফিল্মটি লাংয়ের সুনামকে শুধুমাত্র হলিউডেই প্রতিষ্ঠিত করে দেয়নি; বরং আমেরিকায় অটো প্রেমিঙ্গার মতো অন্যান্য ইউরোপিয়ান ফিল্মমেকারকেও আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে।

পরের ফিল্ম ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’ বানানোর জন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড আর্টির্স্ট’-এর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পান লাং। প্রস্তাবটি তিনি গ্রহণও করেন। লাংয়ের এই দ্বিতীয় আমেরিকান ফিল্মটির কাহিনী এমন একজন মানুষকে ঘিরে, যে কিনা ‘ফিউরি’র জো উইলসনের মতোই এমন এক অপরাধের দায়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে_ যে অপরাধটি সে করেনি। কাহিনীর শুরুতে আমরা দেখি, ছোটখাট অপরাধের জন্য তৃতীয়বারের মতো হাজতবাস শেষে, তিনবারের ব্যর্থতার পর জোয়ান গ্রাহামকে [সিলভিয়া সিডনি অভিনীত] বিয়ে করছে এডি টেইলর [হেনরি ফন্ডা অভিনীত]। এর অল্প কিছুক্ষণ বাদেই, এডির প্রাক্তন গ্যাংয়ের এক সদস্য_ মঙ্ক একটি ব্যাংকে ডাকাতি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় এক নিরাপত্তাকর্মীকে খুন করে ফেলে। এই ব্যাংক ডাকাতিতে হত্যার ঘটনায় এডিকে ফাসিয়ে দেয় মঙ্ক। এডি শেষ পর্যন্ত দুটি অপরাধেই অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পায়। এডি যখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার অপেক্ষারত, তাকে তখন ডেথ-সেলের শিকের ভেতর দিয়ে লাং এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন_ যেন সে খাচাবন্দি কোনো শিকারপ্রত্যাশী প্রাণী।

যার হারানোর কিছু নেই_ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এমন এক আসামী গোপনে একটা আগ্নেয়াস্ত্র এনে দেয় এডিকে, যেন সে পালাতে পারে। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে, কারাগারের আঙিনা দিয়ে পালানোর পথ করে নেয় এডি। আঙিনা জুড়ে তখন ছিল ঘন কুয়াশা। এই কুয়াশা যেন এডির নিজেরই তখনকার পরিস্থিতিতে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়া মানসিক অবস্থার একটি রূপক। প্রিজন চ্যাপলিন_ ফাদার ডোলান [উইলিয়াম গারগ্যান অভিনীত] এগিয়ে এসে এডিকে বলার চেষ্টা করে, মঙ্ক তার অপরাধ উপলব্ধি করতে পেরেছে, তাই এডিকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে সে কথা বোঝার অবস্থায় ছিল না এডি। ফলে সে ক্ষেপে যায় এবং অন্ধের মতো গুলি করতে থাকে সেই কুয়াশার ভেতর; আর, তাতে ঘটনাচক্রে খুন হয় ফাদার ডোলান।

ফিল্মটির রুক্ষ রিয়েলিজমের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে, এডির জেল ভেঙে পালানোর পন্থাটিকে উদাহরণ হিসেবে টেনে, লাং বলেছেন, ফিল্মটিতে কোনো রকম ফেন্সি বা আলঙ্কারিক ফটোগ্রাফি চান না_ এ কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন নিজের ক্যামেরাম্যানকে। বরং ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’-এ মাবুজার গ্যাং আর পুলিশের মধ্যে যে পাশবিক রিয়েলিস্টিক শুটআউটের দৃশ্যায়ন তিনি করেছেন, সে রকম নিউজরিলধর্মী কোয়ালিটির সিনেমাটোগ্রাফি এ ক্ষেত্রেও চাওয়া ছিল তার। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, “আমি মনে করি, সমকালীন মানুষকে ফুটিয়ে তোলে_ এমন যেকোনো সিরিয়াস সিনেমারই উচিত এ সময়ের এক ধরনের ডকুমেন্টারির মতো হয়ে ওঠা। কেবলমাত্র তাহলেই আপনি একটি সিনেমার মধ্যে সত্যের গুণাবলির দেখা পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।… আমার সবগুলো তথাকথিত ক্রাইম সিনেমাই আসলে একেকটি ডকুমেন্টারি_ এমনটা ভাবতে আমি পছন্দ করি।” বলে রাখা ভালো, পরে ফ্রেড জিনমানের মতো হলিউড অভিবাসি অন্য অনেক ফিল্মমেকারই তাদের সিনেমায় এই একই ধরনের ডকুমেন্টারি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছেন।

জেল থেকে পালানোর পরপরই জোয়ানকে ফোন করে এডি জানিয়ে দেয় নিজের পালিয়ে আসার কথা। এই ফিল্মটি তারপর থেকে হয়ে ওঠে ‘বনি ও কাইড সাগা’র অনুরণন, যেখানে জোয়ান ও এডি এটিকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে_ বর্ডার পেরিয়ে কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কানাডিয়ান বর্ডারের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছুতেই তাদের ধরে ফেলে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে এডির আসন্ন গোলাগুলির মুখে প্রথমে জোয়ান খুন হয়, তারপর এডি হয় মারাত্মক আহত। মারা যেতে যেতে এডি দেখতে পায়, তার চোখের সামনে স্বর্গের দরজা খুলে যাচ্ছে; আর শুনতে পায় ফাদার ডোলানের কণ্ঠ : ‘এডি, তুমি মুক্ত; [স্বর্গের] দরজা খোলা।’ স্বর্গের দরজাকে প্রতীক হিসেবে প্রকাশ করা মুক্তির এই ইমেজটি, এডিকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা কারাগারের গেটের একটি বিদ্রূপাত্মক তুলনাকে জাহির করেছে।

দৃশ্য । ইউ অনলি লিভ ওয়ানস
দৃশ্য । ইউ অনলি লিভ ওয়ানস

‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’-এর সমাপ্তিদৃশ্যে বেশ জোরাল ধর্মীয় তাৎপর্যের প্রকাশ ঘটানো সম্পর্কে লাং বলেছেন, “জন্মগতভাবে আমি ক্যাথলিক। গির্জার রীতি মতে হয়তো ভালো ক্যাথলিক আমি নই; তবে [একবার নিলে] ক্যাথলিক শিক্ষা [এবং যে কোনো নীতিশাস্ত্রীয় শিক্ষা] কেউ কোনোদিনই ভোলে না।” বছরের পর বছর ধরে একটা গুজব প্রচলিত আছে_ ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’-এর এন্ডিং হিসেবে স্টুডিও কর্তৃপক্ষ লাংকে দিয়ে একটি বিকল্প শট নিয়ে রেখেছিল এই আশঙ্কায়, যেন আমজনতা ফিল্মটির মধ্যে লাংয়ের এই প্রকাশ-প্রবণ ধর্মীয় এন্ডিংটিকে নেতিবাচকভাবে না নেয়। এ প্রসঙ্গে সিলভিয়া সিডনি নিশ্চিত করে বলেছেন, “ফিল্মটির কোনো অল্টারনেটিভ এন্ডিং শট ছিল না। দৃশ্যটিতে যেহেতু আমি নিজে ছিলাম, ফলে আমি জানি।”

তাছাড়া, স্বর্গরাজ্যে অনন্ত জীবনের প্রত্যাশায় এডির মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে ফিল্মটির যে শেষদৃশ্য হাজির আছে, সেটি লাংয়ের বহুলব্যবহৃত সেই থিমটির কথা মনে করিয়ে দেয় : নিজের ভাগ্যের বিপক্ষে যে লড়াই করে, সে হয়তো হেরে যেতে পারে; কিন্তু বড় অর্থে ভাবলে, তার আসলে পরাজয় নেই। ফলে এই ফিল্মটির নায়ক শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্যকে জয় করতে পারে_ মৃত্যুর পরের জীবনে নিজের প্রেমিকার সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা-জাগানিয়া স্বর্গের দরজায় প্রবেশ করার মাধ্যমে। এই কনটেক্সটিতে, ফিল্মের শুরুতে জোয়ানকে যে ইঙ্গিতটি দিয়েছিল এডি, অর্থাৎ, যদি আরেক জীবনে একে অন্যকে খুঁজে পায়, তাহলে মৃত্যুকে তাদের ভয় করার কিছু নেই_ সেটি অর্থবহভাবে ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সিনে-ইতিহাসবিদ জেরি ভার্মিলিয়ে লিখেছেন, “ভাগ্যের বিপে মানুষের লড়াই করার থিমটিতে লাংয়ের প্রবেশাধিকার একান্তই নিজের, [আর এটি] তার সবগুলো সিনেমার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।” এই মোটিফটি তার ১৯৩০ দশকে বানানো স্যোসাল ড্রামাগুলোর, বিশেষ করে ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’ ও ‘ফিউরি’র চেয়ে এত বেশি সত্য হয়ে ওঠেনি কখনো।

‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’ স্পষ্টতই একটি ভায়োলেন্ট সিনেমা_ যেখানে বেশ কয়েকটি রক্তাক্ত মৃতদেহ হাজির রয়েছে। নিজের সিনেমায় ভায়োলেন্স হাজির করার বিষয়টিকে সামনে রেখে লাং একবার বলেন, “ভায়োলেন্সের দোহাইয়ে ভায়োলেন্স ব্যবহার করি না আমি; বরং সবসময়ই এটি করি কোনো নৈতিক পরিসমাপ্তিতে পৌঁছুতে কিংবা সেটিকে ফুটিয়ে তুলতে।” এ কথা ব্যাপকভাবে স্পষ্ট যে, ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’ সিনেমাটি ধর্মীয় ও থিমগত দিক থেকে একটি ভীষণ রকম নৈতিক পরিসমাপ্তিকে হাজির করেছে। মুক্তির পরপরই সিনেমাটি সমালোচক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পলিন কিলের সেই মন্তব্যটি উল্লেখ করা যায়; তিনি লিখেছেন, “সিলভিয়া সিডনি ও হেনরি ফন্ডার অভিনয়গুণে [এত ভালো অভিনয় এ দুজন আর কখনোই করেননি], ‘বনি অ্যান্ড কাইড’ কাহিনীর এই প্রাথমিক পর্যায়ের সংস্করণটি নিশ্চিতভাবেই ১৯৩০ দশকের আমেরিকান অতি চমৎকার মেলোড্রামা সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম।”

এমজিএম-এর হয়ে ‘ফিউরি’ আর ইউনাইটেড আর্টিস্টস-এর হয়ে ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’ বানানোর পর, নিজের পরবর্তী সিনেমাগুলো নির্মাণে প্যারামাউন্ট, ফক্স, ইউনিভার্সেল ও অন্যান্য স্টুডিওর দিকে পা বাড়ান লাং। এ প্রসঙ্গে চার্লস সাইলেট উল্লেখ করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কোনো একটি স্টুডিওর হয়ে দিনের পর দিন কাজ করেননি লাং।’ নিজের হলিউড ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট স্টুডিওর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করার চেয়ে বরং সিনেমা ধরে ধরে, যে স্টুডিওর সঙ্গে বনিবনা হবে_ তাদের সঙ্গেই সেটি নির্মাণে মনোযোগ দেওয়াটাই পারে একজন ফিল্মমেকারের শিল্পগত স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে। লাংয়ের এই প্রবণতার স্বপে সাইলেট আরও উল্লেখ করেছেন, এই ফিল্মমেকার ‘নিজে যেন পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন_ এ কারণে নিজেই প্রডিউস করতে সক্ষম_ এমনতর আন্ডারবাজেট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন।’ এভাবে হলিউডে নির্মিত নিজের সিনেমার উপর সৃষ্টিশীল নিয়ন্ত্রণ সমন্বয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন লাং_ ঠিক যেমনভাবে তিনি ‘অথর’ ফিল্মমেকার হিসেবে জার্মানিতে বানানো ফিল্মের সময়ও শিল্পগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা উপভোগ করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাবকালে, একগুচ্ছ নাৎসি-বিরোধী ফিল্ম বানান লাং। এর মধ্যে ছিল, ‘ম্যান হান্ট’, ‘হ্যাংমেন অলসো ডাই’ ও এ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠতম কাজ_ ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’। এই শেষোক্ত ফিল্মটির কাহিনী, লাংয়ের সবসময়ের প্রিয় লেখক গ্রাহাম গ্রিনের একটি উপন্যাস অবলম্বনে সৃষ্ট। এক ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি আমাকে জানান, “নিউইয়র্ক থেকে যখন হলিউডে ফিরে এলাম আমি_ চুক্তিতে স্বাক্ষর করা ও স্ক্রিপ্টটি পড়ার পর, ফিল্মটি না বানানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি বাতিল করতে কিছুতেই রাজি হয়নি প্যারামাউন্ড কর্তৃপক্ষ।… এ এমনই এক সময় ছিল, যখন আমার এজেন্ট আমার চুক্তিপত্রে আমাকে স্ক্রিপ্টটির উপর কাজ করার অধিকার দেওয়ার কোনো ধারা যুক্ত করতে পারেননি।”

দৃশ্য । মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার
দৃশ্য । মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার

গ্রিনের উপন্যাসটিতে নায়কের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাবলিকে নিরূপনের যে অনুসন্ধান ছিল, স্ক্রিপ্টটিতে সেটি বলতে গেলে হাজিরই ছিল না বলেই মূলত লাং চেয়েছিলেন স্ক্রিপ্ট পরিমার্জন করতে। উপন্যাসের নায়ক স্টিফেনের প্রতিকৃতি গ্রিনি তার উপন্যাসে একজন গভীরতর নিউরোটিক ব্যক্তি হিসেবে অঙ্কন করলেও, ফিল্মের স্ক্রিপ্টে স্টিফেনের আবেগাত্মক সমস্যাবলিকে বলতে গেলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবুও, ‘মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’ উপন্যাসটির যে সংস্করণ লাং নির্মাণ করেছেন, সেটি তার নির্মিত সবচেয়ে রূচিসম্পন্ন স্পাই মেলোড্রামাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি তো থ্রিলার সৃষ্টিতে ওস্তাদ। বস্তুতপক্ষে থ্রিলারের মতো একটি জনপ্রিয় আমেরিকান ফিল্মি-ধারায় নিজস্বতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে লাংয়ের সাফল্য তাকে স্রেফ আমেরিকার মাটিতে গজিয়ে ওঠা কোনো জার্মান ফিল্মমেকার নয়, বরং স্পষ্টতই একজন প্রকৃত আমেরিকান ফিল্মমেকার করে তুলেছে। ‘মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’-এর মতো একটি তাড়িয়ে নেওয়া মেলোড্রামাই কোনো সাসপেন্সপূর্ণ থ্রিলারে লাংয়ের মুন্সিয়ানা খুঁজে পাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ফিল্মটির শুরু হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি রুমে। একটা দরজা খুলে যায়; তার ফাঁকে ঢোকা আলোকরশ্মিতে দেখা যায়, দরজার দিকে মুখ করে স্টিফেন [রে মিল্যান্ড অভিনীত] বসে আছে ছায়ায়। দরজা দিয়ে একজন ডাক্তার ঢুকে স্টিফেনকে জানায়, সে এখন মুক্ত; পাগলাগারদ থেকে চলে যেতে পারে। গত দুই বছর এই পাগলাগারদে ভর্তি ছিল সে_ নিজের অক্ষম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার নার্ভাস ব্রেকডাউন হওয়ার কারণে। অন্ধকার রুমটি থেকে স্টিফেন যখন বের হয়ে, উজ্জ্বল আলোভরা করিডর ধরে হেঁটে যায়_ তার সেই চলনের মধ্যে নিজের অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীত থেকে ফিরে, বর্তমানের আলোর দিকে বেগবান হওয়ার উদ্যম উপস্থিত। পরিহাসের ব্যাপার হলো, এর পরপরই সে প্রবেশ করে তার সদ্যই ছেড়ে আসা জগতের চেয়েও অধিক অনিশ্চিত এক জগতে।

লন্ডনগামী ট্রেন ধরতে গিয়ে ভুল করে স্টিফেন ‘মাদারস অব দ্য ফ্রি নেশনস’-এর স্পন্সর করা একটি চ্যারিটি বাজারে ঢুকে পড়ে। সঠিক ওজনের অনুমান করতে পেরে সে একটি কেক জিতে নেয়। কিন্তু সে যখন সেই মেলার মাঠ ত্যাগ করতে উদ্যত, তখনই মেলার স্পন্সরেরা জানায়, প্রাইজটি তাকে ভুলক্রমে দেওয়া হয়েছে; এটির প্রকৃত দাবীদার আসলে অন্য কেউ। স্টিফেন তখন একগুয়েমি করে কেকটি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করে এবং রেলওয়ে স্টেশনের দিকে হাঁটা দেয়।

ট্রেনের প্লাটফর্মে স্টিফেন যখন অপেক্ষারত, তখন এক অন্ধ লোক এগিয়ে আসে তার দিকে। অন্ধ লোকটির এই আবির্ভাব এ ক্ষেত্রে লাংয়ের প্রতিষ্ঠিত অস্বস্তিকর প্রত্যাশার আবহের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্ধ লোকটির বর্ণনা দিতে গিয়ে পল জেনসেন লিখেছেন : “নিজের টেপিং কেনের শব্দের ভেতর, সে নিজেকে অনেকটা সুপারন্যাচারাল ওভারটোন দেওয়া এক ধোঁয়ার মেঘের ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান হয়।” জার্নির ব্যাপারে স্টিফেনের সঙ্গে অন্ধ লোকটির কথোপকথনের সময়, লোকটির মুখের একটি কোজ-আপ শটের দেখা মেলে_ তাতে বোঝা যায়, তার চোখ দুটো সংগোপনে ট্রেনের কামরার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই লোকটি নিজের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অন্ধের ভান করছে_ এই শটটি দর্শককে সেই ইঙ্গিত দিলেও, এ ব্যাপারে স্টিফেন ছিল অজ্ঞাত। এলাকাটিতে নাৎসি বাহিনীর বিমান হামলা চলার কারণে ট্রেনটি থামিয়ে রাখা হলে, লোকটি হঠাৎ করেই ছোঁ মেরে কেকটি নিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে অন্ধকারের দিকে; আর তখন আকাশ থেকে পরা এক বোমার আঘাতে মরে যায় সে। দৃশ্যটিতে মনোযোগ দিয়ে তাকালে, লাংয়ের মুন্সিয়ানা টের পাওয়া সম্ভব।

লন্ডনে পৌঁছে, সেই চ্যারিটি মেলার স্পন্সরকারী_ ‘মাদারস অব দ্য ফ্রি নেশনস’-এর হেডকোয়ার্টারে হাজির হয় স্টিফেন_ চুরি যাওয়া কেকটির তাৎপর্য উদ্ধার করার উদ্দেশে। সেখানে উইলি হিলফ্ [কার্ল এজমন্ড অভিনীত] ও কার্লা হিলফ্ [মারজোরি রেনল্ডস অভিনীত] নামের দুই ভাই-বোনের সঙ্গে দেখা হয় তার। এই দুই অস্ট্রিয়ান শরণার্থীই এই সংস্থাটি চালায়; তবে রহস্যটি উন্মোচনে তারা তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফিল্মটি এগিয়ে যেতে যেতে আমরা টের পাই, এই তাৎপর্যপূর্ণ কেকটিতে আসলে ধারণ করা ছিল এক রোল মাইক্রোফিল্ম_ যেগুলোতে ব্রিটিশ ডিফেন্স প্ল্যান সম্পর্কিত গোপন তথ্য দেশের বাইরে পাচার করে দিতে উদ্যত ছিল জনৈক নাৎসি গুপ্তচর। এই বিষয়টি ব্রিটিশ পুলিশ সংস্থা_ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্তে ধরা পড়ে। অধিকতর তদন্তে বের হয়ে আসে, সেই চ্যারিটি বাজারটির স্পন্সরকারী এই ‘মাদার্স অব দ্য ফ্রি নেশনস’ আসলে ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’ নামে পরিচিত নাৎসি এজেন্টদের এক ব্যুরোর একটি অংশ। তাছাড়া, স্টিফেন ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে ফেলে, উইলি আসলে নাৎসি গুপ্তচর; আর সে নিজের বোনকে এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের একটি নিঃষ্পাপ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

শেষ পর্যন্ত স্টিফেন যখন কার্লার সামনে উইলির মুখোমুখি হয়, তখন পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা করে নিতে স্টিফেনের দিকে অস্ত্র ধরে উইলি ঠিকই, কিন্তু অস্ত্রটিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নেয় কার্লা। উইলি তখন সব লাইট নিভিয়ে দেয় এবং রুম থেকে দৌড়ে পালাতে পালাতে কার্লাকে বলে, ‘তুমি নিশ্চয়ই নিজের ভাইকে মারতে পারবে না।’ কিন্তু কার্লা সেটা ঠিকই পারে। উইলি যখন দরজা পেরিয়ে সেটিকে বন্ধ করে দেয়, অন্ধকারে গুলি চলে একটা; আর গুলিতে ছিদ্র হয়ে যাওয়া দরজায় পিনপয়েন্টের আলো দেখি আমরা। দরজাটি খুলে গেলে, কার্লার ভাইয়ের মৃতদেহের উপর আলো এসে পড়ে।

নিজের ভাইকে কার্লার নির্দ্বিধায় গুলি করে মেরে ফেলার যৌক্তিকতা নিয়ে কিছু সিনে-সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, কারও কারও মতে, এই মেয়েটির এই কাজটি স্পষ্টতই বিশ্বাসযোগ্য। কেননা, ফিল্মটির এ অংশে এসে, সর্বোপরি, নিজেদের মধ্যে ভালোবাসাবাসির সম্পর্কের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয় কার্লা ও স্টিফেন; নিজের পাপিষ্ঠ ভাইয়ের চেয়ে বরং স্টিফেনের প্রতিই অধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এই মেয়ে। তাছাড়া, কার্লার আচার-আচরণ লাংয়ের টিপিক্যাল নায়িকাদের মতোই। এই ফিল্মমেকারের বহু সিনেমাতেই নায়িকাকে দেখানো হয়েছে নিঃষ্পাপ ও ন্যায়পরতার প্রতিনিধি হিসেবে_ তা লাং যতই দুঃস্বপ্নময় কাহিনীই সিনেমাটিতে ফুটিয়ে তুলুন না কেন। এ প্রসঙ্গে এন্ড্রু স্যারিসের মন্তব্য, ‘সুন্দরী মেয়েদের নিখাঁদ ও বিশ্বস্ত প্রেমের মধ্যে’ জীবনের হিম-শীতল অন্তর্দর্শনকে ব্যতিক্রমভাবে সৃষ্টি করেছেন লাং; এ ক্ষেত্রে ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’-এ জোয়ান গ্রাহামের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বস্তুতপক্ষে লাংয়ের সিনেমাজুড়ে ‘খ্রিষ্টানধর্মীয় আত্মবিসর্জনের বৈশিষ্ট্য সহকারে রোমান্টিক প্রেমের’ প্রবাহ বিদ্যমান।

লাংয়ের জার্মান ও আমেরিকান সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্তর্নিহিত কন্টিউনিটি বা পরম্পরাকে জন রাসেল টেইলর উল্লেখ করেছেন এই ফিল্মমেকারের হলিউডি সিনেমাগুলোতে সাধারণত অগভীরভাবে থাকা তারই জার্মান সিনেমাগুলোর ছায়াকে বিবেচনায় নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, ‘মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’ আসলে মাবুজার দুঃস্বপ্নময় জগতের ছায়াই অনুসন্ধান করে। বস্তুতপক্ষে এই সিনেমাটিতে স্টিফেনকে নাৎসি এজেন্টদের অনুসরণ করার বিষয়টি মাবুজা ফিল্মগুলোতে মাবুজার এজেন্টদের কর্মকাণ্ডকে মনে করিয়ে দেয়।

দৃশ্য । দ্য ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো
দৃশ্য । দ্য ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো

নাৎসি-বিরোধী ফিল্ম নির্মাণের এ সময়কালে লাং কয়েকটি ক্রাইম মেলোড্রামাও বানিয়েছেন_ যেগুলো ‘মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার’-এর মতোই থ্রিলার ধারার একেকটি সেরা উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রথম সিনেমাটির নাম, ‘দ্য ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’। ফিল্মটির শুরুতে, ক্রিমিনাল সাইকোলোজির প্রফেসর রিচার্ড ওয়ানলি [এডওয়ার্ড জি. রবিনসন অভিনীত] নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের পাঠায় অবকাশযাপনে। এরপর সে নিজের কাবে গিয়ে ড্রিংক করে এবং একটি ইজি চেয়ারে বসে আরাম করে। ক্লাব স্টুয়ার্ডকে সে বলে দেয়, তাকে যেন রাত সাড়ে দশটায় ডেকে দেওয়া হয়, যেন সে তখন বাসায় ফিরতে পারে। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ে। আর তার কথামতো স্টুয়ার্ড তাকে ডেকে তোলার আগপর্যন্ত ঘুমিয়েই থাকে। ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার পথে, রাস্তার পাশের একটি আর্ট গ্যালারির জানালায় প্রদর্শিত হওয়া বিমুগ্ধকর এক তরুণীর পোর্ট্রেটের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। ছবিটির দিকে তার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সময়, এই পেইন্টিংটিতে পোজ দেওয়া তরুণীটিকে আচমকাই তার পেছনে দেখা যায়; আর এই প্রফেসর সেই তরুণীর প্রতিবিম্ব দেখতে পায় জানালায়। প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে এলিস রিড [জোয়ান বেনেট অভিনীত] নামের এই নারী; এবং নাইটক্যাপের জন্য নিজের অ্যাপার্টমেন্টে নিমন্ত্রণ জানায়। নারীটির নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রফেসর। তারা দুজন যখন সেই অ্যাপার্টমেন্টে একা, তখন নারীটির প্রেমিক, কোটিপতি হাওয়ার্ড ম্যাজার্ড তাদের দুজনকে চমকে দিয়ে হাজির হয় সেখানে। চরম ঈর্ষান্বিত হয়ে সে রিচার্ডের সঙ্গে মারামারি করতে উদ্যত হয়; আর হাতাহাতির এক পর্যায়ে, এলিসের বাড়িয়ে দেওয়া এক কাঁচি দিয়ে ম্যাজার্ডকে খুন করে ফেলে রিচার্ড। যদিও আত্মরা করতে গিয়ে ম্যাজার্ডকে মেরেছে রিচার্ড, তবু সে ভয় পায়_ নিশ্চয়ই কেউ তার এই যুক্তি বিশ্বাস করবে না। ফলে শহরতলির এক জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে, মৃতদেহটি লুকিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় সে। এরপর রিচার্ড ভয় পেতে থাকে, কেউ, বিশেষ করে তার নিজেরই ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নি বন্ধু [রেমন্ড ম্যাসি অভিনীত] নিশ্চয়ই এ অপরাধের জন্য তাকে সন্দেহ করবে। এ প্রসঙ্গে জিওফ্রে ও’ব্রায়ান মন্তব্য করেছেন, লাংয়ের সাসপেন্স সিনেমাগুলো অহরহই প্যারানয়ার সমতুল্য হয়ে উঠেছে : ‘ফাঁদে পড়ার ভয়, উপস্থিতির সন্দেহ ও চিরায়ত অবিশ্বাসের’ সমন্বয়ে। একইভাবে, নোরা স্যের লিখেছেন, “লাংয়ের [সিনেমার] খুব কম চরিত্র অন্যের উপর ভরসা রাখতে পারে… [চরিত্রগুলোর] এত এত প্রবঞ্চনার মধ্যে আস্থার উপস্থিতি বিরলই।”

অনিবার্যভাবে, ম্যাজার্ডের লাশ সেই জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া যায়; আর এরপর থেকে রিচার্ডের অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপ হতে থাকে। এলিস তাকে জানিয়ে দেয়, সে রাতে নিজের মনিবকে অনুসরণ করা ম্যাডার্জের দেহরী হেইট [ড্যান ডুরিয়ে অভিনীত] সবকিছুই জানে; এবং সে তাদের দুজনকেই ব্ল্যাকমেইল করতে উদগ্রীব। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে নিজেকে আর এলিসকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে হেইট_ এই ভয়ে এই অসম্ভব প্রতিকূল অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে আত্মহত্যাকেই বেছে নেয় রিচার্ড। অন্যদিকে, ইতোমধ্যেই নিজের মনিবকে হত্যার সন্দেহে পুলিশের জেরার মুখে পড়ার আশঙ্কায় নিজেকে পুলিশের কঠোর নজরদারিতে আবিষ্কার করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে হেইট। তাকে অনুসরণ করা পুলিশের উপর আক্রমণ করে বসে সে; এবং গোলাগুলির এক পর্যায়ে নিহত হয়। যা ঘটেছে তা জানতে পারে এলিস। ফোন করে রিচার্ডকে সে জানাতে চায়, তাদের ব্ল্যাকমেইলকারি শত্রু বা নেমেসিস এখন মৃত। সে সময়ে অবশ্য অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাওয়া ছিল রিচার্ড; ফলে তার লিভিংরুমে বাজা ফোনের রিং টের পায়নি সে। এ বেলা ক্যামেরা মুভ করে রিচার্ডের মুখের ক্লোজ-আপ শট ধারন করেন লাং; আর আমরা দেখি, আর্মচেয়ারে বসে পড়ে বেহুশ হয়ে যাচ্ছে রিচার্ড। এক মুহূর্ত পর, ক্যামেরা পুলব্যাক করে আমাদের দেখানো হয়, রিচার্ড আসলে ইজি চেয়ারে বসে আছে ঠিকই, তবে তা লিভিংরুমে নয়, বরং নিজের ক্লাবে। তার কাঁধের উপর ক্লাবের স্টুয়ার্ডের হাতের বিনীত স্পর্শ পড়ে_ তাকে জাগিয়ে দিতে, এবং বলতে_ সাড়ে দশটা বেজে গেছে। রিচার্ড সহসাই বুঝতে, তাকে এমন ভোগানো পুরো ঘটনাটাই আসলে ছিল এক দুঃস্বপ্ন মাত্র।

এক লোকেশন থেকে আরেক লোকেশনে, নিজের লিভিংরুমের ইজি চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়া থেকে ক্লাবের আর্মচেয়ারে ঘুমিয়ে থাকা রিচার্ডকে ধারন করা এই দৃশ্য লাং কোনো কাট ছাড়াই যেভাবে জাহির করেছেন, তা অনেক দর্শককে চমকে দিয়েছে। এর জবাবটি প্রবঞ্চকপূর্ণভাবে সাদামাটা : অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া রিচার্ডের একটি হেড শটের উপর ক্যামেরা ধরে রেখে, সেই লোকেশনেই তার ক্লাবের সেটিং স্থাপন করে ফেলেন সিনেমার ক্রুরা। তারপর ক্যামেরা পুল-ব্যাক করা হয়েছে; যেন মনে হয়, সেই প্রথমবার ঘুমিয়ে পড়ার পর, ক্লাবের বাইরে একদমই যায়নি রিচার্ড।

কাহিনীটি স্রেফ একটি বিশ্রী দুঃ স্বপ্নে ঘুরে দাঁড়ানোয় লাংয়ের সমালোচনা করেছেন বেশ কিছু সিনে-বোদ্ধা। তাদের মতে, ট্রাজিক এন্ডিং এড়িয়ে যেতে এ কৌশল নিয়েছিলেন ফিল্মমেকার। যেমন ধরুন, সমালোচক টনি থমাস এই এন্ডিংটিকে ‘খানিকটা অধপতন’_ এই টার্মে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, জন ম্যাকার্টি দাবী করেছেন, “ফিল্মটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে টের পাওয়া যায়, যে এন্ডিং লাং বেছে নিয়েছেন_ সেটি যথার্থই ছিল।” গভীরভাবে দেখলে এ কথা যথাযথভাবে যৌক্তিক মনে হয় যে, মধ্যবয়সী এক নিঃসঙ্গ পুরুষ, অনেক বেশি ড্রিংক করে ফেলার ফলে, পেইন্টিংয়ের মডেল হওয়া তার ‘স্বপ্নের নায়িকা’কে নিয়ে একটি প্রণয়মুখর রোমাঞ্চকর সুখ-স্বপ্ন দেখতেই পারে। তাছাড়া, রিচার্ড একজন ক্রিমিনাল সাইকোলজির প্রফেসর; ফলে তার স্বপ্ন খুনের মতো এক দুঃস্বপ্নে মোড় নেওয়াটা বিস্ময়ের কিছু নয়।

আমরা জানি, দর্শকদের অনেক সময়ই বিভ্রান্ত করে থাকে সিনেমা। ঠিক লাংয়ের এ সিনেমায় যেমন হয়েছে; হয়েছে ‘দ্য কেবিনেট অব ড. ক্যালিগরি’র ক্ষেত্রে। আমাদের মনে আছে, সেই ফিল্মটির [যদিও সেটির ডিরেক্টর তিনি নন] অবাক-করা এন্ডিংয়ের প্রস্তাব রেখেছিলেন লাং : ‘ক্যালিগরি’র এপিলগ প্রকাশ করে দেয়_ পুরো কাহিনীটিই ছিল এক বিকারগ্রস্তের হ্যালুসিনেশন। ‘দ্য কেবিনেট অব ড. ক্যালিগরি’ ও ‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’_ দুই সিনেমার চমক দেওয়া এন্ডিংই এতক্ষণ ধরে দেখে আসা কাহিনীর সত্যতা অস্বীকার করে : প্রথম ফিল্মটির ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে একটি হ্যালুসিনেশন; আর দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে এক দুঃস্বপ্ন। ‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’র এন্ডিং নিয়ে সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় লাং বলেছেন, “স্রেফ একটি মেয়ের সঙ্গে বাড়ি যাওয়ার মতো করা ভুলের কারণে কোনো মানুষ প্রথমে আরেকজন মানুষকে এবং এরপর নিজেকে মেরে ফেলুক_ এ রকম কোনো সিনেমাকে কোনো দর্শক কোনোভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ভাববে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না। এ কারণেই আমার মনে হয়েছিল, লোকটিকে এমনভাবে জাগিয়ে তোলা হোক, যেন সে আবিষ্কার করে_ এতক্ষণ নিজের ক্লাবের একটি আর্মচেয়ারে ঘুমিয়ে ছিল। ফলে কোনো হত্যাকাণ্ড আত্মহত্যাকে সত্য করে তোলে এই সিনেমাটি বানানোর চেয়ে বরং একটি ইতিবাচক আভাস দিয়ে কাহিনীটির সমাপ্তি টেনেছি আমি।”

আরেকবার কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’ একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার সাফল্য পেয়েছে; আর আমার পর্যবেক্ষণ মতে, ফিল্মটির যদি অন্য কোনো এন্ডিং রাখতাম, তাহলে এই সাফল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।” এ কারণেই হয়তো পরের সিনেমা ‘স্কারলেট স্ট্রিট’-এর একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হীম-শীতল পরিসমাপ্তি টানতে দ্বিধা করেননি লাং; এর কারণ অবশ্য আর কিছুই নয়, কাহিনীটি নিশ্চিতভাবেই একটি ট্রাজিক এন্ডিংয়ের দাবী রেখেছিল।

দৃশ্য । স্কারলেট স্ট্রিট
দৃশ্য । স্কারলেট স্ট্রিট

ফ্রান্সে জ্যঁ রেনোয়ার বানানো দুটি অরিজিনাল ফিল্মের রিম্যাক এ সময়ে হলিউডে করেন লাং। প্রথমটি ‘দ্য বিচ’-এর [La Chienne; ১৯৩১] রিমেক– ‘স্কারলেট স্ট্রিট’; দ্বিতীয়টি ‘দ্য হিউম্যান বিস্ট’-এর [La Bête Humaine; ১৯৩৮] রিমেক_ ‘হিউম্যান ডিজায়ার’। যেহেতু ‘হিউম্যান ডিজায়ার’ ফিল্মটি ঠিক ‘স্কারলেট স্ট্রিট’-এর মানের নয়, তাই পাঠক/দর্শক, চলুন ‘স্কারলেট স্ট্রিট’-এর দিকেই মন দেওয়া যাক। জন রাসেল টেইলর উল্লেখ করেছেন, ‘স্কারলেট স্ট্রিট’ সিনেমাটি লাংয়ের পূর্ববর্তী সিনেমা ‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’র সমতুল্য; তার মতে, দুটি সিনেমাই ‘বিকৃত ত্রিকোণী নাটকীয়তাকে [ধারণ করে আছে]_ যেখানে নিষ্পাপ এডওয়ার্ড জি. রবিনসন পড়েছেন জোয়ান বেনেটের বিশ্রী রমনী-মোহনীয় ফাঁদে।’

লাং জানিয়েছেন, রেনোয়ার ফিল্মটি তিনি দেখেছিলেন সেটির অরিজিনাল রিলিজের সময়, তবে একই কাহিনী নিয়ে বানানো নিজের ভার্সনে রেনোয়ার মডেল হিসেবে ব্যবহার করেননি তিনি; বরং তার চাওয়া ছিল ফিল্মটিকে অরিজিনাল সিনেমাটির মামুলি কোনো অনুকরণ না করে, বরং নিউ ইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজের প্রোপটে সেই কাহিনী নিয়েই নতুন একটি সিনেমা বানিয়ে তোলার। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যবয়সী ক্যাশিয়ার ও একজন অ্যামেচার পেইন্টার ক্রিস ক্রসের [এডওয়ার্ড জি. রবিনসন অভিনীত] এক রাতে বেলা কিটি মার্চ [জোয়ান বেনেট অভিনীত] নামের এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় লাংয়ের সিনেমাটি। কিটি আসলে যৌনকর্মী; যদিও ক্রিসের কাছে নিজেকে সে একজন মর্যাদাশীল যুবতী হিসেবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়। কিটির প্রতি মোহিত হয়ে পড়ে ক্রিস; আর তাকে এই নারী প্ররোচিত করে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে দেওয়ার জন্য_ যেখানে সে [কিটি] থাকতে পারবে, আর নিজের ঝগড়াটে স্ত্রী আদেলের নিরানন্দ সঙ্গ থেকে বেরিয়ে, পেইন্টিং করার জন্য এসে সময় কাটাতে পারবে ক্রিসও।

কিটির অবিরাম আর্থিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজের কোম্পানির ফান্ড থেকে টাকা সরাতে থাকে ক্রিম। এই চাহিদাগুলো প্রকৃত অর্থে আসতে থাকে কিটির কুমন্ত্রণাদায়ক জনির [ড্যান ডুরিয়ে] কাছ থেকে। এই সিনেমায় একাধিকবার ক্রিসকে নিজের কর্মক্ষেত্রে ক্যাশিয়ারের খাঁচায় দায়িত্ব পালন করতে দেখিয়েছেন লাং। সমালোচক টম কনলির দাবি, ক্রিসের এই শটগুলো এ কথাই স্পষ্ট করে যে, সে একজন ‘খাঁচাবন্দি ক্যাশিয়ার’, ‘এক অনন্ত বাধ্যগত জগতে’ তার বাস_ যেখানে কিটির প্রতি নিজের আচ্ছন্নতায় সে এমনই বন্দি_ যে বন্দিদশা থেকে মুক্তির কোনো উপায় জানা নেই তার।

প্রেক্ষাপট বিকাশের ফলে আমরা দেখি, আদেলে তার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে গেছে; আর ক্রিস বুঝতে পেরেছে_ এখন সে কিটিকে বিয়ে করার মতো স্বাধীন। এই সুসংবাদটি দিতে কিটির অ্যাপার্টমেন্টে ছুটে যায় সে। কিটির প্রেমে ক্রিস এতটাই বিভোর ছিল, বিয়ের প্রস্তাবে মুহূর্তেই সাড়া পেয়ে যাবে_ এমন আত্মবিশ্বাস ছিল তার। কিন্তু প্রস্তাবটি পেয়ে অবজ্ঞায় হেসে ওঠে কিটি। মুহূর্তেই বেদনাবিধুরভাবে ক্রিসের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, কিটি আসলে তার প্রেমিক জনিকেই ভালোবাসে; তাকে [ক্রিসকে] সে কোনোদিনও ভালোবাসেনি। কিটির প্রত্যাখানে ক্রিস ভীষণ রেগে গিয়ে, আইস বাকেট থেকে একটা আইস পিক এনে, সেটি দিয়ে নৃশংসভাবে বিদ্ধ করে মেরে ফেলে কিটিকে। তারপর মুহূর্তেই সেই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে, সবার অগোচরে পালিয়ে যায় সে।

এর কিছুক্ষণ পর জনিকে দেখা যায়_ মাতাল হয়ে চিৎকার করতে। কিটিকে সে আবিষ্কার করে মৃত। সে ধরে নেয়, মাতাল হয়ে অচেতনে সে নিজেই সম্ভবত কিটিকে মেরে ফেলেছে। কেননা, [তার বিবেচনায়] সেই অশনি রাতে এই মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে আসা একমাত্র মানুষ তো সে-ই। অবস্থানগত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, হত্যার দায়ে জনি দোষী সাব্যস্ত হলে ইলেকট্রিক চেয়ারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তার। পুরো ঘটনাটির সময় নিজের মুখ বন্ধ রাখে ক্রিস। কিটি ও জনি_ উভয়ের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্রিসের সম্পৃক্ততা তার নাম_ ক্রিসক্রসের একটি প্রতীকি মর্মার্থ হয়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, যার ডাবল-ক্রস বা প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছে, সেই মানুষের সঙ্গেই যখন কেউ প্রবঞ্চনা করতে শুরু করে, সেটিকে চলতি কথায় ‘ক্রিসক্রস’ নামে ডাকা হয়। এভাবে, কিটিকে হত্যা করে সেই দায়ে কিটির প্রেমিককে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করিয়ে, ক্রিস সেই দুটি মানুষের সঙ্গে ডাবল-ক্রস বা প্রবঞ্চনা করে_ যারা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। ক্রিসের এই প্রতিশোধ নেওয়াটি একটি ক্রিসক্রস হয়ে গিয়ে এভাবে এটি তার নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এরপর, কোম্পানি ফান্ড থেকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়লে চাকরিচ্যুত হয় ক্রিস; আর দিনে দিনে সে হয়ে ওঠে এক নিদারুণ ভবঘুরে। উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে সে শুনতে পায় কিটির কণ্ঠস্বর, ‘সে আমাদের সারাজীবনের জন্য একত্র করে দিয়েছে, জনি।’ ক্রিসের এই কিটির কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়াটা আমাদের জানান দেয়, কিটিকে নিজে খুন করে, সেই খুনের দায়ে জনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দিয়ে ক্রিস আসলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেই দুজনকে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে এক করে দিয়েছে_ এই উপলব্ধি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে ভোগাবে। সমালোচক ডোনাল্ড ফেল্পসের মতে, ‘কিটি ও জনি_ এই প্রেমিক যুগলের রাত্রীকালীন যন্ত্রণা সহ্য করে’ অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত করে ক্রিস; এর প্রতিক্রিয়ায় ‘ভূতগ্রস্ত লোকের মতো ক্রিসকে পরিত্যক্ত অঞ্চল বোয়ারিতে দেখা যায়।’

হেঁটে যেতে যেতে, ক্রিসের অবয়ব যত ছোট হয়ে আসে, হালকা হাওয়ায় তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীরা ফুটপাতে স্রেফ উধাও হয়ে যায়। এই ভিজ্যুয়াল মেটাফরটি লাং হাজির করেছেন প্রতীকিভাবে এই ইঙ্গিত দিতে যে, মানুষের জগত থেকে নিজেকে ক্রিস এতটাই সরিয়ে নিয়েছে_ পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের সম্পর্কে তার কোনো ভাবান্তর নেই। অন্যভাবে বললে, অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে ক্রিসের এই বিচ্ছিন্ন করে নেওয়াটা বস্তুতপক্ষে নিজের অপরাধের শান্তি নিজেকে এক নৈঃসঙ্গের মধ্যে বন্দি করে দেওয়ারই নামান্তর।

লাং জানতেন, যে অপরাধটি ক্রিস করেছে, সেটির শাস্তি হিসেবে জনির মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দেখানো সম্পর্কে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সেন্সর বোর্ড আপত্তি তুলতে পারে_ এই আশঙ্কা স্টুডিও কর্তৃপক্ষকে ভোগাবে। লাং বলেছিলেন, সেন্সর বোর্ডকে তিনি এই বলে বুঝিয়েছিলেন, ‘জেলে গেলে যে শাস্তি পেত, বেঁচে থেকে তার চেয়েও বেশি শাস্তি পাচ্ছে ক্রিস। ফিল্মটির শেষাংশে, সে একেবারেই বিপর্যস্ত অবস্থায় পৌঁছেছে।’ লাং আরও বলেন, যেহেতু তিনি একজন ক্যাথলিক হিসেবে বড় হয়েছেন, ফলে নিজে গভীরভাবেই বিশ্বাস করেন, মানসিক অশান্তিই একজন অপরাধীর জন্য বড় শাস্তি; ঠিক যেমনটা ক্রিস এ সিনেমায় পেয়েছে। তাছাড়া, জনির শাস্তি পাওয়াটা অন্যায্য ছিল_ এমন অভিযোগ কোনো সিনে-সমালোচকই তোলেননি। সমালোচকেরা সম্ভবত ধরে নিয়েছিলেন, কিটিকে দিয়ে ক্রিসের সব টাকা লুটে নেওয়া ও ক্রিসের জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ভীষণ জঘণ্য কলকাঠিটি জনিই নাড়িয়েছে।

ফিল্মটিতে থাকা অনেকগুলো চমৎকার উপাদানের মধ্যে একটিকে এড়িয়ে যাওয়া কিছুতেই ঠিক হবে না; আর তা হলো, পুরো ফিল্মে ‘মেলানকলি বেবি’ মানের স্ট্যান্ডার্ড রোমান্টিক ব্যালেডের যে নিপুণ ব্যবহার করেছেন লাং, সেটি। এ প্রসঙ্গে সমালোচক রিচার্ড ইয়ংগার লিখেছেন, “ওপেনিং ক্রেডিটে, জীবন ক্রিসকে কোন জাহান্নামে নিয়ে ঠেকাবে_ তার কোনো ইঙ্গিত না দেওয়া এই গানটির উচ্ছ্বাসমুখর ব্যবহার থেকে শুরু করে, শেষ দৃশ্যে বজ্রের মতো ব্যবহার পর্যন্ত_ ফিল্মটিতে গানটির অনেকগুলো ভার্সন শুনেছি আমরা; আর একেকটি ভার্সন একেকটির চেয়ে অধিকতর আবেগমাখা।… গানটির শিরোনামই একটা অবশ্যম্ভাবী বিষণ্ন মেজাজের আবহ ঘটাতে সক্ষম।”

লাংয়ের ‘স্কারলেট স্ট্রিট’-এর নৈরাশ্যবাদী এন্ডিংটি রেনোয়ার ‘দ্য বিচ’-এর অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক এন্ডিংয়ের চেয়ে একেবারেই আলাদা। রেনোয়ার ফিল্মটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মরিস নিজের জীবনকে একেবারেই ধ্বংস করে দেওয়া যুগলটির উপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ঠিক ক্রিসের মতো বিশেষ কোনো ঝামেলায় পড়েনি। তাছাড়া, ক্যাশিয়ার থাকার চেয়ে, বরং এমন বেকুব হয়ে জীবনকে দৃশ্যতই উপভোগ করেছে সে। অনেক সিনে-বোদ্ধার মতে, লাংয়ের সিনেমার এন্ডিংটি রেনোয়ার ফিল্মটির এন্ডিংয়ের চেয়ে অধিক ভাবনা-জাগানিয়া ও শক্তিধর; আর এটি হয়ে উঠেছে সকল আমেরিকান সিনেমার মধ্যে একটি মোশন পিকচারের সবচেয়ে বেদনাবিধুর ট্রাজিক এন্ডিংয়ের মধ্যে অন্যতম সেরা। নিজের বানানো জার্মান সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘এম’কে যেমন সবচেয়ে প্রিয় হিসেবে গণ্য করতেন লাং, তেমনই ‘স্কারলেট স্ট্রিট’ ছিল তার বানানো আমেরিকান সিনেমাগুলোর মধ্যে নিজের কাছে সবচেয়ে আদুরে। দুটি সিনেমাকেই তিনি বর্ণনা করেছেন, “ঠিক যেভাবে বানাতে চেয়েছি, যেন এগুলোতে পরা [আমার] সকল স্পর্শ সঠিক হয়ে, এগুলো হয়ে উঠেছে যথার্থই।”

দৃশ্য । র‍্যাঞ্চো নটোরিয়াস
দৃশ্য । র‍্যাঞ্চো নটোরিয়াস

এরপর ‘সিক্রেট বিয়ন্ড দ্য ডোর’ ও ‘হাউস বাই দ্য রিভার’ নামে দুটি রুটিন থ্রিলার বানিয়ে, অবশেষে তিনি নির্মাণ করেন বিখ্যাত ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ সিনেমাটি। এই শেষোক্ত সিনেমাটির অভিনেত্রী মারলিনা ডিট্রিশ ছিলেন লাংয়ের মতোই_ হলিউডে কাজ করা একজন বিখ্যাত জার্মান-নির্বাসিত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ফিল্মের জগতে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। ফলে আর কখনোই সিনেমায় এক সঙ্গে কাজ করা হয়নি তাদের। ডিট্রিশ জানতেন, নিজের কাস্ট ও ক্রু নিজেই ঠিক করে নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন কঠোর মানুষ হিসেবে নামডাক ছিল লাংয়ের। ‘নিজের পছন্দের যে কারও বিরুদ্ধাচারণ করতেন তিনি [ডিট্রিশ]’ _মায়ের জীবনীগ্রন্থে এমনটাই লিখেছেন ডিট্রিশের মেয়ে মারিয়া রিভা। আর ডিট্রিশ বলেছেন, “‘এম’-এর মতো আতঙ্কজাগানিয়া সিনেমাগুলো যে তিনি [লাং] বানিয়েছেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।” তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এ রকম ফিল্মগুলোতে যে রকম আতঙ্কজাগানিয়া ব্যক্তিদের দেখানো হয়েছে, লাং নিজেও সত্যিকার অর্থে সে রকমই ছিলেন! আর নিজের ভবিষ্যতের ফিল্মমেকারদের সম্পর্কে এ কথা বলে ইতি টেনেছেন তিনি_ ‘আর কোনো জার্মান’ ফিল্মমেকারের সঙ্গে কাজই করবেন না!

‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ আসলে লাংয়ের বানানো ওয়েস্টার্ন ট্রিলজির তৃতীয় সিনেমা। এই ট্রিলজির সবগুলো সিনেমাই রঙিন। অন্য দুটির প্রথমটি ‘দ্য রিটার্ন অব ফ্র্যাঙ্ক জেমস’_ জেস জেমসের ভাই ও প্রাক্তন বিদ্রোহী হিসেবে গোঁয়ারের মতো অগ্রসরমান ফ্রাঙ্ক জেমসকে নিয়ে; আর দ্বিতীয়টি ‘ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন’_ ওয়েস্ট বা পাশ্চাত্যের আত্মর্জাতিক টেলিগ্রাফের বিস্তার নিয়ে এর কাহিনী। এই তিনটি সিনেমার মধ্যে ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ই সবচেয়ে অর্থবহ; কেননা, এখানে ‘নিবেলুং সাগা’র দ্বিতীয় পর্ব_ “ক্রিমহাইল্ড’স রিভেঞ্জ”-এ দেখা পাওয়া রিভেঞ্জ বা প্রতিশোধের এনাটমির একটি গভীরতর অন্বেষণ ঘটানো হয়েছে। ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’কে সমালোচক ডেভিড থমসন বৈশিষ্ট্যায়ন করেছেন, ‘যে থিমটিকে লাং চল্লিশ বছর ধরে ধারণ করে আসছেন_ সেই প্রতিহিংসার চাদরে নিজের প্রয়োজনে মুড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিমানুষের একটি প্রতিকৃতি’ হিসেবে।

‘স্কারলেট স্ট্রিট’-এর মতো ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’-এও একটি থিম সং ব্যবহার করেছেন লাং। তবে এ বেলা গানটি হয়ে উঠেছে আরও অর্থপূর্ণ। ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ হলো সিনেমার জন্য বিশেষভাবে কম্পোজ করে, সিনেমায় টাইটেল সং ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ড্রামাটিক ফিল্মগুলোর মধ্যে একেবারেই প্রথমদিকের ফিল্মগুলোর অন্যতম। ফিল্মটির ওপেনিং ক্রেডিট থেকে শুরু করে, এর পরতে পরতে ব্যবহৃত হয়ে, একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত নানাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে গানটিকে। ফিল্মটির এই গানের শিরোনাম রাখা হয়, ‘চাক-অ্যা-লাক’; মূলত পাশ্চাত্যে জুয়ার আসরের বিশেষ চেয়ারের চাকার নাম থেকে এই নামটির আসা। গানটি শুরু হয় এভাবে :
“Listen to the legend of Chuck-a-Luck…
It spins the old, old story of hate, murder, and revenge”

প্লটের একেবারে শুরু থেকেই ‘ঘৃণা, খুন ও প্রতিশোধের’ একটি কাহিনী হয়ে ওঠে রেঞ্চো নটোরিয়াস। ভার্ন হাস্কেল [আর্থার কেনেডি অভিনীত] নামের এক ভদ্র ও সম্মানিত রাখাল তার বাগদত্তা বেথের সঙ্গে দেখা করতে যায়_ যে কিনা ওয়াইয়োমিংয়ের একটি ছোট্ট শহরে নিজের বাবার মুদি দোকানে কাজ করে। সেখানে গিয়ে বাগদত্তাকে একটি অলংকারের ব্রোচ দেয় ভার্ন। সে যখন দোকান থেকে চলে আসে, তখন সেখানে ঢোকে কিঞ্চ নামের এক বেপরোয়া লোক। দোকানের ভেতর থেকে ভেসে আসা আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দে, বাইরে এক্কাদোক্কা খেলারত এক বালকের লাফিয়ে ওঠা দিয়ে শটটি কাট করেছেন লাং। তারপর কিঞ্চকে দৌড়ে বের হয়ে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে আমরা বুঝতে পারি, বেথকে ধর্ষণ ও হত্যা করে, ভার্নের দেওয়া ব্রোচটি নিয়ে পালিয়েছে সে। ‘এম’-এ এলজি বেকমানের নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মতো, এই সিনেমাও বেথকে ধর্ষণ ও হত্যা করার দৃশ্য দর্শকের সামনে সরাসরি হাজির করেননি লাং। বরং, আরও একবার এ বিষয়টি দর্শকের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন, যেন, দোকানের ভেতর ঠিক কী হয়েছে_ তা তারা নিজের মতো কল্পনা করে নেয়। আর এভাবে ব্যাপারটি হয়ে উঠেছে আরও আতঙ্কজাগানিয়া।

এই ঘৃণ্য কাজটি যে করেছে, সেই দস্যুকে খুঁজে বের করে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয় ভার্ন। যখনই সে আইন নিজের হাতে তোলার এবং বাগদত্তার খুনির উপর ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তার আর ফেরার পথ থাকে না। নিজেকে বেআইনি জীবনে জড়িয়ে ফেলে সে। নিজের অনুসন্ধানে নানা রাখালের কাছ থেকে ভার্ন জানতে পারে, ‘চাক-অ্যা-লাক’ নামের এক খামারে থাকে এই অপরাধী। আর সেই খামারটির মালিক অ্যাল্টার কিন [মারলিনা ডিট্রিশ অভিনীত] নামের প্রাক্তন এক ড্যান্স-হল-কুইন। ভার্ন আরও জানতে পারে, অ্যাল্টারের বর্তমান সঙ্গী ফ্রেঞ্চি ফেয়ারমাউন্ট [মেল ফেরার অভিনীত] নামের এক দস্যু-শিরোমণি। ফলে ফ্রেঞ্চির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে ভার্ন।

এ সময়ে ভার্নকে অ্যাল্টার কিনের সেই খামারটিতে নিয়ে যায় ফ্রেঞ্চি_ অনেক দাগী অপরাধীর লুকিয়ে থাকার যেটি অভয়াশ্রম। অবশেষে, এই দুই ‘বন্ধু’ ‘চাক-অ্যা-লাক’-এ থাকতে শুরু করে। ভার্নের ধারণা, বেথের খুনি কখনো-না-কখনো এখানে আসবে। অ্যাল্টারের খোঁপায় বেথের সেই ব্রোচটি দেখতে পেয়ে, ভার্নের ধারণা সত্যে পরিণত হয়। চাতুরি করে সে জেনে নেয়, অ্যাল্টারকে এটি কিঞ্চ দিয়েছে। ফলে ভার্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছে, প্রথম সুযোগেই কিঞ্চকে মেরে ফেলবে সে। কিঞ্চের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার একমাত্র লে ভার্ন যখন অগ্রসরমান, তখন সে মানুষ হিসেবে হয়ে ওঠে ঠাণ্ডা মাথার এক বেপরোয়া লোক। এক কথায়, সে পর্যবসিত হয় সেই হীন-মানুষদের কাতারে_ যাদেরকে নিজে ঘৃণা করে এসেছে এতকাল।

কিঞ্চ যখন জানতে পারে, ভার্নের কাছে সত্য ফাঁস করে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে অ্যাল্টার, তখন সে নিজের গুণ্ডাবাহিনী নিয়ে খামারে পৌঁছে_ অ্যাল্টারের উপর প্রতিশোধ নিতে। এই শোডাউন দেখতে পেয়ে, কিঞ্চ ও তার গুণ্ডাবাহিনীর উপর গুলি চালায় ভার্ন ও ফ্রেঞ্চি। ফ্রেঞ্চির হাতে খুন হয় কিঞ্চ; কিন্তু ফ্রেঞ্চির দিকে ছুটে আসা একটি গুলি থেকে, ফ্রেঞ্চিকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হয়ে যায় অ্যাল্টার। ডিট্রিশের করা অ্যাল্টার কিন চরিত্রটিকে জন বাক্সটার বর্ণনা করেছেন, ভার্ন হাস্কেল চরিত্রের “তরুণ আর্থার কেনেডির অতুলনীয় মোহমুগ্ধতার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলার আগপর্যন্ত, ‘চাক-অ্যা-লাক’-এর আত্মগোপনে থাকা অপরাধীদের ভীড়ে টাইট ট্রাউজার পরা এক সত্যিকারের রানী” হিসেবে। আসলে, ফ্রেঞ্চির প্রতি মোহমুগ্ধ ছিল অ্যাল্টার; আর সে কারণেই তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ দিয়েছে। অ্যাল্টার কিনকে লাং আমাদের সামনে হাজির করেছেন এমন এক ছায়াসঙ্গী নারী হিসেবে_ ভালোবাসার মানুষের জন্য শেষ পর্যন্ত আত্মবিসর্জন করেছে যে। ‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’ ও ‘স্কারলেট স্ট্রিট’ ফিল্ম দুটিতেই এডওয়ার্ড জি. রবিনসন অভিনীত চরিত্রটির জীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনা জোয়ান বেনেট অভিনীত নারী চরিত্রের মোহিনী প্রতিকৃতির তুলনায় অ্যাল্টার চরিত্রটি একদমই বিপরীত।

ফাইনাল ফেড-আউটের মধ্য দিয়ে ফ্রেঞ্চির সঙ্গে ভার্ন বেরিয়ে যায় তার অপরাধজীবন অব্যাহত রাখতে_ ফিল্মটি এই এন্ডিংকে রিচার্ড আর্মার চিহ্নিত করেছেন, প্রতিহিংসার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে না পারায়, সহিংস জীবনে নিজেকে ভার্নের সঁপে দেওয়া হিসেবে। আর তাই ফাইনাল সিক্যুয়েন্সে তুখোড় অপরাধী হিসেবে আবিষ্কার করা লোকটিকে ‘ওপেনিং সিক্যুয়েন্সে নিষ্পাপ হিসেবে আবিষ্কার করার মানে নেই’। এভাবেই, ‘ঘৃণা, খুন ও প্রতিশোধের’ একটি কাহিনী হিসেবে থিম সংটিকে বৈশিষ্ট্যায়িত করে শেষ হয় ফিল্মটি।

এই ফিল্ম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অ্যান্ডি কেইন অভিযোগ তোলেন, ‘এটির অনেকগুলো এক্সটারিয়রই ইচ্ছেকৃতভাবে থিয়েট্রিক্যাল’। স্টুডিও কর্তৃপক্ষ রায় দিয়েছিল, ফিল্মটির শুটিং মূলত স্টুডিওতেই হবে; এটিকে একটি অকৃত্রিম ওয়েস্টার্ন আবহ দিতে সক্ষম হবে_ এমন এক্সটেনসিভ লোকেশনে শুটিং করার সুবিধা দেওয়া হবে না একে। তবু লাং দাবি তোলেন, নিজের সমকালীন ক্রাইম মেলোড্রামা ফিল্মগুলোকে যেমন বাস্তববাদী করে তুলেছিলেন, ওয়েস্টার্নগুলোকে সেই আদলে কিছুতেই দেখাতে চাননি তিনি। তা সত্ত্বেও, ওয়াইয়োমিংয়ের ফ্যাগস্টাফে, কয়েকজন লোকের কাছ থেকে, নিজের ওয়েস্টার্ন ফিল্মগুলোর এমন বাস্তববাদী অবয়বের জন্য একদা একটি চিঠি পেয়েছিলেন লাং। ‘ওল্ড ওয়েস্টার্ন’কে তারা যেভাবে মনে রেখেছে, ঠিক তেমনভাবে সিনেমায় ধারণ করতে পেরেছেন একজন ইউরোপিয়ান ফিল্মমেকার_ এ বিষয়টি যে তাদের চমকে দিয়েছে, চিঠিতে সে কথা লিখতে ভোলেননি তারা। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে লাং বলেছেন, “এর জবাব খুব সিম্পল। নিজের সিনেমায় আমি যে ওল্ড ওয়েস্টকে দেখিয়েছি, এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে হয়নি_ এর কোনো অস্তিত্ব ছিল। ওল্ড ওয়েস্টের যে কিংবদন্তি এখানে রয়েছে, সেটি ‘দ্য নিবেলুংস’-এ আমি যেমনটা ফুটিয়ে তুলেছিলাম, সেই জার্মান মিথেরই একটা আমেরিকান অনুরূপ।”

সুতরাং, লাংয়ের রিটার্ন অব ফ্র্যাঙ্ক জেমস-এ ফ্র্যাঙ্ক জেমসের মতো কিংবদন্তি ওয়েস্টার্ন ফোক হিরো এবং জিগফ্রিডের মতো মিথোলজিক্যাল জার্মান হিরোদের মধ্যে একটি জোরালো সাদৃশ্য রয়েছে। [রেঞ্চো নটোরিয়াস-এ প্রতিহিংসার তৃষ্ণায় দূষিত হয়ে পড়ার আগপর্যন্ত ভার্নের মধ্যে একজন ওয়েস্টার্ন হিরোর গুণাবলি যথার্থই ছিল।] লাং বলেছেন, “যেকোনো জাতীয়তার একজন ফিল্মমেকারের পক্ষে আমরা যেটিকে ওল্ড ওয়েস্ট বলে গণ্য করি, সেই কিংবদন্তিকে বড় পর্দায় সৃষ্টি করা সম্ভব_ যদি সেটি এমন হয়ে ওঠে, যেটিকে মানুষ তাদের কল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাববে। আমাকে চিঠি লেখা ভদ্রলোকদের যে বিষয়টি সম্ভবত মুগ্ধ করেছে বলে আমার ধারণা, তা হলো, আমার ওয়েস্টার্নগুলোতে আমি খানিকটা রিয়েলিস্টিক স্পর্শ দিয়েছি; যেমন, একজন কাউবয় নিজের ঘোড়ার পিঠে চাপড় দিয়ে সেটিকে আশ্বস্ত করে, কিংবা, একজন কাউবয় গোলাগুলিতে যোগ দেওয়ার আগে নিজের আঙুলগুলো নরম করে_ এগুলো নমনীয় আছে কিনা পরখ করতে। বাস্তব কাউবয়েরা কিন্তু এমনটাই করে থাকে।” এক কথায় বললে, ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ হলো অ্যাকশনে ভরপুর এমন এক ওয়েস্টার্ন সিনেমা_ যেটি দর্শকের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে সফল হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ডেভিড থমসন এটিকে লাংয়ের ক্যারিয়ারের শেষ-অধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে গণ্য করেন।

দৃশ্য । দ্য বিগ হিট
দৃশ্য । দ্য বিগ হিট

যে বছর ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’ মুক্তি পায়, সেই ১৯৫২ সালে বেশ কয়েক মাস বেকার থাকেন লাং। তিনি বুঝতে পারেন, হলিউডে তাকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়েছে; কেননা, আমেরিকায় তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে সন্দেহ করছে কেউ কেউ। সেটি ছিল কোল্ড ওয়ারের উত্থানকাল। সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির কমিউনিস্ট তল্লাশি আর হাউস আন-আমেরিকান অ্যাকটিভিটিজ কমিটির [এইচইউএসি] শুনানির সেই দিনগুলোতে হলিউডের আবহ ছিল থমথমে। নিজের বিপক্ষে যখন সন্দেহের এমন বিষাক্ত বাতাস, সে সময়কে লাং বর্ণনা করেছেন, “১৯৩৪ সালে যখন দেশটিতে [আমেরিকায়] এলাম, তখন আমাকে বেশ কয়েকটি নাৎসি-বিরোধী সংস্থায় যোগ দিতে বলা হয়েছিল। একটাতে যোগ দিয়েছিলামও আসি। সেই সংস্থাটির চিঠির উপরে আমি ঔপন্যাসিক টমাস মান ও আরও কয়েকজন বিশিষ্ট জার্মানের নাম দেখলাম। ফলে সদস্যদের তালিকায় নিজের নামটি স্বার করলাম আমিও। বছর কয়েক যেতেই, এইচইউএসি এটিকে একটি প্রো-কমিউনিস্ট সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করল; আর আমি এর সদস্য হওয়ায় আমাকেও করা হলো ব্ল্যাকলিস্টেড। কিন্তু কোনোদিনই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলাম না আমি; যদিও আমার কয়েকজন বন্ধু তা ছিলেন। সম্ভবত আমেরিকান লিজন থেকে গিয়ে কেউ স্টুডিও কর্তৃপকে বলেছে, ‘লাং যে কমিউনিস্ট_ এ ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই আমাদের হাতে; তবে আমরা জানতে পেরেছি, ওর কয়েকজন বন্ধু [কমিউনিস্ট পার্টি] করে। তাই আমাদের প্রস্তাব হলো, ওকে আর কোনো সিনেমা বানাতে দেওয়ার আগে ওর উপর তদন্ত করে নিন।’ স্টুডিও কর্তৃপক্ষ বা ফ্রন্ট অফিস আসলে কারও উপর তদন্ত করে না। তাই সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল, স্রেফ তাকে আর কোনো কাজ না দেওয়া। ফলে এক বছরের বেশি সময় আমি কোনো কাজই পাইনি। অবশেষে ‘কলম্বিয়া’র [স্টুডিও] টপ এক্সিকিউটিভ হ্যারি কোন আমাকে বললেন, ‘ফ্রিৎস্, তুমি যে একজন রেড [কমিউনিস্ট], এ কথায় কোনো সত্যতা আছে?’ আমি বললাম, ‘সম্মানের সঙ্গে জানাচ্ছি, নেই।’ কোনের সহযোগিতায় আবারও সিনেমা বানাতে সক্ষম হলাম। বস্তুতপক্ষে কোনই আমাকে ‘দ্য বিগ হিট’ বানাতে বলেন।”

লাং বলেছেন, ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’-এর থিম সংটি চাইলে খুব সহজেই ‘দ্য বিগ হিট’-এ ব্যবহার করা যেত; কেননা, এটিও ‘ঘৃণা, খুন ও প্রতিশোধের’ একটি কাহিনী। ফিল্মটির ওপেনিং ইমেজে আমরা দেখি, ডেস্কের উপর একটি রিভলভার পড়ে আছে। ফ্রেমের মধ্যে একটি হাত ঢুকে পড়ে, এবং রিভলভারটি উঠিয়ে নেয়। অফস্ক্রিনে একটা গুলির শব্দ শুনতে পাই আমরা। তারপর ডেস্কের উপর আত্মহননকারী শরীরটি ঢলে পড়তে দেখি। ফিল্মটির ওপেনিং শটকে কলিন ম্যাকআর্থার চিহ্নিত করেছেন ফিল্মটিতে দেখানো গ্যাংস্টারদের ভায়োলেন্সকে দেখাতে ‘সিনেমার সবচেয়ে কঠিন’ ও ‘সবচেয়ে যথাযোথ্য এক প্রকাশমুখর’ শট হিসেবে।

ডেস্কের উপর ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নির উদ্দেশ্যে লেখা একটি খামবন্দি চিঠিও পড়ে ছিল। সেটির পাশে ছিল একটি পুলিশ সার্জেন্টের ব্যাজ। আমরা শিগগিরই জেনে যাই, চেন্ডলারটাউন শহরটিতে রাজত্ব করা মাইক ল্যাগানা [আলেক্সান্ডার স্কুরবাই অভিনীত] নামের জনৈক মাবুজাধর্মী মাস্টার ক্রিমিনালের সহযোগী হিসেবে কাজ করার স্বীকারোক্তি এই চিঠিটিতে লিখে গেছে সার্জেন্ট টম ডানকান। এই চিঠির সাহায্যে ল্যাগানাকে ব্ল্যাকমেইল করার পরিকল্পনা করে টমের বিধবা স্ত্রী বার্থা [জেনেট নোল্যান অভিনীত]। ফলে এটি উদ্ধার করার পর পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে বরং নিজের কাছে লুকিয়ে রাখে সে।

ডানকানের আত্মহত্যার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশ সার্জেন্ট ডেভ বেনিয়ন [গ্লেন ফোর্ড অভিনীত] তদন্ত করে বের করে, ল্যাগানার সঙ্গে নিহত এই পুলিশের সম্পৃক্ততার কথা। ল্যাগানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তার বিলাসবহুল অট্টালিকায় ডেভ গেলে, সামান্য এক পুলিশ তাকে নিজের বাসায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছে_ এই অহংবোধ থেকে ক্ষেপে ওঠে সে। পরের সন্ধ্যায় ডেভের স্ত্রী কেট [জসলিন ব্র্যান্ডো অভিনীত] তাদের পারিবারিক গাড়ির দিকে পা বাড়ালে, সেটিতে ঘটা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়। নিঃসন্দেহে, এই বোমাটি স্থাপন করেছিল ল্যাগুনার গুণ্ডাবাহিনী, আর তা ডেভের প্রতি ছিল একটি জবাব।

পরের দিন ডেভকে পুলিশ কমিশনার হিগিংন্স নির্দেশ দেয়, ডানকান-আত্মহননের তদন্ত থামিয়ে দিতে। কেননা, সে চায়নি, ল্যাগানার সঙ্গে ডানকান, অর্থাৎ কোনো পুলিশের মর্যাদাহানীকর আঁতাতের কথা আমজনতা জানতে পারুক। তদন্ত থামাতে অস্বীকার করে ডেভ। ফলে পুলিশ বিভাগ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয় তাকে। ক্ষুব্ধ ডেভ নিজের পুলিশের ব্যাজটি খুলে ফেলে ঠিকই, কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রটি জমা দিতে অস্বীকার করে। সে জানায়, ‘এই গানটি আমার’। ডেভ এরপর স্বঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের স্ত্রীহত্যার তদন্তভার কাঁধে তুলে নেয়। কেননা, চাকরিচ্যুতির ফলে একজন অফিসার হিসেবে কাজটি করার আইনগত অধিকার তার আর নেই। ডেভের বন্ধু, আরেক পুলিশ অফিসার ডেভকে ধর্মযাজকের উপদেশ নেওয়ার পরামর্শ দেয়। ডেভকে সে বলে, ‘তোমার জীবনে নরক নেমে এসেছে’। ঠিক এই মুহূর্ত থেকে, প্রতিশোধের একটি কাহিনী হিসেবে, এই ফিল্মের থিমটি ‘রেঞ্চো নটোরিয়াস’-এর স্পষ্ট সমান্তরাল হয়ে ওঠে।

কাহিনী যত এগিয়ে যায়, আমরা দেখি, ল্যাগানার ডানহাত হিসেবে পরিচিত ভিন্স স্টোনের [লি মারভিন অভিনীত] রক্ষিতা_ ডেবি মার্শের [গ্লোরিয়া গ্রাহাম অভিনীত] আস্থা অর্জন করে নেয় ডেভ। ল্যাগানার গুণ্ডাবাহিনীর এক সদস্য ভিন্সকে জানিয়ে দেয়, একটি পানশালায় ডেবিকে ডেভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছে সে। ভিন্স এরপর রেগে গিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করে ডেবিকে। এই পাশবিক লোকটি এক পর্যায়ে ডেবির মুখে এক পট গরম কফি ছুঁড়ে মারে। এর ফলে এই নারীর মুখের একটা দিক ভয়ানকভাবে পুড়ে যায়। এই সিক্যুয়েন্সটিকে অ্যান্ডি ক্লেইন চিহ্নিত করেছেন ‘সিনেমার ইতিহাসের [সবচেয়ে] ভায়োলেন্ট দৃশ্যগুলোর’ একটি হিসেবে। তবে, স্বভাবতই, লাংয়ের ভায়োলেন্স ব্যবহারের একটি যৌক্তিক কারণ ছিল। এ ক্ষেত্রে, ডেবির বিকৃত মুখকে তিনি মানব-স্বভাবের দ্বিমুখিতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন; অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভালো ও মন্দ_ দুটি দিকের প্রতি অনুরাগ রয়েছে। তার মানে, ডেবির মুখের একটা দিক সুন্দর, আর আরেকটা দিক ভৌতিক_ এই বিষয়টি ভালো ও মন্দ_ উভয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করতে তার সক্ষমতা জানান দেয়। সমালোচক ম্যাকআর্থারের পর্যবেক্ষণ মতে, এভাবে আক্ষরিক ও আলঙ্কারিক_ উভয় বিবেচনায় ডেবি হয়ে ওঠে একজন ‘দু-মুখো’ নারী : একদিকে সে ভালো মানুষ, কেননা, সে বুঝতে পেরেছিল_ ডেভ একজন সম্ভ্রান্ত লোক, আর তাই ল্যাগানা ও তার গুণ্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই লোকটিকে সাহায্য করাটা জরুরি মনে করেছিল সে; অন্যদিকে, ‘স্টোন ও ল্যাগানার সঙ্গে তার অতীত সহযোগিতার কারণে… সে নৈতিকভাবে কলঙ্কিত’।

এই দৃশ্যটির শুটিংয়ের সময় একটি ইন্টারেস্টিং ফুটনোট দিয়েছিলেন লাং। এ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন, “আপনি কারও দিকে কফি ছুড়ে মারলে, সেই দাগটি চিরস্থায়ী হবে না_ এ কথাটা আমি ভালোভাবেই জানতাম। তাই এপিসোডটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে, কফির পটটি ভিন্স হাতে তুলে নেওয়ার আগে, গরম প্লেটে কফি বলকানোর একট শট ঢুকালাম। ফলে ডেবির ক্ষেত্রে ঘটা বিষয়টি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠল।”

ডেভ এরপর ডেবির কাছে স্বীকার করে, ল্যাগানাকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশে মৃত স্বামীর সুইসাইড নোটটি নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে_ এ কথা জোর করে স্বীকার করাতে গিয়ে বার্থা ডানকানকে শ্বাসরোধ করে প্রায় মেরে ফেলার উপক্রম করেছিল সে। ডেবি জবাব দেয়, ‘কাজটা তুমি করতে পারনি; যদি পারতে, তাহলে তোমার আর ভিন্স স্টোনের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকত না’। ঘটনা হলো, ভিন্স স্টোনের মতো গুণ্ডাপ্রকৃতির লোক আসলেই ডেভ ছিল না। সে তখনো একজন ভীষণ ভদ্রলোক, এবং রেঞ্চো ‘নটোরিয়াস’-এ স্ত্রীহত্যার প্রতিশোধ নিতে আসা ভার্ন হাস্কেলের মতো কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় সে। এক কথায় বললে, যে গুণ্ডামিকে নিজে ঘৃণা করত, তাতেই নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছিল ভার্ন; অথচ, নিজে ঘৃণা করে_ এমন কোনো ঘৃণিত ব্যক্তিত্বে নিজেকে রূপান্তরিত করেনি ডেভ। খারাপ কিছু করার মতার চেয়ে বরং ভালো কিছু করার বৈশিষ্ট্য তখনো ডেভের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান ছিল।

নিজের প্রতি ভিন্সের নিষ্ঠুরতার প্রতিক্রিয়ায় ভিন্স ও ভিন্সের বস ল্যাগানার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, বিষয়টি নিজের হাতে তুলে নেয় ডেবি। ল্যাগানার ক্রাইম সিন্ডিকেটের অনেক তথ্য-প্রমাণ ধারণ করা চিঠিটি বার্থা ডানকানের কাছ থেকে নিজের কবজায় নিতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে সে, যেন নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও সেটিকে ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নির হাতে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে বার্থাকে মেরে ফেলে ডেবি; যেন টম ডানকানের লেখা চিঠিটি আপনাআপনি ডিসট্রিক্ট অ্যাটর্নির হাতে চলে যায়। এর ফলে ল্যাগানা ও তার গ্যাংয়ের উপর ‘বিগ হিট’ বা চরম উত্তাপ নেমে আসে।

ডেবি এরপর পা বাড়ায় ভিন্সের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। ভিন্সের মুখের উপর এক পট গরম কফি ছুড়ে মেরে নিজের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে সে। এরপর উল্লাসের সঙ্গে ভিন্সকে জানায়, সে বার্থা ডানকানকে খুন করেছে। প্রতিশোধ নিতে ডেবি যা যা করেছে, তার প্রতিক্রিয়ায় তাকে শ্বাসরোধ করে খুন করতে উদ্যত হয় ভিন্স। আর তখনই, কঠিন পাহারা এড়িয়ে ভিন্সের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পড়ে ডেভ। ভিন্সকে সেখানেই হত্যা করার বদলে, বরং আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে, পুলিশের হাতে তুলে দেয় সে। এভাবেই নিজের ‘ঘৃণা, হত্যা ও প্রতিশোধের’ সমাপ্তি টানে ডেভ।

শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি, ডেভ তার চাকরি ফিরে পেয়েছে, এবং আবারও একজন পুলিশ হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়েছে ভালো কিছু করার পক্ষে। এ বিষয়টিকে ম্যাকআর্থার তার লেখায় বর্ণনা করেছেন, ডেভ আবারও ‘পুলিশ ফোর্সে যোগ দিলো, সমাজে তার পুনঃজিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন হলো’, আর সে আবারও ফিরে পেল নিজ জীবনের নিয়ন্ত্রণ। ফিউরিতে জো উইলসনের পরিসমাপ্তির মতো, এই সিনেমায়ও সিনেমাটির শুরুতে দেখা ভদ্র ও মানবিক এক মানুষ হিসেবেই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হলো ডেভ। লাংয়ের সিনেমাগুলোর পারভাসিভ থিমের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মেতেছিল ডেভ ঠিকই; তবে এ বেলা সেই লড়াইয়ে সে হারেনি। যদিও মুক্তির পর ‘দ্য বিগ হিট’ একটা গতানুগতিক ক্রাইম মেলোড্রামার মতোই সাফল্য পেয়েছে; তবে বছরের পর বছর ধরে অবিরামভাবে এটির সমাদর সমালোচক মহলে বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটিকে এখন এক কথায় সর্বকালের সেরা ক্লাসিক থ্রিলারগুলোর অন্যতম হিসেবে ভক্তি করা হয়।

দৃশ্য । হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস
দৃশ্য । হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস

‘দ্য বিগ হিট’-এর পর আরেকটি ক্রাইম থ্রিলার নির্মাণ করেন লাং; নাম, ‘হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস’। এ প্রসঙ্গে তার স্মৃতিচারণা, “শিকাগোতে ঘটা একটি সত্যিকারের হত্যা-মামলার ভিত্তিতে এর কাহিনী। পত্রিকায় আমি পড়েছি, অপরাধ সংগঠনের পর আয়নায় সে লিখে রাখত, ‘আমি আর কাউকে মারার আগে আমাকে গ্রেফতার করো’। এ থেকেই আমি কাহিনীটি বানিয়েছি।”

রবার্ট ম্যানারস [জন ড্রিউ ব্যারিমোর অভিনীত] নামের এক সেক্স মার্ডারারকে ঘিরে এর কাহিনী– যা আমাদেরকে ‘এম’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও লাংয়ের জার্মান মাস্টারপিস ‘এম’-এর সঙ্গে ‘হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস’-এর তেমন যোগসূত্র নেই; বরং এই ফিল্মটি সলিড ও সাসপেন্সফুল থ্রিলার। বস্তুতপক্ষে এই সিনেমা যা ফুটিয়ে তুলেছে, সেটিকে ডগলাস ব্রডি ব্যাখ্যা করেছেন, এই ফিল্মটি এবং অন্যান্য থ্রিলার ফিল্মের ‘সাবজেক্ট হিসেবে নৈশজগতের’ পাপীষ্ঠদের বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এই ফিল্মমেকারের সবিশেষ দক্ষতার টার্ম দিয়ে। ঘটনা হলো, জার্মানিতে থাকাকালে থ্রিলার [বিশেষ করে, ‘মাবুজা’ ফিল্মগুলো ও ‘এম’] নির্মাণের সবিশেষ দক্ষতা অর্জন করা লাং হলিউডে ফার্স্ট-ক্লাস থ্রিলার [‘ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো’; ‘দ্য বিগ হিট’] নির্মাণ নিরাপদভাবে অব্যাহত রেখে আমেরিকান সিনেমায় থ্রিলার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। এভাবে প্রমাণ করেছেন, হলিউডে তিনি মামুলি কোনো বিদেশি ফিল্মমেকার নন; বরং একজন ‘প্রকৃত’ আমেরিকান ফিল্মমেকারই।

‘হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস’ ও হলিউডে নিজের শেষ ফিল্ম হতে যাওয়া ‘বিয়ন্ড অ্যা রিজনেবল ডাউট’-এর শুটিংকালে প্রডিউসার বার্ট ফ্রাইডলবের সঙ্গে বেশ কয়েকবার তিক্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন লাং। এইসব অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার ফলে, হলিউডকে বিদায় জানানোটাই শ্রেয় ধরে নেন তিনি : “অতীতের দিকে ফিরে তাকালাম; আর যেহেতু হার্ট অ্যাটাকে মরার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, তাই নিজেকেই বললাম, ‘এই ইঁদুর-দৌড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটাই ঠিক হবে তোমার জন্য।’ ফলে এখানে [হলিউডে] আর কোনো সিনেমা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম আমি।”

১৯৫৮ সালে জার্মান প্রডিউসার আর্টুর ব্রাউনারের আমন্ত্রণে জার্মানিতে ফিরে আসেন লাং; উদ্দেশ্য_ ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বানানো তার দুই পর্বের জার্মান ফিল্ম, ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’ ও ‘নিবেলুং সাগা’র স্মৃতিজাগানিয়া একটি দুই পর্বের সিনেমা নির্মাণ। এই দুই পর্বের সিনেমাটি ছিল ভারতীয় এক মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে। প্রথম পর্বের শিরোনাম, ‘দ্য টাইগার অব এখনাপুর’; আর দ্বিতীয়টির, ‘দ্য হিন্দু টম্ব’। ফিল্ম দুটির প্রিমিয়ার হয় জার্মানিতে, ১৯৫৯ সালে; কিন্তু আমেরিকায় দুটি পর্বকে একটি অখণ্ড ৯৫ মিনিটের ফিচার ফিল্ম হিসেবে, ‘জার্নি টু দ্য লস্ট সিটি’ নামে মুক্তি দেওয়া হয়। ফিল্মটির জার্মান ও আমেরিকান_ উভয় ভার্সনেই অবশ্য লাংয়ের ভারতীয় মহাকাব্যটি স্রেফ একটি রুটিন কস্টিউম ড্রামা হয়েই রয়ে যায়।

পোস্টার । দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা
পোস্টার । দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা

এরপর একই প্রডিউসারের কাছ থেকে, মাবুজা ফিল্মের আরেকটি সিক্যুয়েল বানানোর প্রস্তাব পান লাং। ‘ড. মাবুজা, দ্য গেম্বলার’ ও ‘দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা’র সিক্যুয়েল হিসেবে ‘দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা’ শিরোনামে যে সিনেমাটি তিনি নির্মাণ করেন, ঘটনাচক্রে সেটিই হয়ে থাকে তার সর্বশেষ সিনেমা।

হলিউডে পাড়ি জমানোর পর লাংয়ের কাজের অবনতি ঘটেছে নাকি ঘটেনি_ তার ক্যারিয়ারের দিকে চোখ রেখে এই প্রশ্ন তুলেছেন লিল্যান্ড পোগ। তিনি এমন কিছু সমালোচকের বিতর্ককে জাহির করেছেন, যাদের মতে, নিজের জার্মান সিনেমাগুলোর উপর একজন অথর হিসেবে লাং ব্যক্তিগত সিলমোহর সাঁটতে সক্ষম হলেও, তার আমেরিকান সিনেমাগুলো ছিল হলিউড ফ্যাক্টরি সিস্টেমের স্রেফ নৈর্ব্যক্তিক প্রোডাক্ট। এর পাশাপাশি লাংয়ের আমেরিকান সিনেমাগুলোকে নোয়েল বুর্চ অভিযুক্ত করেছেন ‘দীর্ঘ নৈঃশব্দ ধারণ করা কম-বেশি ত্রিশটি’ কাজ হিসেবে [প্রকৃত অর্থে, আমেরিকায় মোট বাইশটি ফিল্ম বানিয়েছিলেন লাং]।

অন্যদিকে, জন ম্যাকার্টির দাবী, হলিউড স্টুডিও সিস্টেমের অংশ হওয়ার পরও লাংয়ের সৃজনশীলতায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ম্যাকার্টি বরং বিশ্বাস করেন, হলিউডে লাংয়ের কাজগুলো ‘ছিল পুরোপুরি তার জার্মান সিনেমাগুলোর মতোই প্রকাশমুখর, ব্যক্তিগত, আর সিনেমাটিক্যালি সুদক্ষ’। মাইকেল বারসনের মতে, হলিউডে ইউরোপিয়ান শরণার্থীদের বানানো সব সিনেমার মধ্যে লাংয়ের আমেরিকান ফিল্মগুলোর অবস্থান সুস্পষ্টত দৃঢ়, “কেননা, হলিউডের [থ্রিলার, ওয়েস্টার্ন ও এ রকম অন্যান্য] কেতাদুরস্ত ধারাগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষমতা ছিল তার।… লাংয়ের কাজের ব্যাপক তারুণ্যদীপ্ত কাঠামো প্রমাণ করে, তার ফিল্মি-রাজত্বের আইনি দরপত্রের ক্ষেত্রে আতঙ্ক কিংবা আকাঙ্ক্ষার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কোনো বালাই নেই।”

সবচেয়ে বড় কথা, নিজের জার্মান ও আমেরিকান_ উভয় ফিল্মেই নিজের সেই ভিশনকে অবিরাম প্রকাশ করে গেছেন লাং_ যেখানে, রক্তয়ী লড়াই থেকে সৃষ্ট একটি নিরপেক্ষ মহাবিশ্বে নিয়তির বিরুদ্ধে নির্ভীক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস জাগিয়ে গেছেন তিনি।

সংক্ষেপে বললে, জার্মান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সময় নিজের সিনেমায় নিজের থিমেটিক ভিশনের যে পারসোনাল স্ট্যাম্প বা ব্যক্তিগত সিলমোহর তিনি সেঁটে দিয়েছিলেন, আমেরিকান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সময় বানানো সিনেমাগুলোতে সেটি অক্ষুণ্ন ছিল। ফলে, ক্যারিয়ার জুড়ে করা তার কাজগুলো সম্মিলিতভাবে হয়ে উঠেছে একটিই কাজ; আর তা তাকে সুস্পষ্টভাবেই আসীন করে দিয়েছে সিনেমার ইতিহাসের একেবারেই প্রথম সারির ‘অথর’দের অন্যতমের আসনে। নিজের সিনেমায় সূক্ষ্মভাবে জড়িয়ে থাকা থিমটির ব্যাপারে তিনি সচেতন ছিলেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে লাং একবার বলেন, “আমার সিনেমাগুলোর থিমেটিক তাৎপর্যসমূহকে সেগুলোর অর্থসহকারে প্রকাশ করতে আমি শেষতক পছন্দ করি না। কখনো কখনো এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে আমার কাছে; আর আমি কখনোই নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সাক্ষাৎকার দিই না। আমার যা বলার, তা সিনেমাতেই বলি; আর সেগুলো নিজের মতো করেই জবাব দিয়ে যায়।”

জীবনের শেষ দিনগুলোতে, জগৎজুড়ে নিজের করা এক জীবনের কাজের জন্য সরকারি স্বীকৃতি লাভ করেন লাং। ১৯৬৩ সালের বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের গোল্ডেন রিবন অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন তিনি; আর ১৯৬৫ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে ‘আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ [Officier des Arts et Lettres] অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। নিজের জন্মশহর ভিয়েনায় তিনি ১৯৭১ সালে, প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ফিরে আসেন_ অস্ট্রিয়ার এই রাজধানী থেকে, এ শহরেরই সন্তানকে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদকটি গ্রহণ করতে; অর্থাৎ, ‘দ্য মেডেল অব হনার অব দ্য সিটি অব ভিয়েনা’। ১৯৭৩ সালে ‘ডিরেক্টরস গিল্ড অব আমেরিকা’ তাকে একটি জমকালো শ্রদ্ধার্ঘ জানিয়ে সম্মানিত করে। এছাড়াও নিজের কাজের জন্য লাং যেসব বড় বড় পুরস্কার অর্জন করেছেন, তার মধ্যে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট ইন নিউইয়র্ক [১৯৬৭], লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টি মিউজিয়ান অব আর্ট [১৯৬৯] ও মস্কো ফিল্ম ইনস্টিটিউটের [১৯৭৫] দেওয়া সম্মাননা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া, ১৯৯৬ সালের বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘এম’-এর একটি রিস্টোরড ভার্সন প্রদর্শনের মাধ্যমে এই ফিল্মমেকারের প্রতি জানানো হয় বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রথম প্রিমিয়ারের পর যে আট মিনিটের ফুটেজ কেটে ফেলা হয়েছিল, সেটিকে ফিল্মটির সঙ্গে পুনঃসংযোগ করে দেওয়া হয়েছিল এই ভার্সনে।

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত, লাংকে নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘ফ্রিৎস্ লাং : দ্য ন্যাচার অব দ্য বিস্ট’-এ প্যাট্রিক ম্যাকগিলিগ্যান নিজের বিবেচনায় এই ফিল্মমেকারের শ্রেষ্ঠ সিনেমাগুলোর একটি তালিকা হাজির করেছেন। লাংয়ের জার্মান সিনেমাগুলোর মধ্যে সাইলেন্ট ও প্রথম সাউন্ড মাবুজা ফিল্মগুলো, ‘নিবেলুং সাগা’, ‘মেট্রোপলিস’ ও ‘এম’-এর নাম উল্লেখ করেছেন তিনি_ যেগুলো সিনেমা মাধ্যমটি যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন দর্শকদের কাছ থেকে সম্ভ্রম পাওয়ার ও তাদের বিনোদিত করার ক্ষমতা রাখে। তাছাড়া, শক্তিমত্তা ও ব্যক্তিগত অর্জনের হিসেবে, হলিউডে বানানো লাংয়ের সেরা ফিল্মগুলোর তালিকায় ম্যাকগিলিগ্যান অন্তর্ভুক্ত করেছেন ‘ফিউরি’, ‘ইউ অনলি লিভস ওয়ানস’, ‘স্কারলেট স্ট্রিট’ ও ‘দ্য বিগ হিট’-এর নাম। ম্যাকগিলিগ্যানের এই তালিকাটি খুব সহজেই অনুমোদনযোগ্য।

‘দ্য অক্সফোর্ড হিস্টোরি অব ওয়ার্ল্ড সিনেমা’ গ্রন্থে লাংয়ের অর্জনকে জেনেট বার্গস্ট্রম সারসংক্ষেপ করে বলেছেন, ‘মেট্রোপলিস’-এর মতো ক্যারিয়ারের একেবারেই শুরুর দিকের সাইলেন্ট ফিল্ম থেকে শুরু করে ‘দ্য বিগ হিট’-এর মতো ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ের আমেরিকান সিনেমাগুলো পর্যন্ত_ দীর্ঘ ক্যারিয়ার জুড়ে ‘সিরিয়াসনেস ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে সিনেমার প্রতি নিজস্ব ভিশনকে স্পষ্ট করার’ ব্যাপারে অধ্যাবসায়ী ছিলেন এই মাস্টার ফিল্মমেকার। ফলে, তার সিনেমায় যে ঋদ্ধতা ও সামঞ্জস্য রয়েছে_ তা আন্তর্জাতিক সিনেমায় একেবারেই স্বতন্ত্র।

জেন ডি. ফিলিপস। আমেরিকান লেখক, সিনে-সমালোচক ও ধর্মযাজক
গ্রন্থ : এক্সাইলস ইন হলিউড : মেজর ইউরোপিয়ান ফিল্ম ডিরেক্টরস ইন আমেরিকা/
জেন ডি. ফিলিপস। লিহাই ইউনিভার্সিটি প্রেস। ১৯৯৮

ফ্রিৎস্ লাং
ফ্রিৎস্ লাং

ফ্রিৎস্ লাংয়ের ফিল্মোগ্রাফি

১৯১৯ : হাফ-ব্লাড/হাফ ব্রিড [Halbblut]* *১
দ্য মাস্টার অব লাভ [Der Herr der Liebe]*
দ্য স্পাইডারস : পার্ট ওয়ান [Die Spinnen, 1. Teil – Der Goldene See]
ম্যাডাম বাটারফ্লাই [Harakiri]
১৯২০ : দ্য স্পাইডারস : পার্ট টু [Die Spinnen, 2. Teil – Das Brillantenschiff]
দ্য মুভিং ইমেজ / দ্য ওয়ান্ডারিং ইমেজ / দ্য ওয়ান্ডারিং শ্যাডো
[Das wandernde Bild]*১
১৯২১ : ফোর অ্যারাউন্ড অ্যা ওম্যান [Vier Um Die Frau]
ডেসটিনি [Der müde Tod]
১৯২২ : ড. মাবুজা দ্য গেম্বলার [Dr. Mabuse, der Spieler]
১৯২৪ : দ্য নিবেলুংস / দ্য নিবেলুং সাগা [Die Nibelungen]*১
১৯২৭ : মেট্রোপলিস [Metropolis]
১৯২৮ : স্পাইজ [Spione]
১৯২৯ : ওম্যান ইন দ্য মুন [Frau im Mond]
১৯৩১ : এম [M]
১৯৩৩ : দ্য টেস্টামেন্ট অব ড. মাবুজা [Das Testament des Dr. Mabuse]
১৯৩৪ : লিলিয়াম [Liliom]
১৯৩৬ : ফিউরি [Fury]
১৯৩৭ : ইউ অনলি লিভ ওয়ানস [You Only Live Once]
১৯৩৮ : ইউ অ্যান্ড মি [You and Me]
১৯৪০ : দ্য রিটার্ন অব ফ্র্যাঙ্ক জেমস [The Return of Frank James]
১৯৪১ : ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন [Western Union]
ম্যান হান্ট [Man Hunt]
১৯৪২ : মুনটাইড [Moontide]
১৯৪৩ : হ্যাংমেন অলসো ডাই! [Hangmen Also Die!]
১৯৪৪ : মিনিস্ট্রি অব ফিয়ার [Ministry of Fear]
দ্য ওম্যান ইন দ্য উইন্ডো [The Woman in the Window]
১৯৪৫ : স্কারলেট স্ট্রিট [Scarlet Street]
১৯৪৬ : ক্লোক অ্যান্ড ডেগার [Cloak and Dagger]
১৯৪৮ : সিক্রেট বিয়ন্ড দ্য ডোর [Secret Beyond the Door]
১৯৫০ : হাউস বাই দ্য রিভার [House by the River]
আমেরিকান গেরিলা ইন দ্য ফিলিপাইনস [American Guerrilla in the Philippines]
১৯৫২ : রেঞ্চো নটোরিয়াস [Rancho Notorious]
ক্ল্যাশ বাই নাইট [Clash by Night]
১৯৫৩ : দ্য ব্লু গার্ডেনিয়া [The Blue Gardenia]
দ্য বিগ হিট [The Big Heat]
১৯৫৪ : হিউম্যান ডিজায়ার [Human Desire]
১৯৫৫ : মুনফ্লিট [Moonfleet]
১৯৫৬ : হোয়াইল দ্য সিটি স্লিপস [While the City Sleeps]
বিয়ন্ড অ্যা রিজনেবল ডাউট [Beyond a Reasonable Doubt]
১৯৫৯ : দ্য টাইগার অব এখনাপুর [Der Tiger von Eschnapur]
দ্য ইন্ডিয়ান টম্ব [Das indische Grabmal]
১৯৬০ : দ্য থাউজেন্ড আইজ অব ড. মাবুজা Die tausend Augen des Dr. Mabuse]

* লস্ট ফিল্ম
*১ ফিল্মটির ইংলিশ/ইন্টারন্যাশনাল টাইটেল একাধিক

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

2 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন